পৃথিবীর ১৪৯টি দেশে এখন ২৫ কোটি ২০ লাখ হেক্টর এলাকায় প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে, আর তাতে তৈরি হয়েছে ১০ লাখের বেশি সবুজ কর্মসংস্থান। ২৯ অক্টোবর আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে (Yerevan) প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এই হিসাব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, নথিভুক্ত পুনরুদ্ধার উদ্যোগের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়, কিন্তু ২০৩০ সালের লক্ষ্যের তুলনায় গতি অনেক কম।
প্রতিবেদনটির নাম নেচারস কামব্যাক (Nature's comeback: scaling ecosystem restoration for people and planet)। জাতিসংঘের প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার দশকের (২০২১-২০৩০) ঠিক মাঝপথে এটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) এবং জীববৈচিত্র্য সনদের সচিবালয়। জাতিসংঘ জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৭-এর এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে এর উদ্বোধন হয়। প্রায় ১০০ কোটি হেক্টর জমি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে অবক্ষয়িত প্রতিবেশের অন্তত ৩০ শতাংশ কার্যকর পুনরুদ্ধারের আওতায় আনার লক্ষ্য কতটা এগোল, তার প্রথম বৈশ্বিক মূল্যায়ন এটি।
মোট নথিভুক্ত এলাকার ১৯ কোটি ২২ লাখ হেক্টরই এশিয়ায়। এরপর আফ্রিকায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ, ইউরোপে ৯১ লাখ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় ৫৮ লাখ, দক্ষিণ আমেরিকায় ৫৪ লাখ এবং ওশেনিয়ায় ৩২ লাখ হেক্টর। প্রতিবেদনের লেখকেরা বলছেন, এই পার্থক্য কাজের মানের ক্রম নয়; অঞ্চলের আয়তন আর তদারকি ও প্রতিবেদন দেওয়ার সামর্থ্যের প্রতিফলন। দেশ হিসেবে স্থলভাগে সবচেয়ে বেশি এলাকা পুনরুদ্ধারের আওতায় এনেছে চীন, ১২ কোটি ৭৪ লাখ হেক্টর; মঙ্গোলিয়া ও কাজাখস্তানেও বড় এলাকা নথিভুক্ত হয়েছে।
স্থলজ প্রতিবেশে ৩০ শতাংশ লক্ষ্যের প্রায় অর্ধেক অর্জিত হয়েছে। কিন্তু নদী, জলাভূমি ও উপকূল, যেগুলোর অবক্ষয় সবচেয়ে দ্রুত, সেখানে অগ্রগতি সামান্য। ৬২টি দেশে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ হেক্টর মিঠাপানির প্রতিবেশ এবং ৪৬টি দেশে ৫৭ লাখ হেক্টর সামুদ্রিক ও উপকূলীয় প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের তালিকায় আছে। তবে ২০২২ সালের পর জলাভূমি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি চালু করার কথা জানানো দেশের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৪ শতাংশ হয়েছে। প্রতিবেদন সতর্ক করেছে, জলজ প্রতিবেশের তথ্য কম আসায় প্রকৃত কাজ কম দেখানো হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঘাটতি অর্থে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুনরুদ্ধারে বার্ষিক ব্যয় চার গুণের বেশি বাড়িয়ে ৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে নিতে হবে; এতে বিশ্বজুড়ে ৩ কোটি ২০ লাখ পর্যন্ত নতুন কাজ তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি অর্থ দরকার কৃষি বনায়নে, বছরে ৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। এরপর পুনরুদ্ধারমূলক বনায়নে ৫ হাজার ২০০ কোটি, পিটভূমি পুনরুদ্ধারে ৪ হাজার ৪০০ কোটি এবং সামুদ্রিক ঘাস পুনরুদ্ধারে ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার।
এফএওর মহাপরিচালক কু তোংইউ (QU Dongyu) বলেন, দশকের পাঁচ বছর পর বার্তা স্পষ্ট, পুনরুদ্ধার কাজ করে। তাঁর মতে, জমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে পুনরুদ্ধারকে গড়ে তুলতে হবে, কৃষি-খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তরও হতে হবে একই ধারায়। ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন (Inger Andersen) বলেন, প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের যে মাত্রা ও গতি দরকার, পৃথিবী এখনো তাতে পৌঁছায়নি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীন, কলম্বিয়া, ইথিওপিয়া, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি উদ্যোগকে জাতিসংঘ বিশ্ব পুনরুদ্ধার ফ্ল্যাগশিপ ঘোষণা করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্য এসেছে বিভিন্ন দেশের সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন এবং এফএওর পুনরুদ্ধার তদারকি কাঠামোয় (এফইআরএম) নিবন্ধিত উদ্যোগ থেকে। কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় চাহিদা কৃষি বনায়নে, অর্থাৎ পুনরুদ্ধারের অর্থের বড় অংশ খেত ও গাছ একসঙ্গে রাখার দিকে যাওয়ার কথা।
সূত্র: এফএও নিউজরুম




মন্তব্য
(০)