দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগাম জেলার কাইমোহ গ্রামের কৃষক নাজির আহমদ আপেলের চারাগাছের সারি দেখিয়ে বলেন, বিশ বছর আগে এর সবই ছিল ধানখেত, জানিয়েছে মোঙ্গাবে ইন্ডিয়া। ধানের জন্য তৈরি সেচনালা এখনো খেতের ভেতর দিয়ে বয়ে যায়, কিন্তু খরচ বাড়া আর ধানে লাভ কম হওয়ায় কাশ্মীর উপত্যকাজুড়ে কৃষকেরা খাদ্যফসলের জায়গায় বাগান করছেন, বিশেষ করে ঘন রোপণের আপেলবাগান।
একক কৃষকের হিসাব সহজ। কুলগামের নিসার আহমেদ নয় কানাল (০.৪৬ হেক্টর) জমিতে ধান চাষ করে বছরে ৩০ থেকে ৫০ হাজার রুপি পেতেন; ঘন রোপণের আপেলবাগান করার পর তাঁর পরিবার মৌসুমে আয় করে ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি। জম্মু ও কাশ্মীরে ধানের জমি ২০১৫-১৬ সালের ৩ লাখ ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর থেকে ২০২৪-২৫ সালে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮৪০ হেক্টরে নেমেছে, প্রায় ১৫ শতাংশ কম; আর আপেলের জমি ২০০৪-০৫ সালের ১ লাখ ৭ হাজার ৯৩০ হেক্টর থেকে বেড়ে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৩ হেক্টর। কুলগামে এখন আপেল ১৮ হাজার ২৫৫ হেক্টরে, ধান মাত্র ৬ হাজার ৯৫১ হেক্টরে।
২০২৪-২৫ সালে অঞ্চলটিতে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টন চাল উৎপাদন হলেও উদ্বৃত্ত রাজ্য, মূলত পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে আনতে হয়েছে ৪ লাখ ৮৬ হাজার টন, যা আগের বছর ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার এবং ২০২২-২৩ সালে ৩ লাখ ৭৪ হাজার টন। শের-এ-কাশ্মীর কৃষিবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (স্কাস্ট-কে) কৃষিতত্ত্বের অধ্যাপক আশাক হোসেনের হিসাবে অঞ্চলটি নিজের চালের চাহিদার মাত্র ৫০-৫৫ শতাংশ উৎপাদন করে। কাশ্মীরের কৃষি পরিচালক সারতাজ আহমদ শাহ জানান, কত ধানের জমি বাগানে বদলেছে তার হিসাব তাঁদের বিভাগ রাখে না, তবে বাইরের চালের ওপর নির্ভরতা যে বেড়েছে তা তিনি স্বীকার করেন। ধানের জমিকে বাগানে রূপান্তর থেকে রক্ষার কোনো আলাদা নীতি নেই।
বিজ্ঞানীরা বড় প্রভাবের কথাও বলছেন। স্কাস্ট-কের গবেষক সামিনা লোন বলেন, বাগানে মাটির গঠন ও আর্দ্রতা বদলে যায়, আর ফসলের বৈচিত্র্য কমলে কৃষক বাজারের ওঠানামা, রোগবালাই ও আবহাওয়ার ঝুঁকিতে বেশি পড়েন; সম্প্রতি শোপিয়ান ও কুলগামে শিলাবৃষ্টিতে বাগানের ক্ষতি হয়েছে, কোথাও কোথাও সেই মৌসুমে তৃতীয়বার। কেন্দ্রীয় ভূগর্ভস্থ পানি বোর্ডের জলভূতত্ত্ববিদ পীর রইস আহমদ জানান, পানিতে ডোবানো ধানখেত অগভীর জলস্তরে পানি ফেরায় এবং বৃষ্টির পানি ধরে রেখে বন্যার চাপ কমায়; ধানখেত হারালে ঝিলাম নদীর প্লাবনভূমিতে পুনর্ভরণ কমতে ও বন্যা বাড়তে পারে। আশাক হোসেনের সতর্কতা, নিচু ও ভেজা জমি ধানের জন্যই উপযুক্ত; সেখানে বাগান করলে শিকড় পচা ও রোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য একমত নন। এজাজ আইয়ুবের মতে, কাশ্মীরের উচিত যেখানে তার সুবিধা, যেমন আপেল, জাফরান, কাঠবাদাম ও আখরোট, তা উৎপাদন করে সেই আয়ে চাল কেনা। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাভেদ ইকবাল খান একে বলছেন বৃহৎ পরিসরের কাঠামোগত ঝুঁকি: প্রতিটি কৃষকের জন্য সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক, কিন্তু সব মিলিয়ে তা উপত্যকার খাদ্য সরবরাহকে সড়ক, বাজার ও সরবরাহপথের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে।
ছবি: Revoshots / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: Mongabay India



মন্তব্য
(০)