কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), বিগ ডেটা, রোবোটিকস আর ড্রোন কৃষির প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে, কিন্তু মাটি, পানি, সূর্যের আলো, ঋতুচক্র আর জীববৈচিত্র্যের বিকল্প কোনো প্রযুক্তি নয়। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘আগামীর সময়, কৃষকের’ শিরোনামের কলামে এ কথা লিখেছেন সমীরণ বিশ্বাস। তাঁর মূল কথা: আগামীর পৃথিবীতে প্রযুক্তি হবে কৃষকের শক্তি, আর কৃষি থাকবে সভ্যতার ভিত্তি।
লেখক উদাহরণ দিয়েছেন, ধানক্ষেতে রোগের লক্ষণ দেখলে কৃষক মোবাইলে ছবি তুলে সম্ভাব্য রোগ আর প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার পরামর্শ পেতে পারেন; মাটির আর্দ্রতা মেপে এআই প্রয়োজনমতো সেচ দিতে সাহায্য করে; আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে বৃষ্টির আগে সার বা কীটনাশক দেওয়ার ভুল সময় এড়ানো যায়। এতে খরচ, অপচয় আর পরিবেশের ক্ষতি কমে।
তবে তাঁর মতে, কৃষি একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। সেন্সর মাটির আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা জানাতে পারে, কিন্তু জৈবপদার্থ, অণুজীবের বৈচিত্র্য আর দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা রক্ষায় মাঠের ব্যবস্থাপনা লাগবেই। এআই রোগের লক্ষণ ধরতে পারলেও মাঠে নিশ্চিত হওয়া আর পরিস্থিতিমতো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন থেকে যায়। সেন্সরের তথ্য স্থানীয় মাটি ও ফসল অনুযায়ী ক্যালিব্রেট করে, পরীক্ষাগারে যাচাই করে, কৃষিবিদদের পরামর্শের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে বলেছেন তিনি।
বন্যা, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা, খরা আর অনিয়মিত বৃষ্টিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি আগাম সতর্কতা ও অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনায় কাজে আসবে, লিখেছেন লেখক। কিন্তু সঙ্গে চাই জলবায়ু-সহনশীল জাত, পানি সংরক্ষণ, ভালো নিষ্কাশন, ফসলের বহুমুখীকরণ আর কৃষকের আর্থিক সুরক্ষা। মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করে, ভূগর্ভের পানির ওপর চাপ বাড়িয়ে বা উপকারী পোকা ধ্বংস করে উৎপাদন বাড়ালে তার দাম সমাজকেই দিতে হয়।
দেশের বেশির ভাগ কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক, তাই প্রযুক্তির সুবিধা শুধু বড় খামারে আটকে থাকলে বৈষম্য বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন সমীরণ বিশ্বাস। হাতে স্মার্টফোন থাকলেই কৃষক ডিজিটাল সেবা কাজে লাগাতে পারবেন, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়; লাগবে ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রশিক্ষণ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, বাংলায় সহজ নির্দেশনা আর মাঠপর্যায়ের সহায়তা। যন্ত্রের কারণে কৃষিশ্রমিকের কাজ বদলালে পুনঃপ্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
নীতির প্রশ্নে লেখকের প্রস্তাব: স্থানীয় মাটি ও ফসলে যাচাই করে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও তথ্যের নিরাপত্তা, সম্প্রসারণকর্মীদের এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ করা, আর মাটির স্বাস্থ্য, পানির সাশ্রয়, জীববৈচিত্র্য, নিরাপদ খাদ্য ও কার্বন নিঃসরণ কমানোকে সাফল্যের মাপকাঠি ধরা। কৃষককে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, উদ্ভাবন ও সিদ্ধান্তের অংশীদার করার কথা বলেছেন তিনি।
মতামতটি লেখকের নিজস্ব।
ছবি: কুড়িগ্রামের একটি ধানক্ষেত, Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: ইত্তেফাক





মন্তব্য
(০)