রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের মাছ, পানি ও তলদেশের মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের আলাদা গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে, যার ফল প্রকাশিত হয়েছে স্প্রিংগার নেচার লিংক ও সায়েন্সডিরেক্টের আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে।
গবেষণায় রুই, কাতলা, কালবাউশ, তেলাপিয়া, কাচকি ও চাপিলাসহ নানা প্রজাতির মাছ পরীক্ষা করা হয়। মাছের পরিপাকতন্ত্রে মিলেছে প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র তন্তু, নাইলনের কণা ও প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাঙা অংশ। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হ্রদের রিজার্ভ বাজার, শুভলং বাজার ও বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ঘাট থেকে সংগ্রহ করা পাঁচ ধরনের দেশি ছোট মাছের ৭৫টি নমুনার সবকটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
নমুনাগুলোর মধ্যে টেংরা মাছে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয় (০.৬৩ গ্রাম)। কণার ধরনে মাছ ধরার সরঞ্জাম ও গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে আসা তন্তু ছিল শতকরা ৮৫ ভাগ, আর পলিথিন পলিমার শতকরা ৭১ ভাগ। গবেষকদের মতে, মাছের শরীরে এসব কণা জমলে খাদ্য গ্রহণ, বৃদ্ধি, প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈফুদ্দিন রানা বলেন, গবেষণাটি মূলত সচেতনতা বাড়ানোর জন্য; এর মানে এই নয় যে কাপ্তাই হ্রদের মাছ খাওয়া যাবে না। প্লাস্টিকদূষণ বন্ধ করাই আসল কথা, কারণ আজ হ্রদে ফেলা বোতল বা বর্জ্য দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দলের সঙ্গে কাজ করা মৎস্য গবেষক মো. মঈনউদ্দীন পাঠান জানান, হ্রদের পানি ও মাটিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাঙামাটি কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম বলেন, তাঁরাও এ নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা করছেন; প্লাস্টিক ও পলিথিনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ না হলে দেশি মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। রাঙামাটির সিভিল সার্জন নুয়েন খীসা বলেন, মাছের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে ঢুকলে তাৎক্ষণিক ক্ষতি না-ও হতে পারে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে পরিপাকতন্ত্র, কিডনি ও যকৃতের ক্ষতির মতো সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ আছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১৯৬২ সালে তৈরি কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ রাঙামাটি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলাধার। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাসিন্দা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটকদের ফেলা প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও একবার ব্যবহারের প্লেট হ্রদের দূষণ বাড়াচ্ছে, পৌর এলাকার বর্জ্যের একটি অংশ সরাসরি হ্রদে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, দোকানি ও ব্যবসায়ীদের বর্জ্য রাখার ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে, হ্রদ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে শিগগির অভিযান চালানো হবে।
প্রতিবেদনটি সমকালের রাঙামাটি প্রতিনিধির।
ছবি: Foysal Mehedi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)