গ্রামের বাঁশঝাড়, আম-কাঁঠালের ডাল কিংবা পুরোনো দালানের কার্নিশে ঝুলে থাকা মাটির কলসির মতো গোল বস্তুটি অনেকের চেনা: ভিমরুলের বাসা। জাগো নিউজে খায়রুল বাশার আশিকের এক ফিচারে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও পেন স্টেট এক্সটেনশনের তথ্য ধরে এই পতঙ্গের জীবন তুলে ধরা হয়েছে।
ভিমরুল মূলত বড় আকারের বোলতা, ইংরেজিতে হর্নেট; পতঙ্গজগতের হাইমেনোপটেরা বর্গের ভেসপিডি পরিবারের সদস্য। প্রজাতিভেদে রং, আকার ও বাসার ধরনে পার্থক্য আছে। মৌমাছির মতো এদের দেহে মাথা, বক্ষ ও উদর থাকে, আর স্ত্রী ভিমরুলের উদরের শেষে থাকে হুল। মৌমাছি যেখানে মধু ও পরাগ সংগ্রহ করে, ভিমরুল সেখানে অন্য পতঙ্গ শিকার করে, গাছের রস ও পাকা ফলের মিষ্টি রস খায়।
বাসাটি সত্যিই কাগজের মতো উপাদানে তৈরি। শুকনো কাঠ বা উদ্ভিদের আঁশ চিবিয়ে লালার সঙ্গে মিশিয়ে নরম মণ্ড বানায় ভিমরুল, তারপর স্তরে স্তরে সাজিয়ে শুকিয়ে শক্ত খোলস ও ভেতরের কোষ তৈরি করে। বাসা হতে পারে গোল, ডিম্বাকার বা নাশপাতির মতো; কোনোটি ডালে ঝোলে, কোনোটি গাছের কোটরে বা মাটির নিচে। ভেতরের সমান্তরাল চাকের প্রতিটি কোষে ডিম, লার্ভা বা পিউপা বড় হয়।
উপনিবেশ শুরু হয় সাধারণত একটি নিষিক্ত রানি দিয়ে। শুরুতে সে একাই বাসা বানায়, খাবার আনে, ডিম পাড়ে ও লার্ভার যত্ন নেয়। প্রথম দফার কর্মীরা বড় হলে তারা বাসা বাড়ানো, খাবার সংগ্রহ, লার্ভাকে খাওয়ানো আর পাহারার দায়িত্ব নেয়, রানি তখন ডিম পাড়ায় মন দেয়। জীবনচক্রের চার ধাপ ডিম, লার্ভা, পিউপা ও পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গ। পরিণত উপনিবেশে নতুন প্রজননক্ষম স্ত্রী ও পুরুষ জন্মায়; অনেক প্রজাতিতে নিষিক্ত নতুন রানিরা প্রতিকূল সময় পার করে পরের মৌসুমে নতুন বাসা গড়ে, আর পুরোনো উপনিবেশের বেশির ভাগ সদস্য মারা যায়।
কর্মী ভিমরুলেরা মাছি, শুঁয়োপোকা, মাকড়সা ও অন্যান্য ছোট পতঙ্গ শিকার করে বাসায় আনে, যা লার্ভার বেড়ে ওঠার জন্য প্রোটিনের জোগান দেয়। এই শিকারি স্বভাবের কারণে বহু প্রজাতি ক্ষতিকর পতঙ্গের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে, আর ফুলের রস খাওয়ার সময় কিছু প্রজাতি পরাগায়ণেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশগত প্রভাব প্রজাতি এবং স্থানীয় পরিস্থিতিভেদে আলাদা।
ভিমরুলের সবচেয়ে পরিচিত দিক তার হুল। বাসার কাছে কেউ গেলে বা বাসায় আঘাত লাগলে তারা দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করতে পারে। হুলের বিষে ব্যথা, লালচে ভাব ও ফোলা হয়; কারও কারও বিষে তীব্র অ্যালার্জি দেখা দেয়, যাতে শ্বাসকষ্ট, গলা বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো প্রাণঘাতী অবস্থা তৈরি হতে পারে, আর একাধিক হুলে বিষের পরিমাণও বাড়ে। খাবারের খোঁজে বা বাসা থেকে দূরে থাকলে অনেক প্রজাতি মানুষকে এড়িয়ে চলে; বিপদ বাড়ে বিরক্ত করলে বা ধরার চেষ্টা করলে।
লেখার পরামর্শ, বসতঘরের পাশের প্রতিটি বাসা অক্ষত রাখতে হবে এমন নয়, মানুষের নিরাপত্তাই আগে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান আর নিরাপদ দূরত্বের পার্থক্য বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া, অকারণে প্রাণী না মারা এবং প্রয়োজনে নিরাপদ পদ্ধতিতে বাসা সরানোই ভালো।
ছবি: Bernard DUPONT / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0); মালয়েশিয়ার বাকো জাতীয় উদ্যানে বৃহৎ ডোরাকাটা ভিমরুলের (Vespa affinis) বাসা
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪





মন্তব্য
(০)