হিজরির নবম বছরে আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একের পর এক প্রতিনিধিদল মদিনায় আসে। ইসলামের ইতিহাসে বছরটি তাই পরিচিত 'আমুল উফুদ' বা প্রতিনিধিদলের বছর নামে। কেউ এসেছিলেন ইসলাম সম্পর্কে জানতে, কেউ আনুগত্যের অঙ্গীকার করতে, কেউ নিজ গোত্রের অবস্থান জানাতে। রাসুল (সা.) প্রত্যেকের সঙ্গে পরিস্থিতি বুঝে কথা বলেছেন: কোথাও যুক্তিতে, কোথাও আন্তরিক অভ্যর্থনায়, কোথাও স্পষ্ট সিদ্ধান্তে।
এই ঢলের পেছনে ছিল অষ্টম হিজরির মক্কা বিজয়। তার আগে অনেক গোত্র কোরাইশের সঙ্গে রাসুলের সংঘাতের পরিণতি দেখার অপেক্ষায় ছিল। মক্কা বিজয় ও তায়েফের প্রতিনিধিদলের ইসলাম গ্রহণের পর মানুষের আগমন বাড়তে থাকে। সুরা নাসরের প্রথম দুই আয়াতে মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখার কথা এসেছে। তবে ইবনে হিশামের সিরাত গ্রন্থ অনুযায়ী, প্রতিনিধিদলের আগমন নবম হিজরিতেই প্রথম নয়, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে দল এসেছিল।
বনু তামিমের প্রতিনিধিদলের কয়েকজন নবীজির কক্ষগুলোর বাইরে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে তাঁকে ডাকাডাকি করেন; সুরা হুজুরাতের ৪-৫ আয়াতে এ আচরণের কথা আছে। তবু রাসুল (সা.) তাঁদের সঙ্গে আলোচনা থেকে বিরত থাকেননি। দলের কবি ও বক্তাদের জবাব দিতে তিনি সাবিত ইবনে কায়েসকে বক্তৃতায় এবং হাসসান ইবনে সাবিতকে কবিতায় দায়িত্ব দেন। এরপর তামিম নেতারা মুসলিম পক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে ইসলাম গ্রহণ করেন।
বনু আবদিল কায়সের প্রতিনিধিদের রাসুল (সা.) আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। সহিহ বুখারির বর্ণনায় তিনি বলেন, সেই দলকে স্বাগতম, যারা লাঞ্ছিত ও অনুতপ্ত না হয়ে এসেছে। দলনেতা আশাজকে তিনি বলেন, তাঁর মধ্যে এমন দুটি গুণ আছে যা আল্লাহ ভালোবাসেন: সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা (সহিহ মুসলিম)।
বনু হানিফার দলের সঙ্গে আসা মুসাইলামা নেতৃত্বের অংশীদারত্ব চাইলে রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায় তিনি বলেন, খেজুরগাছের একটি ছোট ডাল চাইলেও তা দেবেন না। পরে মুসাইলামা মিথ্যা নবুয়তের দাবি তোলে এবং আবু বকরের (রা.) খেলাফতকালে ইয়ামামার যুদ্ধে নিহত হয়।
লেখকের মতে, আমুল উফুদের বড় তাৎপর্য হলো আরবের নানা অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। প্রতিনিধিরা মদিনায় এসে বিধান জেনে নিজ গোত্রে ফিরে শিক্ষা ছড়িয়েছেন। তাঁর সারকথা: সম্পর্ক গড়তে শোনার মানসিকতা লাগে, সম্মান ও ইতিবাচক গুণের স্বীকৃতি আস্থা বাড়ায়, আর সংলাপের সুযোগ দেওয়া মানে নিজের আদর্শ ছেড়ে দেওয়া নয়।
লেখাটি লিখেছেন ঢাকার জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ীর শিক্ষক ফয়জুল্লাহ রিয়াদ; মতামত লেখকের নিজের।
ছবি: Mondephile / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)