নবুয়ত পাওয়ার পাঁচ বছর আগে, আনুমানিক ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে, মক্কার কাবা শরিফ পুনর্নির্মাণ নিয়ে কোরাইশ গোত্রগুলোর বিরোধ প্রায় সশস্ত্র সংঘাতে গড়ায়। তখন ৩৫ বছর বয়সী মুহাম্মদ (সা.)-এর এক সহজ ফয়সালায় সংকট কাটে। সিরাত ও হাদিসের উৎস ধরে প্রথম আলোয় এ ইতিহাস লিখেছেন মনযূরুল হক।
ইসমাইল (আ.)-এর সময় থেকে কাবার উচ্চতা ছিল নয় হাত (প্রায় সাড়ে ৪ মিটার), মর্টার ছাড়া শুকনো পাথরের দেয়াল, কোনো ছাদ ছিল না। এক কোরাইশ নারীর অসাবধানতায় ধূপের স্ফুলিঙ্গে কাবার চাদর ও কাঠামোয় আগুন লাগে। এরপর উত্তরের উচ্চভূমি থেকে নামা পাহাড়ি ঢল দক্ষিণ ও পশ্চিম দেয়ালে ফাটল ধরায়, আর ছাদহীন কাবার ভেতরের কূপে রাখা স্বর্ণভাণ্ডার চুরি যায়। তাই ছাদ আর উঁচু দরজাসহ নতুন নকশায় কাবা গড়ার সিদ্ধান্ত হয়।
লোহিত সাগরের শুআইবা বন্দরে ঝড়ে বিধ্বস্ত এক বাইজেন্টাইন জাহাজের কাঠ কিনে আনেন কোরাইশ নেতা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা; জাহাজের যাত্রী বাকুম নামের এক রোমান স্থপতি ও কাঠমিস্ত্রি হন কাবার মূল নির্মাতা। শর্ত ছিল, নির্মাণে শুধু হালাল উপার্জন ব্যয় হবে; এতে তহবিলে ঘাটতি পড়ায় উত্তর দিকের প্রায় ছয় হাত জায়গা দেয়ালের বাইরে থেকে যায়। চার দেয়াল ভাগ করে দেওয়া হয় চারটি গোত্রজোটকে, আর মুহাম্মদ (সা.) নিজে কাঁধে পাথর বয়েছিলেন বলে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত।
দেয়াল হাজরে আসওয়াদ বসানোর উচ্চতায় পৌঁছালে প্রতিটি গোত্র এ সম্মান দাবি করে, কয়েকটি গোত্র রক্তপাতের শপথও নেয়। তখন প্রবীণ নেতা আবু উমাইয়া ইবনে মুগিরা আল-মাখজুমির প্রস্তাবে ঠিক হয়, পরদিন হারামের ফটক দিয়ে যিনি প্রথম ঢুকবেন, তিনিই হবেন সালিশ। পরদিন ভোরে প্রথম এলেন মুহাম্মদ (সা.), আর নেতারা বলে উঠলেন, 'ইনিই আল-আমিন, তাঁর ফয়সালায় আমরা সন্তুষ্ট।'
তিনি নিজের ইয়েমেনি চাদর বিছিয়ে তার মাঝে হাজরে আসওয়াদ রাখেন এবং প্রতিটি গোত্রজোটের একজনকে চাদরের এক কোণ ধরে পাথরটি তুলতে বলেন। চাদর নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠলে তিনি নিজ হাতে পাথরটি দেয়ালে বসিয়ে দেন। লেখকের মতে, এ ঘটনাই তাঁকে মক্কার সব গোত্রের কাছে সর্বজনমান্য সালিশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
নতুন কাবার উচ্চতা দাঁড়ায় আঠারো হাত (প্রায় ২৭ ফুট); ছয়টি কাঠের স্তম্ভের ওপর বসে প্রথম কাঠের ছাদ, পশ্চিমের দরজা বন্ধ করে পূর্বের দরজা মাটি থেকে প্রায় ৬ ফুট উঁচুতে বসানো হয়, বৃষ্টির পানির জন্য বসে কাঠের নালা, যা পরে 'মিজাবুর রাহমাহ' নামে পরিচিত হয়। বাইরে থেকে যাওয়া অংশটিই আজকের হিজরে ইসমাইল বা হাতিম। ৬৪ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনুজ জুবায়ের হাতিমকে ভেতরে নিয়ে ইব্রাহিমি ভিত্তিতে কাবা পুনর্নির্মাণ করেন, কিন্তু ৭৩ হিজরিতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ খলিফা আবদুল মালিকের নির্দেশে তা আবার কোরাইশদের কাঠামোয় ফিরিয়ে আনেন, যা আজও বহাল।
ছবি: Muhammad Mahdi Karim / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.5)
সূত্র: প্রথম আলো




মন্তব্য
(০)