সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) ভেতরে কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র বা চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়াই গড়ে ওঠা ২৪টি রিসোর্ট চিহ্নিত করেছে পরিবেশ অধিদফতর। ৪ অক্টোবর অধিদফতরের খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ মালিকদের লিখিতভাবে রিসোর্ট বন্ধ এবং ৩০ দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। বাংলা ট্রিবিউনের খুলনা প্রতিনিধি হেদায়েৎ হোসেন খুঁজেছেন, এগুলো কীভাবে তৈরি হলো।
রিসোর্টগুলোর ১৮টি খুলনার দাকোপে (ঢাংমারী, কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা), চারটি সাতক্ষীরায় এবং দুটি বাগেরহাটের মোংলায়। বাণিজ্যিক রিসোর্টের শুরু ২০০৯ সালে, যখন বনজীবী, দাতা সংস্থার প্রতিনিধি ও গবেষকদের থাকার জন্য সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জে এনজিও সুশীলন 'টাইগার পয়েন্ট' তৈরি করে। ২০১৫ সালে দাতা সংস্থার সহায়তায় দাকোপে ১০টি রিসোর্ট হয়, যার গোলকানন ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে; গত তিন-চার বছরে নতুন করে আরও অনেক গড়ে উঠেছে। মালিকদের দাবি, রিসোর্টগুলো বনের সীমানার ভেতরে নয়, বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে; কোনো মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় যে যার মতো কটেজ বানিয়েছেন।
মালিকদের অনেকে পরে পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন করেছিলেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজ দিতে না পারায় ৩০ সেপ্টেম্বর সব আবেদন বাতিল হয়। ইরাবতী ও বনমালী রিসোর্টের মালিক এবং রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক যুবাইর হিরা বলেন, তাঁরা ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন, জেলা প্রশাসনের অনুমতির জন্য ৫৮ হাজার টাকা জমা দিয়ে আবেদন করেছেন, মাসে গড়ে ২০ হাজার টাকা ভ্যাট দেন। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে এসব এলাকায় লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব নয়, আর পরিবেশ অধিদফতর বলেছে ইসিএতে ছাড়পত্রের বিধান নেই। তাঁর প্রশ্ন, মোংলা ইপিজেড ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ১০ কিলোমিটারের ইসিএর ভেতরে থেকে ছাড়পত্র পেলে রিসোর্ট কেন পাবে না।
যুবাইর হিরার হিসাবে, ইরাবতী তৈরিতে চার বছরে এবং এক বছরের কম বয়সী বনমালীতে সোয়া কোটি টাকা করে খরচ হয়েছে, কোনো কোনো রিসোর্টে দুই থেকে তিন কোটি টাকা। প্রতিটিতে ২০ থেকে ২৫ জন স্থানীয় কর্মী কাজ করেন, আশপাশে দোকানপাট গড়ে উঠেছে এবং বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প আয় তৈরি হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
পরিবেশ অধিদফতরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক বলেন, 'পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় কোনো রিসোর্ট পরিচালনা করা যায় না। নোটিশে সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্ধ না হলে আমরাই সেগুলো বন্ধ করে দেব।' সাতক্ষীরা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সোমেন মৈত্র জানান, সে জেলার চারটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জে ডি এম হাছানুর রহমান বলেন, রিসোর্টগুলো বন বিভাগের সীমানার বাইরে ব্যক্তিগত জমিতে হওয়ায় সরাসরি উচ্ছেদের আইনি সুযোগ বন বিভাগের সীমিত। তবে এসব রিসোর্ট থেকে বনের গভীরে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেম, রাতভর তীব্র আলো এবং প্লাস্টিক ও ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলায় সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র চরম হুমকিতে পড়েছে, তাই বন্ধ করা জরুরি। পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, শব্দ, আলো ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করে; বন রক্ষা ও স্থানীয় অর্থনীতি দুই দিক বিবেচনায় একটি সমন্বিত নীতিমালার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ছবি: David M. / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন





মন্তব্য
(০)