সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৭°আংশিক মেঘলাআর্দ্রতা ৮৫%বাতাস ৮ কিমি/ঘ

খাদ্য নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের কৃষি

প্রাপ্যতা, প্রবেশাধিকার, ব্যবহার ও স্থিতিশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তার এই চার স্তম্ভের আলোয় বাংলাদেশ। চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পুষ্টির ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তন, কমতে থাকা জমি ও বিতরণের দুর্বলতা; আর সবার পাতে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার পথ।

খাদ্য নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের কৃষি
অন্যান্য

আশ্বিন-কার্তিকের দিকে উত্তরাঞ্চলের গ্রামে এখনো একটি শব্দ মাঝে মাঝে শোনা যায়: মঙ্গা। আমন ধান তখনো পাকেনি, মাঠে কাজ নেই, ঘরে চাল ফুরিয়ে এসেছে। কয়েক দশক আগেও এই সময়টা ছিল বহু পরিবারের জন্য না খেয়ে থাকার মৌসুম। আজ সেই ছবি অনেকটাই বদলেছে; দেশ চালে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু পেট ভরা আর শরীরের দরকারি পুষ্টি পাওয়া এক কথা নয়। এই দুইয়ের মাঝখানের দূরত্বই খাদ্য নিরাপত্তার আসল প্রশ্ন। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা, যেখানে দেশের সব মানুষ, সব সময়, পর্যাপ্ত, পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার পেতে পারে। সুস্থ জীবন আর দেশের টেকসই উন্নয়ন, দুটোরই ভিত্তি এটি।

সংজ্ঞার পেছনের কথা


খাদ্য নিরাপত্তার যে সংজ্ঞা আজ বিশ্বজুড়ে ব্যবহার হয়, তা এসেছে ১৯৯৬ সালে রোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব খাদ্য শীর্ষ সম্মেলন থেকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আয়োজিত ওই সম্মেলনে বলা হয়, খাদ্য নিরাপত্তা তখনই আছে, যখন সব মানুষ, সব সময়, সক্রিয় ও সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ও পছন্দের পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পেতে পারে। এই সংজ্ঞার গুরুত্ব হলো, এটি শুধু গুদামে কত চাল আছে তা দেখে না; দেখে মানুষ সেই খাবার কিনতে পারছে কি না, খাবারে পুষ্টি আছে কি না, আর দুর্যোগের সময়ও তা পাওয়া যাচ্ছে কি না।

খাদ্য নিরাপত্তার চার স্তম্ভ


এই সংজ্ঞা থেকেই এসেছে খাদ্য নিরাপত্তার চারটি স্তম্ভ। একটি দুর্বল হলে পুরো কাঠামোই নড়বড়ে হয়ে যায়।

প্রথম স্তম্ভ খাদ্যের প্রাপ্যতা। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার উৎপাদন বা আমদানি হচ্ছে কি না, সেটিই এর মূল প্রশ্ন। ধান, গম, শাকসবজি, মাছ ও মাংসের মতো প্রধান খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো এর কেন্দ্রে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ খাদ্যে প্রবেশাধিকার। বাজারে খাবার থাকলেই হয় না, মানুষকে তা কেনার সামর্থ্য আর হাতের নাগালে পাওয়ার সুযোগ থাকতে হয়। সব শ্রেণির মানুষের জন্য খাবারের অর্থনৈতিক ও ভৌত প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া এর লক্ষ্য।

তৃতীয় স্তম্ভ খাদ্যের ব্যবহার, অর্থাৎ খাবারের মান ও পুষ্টি। খাবারের পুষ্টিগুণ বজায় রাখা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং জৈব ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এর অংশ। বিশুদ্ধ পানি আর পরিচ্ছন্নতাও এখানে জড়িত, কারণ অসুস্থ শরীর খাবারের পুষ্টি ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারে না।

চতুর্থ স্তম্ভ স্থিতিশীলতা। আজ খাবার আছে, কাল নেই, এমন অবস্থাকে নিরাপত্তা বলা যায় না। খাদ্য সরবরাহে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক সংকট বা অন্য যেকোনো বিপর্যয়ের সময়ও খাবারের জোগান নিশ্চিত করা এর লক্ষ্য।

অভাব থেকে উদ্বৃত্তের পথে


আজকের অবস্থান বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকাতে হয়। স্বাধীনতার পরের বছরগুলোতে বাংলাদেশ ছিল খাদ্য ঘাটতির দেশ। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সেই সময়ের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি; বন্যা, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি আর বিতরণের ব্যর্থতা মিলে বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। সে সময় দেশের মানুষ ছিল আজকের অর্ধেকেরও কম, তবু সবার মুখে খাবার তুলে দেওয়া যায়নি। বিদেশি খাদ্য সাহায্যের ওপর নির্ভরতা ছিল বড়।

পরের দশকগুলোতে বদলটা এসেছে ধীরে ধীরে। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট একের পর এক উচ্চফলনশীল জাত ছাড়তে থাকে। গভীর ও অগভীর নলকূপ দিয়ে সেচের বিস্তারে শুকনো মৌসুমের বোরো ধান হয়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে বড় ফসল। রাসায়নিক সার, উন্নত বীজ আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের পরামর্শ মিলে একই জমি থেকে বছরে দুই, কখনো তিনটি ফসল ওঠা শুরু হয়। এর ফলেই আজ প্রায় দ্বিগুণের বেশি মানুষের দেশ নিজের প্রধান খাদ্য নিজেই ফলাতে পারছে।

উত্তরাঞ্চলের মঙ্গার অভিজ্ঞতাও এই বদলের অংশ। রংপুর অঞ্চলে আমন কাটার আগের কয়েক সপ্তাহে কাজ আর খাবারের যে সংকট দেখা দিত, আগাম পাকে এমন আমন জাত, মৌসুমি কর্মসংস্থান কর্মসূচি আর সামাজিক সুরক্ষার বিস্তারে তা অনেকটাই কমে এসেছে। তবে অভাবের সেই মৌসুম পুরোপুরি ইতিহাস হয়ে যায়নি; দুর্যোগের বছরে তা আবার ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে।

বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে


বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ। তবু বাড়তে থাকা জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তন আর আর্থসামাজিক নানা চ্যালেঞ্জের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা এখানে সব সময়ই বড় বিষয়। দেশ এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে, তবে কিছু নির্দিষ্ট দুর্বলতা রয়ে গেছে।

সাফল্যের জায়গাটি উৎপাদনে। ধান, গম ও শাকসবজির মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ধানের উৎপাদন পৌঁছেছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ মেট্রিক টনে, যা দেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে। অথচ দেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৭ কোটি, আর আবাদি জমি বাড়েনি, বরং কমছে। কম জমিতে বেশি মানুষের খাবার জোগানোর এই সাফল্যের পেছনে আছে উচ্চফলনশীল জাত, সেচের বিস্তার আর কৃষকের পরিশ্রম। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট একের পর এক উচ্চফলনশীল জাতের পাশাপাশি লবণ, বন্যা ও খরা সহ্য করতে পারে এমন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যা কঠিন পরিবেশেও ফসল রক্ষা করছে।

কিন্তু পুষ্টির হিসাবে ছবিটা অন্য রকম। চালে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ফল, দুধ, ডিম ও প্রোটিনজাতীয় পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতায় এখনো ঘাটতি রয়েছে। অনেক পরিবারের থালায় ভাতই প্রধান, সঙ্গে সামান্য ডাল বা শাক; মাছ, মাংস, ডিম বা দুধ নিয়মিত জোটে না। এফএওর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রায়ই বলা হয়, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ২৪ শতাংশ বয়সের তুলনায় খর্বকায়, প্রায় ২২ শতাংশের ওজন বয়সের তুলনায় কম, আর প্রায় ১১ শতাংশ উচ্চতার তুলনায় রোগা। অর্থাৎ প্রতি চারটি শিশুর প্রায় একটি দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির চিহ্ন বহন করছে।

বিশ্ব ক্ষুধা সূচকও একই কথা বলে। ২০২৫ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ১২৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৫তম, স্কোর ১৯.২, যাকে সূচকটি মাঝারি মাত্রার ক্ষুধা হিসেবে চিহ্নিত করে। কয়েক দশক আগের তুলনায় এটি বড় অগ্রগতি, তবে এখনো পথ অনেক বাকি।

আমদানি আর বিশ্ববাজারের ঝুঁকি


চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতার মানে এই নয় যে দেশ সব খাবারে স্বনির্ভর। গমের চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আনতে হয়। ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি আর গুঁড়া দুধের ক্ষেত্রেও আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেক। ফলে বিশ্ববাজারে কিছু ঘটলে তার ধাক্কা সরাসরি এসে পড়ে দেশের বাজারে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর যখন বিশ্বজুড়ে গম, ভোজ্যতেল আর সারের দাম বেড়ে যায়, বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। ডলারের দাম বাড়লে আমদানি খরচও বাড়ে, আর সেই খরচ শেষ পর্যন্ত যোগ হয় ভোক্তার বাজারের ব্যাগে।

এই অভিজ্ঞতা স্থিতিশীলতার স্তম্ভটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত রাখা, আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা আর দেশে ডাল ও তেলবীজের উৎপাদন বাড়ানো, এসবই বাইরের ধাক্কা সামলানোর উপায়।

নিরাপদ খাবারের প্রশ্ন


খাদ্য নিরাপত্তার সংজ্ঞায় নিরাপদ শব্দটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। খাবার পর্যাপ্ত হলেও তাতে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকলে তা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। বাজারে ফল পাকাতে বা মাছ তাজা রাখতে রাসায়নিকের অপব্যবহার নিয়ে দেশে বহু বছর ধরে উদ্বেগ আছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, যার কাজ খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত পুরো পথে নিরাপত্তা তদারকি করা। মাঠে কৃষকের কাছ থেকে শুরু করে পাইকার, প্রক্রিয়াজাতকারী আর রেস্তোরাঁ, সবার দায়িত্ব এখানে জড়িত।

লুকানো ক্ষুধা


পুষ্টিবিদেরা একটি শব্দ ব্যবহার করেন: লুকানো ক্ষুধা। পেট ভরা থাকলেও শরীরে যদি আয়রন, জিংক, ভিটামিন এ বা আয়োডিনের মতো অণুপুষ্টির ঘাটতি থাকে, তবে বাইরে থেকে তা চোখে পড়ে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষতি চলতে থাকে। রক্তস্বল্পতায় ভোগা কিশোরী, ঘনঘন অসুখে পড়া শিশু, পড়ায় মন বসাতে না পারা ছাত্র, সবার পেছনে এই ঘাটতি থাকতে পারে। ভাতনির্ভর খাদ্যাভ্যাসে এই ঝুঁকি বেশি, কারণ কেবল ভাতে এসব পুষ্টি যথেষ্ট থাকে না।

এর মোকাবিলায় কৃষি গবেষণাও এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০১৩ সালে ব্রি ধান৬২ ছাড়ে, যা ছিল বিশ্বের প্রথম জিংকসমৃদ্ধ ধানের জাত। এর পর আরও কয়েকটি জিংকসমৃদ্ধ জাত এসেছে। ভাত যেহেতু প্রায় সবার প্রতিদিনের খাবার, তাই ভাতের মাধ্যমেই পুষ্টি পৌঁছে দেওয়ার এই চেষ্টা বড় পরিসরে কাজে আসতে পারে। তবে বৈচিত্র্যময় খাবারের কোনো বিকল্প নেই।

মাছ, ডিম আর দুধের হিসাব


বাংলাদেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস মাছ। মাছে-ভাতে বাঙালি কথাটি এমনি আসেনি। পুকুর, বিল, নদী আর উপকূলের জলাশয়ে মাছ চাষের বিস্তারে মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে দেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে উঠে এসেছে। পোলট্রি খামারের বিস্তারে ডিম আর মুরগির মাংসও আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের নাগালে এসেছে। তবু দরিদ্র পরিবারে এসব খাবার এখনো নিয়মিত নয়, কারণ দাম বাড়লে প্রথমেই বাদ পড়ে আমিষ। বিশেষ করে ছোট মাছ, যা কাঁটাসহ খাওয়া হয় বলে ক্যালসিয়াম ও অণুপুষ্টিতে ভরপুর, শিশুর পুষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

শহরে প্রাচুর্য, প্রত্যন্তে টান


খাবারের প্রাপ্যতা শহরে তুলনামূলক ভালো হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাদ্যের অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। হাওর, চর, পাহাড় আর উপকূলের অনেক এলাকায় বর্ষায় যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়, বাজার দূরে, দামও বেশি। সেখানে খাবার পৌঁছাতে পরিবহন ব্যবস্থা আর সরবরাহ শৃঙ্খলের উন্নয়ন জরুরি। আবার শহরের ভেতরেও বস্তিবাসী আর দিনমজুরদের কাছে খাবার আছে, কিন্তু দাম বাড়লে তা কেনার সামর্থ্য থাকে না। অর্থাৎ প্রাপ্যতা আর প্রবেশাধিকার, দুই স্তম্ভই এখানে পরীক্ষার মুখে। দাম বাড়লে এসব পরিবার প্রথমে মাছ, ডিম আর দুধ কেনা কমায়, তারপর কমায় খাবারের পরিমাণ। কখনো ধার করে সংসার চালাতে হয়, কখনো সন্তানকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে কাজে পাঠাতে হয়। বাজারদরের প্রতিটি ওঠানামা তাই দরিদ্র পরিবারের জন্য শুধু হিসাবের খাতার বিষয় নয়, সরাসরি থালার বিষয়।

জলবায়ুর চাপ


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ বারবার আসছে, আর প্রতিবারই তা খাদ্য উৎপাদনে আঘাত হানছে। একটি বড় বন্যায় পাকা ধান ডুবে যায়, একটি ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের খেত, ঘের আর গবাদিপশু একসঙ্গে ভেসে যায়। উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা আর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া সেচের খরচ বাড়াচ্ছে।

হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা আরেক ধরনের ঝুঁকিতে থাকেন। সেখানে বছরে কার্যত একটিই ফসল, বোরো ধান। চৈত্র-বৈশাখে ধান পাকার ঠিক আগে উজান থেকে নেমে আসা আগাম ঢলে বাঁধ ভেঙে গেলে পুরো মৌসুমের ফসল কয়েক দিনে তলিয়ে যায়। ২০১৭ সালের আগাম বন্যায় হাওরের বিস্তীর্ণ বোরো জমি এভাবেই ডুবে গিয়েছিল, আর বহু পরিবারকে পরের বছর পর্যন্ত খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল।

উপকূলে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর আর ২০০৯ সালের আইলার পর লবণপানি ঢুকে বহু জমি বছরের পর বছর চাষের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। আর সাধারণভাবেই উপকূলে লবণাক্ততা জমির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের হিসাবে, দেশে লবণাক্ততায় আক্রান্ত জমি ১৯৭৩ সালে ছিল প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর, যা ২০০৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টরে; অর্থাৎ ৩৬ বছরে বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। লবণাক্ত জমিতে অনেক ফসলই ভালো হয় না, শুষ্ক মৌসুমে বহু জমি পতিত পড়ে থাকে।

চ্যালেঞ্জগুলো এক নজরে


খাদ্য নিরাপত্তার পথে বাধাগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িয়ে আছে। বাড়তে থাকা জনসংখ্যার কারণে খাবারের চাহিদা বাড়ছে, আর সেই চাপ পড়ছে সীমিত কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। জলবায়ু পরিবর্তন বন্যা, খরা আর ঘূর্ণিঝড়ে ফসলের ক্ষতি বাড়াচ্ছে এবং পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জমির সংকটও দিন দিন তীব্র হচ্ছে। নগরায়ণ, নতুন বসতবাড়ি, রাস্তা, কলকারখানা আর ইটভাটার জন্য কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, যা খাদ্য উৎপাদনে সরাসরি বাধা তৈরি করছে। একবার কংক্রিটের নিচে চলে যাওয়া জমি আর কখনো খেতে ফেরে না।

অপুষ্টি ও বৈষম্য আরেকটি বড় সমস্যা। দরিদ্র জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পায় না, আর পুষ্টিকর খাবারের অভাবে শিশুদের বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য ব্যাহত হয়। শৈশবের অপুষ্টি শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের বিকাশেও প্রভাব ফেলে, যার দাম দিতে হয় সারা জীবন, আর শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিকেও।

খাদ্য সংরক্ষণ ও বিতরণের দুর্বলতাও বড় ক্ষতির কারণ। উৎপাদিত খাবার ঠিকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক খাবার নষ্ট হয়ে যায়। ভরা মৌসুমে টমেটো বা আলুর দাম পড়ে যায়, কৃষক খরচও তুলতে পারেন না, অথচ কয়েক মাস পর একই জিনিস কিনতে হয় চড়া দামে। হিমাগার, গুদাম আর সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থার অভাব এই দোলাচলকে আরও তীব্র করে।

  • বাড়তে থাকা জনসংখ্যা ও সীমিত জমি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  • নগরায়ণে কৃষিজমি হ্রাস
  • অপুষ্টি ও খাদ্যের বৈষম্য
  • সংরক্ষণ ও বিতরণের দুর্বলতা

কৃষিতে শ্রমিকের সংকটও নতুন চ্যালেঞ্জ। গ্রামের তরুণেরা শহরে, কারখানায় বা বিদেশে কাজের খোঁজে চলে যাচ্ছেন, আর মাঠে থেকে যাচ্ছেন বয়স্ক কৃষকেরা। ধান রোপণ আর কাটার ভরা মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, মজুরিও বাড়ে। কৃষিকে তরুণদের কাছে লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে দাঁড় করাতে না পারলে ভবিষ্যতের খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকিতে পড়বে।

কীভাবে নিশ্চিত হবে খাদ্য নিরাপত্তা


প্রথম পথ কৃষির উন্নয়ন। উন্নত প্রযুক্তি আর উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার বাড়াতে হবে, সঙ্গে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন। শ্রমিকসংকটের সময় ধান রোপণ ও কাটার যন্ত্র কৃষককে সময়মতো কাজ শেষ করতে সাহায্য করে। তবে শুধু ধান নয়; ডাল, তেলবীজ, ফল, সবজি, মাছ, দুধ ও ডিমের উৎপাদন বাড়ানো, অর্থাৎ ফসলে বৈচিত্র্য আনাই পুষ্টির ঘাটতি মেটানোর চাবি। বাড়ির আঙিনায় সবজি বাগান, পুকুরে মাছ আর কয়েকটি মুরগি গ্রামীণ পরিবারের পুষ্টিতে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

দ্বিতীয় পথ খাদ্য সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থা। আধুনিক গুদাম ও হিমাগার স্থাপন করতে হবে, আর বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করতে হবে, যাতে ভরা মৌসুমের খাবার নষ্ট না হয়ে সারা বছরের কাজে লাগে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ঠিক দামে পৌঁছায়।

তৃতীয় পথ পুষ্টি শিক্ষার প্রসার। পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে, আর অপুষ্টি দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অনেক সময় দামি খাবার নয়, বরং শাক, ডাল, মৌসুমি ফল আর ছোট মাছের মতো হাতের কাছের খাবার ঠিকভাবে খাওয়ানোই শিশুর পুষ্টিতে বড় পরিবর্তন আনে। গর্ভবতী মা আর দুই বছরের কম বয়সী শিশুর খাবারের দিকে বিশেষ নজর দরকার, কারণ জীবনের এই সময়ের অপুষ্টির ক্ষতি পরে পূরণ করা কঠিন।

চতুর্থ পথ সরকারি সহায়তা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভর্তুকি ও খাদ্য সহায়তা, আর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখা এর মূল কাজ। দেশে এমন কর্মসূচির উদাহরণ আছে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় কার্ডধারী দরিদ্র পরিবারগুলো বছরের অভাবের মাসগুলোতে ১৫ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি করে চাল পায়; উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে বেড়ে ৫৫ লাখে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি খোলাবাজারে কম দামে চাল-আটা বিক্রি আর দুর্যোগের সময় ত্রাণ বিতরণ খাদ্য নিরাপত্তার জাল হিসেবে কাজ করে।

খাবারের অপচয়: নীরব ক্ষতি


খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় উৎপাদন যতটা গুরুত্ব পায়, অপচয় ততটা পায় না। অথচ মাঠ থেকে থালা পর্যন্ত পথে প্রতিটি ধাপে খাবার নষ্ট হয়। ধান কাটার পর খোলা উঠানে মাড়াই আর রোদে শুকানোর সময় কিছু দানা হারায়, বৃষ্টিতে ভিজে কিছু পচে যায়। সবজি আর ফল বস্তায় গাদাগাদি করে ট্রাকে পাঠানোর পথে থেঁতলে যায়। বাজারে বিক্রি না হওয়া শাকসবজি দিনের শেষে ফেলে দিতে হয়। আর শহরের বাসাবাড়ি, অনুষ্ঠান ও রেস্তোরাঁয় উচ্ছিষ্ট খাবারের পরিমাণও কম নয়।

এই অপচয় কমানো মানে নতুন জমি ছাড়াই বাড়তি খাবার পাওয়া। উন্নত মাড়াই ও শুকানোর যন্ত্র, প্লাস্টিকের ক্রেটে ফল-সবজি পরিবহন, কাছাকাছি হিমাগার আর ঘরে ঘরে সচেতনতা, এসবই অপচয় কমানোর বাস্তব উপায়। প্রতিটি নষ্ট হওয়া দানার পেছনে থাকে কৃষকের শ্রম, পানি, সার আর জমি; সেই হিসাবটি মনে রাখলেই অপচয়ের দাম বোঝা যায়।

কৃষকের আয়, দেশের নিরাপত্তা


খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় একজন মানুষকে প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয়, তিনি কৃষক। যিনি দেশের খাবার জোগান, তিনি নিজেও অনেক সময় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে কৃষক পরের মৌসুমে চাষ কমান, জমি বিক্রি করেন বা পেশা বদলান। তাই কৃষকের আয় নিশ্চিত করা, ন্যায্য দামে ফসল কেনা, কৃষকবান্ধব শর্তে ঋণ আর শস্যবিমার মতো সুরক্ষা খাদ্য নিরাপত্তারই অংশ।

নারীর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের বাড়িতে সবজি বাগান, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু আর বীজ সংরক্ষণের বড় অংশ সামলান নারীরা। পরিবারের থালায় কী উঠবে, তার সিদ্ধান্তও অনেক সময় তাঁদের হাতে। তাঁদের হাতে প্রশিক্ষণ, ঋণ আর তথ্য পৌঁছালে পরিবারের পুষ্টি সরাসরি উন্নত হয়।

ভাতের নিশ্চয়তা থেকে পুষ্টির নিশ্চয়তায়


খাদ্য নিরাপত্তা একটি দেশের উন্নয়নের মৌলিক শর্ত। বাংলাদেশে তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সবার জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একসময় যে দেশকে নিয়মিত খাদ্য ঘাটতি আর মঙ্গার সঙ্গে লড়তে হতো, সেই দেশ আজ নিজের ভাত নিজে ফলাতে শিখেছে। এখনকার লক্ষ্য তার পরের ধাপ: প্রতিটি শিশুর থালায় ভাতের পাশে ডাল, ডিম, মাছ, শাক আর ফল। টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী জাতি।

ছবি: নিজের খেতে ধান কাটছেন এক কৃষক, Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

অন্যান্য

সম্পর্কিত খবর

অন্যান্য

মার্চ মাসে কৃষিতে করণীয়: ফাল্গুন চৈত্রের মাঠের কাজ

মার্চে একসঙ্গে শেষ হয় শীতের ফসল, শুরু হয় গরমের ফসল। বোরোতে পানি ও বাদামি গাছফড়িং, গম কাটা, পাট ও মুগ বোনা, গরমের সবজি, আমের মুকুল রক্ষা, পুকুর তৈরি আর গরমে পশুপাখির যত্ন নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ।

তানিয়া চৌধুরী২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
অন্যান্য

ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষিতে করণীয় কাজ: ফসল ধরে ধরে মাঠের পঞ্জিকা

শীত বিদায় আর গরমের শুরু, ফেব্রুয়ারিতে একসঙ্গে ফসল তোলা, বীজ বোনা আর পরিচর্যার চাপ। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাসভিত্তিক পরামর্শ ধরে বোরো, গম, ভুট্টা, পাট, ডাল, সরিষা, সবজি, আম-লিচু, পুকুর ও গবাদি পশুর এ মাসের কাজ।

তানিয়া চৌধুরী২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
অন্যান্য

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান

জিডিপিতে কৃষির ভাগ কমছে, কিন্তু দেশের প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী মানুষ এখনো মাঠে, খামারে আর জলাশয়ে কাজ করেন। খাদ্য নিরাপত্তা, পাট ও চায়ের রপ্তানি, শিল্পের কাঁচামাল আর গ্রামীণ দারিদ্র্য কমানোয় কৃষির ভূমিকা, সামনের চ্যালেঞ্জ এবং টেকসই কৃষির পথ নিয়ে বিশ্লেষণ।

তানিয়া চৌধুরী২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)