সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৭°আংশিক মেঘলাআর্দ্রতা ৮৬%বাতাস ৭ কিমি/ঘ

মার্চ মাসে কৃষিতে করণীয়: ফাল্গুন চৈত্রের মাঠের কাজ

মার্চে একসঙ্গে শেষ হয় শীতের ফসল, শুরু হয় গরমের ফসল। বোরোতে পানি ও বাদামি গাছফড়িং, গম কাটা, পাট ও মুগ বোনা, গরমের সবজি, আমের মুকুল রক্ষা, পুকুর তৈরি আর গরমে পশুপাখির যত্ন নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ।

মার্চ মাসে কৃষিতে করণীয়: ফাল্গুন চৈত্রের মাঠের কাজ
অন্যান্য

মার্চের সকালে গ্রামের মাঠে দাঁড়ালে একসঙ্গে দুই রকম ছবি চোখে পড়ে। একদিকে গম আর ছোলার খেত পেকে সোনালি হয়ে এসেছে, কাস্তে হাতে নামার অপেক্ষা। অন্যদিকে বোরো ধানের খেত ঘন সবুজ, সেখানে পানি ধরে রাখার চিন্তায় কৃষকের ঘুম কম। আমগাছে মুকুলের গন্ধ, পুকুরের পানি নেমে গেছে তলায়, আর বাতাসে গরমের প্রথম আঁচ। এক মাসের মধ্যে শীতের ফসল ঘরে তোলা আর গরমের ফসলের মাটি তৈরি করা, দুটো কাজই চাপে কৃষকের কাঁধে। এ কারণেই মার্চকে বলা হয় কৃষকের সবচেয়ে ব্যস্ত মাসগুলোর একটি।

ফাল্গুনের শেষ, চৈত্রের শুরু


বাংলা পঞ্জিকার হিসাবে মার্চ মাস ভাগ হয়ে যায় দুই মাসে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাসিক কৃষিকথা অনুযায়ী ফাল্গুন চলে ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত, আর চৈত্র শুরু হয় ১৫ মার্চ, শেষ হয় ১৩ এপ্রিল। চৈত্র বাংলা বছরের শেষ মাস। কৃষি তথ্য সার্ভিস লিখেছে, এ মাসে রবি ফসল আর গ্রীষ্মকালীন ফসলের কাজ একসঙ্গে করতে হয় বলে কৃষকের ব্যস্ততা বেড়ে যায়।

রবি মৌসুম মানে শীতের ফসল: গম, সরিষা, ছোলা, মসুর, আলু, শীতের সবজি। খরিফ মৌসুম মানে গরম ও বর্ষার ফসল, যার প্রথম ভাগকে কৃষিবিদেরা বলেন খরিফ-১। মার্চ ঠিক এই দুই মৌসুমের সীমানায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আর তার প্রকাশনা শাখা কৃষি তথ্য সার্ভিস প্রতি মাসে দেশের কৃষকদের জন্য ফসলভিত্তিক করণীয় প্রকাশ করে। এই লেখায় সেই পরামর্শের ভিত্তিতে মার্চের মাঠের কাজ ফসল ধরে ধরে সাজানো হলো।

বোরো ধান: পানির হিসাব সবার আগে


বোরো দেশের সবচেয়ে বড় ধানের মৌসুম, আর মার্চে এই ধান থাকে জীবনের সবচেয়ে নাজুক পর্যায়ে। শিষ বের হওয়ার আগে গাছের ভেতরে যে কচি শিষ তৈরি হয়, মাঠের ভাষায় তাকে বলে কাইচ থোড়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ হলো, কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানে দুধ আসা পর্যন্ত খেতে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে। এই সময় খেত শুকিয়ে গেলে শিষে চিটা বাড়ে, অর্থাৎ ধানের খোসা থাকে কিন্তু ভেতরে চাল হয় না।

যাঁরা শীতের কারণে দেরিতে চারা রোপণ করেছেন, তাঁদের জন্য আলাদা পরামর্শ আছে। চারার বয়স ৫০ থেকে ৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। উপরিপ্রয়োগ মানে দাঁড়ানো ফসলের ওপর ছিটিয়ে দেওয়া। পটাশ সারও প্রয়োজন অনুযায়ী দিতে হবে, কারণ পটাশ গাছের কাণ্ড শক্ত করে এবং দানা পুষ্ট করতে সাহায্য করে। তবে ইউরিয়া বেশি দেওয়া চলবে না; কারণটা পরের অংশেই পরিষ্কার হবে।

এ সময় বোরো খেতে কয়েকটি রোগ দেখা দেয়। কৃষি তথ্য সার্ভিস নাম ধরে সতর্ক করেছে উফরা, ব্লাস্ট, পাতাপোড়া ও টুংরো রোগের বিষয়ে। ব্লাস্ট একটি ছত্রাকজনিত রোগ; পাতায় চোখের মতো দাগ পড়ে, আর শিষের গোড়ায় আক্রমণ হলে পুরো শিষ ভেঙে সাদা হয়ে যায়। পাতাপোড়া রোগে পাতার আগা থেকে শুকিয়ে আসে। টুংরো রোগে গাছ খাটো ও হলদে হয়ে পড়ে। রোগ দেখা দিলে দেরি না করে ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

বাদামি গাছফড়িং: ছোট পোকা, বড় ক্ষতি


বোরো মৌসুমের শেষভাগে যে পোকাটি কৃষকের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, তার নাম বাদামি গাছফড়িং। পোকাটি থাকে ধানগাছের গোড়ায়, পানির ঠিক ওপরে, তাই দূর থেকে চোখে পড়ে না। গাছের রস শুষে খায় বলে আক্রান্ত জায়গার ধান গোল হয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো বাদামি হয়ে যায়, যাকে মাঠে বলে ফড়িং পোড়া। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি ইউরিয়া দেওয়া নরম ও ঘন সবুজ ধান এই পোকার প্রিয়।

সে কারণেই বাদামি গাছফড়িং ঠেকানোর প্রথম উপায় সুষম সার। দ্বিতীয় উপায় পানি ব্যবস্থাপনা: আক্রমণ দেখা দিলে খেত থেকে পানি সরিয়ে কয়েক দিন শুকনো রাখলে গোড়ার আর্দ্রতা কমে, পোকার সংখ্যাও কমে। তৃতীয় উপায় আলোর ফাঁদ। সন্ধ্যার পর খেতের পাশে বাতি জ্বালিয়ে নিচে পানির পাত্র রাখলে পোকা আলোয় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে যায়; এতে বোঝা যায় এলাকায় পোকা কতটা আছে। চারা রোপণের সময় সারির মাঝে যথেষ্ট ফাঁক থাকলে গোড়ায় আলো বাতাস ঢোকে, তাতেও পোকার বংশবৃদ্ধি কমে। আক্রমণ মাত্রা ছাড়ালে কৃষি অফিসের অনুমোদিত কীটনাশক গাছের গোড়ায় লক্ষ্য করে দিতে হবে।

গ্রীষ্মকালীন ধানের বীজতলা


বোরো যখন পাকার পথে, তখনই শুরু হয় পরের ধানের প্রস্তুতি। গ্রীষ্মকালীন ধান, যা আউশ নামে পরিচিত, তার বীজতলা তৈরির সময় এটি। বীজতলা হলো ছোট একটি জমি, যেখানে ঘন করে বীজ ফেলে চারা বড় করা হয়, পরে সেই চারা তুলে মূল জমিতে লাগানো হয়। বীজতলার মাটি ভালো করে কাদা করে, সামান্য জৈব সার মিশিয়ে, উঁচু করে বানালে পানি জমে না এবং চারা সবল হয়।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো জাত বাছাই। উচ্চফলনশীল জাত নির্বাচন করতে হবে, আর সেই জাত যেন নিজের এলাকার মাটি ও পানির সঙ্গে মানানসই হয়। কোন জাত কোন অঞ্চলে ভালো, সে বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিস ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরামর্শ নেওয়া যায়। ভালো বীজ মানে অর্ধেক কাজ শেষ; তাই বীজ কেনার সময় উৎস ও অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা দেখে নেওয়া দরকার।

গম: কাটার সময়, শুকানোর সময়


মার্চে উত্তরাঞ্চলের মাঠে গম কাটার ধুম পড়ে। কৃষি তথ্য সার্ভিস গম কাটার ঠিক সময় চেনার একটি ঘরোয়া উপায় বলে দিয়েছে: দানা দাঁতে কাটলে যদি কট করে শব্দ হয়, অর্থাৎ দানা যথেষ্ট শক্ত হয়ে এসেছে, তখন কাটার উপযুক্ত সময়। কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে কাটলে সকালে বা বিকেলে কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেরিতে বোনা গম পেকে গেলে কেটে মাড়াই ও ঝাড়াই করে ভালো করে শুকিয়ে নিতে হবে।

শুকানো ঠিকমতো না হলে গোলায় রাখা গমে পোকা ধরে, ছত্রাক জন্মায়। তাই রোদে কয়েক দিন শুকিয়ে, ঠান্ডা করে, বায়ুরোধী পাত্রে রাখা ভালো। বীজ হিসেবে রাখতে চাইলে আলাদা করে বাছাই করা পুষ্ট দানা রাখতে হবে। গম কাটার পর খেত পরিষ্কার করে পরের ফসলের জন্য প্রস্তুত রাখাও এ মাসের কাজ। পড়ে থাকা নাড়া ও আগাছা সরিয়ে চাষ দিলে সেই জমিতে পাট, আউশ বা মুগের মতো খরিফ ফসল সময়মতো বোনা যায়।

পাট ও গ্রীষ্মকালীন ভুট্টা


মার্চের মাঠের আরেকটি বড় কাজ পাট বোনা। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী ফাল্গুনের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপন করা যায়। জমি হতে হবে ঝুরঝুরে ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাসহ। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার আর চারা থেকে চারার দূরত্ব ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার রাখা ভালো। চারা গজানোর ১৫ থেকে ২০ দিন পর শতাংশপ্রতি ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া উপরিপ্রয়োগ করতে বলা হয়েছে। এক শতাংশ হলো এক একরের একশো ভাগের এক ভাগ জমি।

যাঁরা গ্রীষ্মকালীন ভুট্টা করতে চান, তাঁদের জন্য কৃষি তথ্য সার্ভিসের কথা স্পষ্ট: এখনই বীজ বপন করতে হবে। শতাংশপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ গ্রাম বীজ লাগবে। শীতের ভুট্টার মোচা যদি এখনো মাঠে থাকে, তবে মোচার খোসা খড়ের রং ধরলে তুলে ভালো করে শুকিয়ে রাখতে হবে। দেশের অনেক এলাকায় ভুট্টা এখন পশু ও মুরগির খাদ্যের বড় উৎস, তাই ভালো শুকানো দানার চাহিদাও বেশি।

ডাল: মুগ আর মাসকলাইয়ের মৌসুম


গম বা সরিষা তোলার পর যে জমি কিছুদিন খালি পড়ে থাকে, সেখানে মুগ বা মাসকলাই বুনে বাড়তি একটি ফসল পাওয়া যায়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ই কৃষি তথ্য অনুযায়ী খরিফ-১ মৌসুমে মুগ বপনের সময় ফাল্গুনের পুরো মাস, অর্থাৎ মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ। তাই মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহ মুগ বোনার শেষ সুযোগ। ডাল ফসলের শিকড়ে থাকা গুটি বাতাস থেকে নাইট্রোজেন ধরে মাটিতে যোগ করে, তাই পরের ফসলও উপকার পায়।

মুগ ও মাসকলাইয়ের খেতে প্রথম কয়েক সপ্তাহ আগাছা পরিষ্কার রাখা জরুরি, কারণ কচি চারা আগাছার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠে না। মাটিতে রস কম থাকলে সময়মতো হালকা সেচ দিতে হবে, তবে জমিতে পানি দাঁড়িয়ে থাকলে ডালের গাছ মরে যায়। ছোলার বিষয়টি একটু আলাদা। ছোলা রবি মৌসুমের ফসল, বোনা হয় শীতের শুরুতে; মার্চে সাধারণত ছোলা পেকে ওঠে এবং তোলার সময় হয়। তাই এ মাসে ছোলার খেতে মূল কাজ হলো পাকা ফসল সময়মতো তুলে শুকিয়ে রাখা।

সূর্যমুখী ও সয়াবিন


তেলবীজের মধ্যে সূর্যমুখী ও সয়াবিন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ও চরাঞ্চলে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। এই দুই ফসলের জন্য জমি তৈরির কাজ মার্চে হাতে নেওয়া যায়। বীজ বপনের আগে কয়েকটি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে। জমি সমান রাখতে হবে যাতে সেচের পানি সবখানে পৌঁছায় এবং বাড়তি পানি বের হয়ে যায়।

সূর্যমুখী ও সয়াবিন দুটোই সুষম সার চায়। মাটি পরীক্ষা করে সারের মাত্রা ঠিক করলে খরচ কমে, ফলনও বাড়ে; উপজেলা কৃষি অফিসে মাটি পরীক্ষার সুযোগ আছে। চারা গজানোর পর প্রথম মাসে আগাছা নিয়ন্ত্রণ না করলে ফলন অনেকখানি কমে যায়। রবি মৌসুমে বোনা সূর্যমুখী যেখানে এখন মাঠে আছে, সেখানে ফুলের মাথা পেছনের দিক থেকে হলদে বাদামি হয়ে এলে কাটার প্রস্তুতি নিতে হয়।

গরমের সবজি বোনার সময়


বাজারে যখন শীতের বাঁধাকপি, ফুলকপি আর মুলার দাম পড়ে আসে, তখন সবজি চাষির নজর যায় গরমের সবজিতে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ভাষায়, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি চাষ করতে চাইলে এ মাসেই বীজ বপন বা চারা রোপণ শুরু করতে হবে। লাউ, কুমড়া, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, আর নানা রকম পাতাশাক এই তালিকায় পড়ে।

লতানো সবজি, যেমন লাউ, কুমড়া, করলা ও শসা, মাদায় বুনতে বলা হয়। মাদা হলো গর্ত করে জৈব সার মিশিয়ে তৈরি উঁচু মাটির ঢিবি, যেখানে কয়েকটি বীজ একসঙ্গে বোনা হয়। মাদায় পচা গোবর বা কম্পোস্ট দিলে মাটি রস ধরে রাখে, গাছও দ্রুত বাড়ে। লতা বেয়ে ওঠার জন্য সময়মতো মাচা বা বাউনি দিতে হবে। ঢেঁড়স ও বেগুন সারিতে লাগালে পরিচর্যা ও তোলা দুটোই সুবিধাজনক হয়।

গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির রস দ্রুত শুকায়, তাই সবজি খেতে নিয়মিত সেচ ও আগাছা পরিষ্কার এ মাসের নিয়মিত কাজ। সেচের পর মাটির ওপরের স্তর আলগা করে দিলে পানি বেশিক্ষণ থাকে। অন্যদিকে শীতের যে বাঁধাকপি, ফুলকপি ও মুলা এখনো মাঠে আছে, সেগুলো দেরি না করে তুলে বাজারে পাঠানো ভালো। বেশি দিন মাঠে রাখলে ফুলকপির ফুল আলগা হয়ে যায়, মুলা আঁশযুক্ত হয়ে দাম হারায়।

লাউ, কুমড়া, করলা ও শসার মতো কুমড়াজাতীয় সবজিতে ফুল আসার পর মাছি পোকা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। মাছি কচি ফলের ভেতরে ডিম পাড়ে, পরে ফল পচে ঝরে যায়। আক্রান্ত ফল তুলে মাটিতে পুঁতে ফেলা আর খেতে ফেরোমন ফাঁদ বসানো এর পরিচিত প্রতিকার। ফেরোমন ফাঁদে পোকার নিজের গন্ধের মতো একটি রাসায়নিক টোপ থাকে, যা পুরুষ মাছিকে টেনে এনে আটকে ফেলে। এতে বিষ ছিটানোর প্রয়োজন কমে।

আম, লিচু, কাঁঠালের মুকুল রক্ষা


মার্চ মানে গাছে গাছে মুকুল আর গুটি। এই সময় সবচেয়ে বড় শত্রু আমের হপার পোকা। ছোট এই পোকা মুকুল ও কচি পাতার রস শুষে খায়, ফলে মুকুল শুকিয়ে ঝরে যায়। পোকার শরীর থেকে বের হওয়া মিষ্টি রসের ওপর কালো ছত্রাক জন্মায়, পাতা ও মুকুল কালো হয়ে যায়। কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, হপারের আক্রমণ হলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবার পরামর্শে স্প্রের সময়ও বলা আছে: মুকুল যখন ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা হয় তখন একবার, আর আম যখন মটরদানার আকার পায় তখন আরেকবার। পুরো ফুল ফোটা অবস্থায় স্প্রে না করাই ভালো, কারণ তখন পরাগায়ণে সাহায্যকারী মৌমাছি ও অন্যান্য পোকা মাঠে থাকে। এ সময় আমে পাউডারি মিলডিউ ও অ্যানথ্রাকনোজ রোগও দেখা দিতে পারে। প্রথমটিতে মুকুলে সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ পড়ে, দ্বিতীয়টিতে মুকুল ও গুটিতে কালো দাগ হয়। দুটোর জন্যই অনুমোদিত ছত্রাকনাশক আছে।

কাঁঠালের মুচি পচে কালো হয়ে ঝরে যাওয়া এ মৌসুমের পরিচিত সমস্যা। কৃষি তথ্য সার্ভিস এর জন্য বোর্দো মিশ্রণ স্প্রের কথা বলেছে। বোর্দো মিশ্রণ হলো তুঁতে ও চুন মিশিয়ে তৈরি পুরোনো ও পরীক্ষিত একটি ছত্রাকনাশক। লিচু গাছেও মুকুল ও গুটি রক্ষায় পোকা ও রোগের দিকে নজর রাখতে হয়। সব ফলগাছের গোড়ায় এ সময় নিয়মিত সেচ দিলে গুটি ঝরা কমে, কারণ খরায় গাছ নিজেই কিছু গুটি ফেলে দেয়।

নতুন ফলের বাগান করার কথা যাঁরা ভাবছেন, তাঁদের জন্য মার্চ প্রস্তুতির মাস। জমি বাছাই, নকশা করা, গর্ত খুঁড়ে তাতে জৈব সার মিশিয়ে রাখার কাজ এখন করা যায়। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবার তথ্য অনুযায়ী আমের চারা রোপণের উপযুক্ত সময় জ্যৈষ্ঠ থেকে আষাঢ় এবং ভাদ্র থেকে আশ্বিন। তাই গর্ত আগেভাগে তৈরি থাকলে বর্ষা নামার সঙ্গে সঙ্গে চারা লাগানো যায়, আর সেচ দিতে পারলে চারা লাগানোর কাজ আরও আগে সারা যায়।

পুকুর তৈরির এখনই সময়


শুষ্ক মৌসুমের শেষে অনেক পুকুরের পানি তলায় নেমে যায়। মাছচাষিদের জন্য এটাই পুকুর তৈরির সবচেয়ে ভালো সময়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ, পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে নিচ থেকে পচা কাদা তুলে ফেলতে হবে এবং শতাংশপ্রতি ১ কেজি চুন দিতে হবে। পচা কাদায় ক্ষতিকর গ্যাস ও রোগজীবাণু জমে থাকে, আর চুন মাটির অম্লতা কমায় ও জীবাণু দূর করে।

চুন দেওয়ার কয়েক দিন পর পরিষ্কার পানি ঢুকিয়ে জৈব সার দিলে পানিতে প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হয়। এই প্রাকৃতিক খাবার হলো খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না এমন ক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণী, যা পানিকে হালকা সবুজ রং দেয় এবং মাছের পোনার প্রথম খাবার হয়। যে পুকুরে মাছ আছে, সেখানে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছের খাওয়া ও বৃদ্ধি বাড়ে, তাই খাবারের পরিমাণ ও মান বাড়াতে হয়। পানি খুব কমে গেলে বা নষ্ট হলে আংশিক পানি বদলে দেওয়া যায়।

গরমের শুরুতে গরু, ছাগল ও মুরগি


চৈত্রের গরম শুধু মানুষকে নয়, খামারের পশুপাখিকেও কাবু করে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাসিক পরামর্শে বলা হয়েছে, চৈত্রে বেশ গরম পড়ে, তাই গবাদিপশুর এ সময় বিশ্রামের প্রয়োজন। দুপুরের কড়া রোদে গরুকে দিয়ে হাল চাষ বা ভারী কাজ না করানো, ছায়ায় রাখা, আর দিনে কয়েকবার পরিষ্কার পানি খেতে দেওয়া এ মাসের মূল নিয়ম।

গরু ও ছাগলের খাদ্যতালিকায় এ সময় পুষ্টিকর খাবার যোগ করা দরকার। শুকনো খড়ের পাশাপাশি কাঁচা ঘাস, দানাদার খাবার, খৈল ও খনিজ মিশ্রণ দিলে পশুর শরীর ঠিক থাকে, দুধও কমে না। মৌসুম বদলের সময় রোগের ঝুঁকি বাড়ে, তাই পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং নিয়ম অনুযায়ী টিকা দেওয়া জরুরি। কোন রোগের টিকা কখন দিতে হবে, তা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে জানা যায়।

হাঁস মুরগির খামারিদের জন্য কৃষি তথ্য সার্ভিসের সতর্কবার্তা হলো, শীত শেষে গরম পড়ার এই সময়টিতে বেশ সতর্ক থাকতে হবে। ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ঠান্ডা পানি, প্রয়োজনে ভিটামিন, আর সময়মতো টিকা মুরগিকে গরমের ধকল সামলাতে সাহায্য করে। ঘরের চালে খড় বা চট বিছিয়ে দিলে ভেতরের তাপ কিছুটা কমে।

আকাশের দিকে চোখ রাখা


মার্চের শেষ দিক থেকে দেশে কালবৈশাখীর মৌসুম শুরু হয়। বিকেলের দিকে হঠাৎ কালো মেঘ, দমকা ঝড়, কখনো শিলাবৃষ্টি। পাকা গম, পাকা ছোলা বা ফুল আসা বোরো ধানের জন্য এমন একটি ঝড়ই যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হতে পারে। শিলার আঘাতে ধানের শিষ ও আমের গুটি ঝরে যায়, ঝড়ে কলাগাছ ও লতানো সবজির মাচা ভেঙে পড়ে। তাই পাকা ফসল মাঠে ফেলে না রেখে যত দ্রুত সম্ভব কেটে ঘরে তোলাই নিরাপদ।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস এখন মোবাইল ফোন, রেডিও ও টেলিভিশনে নিয়মিত পাওয়া যায়, আর কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা উপজেলাভিত্তিক কৃষি পরামর্শও দেয়। ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে সেদিন কীটনাশক বা সার না দেওয়া ভালো, কারণ বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়ে টাকা ও শ্রম দুটোই নষ্ট হয়। কলাগাছ ও পেঁপে গাছে খুঁটি দিয়ে বেঁধে রাখা, মাচার খুঁটি শক্ত করা, আর মাড়াই করা শস্য রাতে ঢেকে রাখার মতো ছোট কাজগুলো ঝড়ের রাতে বড় ক্ষতি ঠেকায়।

এ মাসে আরেকটি কাজ অনেকে ভুলে যান: পরের মৌসুমের বীজ রাখা। নিজের খেতের সবচেয়ে সুস্থ গাছ থেকে ডাল ও সবজির বীজ আলাদা করে তুলে, ভালো করে শুকিয়ে, বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে পরের বছর বীজ কেনার খরচ কমে। তবে উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের মধ্যে পার্থক্য মনে রাখতে হবে; হাইব্রিড ফসলের বীজ থেকে পরের বছর একই রকম ফলন পাওয়া যায় না, তাই সেগুলোর বীজ প্রতিবার নতুন করে কিনতে হয়।

মার্চের কাজ কেন বছরের ফলন ঠিক করে


মার্চে যে কাজ সময়মতো হয়, তার ফল আসে পরের কয়েক মাস ধরে। বোরো খেতে পানি ঠিক থাকলে বৈশাখে ধান ভরা থাকে। গম ঠিকমতো শুকালে সারা বছর গোলায় ভালো থাকে। মুকুল রক্ষা পেলে জ্যৈষ্ঠে আম বাজারে যায়। পুকুর এখন তৈরি হলে বর্ষার আগেই পোনা ছাড়া যায়। আবার এ মাসে একটি কাজ পিছিয়ে গেলে তার জের টানতে হয় পুরো মৌসুম।

মাঠে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কৃষক নিজের ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে ফোন করেও পরামর্শ পাওয়া যায়। মাছ ও পশুপাখির জন্য আছে উপজেলা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর। মাসের শুরুতে একটি ছোট তালিকা করে কোন খেতে কবে কী কাজ, তা ঠিক করে নিলে চৈত্রের ব্যস্ততা অনেকটাই সামলে নেওয়া যায়।

ছবি: পাটখেতে কৃষক, Afifa Afrin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

অন্যান্য

সম্পর্কিত খবর

অন্যান্য

ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষিতে করণীয় কাজ: ফসল ধরে ধরে মাঠের পঞ্জিকা

শীত বিদায় আর গরমের শুরু, ফেব্রুয়ারিতে একসঙ্গে ফসল তোলা, বীজ বোনা আর পরিচর্যার চাপ। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাসভিত্তিক পরামর্শ ধরে বোরো, গম, ভুট্টা, পাট, ডাল, সরিষা, সবজি, আম-লিচু, পুকুর ও গবাদি পশুর এ মাসের কাজ।

তানিয়া চৌধুরী২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
অন্যান্য

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান

জিডিপিতে কৃষির ভাগ কমছে, কিন্তু দেশের প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী মানুষ এখনো মাঠে, খামারে আর জলাশয়ে কাজ করেন। খাদ্য নিরাপত্তা, পাট ও চায়ের রপ্তানি, শিল্পের কাঁচামাল আর গ্রামীণ দারিদ্র্য কমানোয় কৃষির ভূমিকা, সামনের চ্যালেঞ্জ এবং টেকসই কৃষির পথ নিয়ে বিশ্লেষণ।

তানিয়া চৌধুরী২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
অন্যান্য

খাদ্য নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের কৃষি

প্রাপ্যতা, প্রবেশাধিকার, ব্যবহার ও স্থিতিশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তার এই চার স্তম্ভের আলোয় বাংলাদেশ। চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পুষ্টির ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তন, কমতে থাকা জমি ও বিতরণের দুর্বলতা; আর সবার পাতে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার পথ।

তানিয়া চৌধুরী২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)