ফ্রিজ আসার অনেক আগে ঢাকার হেঁশেলে গরুর মাংসের এমন একটি পদ রান্না হতো, যা দীর্ঘ যাত্রায় এক মাসের বেশি সময় খাওয়া যেত। নাম জাহাজি কালিয়া। দূরপথের যাত্রীরা বাখরখানির সঙ্গে এটি নিয়ে বের হতেন, আর সবচেয়ে বেশি কদর ছিল হজযাত্রীদের কাছে। আমার দেশে প্রকাশিত এক লেখায় হারিয়ে যেতে বসা এই পদের ইতিহাস ও পুরোনো রেসিপি তুলে ধরা হয়েছে।
সেকালে ঢাকা থেকে মক্কা, মদিনা ও আরাফাত ঘুরে ফিরতে কমপক্ষে প্রায় পাঁচ মাস লাগত। ঐতিহাসিক আবদুল হক চৌধুরীর বরাতে লেখায় বলা হয়েছে, সুলতানি আমলে (১৩৪০-১৫৩৮) বাংলার হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বা সাতগাঁও থেকে জাহাজে প্রায় ৫,৬৩৩ নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিয়ে জেদ্দা পৌঁছাতেন। ব্রিটিশ আমলে বোম্বে হয়ে ওঠে হজযাত্রার প্রধান বন্দর। ঢাকা-গবেষক হাশেম সুফির বর্ণনায়, তাঁর পূর্বপুরুষেরা উটের কাফেলায় হজে যাওয়ার সময় জাহাজি কালিয়া সঙ্গে নিতেন।
হেকিম হাবিবুর রহমান ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ঢাকা পাচাস বারাস পাহলে গ্রন্থে লিখেছেন, জাহাজি কালিয়ার কথা না বললে ঢাকার বর্ণনা অসম্পূর্ণ থাকে। তাঁর বর্ণনায়, মাংস ও মাছ দুটিই এই কালিয়ায় পাক হতো জলপাই বা জয়তুনের তেলে, আর ঘি বা সাধারণ তেল দিলে কালিয়ার আয়ু কমে যেত। তিনি নিজে এর স্বাদ নিয়েছেন এবং আশঙ্কা করেছিলেন, শহরে হাতেগোনা দু-একটি পরিবার ছাড়া কেউ আর এটি রাঁধতে পারবে না।
সংরক্ষণের নিয়মও ছিল কড়া। কালিয়া রাঁধা ও বহন করা হতো চীনামাটির বয়ামে। এতে হাত লাগানো চলত না, কাঠের চামচ ছাড়া অন্য চামচ ব্যবহার করা যেত না। ভেতরের কালিয়া শুকনো রাখতে হতো, আর পাত্র রাখা হতো আগুনের আঁচ থেকে দূরে।
পুরোনো রেসিপি অনুযায়ী এক কেজি গরুর মাংসে মেশানো হতো লবণ, লেবুর রস, জিরা গুঁড়া, ধনে গুঁড়া, শুকনা মরিচ গুঁড়া ও কেওড়াজল, প্রতিটি এক টেবিল চামচ। সঙ্গে তিন টেবিল চামচ শাহি গরম মসলা, চারটি কাঁচামরিচ বাটা, এক কাপ জলপাই তেল, এক কাপ টকদই এবং এক চা-চামচ করে হলুদ গুঁড়া ও চিনি।
সব উপকরণ মাখিয়ে দুই ঘণ্টা ঢেকে রাখার পর কম আঁচে আরও দুই ঘণ্টা রান্না করা হতো। মাংস সেদ্ধ হয়ে এলে ভেজে ভেজে ঝরঝরে ও শুকনো করে নেওয়া হতো। লেখক মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই পরিমাপ আধুনিক রান্নার ভাষায় লেখা পুরোনো রেসিপির রূপান্তর; আদি পদ্ধতি ঠিক এমনই ছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
ছবি: পুরান ঢাকার একটি বাখরখানির দোকান, Mak / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.5)
সূত্র: আমার দেশ





মন্তব্য
(০)