সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৭°আংশিক মেঘলাআর্দ্রতা ৮৬%বাতাস ৭ কিমি/ঘ

ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষিতে করণীয় কাজ: ফসল ধরে ধরে মাঠের পঞ্জিকা

শীত বিদায় আর গরমের শুরু, ফেব্রুয়ারিতে একসঙ্গে ফসল তোলা, বীজ বোনা আর পরিচর্যার চাপ। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাসভিত্তিক পরামর্শ ধরে বোরো, গম, ভুট্টা, পাট, ডাল, সরিষা, সবজি, আম-লিচু, পুকুর ও গবাদি পশুর এ মাসের কাজ।

ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষিতে করণীয় কাজ: ফসল ধরে ধরে মাঠের পঞ্জিকা
অন্যান্য

ফেব্রুয়ারির ভোরে মাঠে নামলে একসঙ্গে দুই ঋতুর দেখা মেলে। কুয়াশা তখনো পুরো কাটেনি, অথচ দুপুরের রোদে গায়ে তাপ লাগে। একদিকে হলুদ সরিষার খেত শুকিয়ে বাদামি হয়ে আসছে, গমের শিষে দানা শক্ত হচ্ছে, আরেকদিকে বোরোর সবুজ চারা দিনে দিনে ঝাড়ালো হচ্ছে, আর আমগাছে মুকুলের গন্ধ। শীতের শেষ আর গরমের শুরু, এই সন্ধিক্ষণে কৃষকের হাতে একসঙ্গে অনেক কাজ: কোথাও ফসল তোলা, কোথাও নতুন বীজ বোনা, কোথাও চলমান ফসলের যত্ন। বাংলা পঞ্জিকায় মাসটি পড়ে মাঘের শেষ আর ফাল্গুনের শুরুতে; ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ফাল্গুন শুরু। সঠিক পরিকল্পনা আর সময়মতো কাজ করতে পারলে এই মাসের পরিশ্রমই পরের মৌসুমের ফলন আর আয় নিশ্চিত করে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি তথ্য সার্ভিস, যারা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সরকারি কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরামর্শ কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়, প্রতি মাসে কৃষিকথা পত্রিকায় মাসভিত্তিক করণীয় প্রকাশ করে। সেই পরামর্শের আলোকে ফসল ধরে ধরে দেখা যাক, ফেব্রুয়ারিতে মাঠে কী কী কাজ।

কেন ফেব্রুয়ারি এত ব্যস্ত মাস


বাংলাদেশের কৃষিবর্ষ সাধারণত তিনটি মৌসুমে ভাগ করে দেখা হয়: মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য মার্চ পর্যন্ত রবি, মধ্য মার্চ থেকে মধ্য জুলাই খরিপ-১, আর মধ্য জুলাই থেকে মধ্য অক্টোবর খরিপ-২। ফেব্রুয়ারি পড়ে রবি মৌসুমের একেবারে শেষ ভাগে, খরিপ-১ শুরুর ঠিক আগে। তাই একই জমিতে একটি ফসল বিদায় নিচ্ছে আর আরেকটির প্রস্তুতি চলছে। শীতের ফসল ঠিক সময়ে না তুললে গ্রীষ্মের ফসল বুনতে দেরি হয়, আবার গ্রীষ্মের ফসল দেরিতে বুনলে বর্ষার পানি আসার আগে তা ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। এক মাসের দেরি পরের দুই মৌসুমের হিসাবে গিয়ে পড়ে, এ কারণেই ফেব্রুয়ারিকে কৃষকেরা ব্যস্ততম মাসগুলোর একটি মনে করেন।

বোরো ধান: পানি, সার আর পোকার দিকে নজর


ফেব্রুয়ারিতে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বোরো ধানের চারা মাঠে বেড়ে উঠছে। বোরো দেশের সবচেয়ে বড় ধানের মৌসুম, আর পুরোটাই সেচনির্ভর। তাই এ মাসের প্রথম কাজ জমিতে পানি ঠিকমতো ধরে রাখা এবং গাছের বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত সেচ নিশ্চিত করা। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো, ধানের কাইচ থোড় আসা, অর্থাৎ গাছের ভেতরে শিষ তৈরি হওয়া শুরু থেকে দানায় দুধ আসা পর্যন্ত খেতে পানি ধরে রাখতে হবে। এই সময় পানির ঘাটতি হলে শিষ ছোট হয়, দানা চিটা হয়ে যায়।

তবে সব সময় খেত ডুবিয়ে রাখার দরকার নেই। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতির কথা বলে আসছে। চারা রোপণের প্রায় ১৫ দিন পর থেকে খেতে ছিদ্রযুক্ত একটি প্লাস্টিকের পাইপ পুঁতে রাখা হয়; পাইপের ভেতরে পানি মাটির প্রায় ২০ সেন্টিমিটার নিচে নেমে গেলে আবার সেচ দেওয়া হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে ব্রির গবেষণার বরাতে বলা হয়েছে, এতে সেচের পানি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হয় এবং সেচের খরচ কমে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। ডিজেল বা বিদ্যুতে চলা পাম্পের খরচ যেখানে বোরো চাষের বড় বোঝা, সেখানে এই সাশ্রয় কৃষকের পকেটে সরাসরি পৌঁছায়। শুধু শিষ বের হওয়া ও ফুল ফোটার সময়টায় খেতে পানি রাখতেই হবে।

সারের ক্ষেত্রে ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ প্রয়োজনমতো দিতে হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, চারার বয়স ৫০ থেকে ৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরি প্রয়োগ করতে হবে। উপরি প্রয়োগ মানে জমি তৈরির সময় নয়, দাঁড়িয়ে থাকা ফসলের ওপর ছিটিয়ে দেওয়া। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো, সার দেওয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। আগাছা থাকলে সারের ভাগ নেয় আগাছা, আর দাঁড়ানো পানিতে ছিটানো ইউরিয়ার একটি অংশ ভেসে বা বাতাসে উড়ে নষ্ট হয়। হাওরাঞ্চলে বোরো আগেভাগে লাগানো হয় এবং বৈশাখের আগাম ঢলের আগেই ঘরে তোলার তাড়া থাকে; সেখানে ফেব্রুয়ারির এই পরিচর্যায় দেরি হলে পুরো মৌসুমের হিসাব ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।

এ সময় মাজরা পোকা, যা কাণ্ডের ভেতরে ঢুকে গাছ শুকিয়ে দেয়, আর পাতামোড়ানো পোকা, যা পাতা মুড়িয়ে ভেতরের সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে, দুটোরই আক্রমণ দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়, তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আগে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়। এর মানে হলো রাতে আলোর ফাঁদ দিয়ে পোকার উপস্থিতি যাচাই, খেতে ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা, উপকারী পোকা সংরক্ষণ, আর শুধু যখন ক্ষতির মাত্রা বেশি তখনই সঠিক মাত্রায় কীটনাশক। পাশাপাশি ব্লাস্ট, পাতাপোড়া, টুংরো ও উফরা রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে।

গম: আগাছা, সেচ আর রোগের সতর্কতা


উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের গমের খেতে ফেব্রুয়ারি হলো দানা গঠনের মাস। এ সময় জমি আগাছামুক্ত রাখা এবং সঠিক পরিমাণে সেচ দেওয়া জরুরি। মাঘ মাসের পরামর্শে কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, গমের বয়স ৫৫ থেকে ৬০ দিন হলে সেচ দিতে হবে, কারণ তখন শিষ বের হয় এবং পানির টান পড়লে দানা পুষ্ট হয় না। গমখেতে ইঁদুরের উপদ্রবও এ সময় বাড়ে; একা একা নয়, পাশের জমির মালিকদের সঙ্গে মিলে একসঙ্গে ইঁদুর দমন করলে ফল ভালো হয়।

রোগের মধ্যে পাউডারি মিলডিউ ও ব্রাউন রাস্টের দিকে নজর রাখতে হবে। পাউডারি মিলডিউ হলে পাতায় সাদা পাউডারের মতো ছত্রাকের আস্তর পড়ে; ব্রাউন রাস্ট বা পাতার মরিচা রোগে পাতায় লালচে বাদামি গুঁড়ার মতো দাগ দেখা যায়। লক্ষণ দেখা দিলেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এর বাইরে গমের ব্লাস্ট রোগ নিয়েও কৃষকের সচেতনতা দরকার; ২০১৬ সালে দেশে প্রথম এই রোগ ধরা পড়ে এবং শিষ বের হওয়ার পর গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এটি দ্রুত ছড়ায়। আক্রান্ত শিষের ওপরের অংশ অকালে সাদা হয়ে শুকিয়ে যায়, ভেতরের দানা পুষ্ট হয় না। খেতে এমন সাদা শিষ চোখে পড়লে দেরি না করে উপজেলা কৃষি অফিসকে জানানো উচিত, কারণ এ রোগ একবার ছড়িয়ে পড়লে থামানো কঠিন।

ফাল্গুনের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শেষ দিক ও মার্চের শুরুতে, আগাম বোনা গম পাকতে শুরু করে। কখন কাটবেন, তার একটি পুরোনো ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা কৃষি তথ্য সার্ভিসও উল্লেখ করেছে: শিষের শক্ত দানা দাঁত দিয়ে কাটলে যদি কট কট শব্দ হয়, তবে বুঝতে হবে কাটার সময় হয়েছে। কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে কাটলে সকালে বা পড়ন্ত বিকেলে কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে দুপুরের কড়া রোদে দানা ঝরে না পড়ে।

ভুট্টা ও পাট: এক ফসল তোলা, আরেক ফসল বোনা


শীতকালীন বা রবি মৌসুমের ভুট্টা এ সময় পাকতে থাকে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী, শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ গাছের মোচার খোসা খড়ের রং ধারণ করলে ভুট্টা সংগ্রহ করতে হবে এবং দানা ভালোভাবে শুকিয়ে তবেই গুদামে তুলতে হবে। ভেজা দানা রাখলে ছত্রাক ধরে। আবার গ্রীষ্মকালীন বা খরিপ মৌসুমের ভুট্টার বীজ বোনার সময়ও এটি; বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত হাইব্রিড জাতগুলো এ মৌসুমের জন্য উপযুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাটচাষিদের জন্যও সময় ঘনিয়ে আসছে। কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, ফাল্গুনের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশ জমিতে ২৫ গ্রাম বীজ লাগে। সারিতে বোনার সুবিধা হলো নিড়ানি ও পরিচর্যা করা যায় কম পরিশ্রমে, আর গাছ সমানভাবে আলো বাতাস পায়। তাই ফেব্রুয়ারির শেষভাগে পাটের জমি চাষ দিয়ে তৈরি রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

ডাল ও তৈলবীজ: ঘরে তোলার সময়


মসুর, মুগ ও ছোলার ফসল সংগ্রহের উপযুক্ত সময় এটি। ডালের গাছ পেকে গেলে শুঁটি ফেটে দানা মাটিতে ঝরে পড়ে, তাই সময়মতো তোলা জরুরি। ফসল কাটার পর জমি পরিষ্কার করে পরবর্তী চাষের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। ডাল ফসলের একটি বাড়তি গুণ আছে: এদের শিকড়ে থাকা উপকারী জীবাণু বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে ধরে রাখে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো, ডাল কাটার সময় গাছের গোড়ার অংশ জমিতে রেখে দেওয়া, যাতে সেই নাইট্রোজেন মাটিতে থেকে যায় এবং পরের ফসল তার সুফল পায়।

সরিষার ক্ষেত্রে সময়ের হিসাব আরও সূক্ষ্ম। শুঁটি পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে সামান্য নাড়াচাড়াতেই ফেটে দানা ঝরে যায়। তাই শুঁটি পুরো শুকিয়ে যাওয়ার আগেই ফসল তুলতে হবে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী, তৈলবীজ ফসলের প্রায় ৮০ শতাংশ পেকে গেলেই কাটা উচিত, তাহলে দানার অপচয় কম হয়। কাটা গাছ কয়েক দিন স্তূপ করে রেখে তারপর মাড়াই করলে দানা কম ঝামেলায় আলাদা হয়ে আসে।

সরিষা তোলার পর জমি ফেলে না রেখে পরবর্তী ফসলের জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। অনেক এলাকায় সরিষার পরেই বোরো লাগানো হয়, কোথাও মুগ বা পাট। পাশাপাশি সূর্যমুখী ও সয়াবিনের জন্য জমি তৈরির কাজও এ সময় চলে। এই দুই তেলফসলে সঠিক সার ব্যবস্থাপনা ফলনের মূল চাবি; মাটি পরীক্ষা করে উপজেলা কৃষি অফিসের সুপারিশ অনুযায়ী সার দেওয়াই নিরাপদ।

সবজি: শীতের ফসল ঘরে, গরমের বীজ মাটিতে


ফেব্রুয়ারিতে সবজির বাগানে দুই ঋতুর অদলবদল সবচেয়ে স্পষ্ট। বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর ও মুলা এখন তোলার সময়। দেরি করলে ফুলকপির ফুল ঢিলে হয়ে যায়, মুলা আঁশ হয়ে যায়, বাজারদরও পড়ে যায়। তাই পরিপক্ব হলেই তুলে ফেলা ভালো।

একই সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন সবজির বীজ বোনার সময়। লাউ, কুমড়া, ঢেঁড়স ও করলার বীজ এখনই বোনা যায়। কৃষি তথ্য সার্ভিস এ সময় ডাঁটা, কলমিশাক, বেগুন ও পটোলের চাষ শুরুর কথাও বলেছে। বীজ বোনার আগে জমিতে পর্যাপ্ত জৈব সার দিতে হবে। চারা গজানোর পর আগাছা পরিষ্কার এবং সেচের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, কারণ ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মাটি দ্রুত শুকাতে শুরু করে। লাউ, কুমড়া বা করলার মতো লতানো সবজির জন্য অনেক কৃষক আগে ছোট পলিব্যাগে চারা তৈরি করে পরে মাদায় লাগান; এতে চারা মরার ঝুঁকি কমে, জমিও কিছুদিন আগের ফসলের জন্য খালি থাকে। লতা বাড়তে শুরু করলে মাচা বা বাউনি তৈরির কাজও এ সময়ই সেরে রাখা ভালো।

শীতের শেষ দিকে টমেটোতে ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ বাড়ে। মাঘ মাসের পরামর্শে কৃষি তথ্য সার্ভিস ফেরোমন ফাঁদ ও নিমের নির্যাস ব্যবহারের কথা বলেছে। ফেরোমন ফাঁদ হলো এমন একটি ফাঁদ, যাতে পোকার নিজস্ব গন্ধের মতো রাসায়নিক রাখা থাকে; পুরুষ পোকা সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদে ধরা পড়ে, ফলে বংশবৃদ্ধি কমে যায়। আলুর খেতে নাবি ধসা রোগ, অর্থাৎ পাতা ও কাণ্ড পচে যাওয়ার রোগ, দেখা দিলে নির্ধারিত সূচি মেনে ছত্রাকনাশক দিতে বলা হয়েছে; আর আলু তোলার পর সঠিক নিয়মে সংরক্ষণের দিকেও নজর দিতে হবে।

ফলবাগান: আম ও লিচুর মুকুল রক্ষার মাস


ফেব্রুয়ারি হলো মুকুলের মাস। আম, কাঁঠাল ও লিচুগাছে এখন ফুল আসছে, আর এই মুকুল রক্ষা করতে পারলেই মৌসুমের ফলন নিশ্চিত হয়। মুকুল রক্ষায় কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয়, তবে কখন দেবেন সেটাই আসল কথা।

আমের মুকুলে এ সময় অ্যানথ্রাকনোজ রোগ দেখা দেয়; এতে মুকুল কালো হয়ে শুকিয়ে ঝরে পড়ে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো, গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে আক্রান্ত গাছে টিল্ট-২৫০ ইসি বা ডাইথেন এম-৪৫ জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করা। আমের আরেক বড় শত্রু হপার বা শোষক পোকা, যা মুকুলের রস চুষে খায় এবং মুকুল ঝরিয়ে দেয়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুকুল ১০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে কিন্তু ফুল ফোটার আগে একবার, এবং আম মটরদানার আকার হলে আরেকবার, সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে স্প্রে করতে হবে।

ছত্রাকনাশকের মাত্রাও কৃষি তথ্য সার্ভিস জানিয়ে দিয়েছে: টিল্ট-২৫০ ইসি হলে প্রতি লিটার পানিতে আধা মিলিলিটার, আর ডাইথেন এম-৪৫ হলে প্রতি লিটারে ২ গ্রাম। আম মটরদানার আকার হলে কীটনাশকের সঙ্গে ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক মিশিয়ে আরেকবার স্প্রে করার পরামর্শও আছে, যাতে কচি আমে অ্যানথ্রাকনোজের দাগ না পড়ে। মাত্রার চেয়ে বেশি ওষুধ দিলে লাভ হয় না, বরং খরচ বাড়ে আর পরিবেশের ক্ষতি হয়।

সেচের ক্ষেত্রেও আমগাছের একটি নিজস্ব হিসাব আছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের আম বাগান পরিচর্যা বিষয়ক লেখায় বলা হয়েছে, ফুল আসার এক মাস আগে সেচ না দেওয়াই উত্তম, কারণ তখন সেচ দিলে গাছে নতুন পাতা বের হয় এবং মুকুলের সংখ্যা কমে যায়। কিন্তু ফল ধরার পর থেকে বর্ষার বৃষ্টি শুরু হওয়া পর্যন্ত মাসে একবার সেচ দেওয়া ভালো। পরে যখন ফলের মাছি ও আমের ভোমরা পোকার ঝুঁকি বাড়ে, তখন ফল ব্যাগিং, অর্থাৎ কচি আম বিশেষ কাগজের ব্যাগে মুড়ে দেওয়া, সবচেয়ে কার্যকর ও লাভজনক উপায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফুল পুরো ফোটা অবস্থায় স্প্রে না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তখন মৌমাছিসহ পরাগায়নকারী পোকা ফুলে আসে; তাদের ক্ষতি হলে ফল ধরাই কমে যায়। কাঁঠালে ফল পচা রোগ দমনে বোর্দো মিশ্রণ প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর যাঁরা নতুন বাগান করতে চান, তাঁরা এ সময় নতুন ফলের চারা রোপণ করতে পারেন; তবে রোপণের পর নিয়মিত পানি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা চাই, কারণ সামনে শুষ্ক মাস।

মাছ চাষ: পুকুরে প্রাণ ফেরানোর সময়


শীতে পানির তাপমাত্রা কম থাকায় মাছ কম খায়, বাড়েও ধীরে। ফেব্রুয়ারিতে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে মাছের খাওয়া ও বৃদ্ধি দুটোই বাড়ে। তাই এ সময় নিয়মিত পানি পরিবর্তন ও মাছের খাবার সরবরাহ জরুরি। কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, মাছের বৃদ্ধি দ্রুত হওয়ায় এ সময় উপযুক্ত খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।

পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য, অর্থাৎ পানিতে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণিকণা, তৈরি করতে জৈব সার প্রয়োগ করা হয়। যাঁরা নতুন করে পুকুর তৈরি বা সংস্কার করছেন, তাঁদের জন্য কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো প্রতি শতাংশে ১ কিলোগ্রাম চুন এবং ১০ কিলোগ্রাম গোবর প্রয়োগ। চুন পানির অম্লতা ঠিক রাখে ও রোগজীবাণু কমায়; গোবর প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান বাড়ায়। পানির গুণমান ঠিক রাখতে প্রতি শতাংশে ১ কিলোগ্রাম করে পাথুরে চুন ছিটিয়ে দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছে কৃষি তথ্য সার্ভিস। শীতের শেষে মাছে ক্ষত রোগ দেখা দিলে দেরি না করে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি: বদলাতে থাকা আবহাওয়ায় যত্ন


শীত থেকে গরমে পা রাখার সময়টায় পশুপাখির রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ে। গরু ও ছাগলের খাদ্য তালিকায় শুকনা খড়ের পাশাপাশি কাঁচা ঘাস যোগ করতে হবে। সবুজ ঘাস থেকে পশু ভিটামিন ও খনিজ পায়, দুধ ও মাংসের উৎপাদন ভালো হয়। রোগ প্রতিরোধে সময়মতো টিকা দেওয়া এবং গোয়ালঘর পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি।

কৃষি তথ্য সার্ভিস এ সময় হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশুকে প্রতিরোধমূলক টিকা দেওয়ার এবং প্রয়োজনে ভিটামিন খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। টিকার সময়সূচি ও কোন রোগের টিকা দরকার, তা জানতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগাযোগ করা যায়। দিনের তাপমাত্রা বাড়লেও রাতে এখনো ঠান্ডা থাকে; তাই মুরগির ঘরে রাতে যেন ঠান্ডা বাতাস না ঢোকে, আবার দিনে যেন বাতাস চলাচল ঠিক থাকে, দুদিকেই খেয়াল রাখতে হবে। দিনের গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পশুপাখির পানির চাহিদাও বাড়ে, তাই গোয়াল ও খামারে সারা দিন পরিষ্কার খাবার পানি রাখা জরুরি।

এক নজরে ফেব্রুয়ারির কাজ


মাসজুড়ে কাজগুলো ছড়িয়ে থাকলেও কোনটি কখন, তার একটি মোটা দাগের ক্রম মনে রাখলে সুবিধা হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাঘ ও ফাল্গুন মাসের পরামর্শ মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির প্রধান কাজগুলো দাঁড়ায় এমন:

  • বোরো: চারার বয়স ৫০ থেকে ৫৫ দিনে আগাছা পরিষ্কার ও পানি সরিয়ে ইউরিয়ার শেষ কিস্তি; কাইচ থোড় থেকে দুধ আসা পর্যন্ত খেতে পানি।
  • গম: ৫৫ থেকে ৬০ দিনে সেচ, রোগ ও ইঁদুরের দিকে নজর; মাসের শেষে দানা কট কট করলে কাটা।
  • রবি ভুট্টা: ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মোচা খড়ের রং হলে তোলা; খরিপ ভুট্টার বীজ বোনা।
  • পাট: মাসের শেষভাগে জমি তৈরি, ফাল্গুনের মাঝামাঝি থেকে সারিতে বোনা।
  • ডাল ও সরিষা: সময়মতো কাটা, গাছের গোড়া জমিতে রেখে দেওয়া, জমি পরের ফসলের জন্য তৈরি।
  • সবজি: শীতের সবজি তোলা, লাউ, কুমড়া, ঢেঁড়স, করলা বোনা, টমেটোতে ফেরোমন ফাঁদ।
  • আম ও লিচু: ফুল ফোটার আগে ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক, ফুল ফোটা অবস্থায় স্প্রে নয়।
  • পুকুর: পানি বদল, খাবার, চুন ও জৈব সার।
  • পশুপাখি: খড়ের সঙ্গে কাঁচা ঘাস, টিকা, পরিচ্ছন্ন ঘর।

সময় মেনে কাজ, পরের মৌসুমের আয়


ফেব্রুয়ারির কাজের তালিকা লম্বা, কিন্তু প্রতিটি কাজের পেছনে একটি হিসাব আছে: সময় পেরিয়ে গেলে আর ফেরানো যায় না। সরিষার শুঁটি ফেটে গেলে দানা আর কুড়ানো যায় না, আমের মুকুল ঝরে গেলে সেই মৌসুমের ফল হারায়, বোরোতে পানির টান পড়লে চিটা ধান আর ভরাট হয় না। ফেব্রুয়ারিতে কৃষিকাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করলে ফসলের ফলন বাড়ে এবং কৃষকের আয় বাড়ে।

এলাকাভেদে আবহাওয়া ও মাটির ধরন আলাদা, তাই সবার জন্য এক নিয়ম খাটে না। নিজের এলাকার জন্য নির্দিষ্ট পরামর্শ পেতে ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা যায়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে ফোন করেও ফসলের সমস্যা নিয়ে পরামর্শ নেওয়া যায়। প্রতিটি কাজ সময়মতো এবং সঠিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে পারলেই ফাল্গুনের এই ব্যস্ত মাঠ চৈত্র-বৈশাখে ভরা গোলার প্রতিশ্রুতি দেয়।

ছবি: গমের খেত, মিলন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

অন্যান্য

সম্পর্কিত খবর

অন্যান্য

মার্চ মাসে কৃষিতে করণীয়: ফাল্গুন চৈত্রের মাঠের কাজ

মার্চে একসঙ্গে শেষ হয় শীতের ফসল, শুরু হয় গরমের ফসল। বোরোতে পানি ও বাদামি গাছফড়িং, গম কাটা, পাট ও মুগ বোনা, গরমের সবজি, আমের মুকুল রক্ষা, পুকুর তৈরি আর গরমে পশুপাখির যত্ন নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ।

তানিয়া চৌধুরী২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
অন্যান্য

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান

জিডিপিতে কৃষির ভাগ কমছে, কিন্তু দেশের প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী মানুষ এখনো মাঠে, খামারে আর জলাশয়ে কাজ করেন। খাদ্য নিরাপত্তা, পাট ও চায়ের রপ্তানি, শিল্পের কাঁচামাল আর গ্রামীণ দারিদ্র্য কমানোয় কৃষির ভূমিকা, সামনের চ্যালেঞ্জ এবং টেকসই কৃষির পথ নিয়ে বিশ্লেষণ।

তানিয়া চৌধুরী২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
অন্যান্য

খাদ্য নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের কৃষি

প্রাপ্যতা, প্রবেশাধিকার, ব্যবহার ও স্থিতিশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তার এই চার স্তম্ভের আলোয় বাংলাদেশ। চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পুষ্টির ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তন, কমতে থাকা জমি ও বিতরণের দুর্বলতা; আর সবার পাতে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার পথ।

তানিয়া চৌধুরী২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)