২০১৪ সালের জুনে ঢাকায় পুলিশের অভিযানে দুই দিনে প্রায় ২০০ টন ফল নষ্ট করা হয়, যার মধ্যে ছিল ১২০ টন আম আর পাঁচ লাখের বেশি লিচু। অভিযোগ ছিল, এসব ফলে ফরমালিন মেশানো হয়েছে। এরপর থেকে প্রতি আমের মৌসুমে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে: বিষাক্ত রাসায়নিক ছাড়া ফল ও মাছ তাজা রাখার নিরাপদ কোনো উপায় কি আছে?
এর একটি উত্তর এসেছিল সাভারের একটি গবেষণাগার থেকে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তখনকার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোবারক আহমদ খান জানান, চিংড়ির ফেলে দেওয়া খোসা থেকে তৈরি প্রাকৃতিক উপাদান কাইটোসান (কিটোজেন নামেও লেখা হয়) ফরমালিনের বদলে খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহার করা যায়। এই প্রতিবেদনে থাকছে তিনি ও তার সহকর্মীরা কী অর্জনের কথা বলেছিলেন, কাইটোসান কীভাবে তৈরি হয়, প্রকাশিত গবেষণায় কী পাওয়া গেছে, ফরমালিন নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কেন উদ্বিগ্ন এবং কোন বিষয়গুলো তখনো প্রমাণের অপেক্ষায় ছিল।
ফেলে দেওয়া খোসা থেকে খাদ্য সংরক্ষক
ড. মোবারকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রক্রিয়াজাত কারখানা ও রান্নাঘরে যে চিংড়ির খোসা ফেলে দেওয়া হয়, তা থেকেই প্রাকৃতিকভাবে কাইটোসান তৈরি করা যায়। তিনি একে ব্যয়সাশ্রয়ী ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয় বলে বর্ণনা করেন এবং জানান, বিভিন্ন ফল ও সবজি সংরক্ষণে এরই মধ্যে এটি সফলভাবে ব্যবহার করেছেন। এরপর মাছের ওপর পরীক্ষা, তারপর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরুর কথা ছিল।
তার তথ্যমতে, তিন বছরের গবেষণার পর কাইটোসান ব্যবহার করে আম দুই থেকে তিন সপ্তাহ, লিচু ১২ থেকে ১৩ দিন, আনারস ১০ থেকে ১২ দিন, হিমায়িত করলা প্রায় ১৮ দিন এবং টমেটো ২১ দিন সংরক্ষণ করা গেছে। তিনি বলেন, এতে খাদ্যের গুণগত মান, আকৃতি, রং ও স্বাদে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো সাভারের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ইনস্টিটিউট অব রেডিয়েশন অ্যান্ড পলিমার টেকনোলজি (আইআরপিটি) ঘুরে জানায়, প্রায় আট বছর আগে, ২০০৮ সালে, দলটি প্রথম চিংড়ির খোসা থেকে কাইটোসান তৈরি করে। গবেষণা সমন্বয়ক ছিলেন জাহিদ মো. মাহাবুব ইসলাম। ২০১২ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক পরীক্ষায় কাইটোসান দেওয়া আম ১৪ দিন ভালো ছিল, আর আনারস ১০ দিন পর্যন্ত রাখা গেছে। জাম, স্ট্রবেরি ও কাঁঠালেও পরীক্ষা চালানো হয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাইটোসান দেওয়া মলা মাছ খোলা অবস্থায় ১৮ ঘণ্টা এবং তেলাপিয়া ২১ ঘণ্টা ভালো ছিল। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক পাঠকের চিঠিতে টাঙ্গাইলের মধুপুরের একটি আনারস খামারে পরীক্ষার কথাও উল্লেখ করা হয়।
ড. মোবারক আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক বৈঠকে তার আবিষ্কারের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয় এবং তা এগিয়ে নিতে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। তার বর্ণনায়, কমিটিতে ছিলেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, দপ্তরের মহাপরিচালক, বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা। কমিটির বৈঠকে অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে বলা হয় এবং মাছের ওপর কাজ শুরুর অনুমতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশে কাইটোসান তৈরির প্রক্রিয়া পেটেন্ট করার কথাও ভাবছেন বলে তিনি জানান।
চিংড়ির খোসা থেকে কাইটোসান যেভাবে তৈরি হয়
চিংড়ির শক্ত বাইরের খোসায় প্রচুর কাইটিন থাকে, যা একটি প্রাকৃতিক পলিমার। কাইটিন থেকে এর অ্যাসিটাইল গ্রুপের একাংশ সরিয়ে কাইটোসান পাওয়া যায়; রসায়নবিদেরা এ প্রক্রিয়াকে বলেন ডিঅ্যাসিটাইলেশন। ২০১৮ সালে পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজিতে জিয়ানফ্রাঙ্কো রোমানাজ্জি, এরিকা ফেলিজিয়ানি ও ধারিণী শিবকুমারের এক পর্যালোচনায় কাইটোসানকে গ্লুকোসামিন ও এন-অ্যাসিটাইলগ্লুকোসামিন একক দিয়ে গঠিত একটি সরল শিকলের পলিস্যাকারাইড বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে, সেলুলোজের পর এটি প্রকৃতির সবচেয়ে প্রচুর পলিমারগুলোর একটি।
সাভারে ব্যবহৃত ধাপগুলো ড. মোবারক বর্ণনা করেন। প্রথমে খোসা ৩ শতাংশ সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (কস্টিক সোডা) দ্রবণে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়, তাতে পাওয়া যায় কাইটিন। এরপর কাইটোসান তৈরিতে রেডিয়েশন ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, অন্য দেশে সাধারণত ব্যয়বহুল রাসায়নিক পদ্ধতিতে কাইটোসান তৈরি হয়, আর তার দল ব্যবহার করেছে গামা রশ্মি, যা তুলনামূলক সস্তা। ওই ধাপে অন্য কোনো রাসায়নিক যোগ হয় না বলে এতে পরিবেশ দূষণ হয় না বলেও তিনি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সীতেশ চন্দ্র বাছার ২০১৬ সালে প্রথম আলোকে রসায়নটি ব্যাখ্যা করেন: চিংড়ির খোসার উপাদানগুলোকে অ্যাসিড ও ক্ষার দিয়ে বিক্রিয়া ঘটিয়ে কাইটোসান তৈরি করা হয়। রেডিয়েশন কোথায় কাজে লাগে, তা দলটির প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দেখা যায়। এইউএসটি জার্নাল অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সপ্তম খণ্ডে (২০১৫ সালের সংখ্যা) মো. আবদুল কাদের, নেহার পারভীন, মো. ইলিয়াস মোল্লা ও মোবারক এ খানের গবেষণায় আইআরপিটিতে চিংড়ির খোসা থেকে আহরিত কাইটোসান ২ শতাংশ অ্যাসিটিক অ্যাসিডে ২ শতাংশ হারে দ্রবীভূত করা হয়। সেই দ্রবণে ১২০ কিলোকুরি উৎস থেকে ঘণ্টায় ৩.২ কিলোগ্রে হারে মোট ৪০ কিলোগ্রে গামা রশ্মি দেওয়া হয়। রশ্মি দেওয়া কাইটোসানের ডিঅ্যাসিটাইলেশনের মাত্রা ছিল প্রায় ৭৯ শতাংশ।
ড. মোবারক উল্লেখ করেন, খাদ্য সংরক্ষণে রেডিয়েশন প্রযুক্তি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) অনুমোদিত একটি নিরাপদ প্রক্রিয়া। ১৯৮০ সালে খাদ্য বিকিরণবিষয়ক এফএও, আইএইএ ও ডব্লিউএইচওর যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে গড়ে ১০ কিলোগ্রে পর্যন্ত মাত্রায় যেকোনো খাদ্যপণ্যে রশ্মি দিলে তা ভোক্তার জন্য বিষাক্ততার ঝুঁকি তৈরি করে না। তবে সাভারের পদ্ধতিতে রশ্মি দেওয়া হয় কাইটোসান দ্রবণে, ফলে নয়।
প্রকাশিত গবেষণায় যা পাওয়া গেছে
২০১৩ সালে আশনা ইসলাম, মাহফুজা শরিফা সুলতানা, ফাহমিদা পারভীন ও মোবারক এ খান জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি এনভায়রনমেন্টাল বুলেটিনের দ্বিতীয় খণ্ডে (পৃষ্ঠা ৩৫ থেকে ৪০) আম সংরক্ষণে কাইটোসানে গামা রশ্মির কার্যকর মাত্রা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এতে বলা হয়, ৫০ ও ১০০ কিলোগ্রে রশ্মি দেওয়া কাইটোসান আমের সংরক্ষণকাল বাড়াতে বেশি কার্যকর।
পরের এইউএসটি গবেষণায় আরও বিস্তারিত পাওয়া যায়। গবেষকেরা মানিকগঞ্জ জেলার একটি বাগান থেকে আম্রপালি জাতের কাঁচা আম সংগ্রহ করেন। আমগুলো ৫০০, ৭৫০ ও ১০০০ পিপিএম (প্রতি দশ লাখ ভাগে ভাগ) মাত্রার রশ্মি দেওয়া কাইটোসান দ্রবণে দুই মিনিট ডুবিয়ে রাখা হয়, তারপর বাতাসে শুকিয়ে খোলা অবস্থায় বা জিপ ব্যাগে ঘরের তাপমাত্রায় এবং হিমায়িত অবস্থায় রাখা হয়। তুলনার জন্য কাইটোসান না দেওয়া আমও রাখা হয়।
- ঘরের তাপমাত্রায় কাইটোসান না দেওয়া আম ছয় দিন পর কুঁচকে নষ্ট হতে শুরু করে এবং ১২তম দিনের মধ্যে সবগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
- কাইটোসান দেওয়া আম ১২ দিন পর্যন্ত পুরোপুরি তাজা ছিল, এরপর কিছু আম নষ্ট হতে শুরু করে।
- খোলা অবস্থায় ১৮ দিন পর ৭৫০ বা ১০০০ পিপিএম দ্রবণে ডোবানো আমের ওজন কমে ২৭.৩ শতাংশ, আর ৫০০ পিপিএমে ডোবানো আমের ২৮.৯ শতাংশ।
- তিন মাত্রার মধ্যে ৭৫০ পিপিএমে গড়ে ওজন কমেছে সবচেয়ে কম, তাই গবেষকেরা একেই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলেছেন।
গবেষকেরা এর কারণ হিসেবে কাইটোসানের জীবাণুরোধী গুণ এবং ফলের গায়ে তৈরি হওয়া পাতলা আবরণের কথা বলেন। এই আবরণ অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের আদান-প্রদান ধীর করে এবং পানি বেরিয়ে যাওয়া আটকায়। আগের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তারা জানান, ঘরের তাপমাত্রায় আম মাত্র ৪ থেকে ৮ দিন এবং ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের হিমাগারে ২ থেকে ৩ সপ্তাহ ভালো থাকে, আর অব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের অভাবে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ আম নষ্ট হয়।

খরচ ও খোসার জোগান: বিজ্ঞানীদের হিসাবে
ড. মোবারক বলেন, দেশীয় কাঁচামাল দিয়েই চাহিদা অনুযায়ী কাইটোসান উৎপাদন সম্ভব। তার হিসাবে, বাণিজ্যিকভাবে প্রতি কেজি আমে এক টাকার কাইটোসানই যথেষ্ট, আর সবজিতে কেজিপ্রতি খরচ পড়বে ৪০ পয়সা। তিনি জানান, প্রতি কেজি চিংড়ি থেকে প্রায় ৬০ গ্রাম খোসা পাওয়া যায় এবং ছয় কেজি খোসা থেকে এক কেজি কাইটোসান তৈরি হয়, যাতে খরচ পড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা। অথচ ভারতে রাসায়নিক পদ্ধতিতে এক কেজি কাইটোসান তৈরিতে খরচ হয় প্রায় এক লাখ টাকা। ২০১৬ সালে দ্য ডেইলি স্টারও তার কাজের খবরে একই ছয়-এক অনুপাত ও ২০ হাজার টাকা খরচের কথা লেখে এবং জানায়, কোনো কোনো দেশে এক কেজি কাইটোসানের দাম পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত।
২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে অবশ্য ভিন্ন হিসাব আসে: ১০ কেজি খোসা থেকে এক কেজি কাইটোসান, দেশীয় পদ্ধতিতে কেজিপ্রতি খরচ প্রায় দুই হাজার টাকা, যেখানে আমদানি করা কাইটোসানের দাম কেজিপ্রতি প্রায় এক লাখ টাকা; আর এক কেজি কাইটোসান থেকে প্রায় ৫০০ লিটার তরল সংরক্ষক তৈরি হয়। দুই হিসাবের পার্থক্যের ব্যাখ্যা প্রতিবেদনগুলোতে ছিল না; দুটিই সে সময়ের বিজ্ঞানীদের অনুমান, বাজারদর নয়।
কাঁচামাল প্রসঙ্গে মূল প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বছরে যে চিংড়ি উৎপাদিত হয়, তা থেকে প্রায় ১৫ হাজার টন খোসা পাওয়া যায়, এবং বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ খোসা থেকে তৈরি কাইটোসান দেশের খাদ্য সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট। প্রথম আলো ২০১৬ সালে জানায়, দেশে তখনো কাইটোসান উৎপাদনের কোনো কারখানা ছিল না এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন নিয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সঙ্গে আলোচনা চলছিল।
ফরমালিন নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ
ফরমালিন হলো পানিতে ফরমালডিহাইডের দ্রবণ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের বর্ণনায়, ফরমালডিহাইড একটি বর্ণহীন, দাহ্য ও তীব্র গন্ধযুক্ত রাসায়নিক, যা নির্মাণসামগ্রী ও নানা গৃহস্থালি পণ্যে ব্যবহৃত হয়। ২০০৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) ফরমালডিহাইডকে মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল টক্সিকোলজি প্রোগ্রাম তাদের ১২তম রিপোর্ট অন কারসিনোজেনসে একে মানুষের জন্য জ্ঞাত ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এর সংস্পর্শে আসা শ্রমিকদের ওপর গবেষণায় সবচেয়ে জোরালো সম্পর্ক পাওয়া গেছে মায়েলয়েড লিউকেমিয়ার সঙ্গে, আর কয়েকটি গবেষণায় নাক ও গলার পেছনের অংশের (ন্যাসোফ্যারিঞ্জিয়াল) ক্যানসারের সঙ্গে।
এসব প্রমাণের বেশির ভাগই শ্বাসের সঙ্গে ফরমালডিহাইড গ্রহণ নিয়ে। খাওয়ার মাধ্যমে গ্রহণের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্সি ফর টক্সিক সাবস্ট্যান্সেস অ্যান্ড ডিজিজ রেজিস্ট্রি (এটিএসডিআর) জানায়, প্রাণীদের দৈনিক শরীরের প্রতি কেজি ওজনে ৫০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম ফরমালডিহাইড খাওয়ানো হলে ওজন কমে, পাকস্থলী ও অন্ত্রে ক্ষত হয় এবং যকৃৎ ও কিডনির ক্ষতি হয়। হংকংয়ের সেন্টার ফর ফুড সেফটির ২০০৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশি পরিমাণে গিলে ফেললে পেটে তীব্র ব্যথা, বমি, কোমা, কিডনির ক্ষতি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে; সেখানে খাবারে ফরমালডিহাইড মেশানো নিষিদ্ধ।
হংকংয়ের ওই প্রতিবেদনে পরীক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ও আছে: ফরমালডিহাইড খাবারে প্রাকৃতিকভাবেও থাকে। আপেলে প্রতি কেজিতে ৬.৩ থেকে ২২.৩ মিলিগ্রাম এবং নাশপাতিতে ৩৮.৭ থেকে ৬০ মিলিগ্রাম প্রাকৃতিক ফরমালডিহাইড পাওয়া গেছে, আর কোনো কোনো খাবারে প্রাকৃতিক মাত্রা প্রতি কেজিতে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। তাই কেবল পরীক্ষায় ফরমালডিহাইড ধরা পড়লেই প্রমাণ হয় না যে ব্যবসায়ী তা মিশিয়েছেন। খাবারে কোনো রাসায়নিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দেশের বাজারে ফরমালিন ও আইন
ফরমালিন-আতঙ্ক চূড়ায় ওঠে ২০১৪ সালে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের খবর অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জুনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অভিযানে আমে ২ পিপিএম, বরইয়ে ৫.০৭ পিপিএম এবং পেঁপেতে ১৪৩.৯৪ পিপিএম মাত্রা পাওয়ার কথা জানানো হয়, আর কয়েকজনকে মোট ৫০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ২০১৪ সালের ১ থেকে ১০ জুন ঢাকার ৩৫টি স্থান থেকে ২৬৩টি ফলের নমুনা সংগ্রহ করে এবং বেশির ভাগ নমুনায় ফরমালডিহাইড পাওয়ার কথা জানায়, যার মধ্যে ছিল ৬৬ শতাংশ আম ও ৯৫ শতাংশ লিচু।
তবে পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। পুলিশ ও পবা দুই পক্ষই জেড-৩০০ ফরমালডিহাইড মিটার ব্যবহার করেছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৪ সালে জানায়, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) এক প্রতিবেদনে যন্ত্রটিকে ফল পরীক্ষার উপযুক্ত নয় বলা হয়েছে। যন্ত্রটি বাতাসে ফরমালডিহাইড মাপার জন্য তৈরি; অ্যাসিটোন, অ্যাসিটিক অ্যাসিড ও মিথানলের মতো উদ্বায়ী পদার্থ থাকলে বা বেশি তাপমাত্রায় রাখা ফলে এটি ভুল ফল দিতে পারে।
সরকার এর জবাব দেয় আইন করে। জাতীয় সংসদে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয় ২০১৫ সালের ১৬ নভেম্বর, আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এর বিধিমালা জারি করে ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর। আইনটি ফরমালিন নিষিদ্ধ করেনি, কারণ গবেষণাগার, হাসপাতাল, ট্যানারি, বস্ত্রকল ও হ্যাচারিতে এর ব্যবহার আছে; তবে আমদানি, উৎপাদন, পরিবহন, মজুত, বিক্রি ও ব্যবহারে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করেছে। আমদানির লাইসেন্স দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, উৎপাদনের অনুমতি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা; লাইসেন্স ছাড়া আমদানিতে আড়াই বছরের কারাদণ্ড ও তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তার সামগ্রিক বিষয়টি দেখা হয় ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর পাস হওয়া নিরাপদ খাদ্য আইনের অধীনে, যার আওতায় ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) গঠিত হয়।

কাইটোসান যা পারে, যা পারে না
ফলে কাইটোসানের আবরণ কেবল বাংলাদেশের উদ্ভাবন নয়। ২০১৮ সালের ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজির পর্যালোচনায় তোলা ফসল রক্ষায় কাইটোসানের তিনটি কাজের কথা বলা হয়েছে: এটি ছত্রাকের রেণু অঙ্কুরোদ্গম ও রোগজীবাণুর বৃদ্ধি ঠেকায়; ফলের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে; এবং খাওয়ার উপযোগী একটি আবরণ তৈরি করে, যা শ্বসন ও পাকা হওয়ার গতি কমায়। পর্যালোচনায় আরও বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে উদ্ভিদ সুরক্ষায় 'বেসিক সাবস্ট্যান্স' হিসেবে অনুমোদন পাওয়া প্রথম যৌগ কাইটোসান, রেগুলেশন (ইইউ) নম্বর ৫৬৩/২০১৪ অনুযায়ী, জৈব কৃষি ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা দুই ক্ষেত্রেই।
একই পর্যালোচনায় সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরা হয়েছে। কাইটোসান প্রায় ১ শতাংশ ঘনত্বে সবচেয়ে ভালো কাজ করে, পাতলা দ্রবণে সুরক্ষা কমে যায়। ব্যবহারের আগে একে অ্যাসিডে দ্রবীভূত করতে হয়, আর শুরুর দিকের প্রস্তুতিতে এক থেকে দুই দিন লাগত। ফল যত পাকে, এর কার্যকারিতা তত কমে, কারণ পাকা কোষ কম সাড়া দেয়। প্রচলিত ছত্রাকনাশকের তুলনায় খরচও একটি বাধা।
দেশের বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক থাকার কথা বলেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক ২০১৬ সালে প্রথম আলোকে বলেন, কাইটোসান একটি নির্জীব প্রাকৃতিক পদার্থ এবং এর স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই, তবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে আরও পরীক্ষা দরকার। ড. মোবারকের নিজের বর্ণনাতেও পরিকল্পনা ছিল, বাণিজ্যিক ব্যবহারের আগে অন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান দিয়ে ফল যাচাই করানো এবং মাছের ওপর কাজ শেষ করা।
গবেষণার পেছনের বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠান
মোবারক আহমদ খানের জন্ম ১৯৫৮ সালে। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন এবং পলিমার ও বিকিরণ রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি নেন। পরমাণু শক্তি কমিশনে তিনি প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং ইনস্টিটিউট অব রেডিয়েশন অ্যান্ড পলিমার টেকনোলজিতে কাইটোসান গবেষণার নেতৃত্ব দেন। পাট নিয়ে কাজের জন্য তিনি বেশি পরিচিত: ২০০৯ সালে তিনি পাট ও পলিমারের মিশ্রণে তৈরি ঢেউটিন জুটিন উদ্ভাবন করেন, পরে পাট থেকে পচনশীল ব্যাগ সোনালী ব্যাগ তৈরি করেন। তিনি ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির স্বর্ণপদক, ২০১৬ সালে জাতীয় পাট পুরস্কার এবং ২০১৭ সালে ফেডারেশন অব এশিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটিজের পুরস্কার পান।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। সাভারে এর পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কয়েকটি ইনস্টিটিউট রয়েছে, তার একটি খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট। বিকিরণ প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে কমিশনের কাজ বহু বছরের: ১৯৯৩ সালে বেক্সিমকোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে চট্টগ্রামে বাণিজ্যিক গামা বিকিরণ প্লান্ট গামাটেক চালু হয়।

খোসা আসে যেখান থেকে: দেশের চিংড়ি
চিংড়ি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যপণ্যগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, দেশের জলাশয়ে ৫৬ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া যায়, যার ৩৭টি লোনা পানির, ১২টি আধা লোনা পানির এবং ৭টি মিঠা পানির। চাষ হওয়া প্রধান দুটি প্রজাতি হলো বাগদা (Penaeus monodon) এবং গলদা (Macrobrachium rosenbergii)।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টরে বাগদা এবং প্রায় ৬০ হাজার পুকুর ও ধানখেত মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টরে গলদার চাষ হয়, প্রধানত খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও কক্সবাজারে। খুলনা, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে উঠেছে।
নতুন কোনো সংরক্ষকের প্রয়োজন কত বড়, তা বোঝা যায় পুরো মৎস্য খাতের আকার দেখলে। মৎস্য অধিদপ্তরের ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ ২০১৯-২০ অনুযায়ী, যা ২০২১ সালের নভেম্বরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস প্রকাশ করে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদিত হয় ৪৫.০৩ লাখ টন, যার ৫৭.৩৮ শতাংশ এসেছে চাষ থেকে। ওই বছর ৭০ হাজার ৯৫০ টন মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি হয়, যার মূল্য ছিল ৩৯ হাজার ৮৫১.৫০ মিলিয়ন টাকা।
ছবি: পেলাজিক / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, এইউএসটি জার্নাল অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি এনভায়রনমেন্টাল বুলেটিন, ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজি, ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট (যুক্তরাষ্ট্র), এটিএসডিআর, সেন্টার ফর ফুড সেফটি (হংকং), এফএও ও ডব্লিউএইচওর কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)