জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা এবং নারী অধিকারকর্মী মারজিয়া প্রভা প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক কলামে বলেছেন, দেশের কৃষি আর খামারের বড় ভার এখন গ্রামীণ নারীর কাঁধে, কিন্তু কৃষি ও অর্থনীতির মূলধারার আলোচনায় তাঁদের প্রায় দেখাই যায় না।
লেখকদের যুক্তির ভিত্তি বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ (২০২৪)। তাঁরা লিখেছেন, দেশে কৃষিতে যুক্ত পুরুষ এক কোটি ৩০ লাখ, আর নারী এক কোটি ৭০ লাখ; অর্থাৎ বেশ কয়েক বছর ধরেই কৃষিতে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাঁদের মতে, পুরুষ সদস্য শহরে অটোরিকশা চালাতে বা হকারি করতে গেলে গ্রামে চাষ, ধান কাটা আর হাঁস-মুরগি-গরুর খামার সামলান পরিবারের নারীরাই, আর শহরের আয় দিয়ে তাঁরা বর্গা জমি, খামার ও এনজিওর কিস্তিতে বিনিয়োগ করেন।
কলামে বাজারের চাপকে কৃষক নারীর বড় লড়াই হিসেবে দেখানো হয়েছে। লেখকদের হিসাবে বাজারের ৮০ শতাংশ বীজ দেশি-বিদেশি কোম্পানির দখলে, পাঁচ বছরে কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ, আর একই সময়ে বাচ্চা মুরগির দাম বেড়েছে ২৫ টাকা। সার-সংকট, অসৎ ডিলার আর ফিডের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষুদ্রঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি, যার মূল গ্রহীতা নারী।
প্রস্তাবিত মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন লেখকেরা। তাঁদের ভাষ্য, চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ডিম, দুধ, হিমায়িত গরুর মাংস, মুরগির মাংস, মাখন, দই ও পনিরের মতো ডেইরি ও পোলট্রি পণ্য শূন্য শুল্কে আমদানির কথা আছে। এক যুগে দেশে গরু-ছাগল বেড়েছে এক কোটি এবং এই খাতে প্রায় ৭০ লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে বলে উল্লেখ করে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, ভর্তুকিপ্রাপ্ত বিদেশি পণ্যের সঙ্গে সিরাজগঞ্জের একজন নারী খামারি টিকবেন কীভাবে। নব্বইয়ের দশকে গুঁড়া দুধের অবাধ আমদানিতে মিল্ক ভিটার দুধ সংগ্রহ পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে আসার উদাহরণও তাঁরা টেনেছেন।
রামপাল, মাতারবাড়ী, বাঁশখালী ও পায়রার মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় উচ্ছেদ হওয়া নারী কৃষকদের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা থেকে লেখকেরা লিখেছেন, কৃষিজমি অধিগ্রহণের পর প্রথম ক্ষতির মুখে পড়ে পরিবারের কন্যাশিশু: স্কুল ছাড়া, তারপর বাল্যবিবাহ। জলবায়ু তহবিলের প্রসঙ্গে তাঁদের হিসাব, ১৪ বছরে দেশে এসেছে ২৬৮ মিলিয়ন ডলার, কিন্তু হাওর, বাঁওড়, চর ও উপকূলের নারীর পানির সংকট বা অর্থনৈতিক বিপন্নতা তাতে কতটা কমেছে, সে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
লেখকদের উপসংহার, গ্রাম ও শহর, নারী ও পুরুষ, কৃষি ও শহরের অনানুষ্ঠানিক আয় যে একসঙ্গে বাঁধা, তা না বুঝে কৃষিনীতি বা বাণিজ্যনীতি ঠিক করা যায় না; বাজার, শুল্ক আর মেগা প্রকল্পের প্রশ্নকে তাঁরা সরাসরি গ্রামীণ নারীর প্রশ্ন হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকদের নিজস্ব।
ছবি: Clarence Woodrow Sorensen / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন); ধানের চারা রোপণে নারীরা, প্রতীকী ছবি
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)