হাওরের কাদাভরা পথে মহিষের গাড়ি চলছে ধানের আঁটি নিয়ে। বৈশাখের এই দৃশ্য শুধু একটি মৌসুমের ফসল তোলার ছবি নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশের ছবিও। ওই ধান যাবে কৃষকের গোলায়, সেখান থেকে চালকলে, তারপর শহরের বাজারে আর দেশের কোটি মানুষের থালায়। পথে পথে কাজ পাবেন শ্রমিক, ভ্যানচালক, চালকল মালিক, আড়তদার আর দোকানি। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ, আর এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবিকা কোনো না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনে এই খাতের অবদান বিশাল।
তবু কৃষির গুরুত্ব নিয়ে একটি ধাঁধা আছে। জাতীয় আয়ে কৃষির ভাগ বছর বছর কমছে, কারণ শিল্প আর সেবা খাত অনেক দ্রুত বাড়ছে। অথচ কর্মসংস্থানের হিসাবে কৃষি এখনো সবচেয়ে বড় খাত। এই দুই সংখ্যার মাঝখানেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির আসল চেহারা। কৃষি এখানে শুধু একটি উৎপাদন খাত নয়, এটি খাদ্য, কাজ, কাঁচামাল আর গ্রামের নগদ টাকার প্রবাহের মূল উৎস।
জাতীয় আয়ে কৃষির ভাগ
মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি হলো এক বছরে দেশে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট মূল্য। বহুল প্রচলিত একটি হিসাবে, ২০২৩ সালের আনুমানিক তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। সরকারি সর্বশেষ হিসাবে ভাগটি আরও কম। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব তুলে ধরে জানিয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বৃহত্তর কৃষি খাতের অবদান জিডিপির প্রায় ১১ শতাংশ। এখানে বৃহত্তর কৃষি বলতে শস্য, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও বনজ সম্পদ, সবকিছু মিলিয়ে বোঝানো হয়।
একই সমীক্ষা বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ২১ শতাংশে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। জিডিপিতে ভাগ কমে যাওয়া মানে কিন্তু কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া নয়। উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু কারখানা, নির্মাণ, পরিবহন আর সেবা খাত আরও দ্রুত বাড়ছে বলে পুরো অর্থনীতির মধ্যে কৃষির অংশ ছোট দেখায়। উন্নয়নের পথে প্রায় সব দেশেই এমনটা ঘটেছে।
জিডিপিতে কৃষির অবদানের বড় অংশ আসে ধান থেকে। গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফলমূলও এ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ, আর ২০২৩ সালে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৯১ লাখ টন। অথচ পিএলওএস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী ১৯৭১-৭২ সালে দেশে চাল উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টনের মতো, যা ২০১৯-২০ সালে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টনে। জমি প্রায় বাড়েনি, বেড়েছে প্রতি বিঘায় ফলন আর বছরে চাষের সংখ্যা। স্বাধীনতার পর যাকে কেউ কেউ তলাবিহীন ঝুড়ি বলে উপহাস করেছিলেন, সেই দেশের এই রূপান্তর কৃষকের হাতেই ঘটেছে। আলু উৎপাদনেও বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দশটি দেশের মধ্যে আছে, আর ২০২৩ সালে উৎপাদন ছাড়িয়েছে এক কোটি টন।
কাজের সবচেয়ে বড় উৎস
কৃষির আসল শক্তি বোঝা যায় কর্মসংস্থানের হিসাবে। প্রচলিত হিসাবে দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কৃষি খাতে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী সংখ্যাটি ৪৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যেখানে ২০১৬-১৭ সালের জরিপে এটি ছিল ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ জিডিপিতে ভাগ কমলেও কৃষিতে কাজ করা মানুষের অনুপাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস এখনো কৃষি। শুধু জমির মালিক কৃষকই নন, বর্গাচাষি, দিনমজুর, জেলে, খামারি, নার্সারির মালিক, বীজ ও সারের দোকানি, সবাই এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। নারীদের একটি বড় অংশ হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, বীজ সংরক্ষণ, বসতবাড়ির সবজি চাষ আর ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে যুক্ত, যদিও তাঁদের অনেক শ্রম মজুরির হিসাবে ধরা পড়ে না।
এই বাস্তবতার একটি অস্বস্তিকর দিকও আছে। জিডিপির মাত্র এক ভাগের কাছাকাছি উৎপাদন করতে যদি প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী মানুষ লাগে, তাহলে প্রতিজনের আয় অন্য খাতের তুলনায় কম থাকাটাই স্বাভাবিক। কৃষকের আয় বাড়ানো তাই শুধু কৃষির প্রশ্ন নয়, দেশের দারিদ্র্য আর বৈষম্য কমানোর প্রশ্নও।
খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি
খাদ্য নিরাপত্তা মানে সব মানুষের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা। ধান, গম, আলু আর শাকসবজি উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষি এই নিশ্চয়তার ভিত্তি গড়ে দেয়। স্বাধীনতার পর যে দেশ বারবার খাদ্য ঘাটতিতে ভুগেছে, সেই দেশ এখন প্রধান খাদ্য চালে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিজস্ব খাদ্য উৎপাদনের ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমেছে, আর বিশ্ববাজারে দাম হঠাৎ বেড়ে গেলেও দেশের মানুষ তুলনামূলক কম ধাক্কা খায়।
এই সাফল্যের পেছনে আছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাত, সেচের বিস্তার, আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মাঠপর্যায়ের কাজ। তবে সব খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আসেনি। দেশের চাহিদার বেশির ভাগ গম এখনো আমদানি করতে হয়, ভোজ্যতেল আর ডালেও বিদেশনির্ভরতা রয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তার আরেকটি বড় স্তম্ভ মাছ। মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৩-২৪ অনুযায়ী ওই অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টন, যার বড় অংশ এসেছে পুকুর ও বদ্ধ জলাশয়ের চাষ থেকে। এফএওর বিশ্ব মৎস্য ও জলজ চাষ প্রতিবেদন ২০২২ অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়, আর চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। মাছে ভাতে বাঙালির পরিচয় তাই কেবল প্রবাদ নয়, পুষ্টির হিসাবেও সত্য।
তবে পেট ভরা আর পুষ্টি পাওয়া এক কথা নয়। দেশের মানুষের খাবারের বড় অংশ এখনো ভাত, আর ডাল, শাকসবজি, ফল, দুধ ও ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবার অনেক দরিদ্র পরিবারের থালায় নিয়মিত ওঠে না। কৃষির পরের ধাপের চ্যালেঞ্জ তাই শুধু বেশি চাল নয়, বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবার সবার নাগালে আনা। ধানের জমিতে বছরে একবার ডাল বা তেলবীজ, বসতবাড়িতে সবজি আর ফলের গাছ, পুকুরে দেশি ছোট মাছ, এসব ছোট পরিবর্তনই গ্রামের পরিবারের পুষ্টিতে বড় পার্থক্য আনতে পারে।
রপ্তানি আয়ে কৃষি
রপ্তানির কথা উঠলে সবার আগে মনে পড়ে তৈরি পোশাকের কথা। কিন্তু কৃষিভিত্তিক পণ্যও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। চা, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া এবং ফলমূল এর মধ্যে প্রধান।
পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি পণ্য, একসময় যাকে বলা হতো সোনালি আঁশ। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ এবং কাঁচা পাট রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ ও মোড়কের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে, যা পাটের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কাঁচা পাট বিক্রির চেয়ে পাট থেকে সুতা, কাপড়, ব্যাগ, কার্পেট বা হস্তশিল্প বানিয়ে বিক্রি করলে দেশের ভেতরে অনেক বেশি মূল্য সংযোজন হয়, কাজও তৈরি হয় বেশি। পাটচাষির জন্য এর অর্থ তাঁর আঁশের স্থায়ী ও ভালো দামের বাজার। পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো আর শুকানোর প্রতিটি ধাপে গ্রামের মানুষ কাজ পান, আর পাটকাঠি জ্বালানি ও বেড়ার কাজে লাগে।
চা শিল্পও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ চা বোর্ডের হিসাবে ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজির বেশি চা উৎপাদন হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাগানের পাশাপাশি পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্র চা চাষিরাও এখন এই উৎপাদনে যুক্ত। দেশের ভেতরেই চায়ের চাহিদা বিশাল, তবে উদ্বৃত্ত চা রপ্তানিও হয়।
চামড়া আসে দেশের গবাদিপশু থেকে, বিশেষ করে কোরবানির মৌসুমে সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া থেকে। প্রক্রিয়াজাত চামড়া, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয় ইউরোপ, এশিয়াসহ বিভিন্ন বাজারে। আম, কাঁঠাল, সবজি আর হিমায়িত মাছ, বিশেষ করে চিংড়ি, প্রবাসী বাঙালিদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে।
শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ
কৃষি শুধু খাবার জোগায় না, কারখানাও চালায়। পাট, তুলা, আখ এবং অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাটকল চলে পাটে, চিনিকল চলে আখে, আর বস্ত্রশিল্পে লাগে তুলা। দেশের চামড়াশিল্প পুরোপুরি নির্ভর করে প্রাণিসম্পদের ওপর। চালকল, আটা ও ময়দার কল, তেলকল, পশুখাদ্যের কারখানা আর হিমাগার, সবই কৃষির উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে।
এই সম্পর্ক দুই দিকেই কাজ করে। কৃষি যখন ভালো করে, কাঁচামাল সস্তা ও নিয়মিত হয়, কারখানার উৎপাদন খরচ কমে। আবার কারখানা যখন চলে, কৃষক তাঁর পণ্যের নিশ্চিত ক্রেতা পান। এ কারণেই অর্থনীতিবিদরা কৃষিকে শিল্পায়নের ভিত বলে থাকেন।
দারিদ্র্য কমানোয় ভূমিকা
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, আর তাতে কৃষির ভূমিকা বড়। কৃষি উৎপাদন বাড়ার মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য কমানো সম্ভব হয়েছে। বছরে এক ফসলের জমিতে যখন দুই বা তিন ফসল হতে শুরু করল, তখন কৃষকের আয় বাড়ল, শ্রমিকের কাজের দিন বাড়ল, আর চালের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে থাকল।
ছোট ছোট কৃষি উদ্যোগ অনেক পরিবারকে স্বনির্ভর করেছে। একটি গাভি, কয়েকটি ছাগল, একটি ছোট পুকুর বা উঠানের সবজি বাগান গ্রামের দরিদ্র পরিবারের জন্য নিয়মিত নগদ আয় আর পুষ্টির উৎস হয়ে উঠেছে। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালনে নারীদের আয় বেড়েছে, যা সংসারে তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়িয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচিও এসব উদ্যোগকে সহায়তা করেছে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প
কৃষিজাত পণ্যকে ঘিরে দেশে একটি বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠেছে। মুড়ি, চিড়া আর আচার থেকে শুরু করে ফলের রস, জুস, দুগ্ধজাত পণ্য, মসলা, বিস্কুট ও প্যাকেটজাত খাবার, সবকিছুর কাঁচামাল আসে মাঠ থেকে। এই শিল্প দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানি বাজারেরও চাহিদা পূরণ করে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে দেশি খাবারের কদর এই রপ্তানির বড় চালিকাশক্তি।
প্রক্রিয়াজাতকরণের আরেকটি সুবিধা হলো ফসলের অপচয় কমানো। মৌসুমে যখন টমেটো বা আম বাজারে উপচে পড়ে আর দাম পড়ে যায়, তখন কারখানা সেই পণ্য কিনে নিলে কৃষক লোকসান থেকে বাঁচেন। তাই কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেও এই শিল্পের বিকাশ জরুরি।
গ্রামের অর্থনীতির চাকা
ফসল তোলার মৌসুমে গ্রামের হাটবাজারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কৃষি কীভাবে স্থানীয় অর্থনীতি সচল রাখে। কৃষি উৎপাদন স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা বাড়ায়। ধান বিক্রির টাকায় কৃষক কাপড়, আসবাব, মোবাইল ফোন কেনেন, বাড়ি মেরামত করেন, সন্তানের পড়াশোনার খরচ দেন।
পরিবহন, বিতরণ আর খুচরা বিক্রির প্রতিটি ধাপে তৈরি হয় কাজ ও আয়। ট্রাক, ভ্যান আর নৌকার মালিক, আড়তদার, পাইকার, খুচরা দোকানি, সবাই এই প্রবাহের অংশ। যে বছর ফসল ভালো হয়, গ্রামের দোকানগুলোর বিক্রিও বাড়ে। আর যে বছর বন্যা বা খরায় ফসল নষ্ট হয়, তার ধাক্কা পৌঁছায় পুরো এলাকার অর্থনীতিতে।
প্রাণিসম্পদ ও হাওরের কথা
কৃষি বলতে অনেকে শুধু ফসলের মাঠ বোঝেন, কিন্তু প্রাণিসম্পদও এই খাতের বড় অংশ। দুধ, মাংস আর ডিম মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস। দেশে ছোট ও মাঝারি দুগ্ধ খামার আর বাণিজ্যিক মুরগির খামার গত দুই দশকে দ্রুত বেড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়ে আসছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর চাহিদা মূলত দেশের খামার থেকেই মেটানো হচ্ছে। এর মানে লাখো খামারির জন্য বছরে অন্তত একটি বড় আয়ের মৌসুম, আর গ্রামের অর্থনীতিতে বিপুল নগদ টাকার প্রবাহ।
শুরুর দৃশ্যের হাওরও কৃষি অর্থনীতির একটি বিশেষ অধ্যায়। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এই বিশাল নিচু এলাকা বছরের কয়েক মাস পানির নিচে থাকে। পানি নেমে গেলে সেখানে একটিই বড় ফসল হয়, বোরো ধান। সেই এক ফসলের ওপর নির্ভর করে লাখো পরিবারের সারা বছরের খাবার আর আয়। তাই আগাম ঢলে ফসল ডুবলে পুরো অঞ্চল বিপদে পড়ে; ২০১৭ সালের এপ্রিলে আগাম বন্যায় হাওরের বিস্তীর্ণ বোরো খেত তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা এখনো মানুষ মনে রাখে। বর্ষায় আবার এই হাওরই হয়ে ওঠে মাছের বিশাল ভান্ডার।
তথ্য আর প্রযুক্তি পৌঁছাচ্ছে মাঠে
কৃষির চেহারা বদলাচ্ছে আরেকভাবেও। এখন অনেক কৃষক মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার খবর দেখেন, বাজারদর জানেন, ফসলের রোগের ছবি পাঠিয়ে পরামর্শ চান। কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে ফোন করে কৃষক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। কম্বাইন হারভেস্টার, পাওয়ার টিলার আর সেচ পাম্প মাঠের অনেক কাজ দ্রুত করেছে। শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ মাশরুম, মাছ, ফল বা দুগ্ধ খামারে বিনিয়োগ করে কৃষিকে ব্যবসা হিসেবে দেখছেন। এই পরিবর্তন কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে সরকারও উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এতে কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ বিভিন্ন যন্ত্রের দামের ওপর সাধারণ এলাকায় ৫০ শতাংশ এবং হাওর অঞ্চলে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। হাওরে ভর্তুকি বেশি রাখার কারণ স্পষ্ট: সেখানে আগাম ঢলের আগে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ধান কেটে ফেলতে হয়, আর ঠিক তখনই শ্রমিকের সংকট সবচেয়ে তীব্র হয়। তবে সমালোচকেরা বলছেন, বড় যন্ত্র বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গেছে সচ্ছল কৃষক বা যন্ত্র ভাড়া দেওয়া উদ্যোক্তাদের হাতে। ক্ষুদ্র কৃষক যাতে ভাড়ায় হলেও ন্যায্য খরচে এই যন্ত্রের সেবা পান, সেটি নিশ্চিত করাই এখন বড় কাজ।
কৃষির সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
এত অবদান সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষি খাত কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে:
- জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফসল উৎপাদনে ক্ষতি।
- কৃষিজমি কমে যাওয়া।
- আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির অভাব।
- কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া।
- বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন মাঠেই দেখা যাচ্ছে। উপকূলীয় জেলাগুলোতে মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে, ফলে শুকনো মৌসুমে অনেক জমি পতিত থাকে। হাওরে আগাম পাহাড়ি ঢল পাকার আগেই বোরো ধান ডুবিয়ে দেয়। উত্তরাঞ্চলে খরা আর অসময়ের বৃষ্টি ফসলের ক্ষতি করে। তাপমাত্রা বাড়লে ধানের ফুল ফোটার সময় চিটা হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
কৃষিজমি কমছে বসতবাড়ি, রাস্তা, কারখানা আর নগরায়ণের চাপে। জনসংখ্যা বাড়ছে, অথচ চাষের জমি বাড়ানোর সুযোগ নেই। তাই একই জমি থেকে বেশি ফসল পাওয়াই একমাত্র পথ।
আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়লেও এখনো অনেক কাজ হাতে হয়, বিশেষ করে ছোট ও খণ্ড খণ্ড জমিতে। আর ন্যায্যমূল্যের সমস্যা পুরোনো। ফসল তোলার পরপরই যখন সবাই একসঙ্গে বিক্রি করেন, তখন দাম পড়ে যায়; অথচ কয়েক মাস পরে সেই পণ্যই ভোক্তা কেনেন অনেক বেশি দামে। মাঝখানের লাভ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে।
এই দামের ওঠানামা প্রায় প্রতি বছরই চোখে পড়ে। কোনো মৌসুমে আলু, পেঁয়াজ বা টমেটোর দাম এত পড়ে যায় যে কৃষক খেত থেকে ফসল তোলার খরচও তুলতে পারেন না। পরের মৌসুমে সেই ফসলই কম আবাদ হয়, আর দাম আকাশ ছোঁয়। সংরক্ষণের সুবিধা, বাজারের নির্ভরযোগ্য তথ্য আর কৃষকদের দলগতভাবে বিক্রির ব্যবস্থা না থাকলে এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন।
টেকসই কৃষির জন্য যা দরকার
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে কৃষিকে টেকসই করতে কয়েকটি বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন:
- উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষি গবেষণা বাড়ানো।
- সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ।
- জৈব কৃষি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি নিশ্চিত করা।
- ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কম সুদে, ঝামেলাহীন ঋণ এবং ভর্তুকি।
- রপ্তানি বাজারে কৃষিপণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো।
গবেষণার সুফল ইতিমধ্যে দেখা গেছে। ব্রি ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) লবণসহিষ্ণু, বন্যাসহিষ্ণু ও খরাসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এ ধরনের জাত মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া, কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ভালো বীজ সময়মতো পৌঁছে দেওয়া এখন বড় কাজ।
সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো, খাল পুনঃখনন আর পানি সাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি চালু করা জরুরি। মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে রাসায়নিক সারের সঙ্গে জৈব সার, সবুজ সার আর শস্য পর্যায় মেনে চলা দরকার।
ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য ঋণ পাওয়া প্রায়ই কঠিন, কারণ জামানত থাকে না, কাগজপত্রের জটিলতা থাকে। ঝামেলাহীন কৃষিঋণ, শস্যবিমা আর সরকারি ধান-চাল ক্রয় কর্মসূচিতে প্রকৃত কৃষকের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে তাঁরা ফসলের দাম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবেন। হিমাগার, গুদাম আর বাজার পর্যন্ত ভালো যোগাযোগব্যবস্থা ফসল ধরে রাখার সুযোগ দেয়, ফলে কৃষককে তাড়াহুড়া করে কম দামে বিক্রি করতে হয় না।
রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা করতে হলে পণ্যের মান, নিরাপদ খাদ্যের মানদণ্ড আর প্যাকেজিংয়ে বিনিয়োগ লাগবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন জানতে চান, পণ্যটি কোথায়, কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে, কতটা কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে। উত্তম কৃষিচর্চা বা গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস মেনে উৎপাদন এবং মান সনদ পাওয়ার ব্যবস্থা তাই রপ্তানি বাড়ানোর পূর্বশর্ত।
মেরুদণ্ড শক্ত হলে দাঁড়ায় পুরো দেশ
বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যমে এটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অসাধারণ অবদান রাখছে। জিডিপিতে এর ভাগ হয়তো আরও কমবে, কারণ অর্থনীতি বড় হচ্ছে, বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। কিন্তু যত দিন দেশের প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী মানুষ মাঠে কাজ করবেন আর প্রতিটি ঘরের খাবার আসবে সেই মাঠ থেকে, তত দিন কৃষির স্বাস্থ্যই দেশের স্বাস্থ্য নির্ধারণ করবে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আধুনিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা আরও সুসংহত হবে। হাওরের সেই মহিষের গাড়ির চালক, উপকূলের লবণাক্ত জমির কৃষক কিংবা উত্তরের চা বাগানের ক্ষুদ্র চাষি, সবার আয় আর নিরাপত্তা বাড়ানোই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে টেকসই পথ।
ছবি: হাওরে মহিষের গাড়িতে ধান বহন, Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)





মন্তব্য
(০)