বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সামনের কয়েক মাসে আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য এবং এল নিনোর প্রভাবে খরায় শস্য উৎপাদন কমার আশঙ্কা মিলে এই চাপ ২০২৭ সালজুড়েও থাকতে পারে। সবচেয়ে বেশি ভুগছেন মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের দরিদ্র পরিবারগুলো, যাদের আয়ের বড় অংশ যায় খাবার কেনায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেছেন, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে, যার বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে এ বছরের শেষে, আগামী বছরের শুরুতে এবং সম্ভবত পুরো ২০২৭ সালে। এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক সেপ্টেম্বরে গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ১৫০টি দেশের ২২ শতাংশে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়েছে; আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ।
কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য পরিবহন অবকাঠামোয় হামলায় গমের চালান ব্যাহত হচ্ছে, ফলে মিসর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারকদের বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তাঝুঁকিতে জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে যেতে হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে; কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো পথে জাহাজভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানি বিঘ্নিত হয়ে কৃষি উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। একই সময়ে এল নিনোর শুষ্ক আবহাওয়া ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফসলকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, আর বড় মজুত থাকা সত্ত্বেও এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুতে সারের দাম যে চূড়ায় উঠেছিল, সেখান থেকে কিছুটা নামলেও এখনো তা বেশি। মিসরে ভর্তুকিবিহীন বড় একটি রুটির দাম জুলাইয়ের চার পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় পাঁচ মিসরীয় পাউন্ড হয়েছে; সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ, আর বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদক ইন্দোনেশিয়ায় ভোজ্যতেলের দাম এ বছর বেড়েছে ৭ শতাংশ। ভারতে উৎপাদন ঘাটতিতে সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের চেয়ে ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
সামনে চাহিদার চাপও বাড়তে পারে। ভালো ফলনের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি বড় আমদানিকারক সম্প্রতি কেনাকাটা কমিয়েছিল, কিন্তু স্থানীয় মজুত কমে আসায় তাদের আবার আমদানিতে ফিরতে হতে পারে। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেকজান্ডার কারাভাইতসেভ বলেছেন, কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারকেরা বাজারে ফিরলে চাহিদার বড় নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে। তোরেরোর ভাষায়, আগের মৌসুমের ভালো ফলন আর রেকর্ড মজুত এত দিন বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে, কিন্তু সেই সুরক্ষা এখন চাপে, ফলে দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারীরাও বাড়তি খরচের মুখে। তারা সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে, নতুন চুক্তিতে বেশি দাম দিতে হচ্ছে, আর স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ব্যয় আরও বাড়ছে। নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন বাস্তব সমস্যা। ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদক পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকুস ওয়েলিরাংয়ের কথায়, জাহাজভাড়া বেড়েছে, আর রুপিয়াহর দর কমায় ডলারে পরিশোধ করা আমদানির খরচ স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেশি পড়ছে।
ছবি: H. Hakan Atik / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0); কায়রোর নাশতার টেবিলে স্থানীয় রুটি ‘আইশ বালাদি’ ও ফুল মেদামেস, প্রতীকী ছবি
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)