ইসলামি আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে হাম্বলি মাজহাবের ইমাম ইবনে কুদামা আল-মাকদিসির ‘আল-মুগনি’ তুলনামূলক ফিকহের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত। প্রথম আলোর ইসলাম পাতায় মনযূরুল হকের এক লেখায় গ্রন্থটির জন্ম, গঠন ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।
ইবনে কুদামার পুরো নাম আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি। ১১৪৬ খ্রিষ্টাব্দে (৫৪১ হিজরি) ফিলিস্তিনের নাবলুস এলাকার জাব্বাইন গ্রামে তাঁর জন্ম। দামেস্ক ও বাগদাদে সে সময়ের শীর্ষ আলেমদের কাছে তিনি পড়েছেন, যাঁদের একজন ছিলেন আবদুল কাদির জিলানি। ফিকহ, হাদিস, উসুল ও জুহদের সমন্বয় ছিল তাঁর জ্ঞানচর্চার বৈশিষ্ট্য।
লেখাটির ভাষ্য, ইবনে কুদামার বইগুলো সাজানো একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাক্রমের মতো। শুরুর স্তরে ‘উমদাতুল ফিকহ’, যেখানে মতভেদ বা দীর্ঘ দলিল ছাড়া শুধু মাজহাবের নির্ভরযোগ্য একটি সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। মধ্যবর্তী স্তরে ‘আল-মুকনি’, যা মাজহাবের ভেতরের একাধিক মত চেনায়। এরপর ‘আল-কাফি’, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনের কোরআন, হাদিস ও সাহাবিদের বক্তব্যের দলিল আর যুক্তি শেখানো হয়। এই তিন ধাপ পেরিয়ে শিক্ষার্থী পৌঁছান ‘আল-মুগনি’তে।
‘আল-মুগনি’ মূলত চতুর্থ হিজরি শতকের হাম্বলি ফকিহ আবুল কাসিম ওমর ইবনুল হুসাইন আল-খিরাকির (মৃত্যু ৩৩৪ হিজরি) সংক্ষিপ্ত পাঠ ‘মুখতাসারুল খিরাকি’র ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যেখানে প্রায় ২,৩০০টি ফিকহি মাসআলা সাজানো ছিল। ‘মুগনি’ শব্দের অর্থ ‘স্বয়ংসম্পূর্ণকারী’; লেখকের ভাষায়, গ্রন্থটি এতটাই পূর্ণাঙ্গ যে এটি পড়ার পর গবেষককে অন্য অনেক বইয়ের মুখাপেক্ষী হতে হয় না।
গ্রন্থটির প্রধান বৈশিষ্ট্য তুলনামূলক বিচার। ইবনে কুদামা হাম্বলি মাজহাবের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও সুফিয়ান আস-সাওরিসহ নানা মুজতাহিদের মত ও দলিল বিশ্বস্তভাবে তুলে ধরেছেন, তারপর নিজের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, এমনকি তা হাম্বলি অবস্থানের বাইরে গেলেও। শাফেয়ি মাজহাবের আলেম ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম বলতেন, ‘আল-মুগনি’র একটি কপি হাতে না আসা পর্যন্ত ফতোয়া দিতে তাঁর মন সায় দিত না।
লেখায় অন্য মাজহাবের বড় গ্রন্থগুলোর সঙ্গেও তুলনা টানা হয়েছে: হানাফি মাজহাবে আলাউদ্দিন আল-কাসানির ‘বাদাইউস সানাই’, মালেকি মাজহাবে ইবনে আবদিল বারের ‘আল-ইস্তিজকার’, শাফেয়ি মাজহাবে ইমাম নববির ‘আল-মাজমু’ এবং জাহিরি মাজহাবে ইবনে হাজমের ‘আল-মুহাল্লা’। লেখকের মতে, কাসানির চেয়ে ইবনে কুদামার তুলনার পরিধি বিস্তৃত, নববি হাদিসের সনদ বিচারে বেশি মনোযোগী, আর ইবনে হাজমের তীক্ষ্ণ বিতর্কের বিপরীতে ইবনে কুদামা কিয়াস স্বীকার করে ভিন্নমতের প্রতি বিনয় বজায় রেখেছেন।
লেখকের উপসংহার, ‘আল-মুগনি’ শুধু হাম্বলি মাজহাবের সম্পদ নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর গবেষণার ধারক; একটি মাজহাবের পাঠ থেকে তুলনামূলক আইনশাস্ত্রে পৌঁছানোর যে পথ ইবনে কুদামা দেখিয়েছেন, তা পরের সব যুগের ফিকহ গবেষকের জন্য দিশারি।
ছবি: أبو تائب / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0); ‘আল-মুগনি’র খণ্ডগুলো
সূত্র: প্রথম আলো




মন্তব্য
(০)