টাঙ্গাইল জেলায় সরিষা ক্ষেতের পাশে বাক্সে মৌমাছি পালন করে মধু সংগ্রহ করছিলেন মৌচাষীরা। ২০১৯ সালের জানুয়ারির শুরুতে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, টাঙ্গাইল শহর ও বাসাইল উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে সরিষা ক্ষেতের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে মৌ বাক্স বসানো হয়েছিল। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে সে মৌসুমে তখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার কেজি মধু উৎপাদন হয়েছিল। এই মধু দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং বিদেশেও বিক্রি হচ্ছিল। তবে চাষীরা বলেছিলেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে মৌচাষে তাঁরা আরও লাভবান হতেন।
টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগের মধ্যাঞ্চলের একটি জেলা; এর পশ্চিম সীমা দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা নদী। জেলার আয়তন ৩ হাজার ৪১৪ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ১২টি। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ ৫ হাজার ৮৩ জন। ধান, পাট, আখ, তিল ও গমের পাশাপাশি সরিষা এ জেলার প্রধান ফসলগুলোর একটি। প্রতিবেদনে নাম আসা বাসাইল উপজেলার আয়তন ১৫৭ দশমিক ৭৭ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ছয়টি।

সরিষা ক্ষেতে শতাধিক বাক্স, এক মৌসুমে দেড় টন মধু
টাঙ্গাইল পৌর এলাকার সন্তোষ ঘোষপাড়ার আমিনুর রহমান ১০ বছর ধরে মৌচাষ করছিলেন। পেশাটিকে লাভজনক উল্লেখ করে তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বছর আমি সরিষা ক্ষেতে শতাধিক মৌ বাক্স স্থাপন করেছি। এখন পর্যন্ত আমরা (ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির ১ সপ্তাহ) প্রায় দেড় টন মধু সংগ্রহ করতে পেরেছি। সরিষা ক্ষেতে বছরে ৪ মাস মধু আহরণ করে থাকি। অন্য ৬ মাস কৃত্রিম পদ্ধতিতে চিনি খাইয়ে মৌমাছিদের রাখা হয়। এবার আমার প্রায় আড়াই লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। আশা করছি আমার প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মতো লাভ হবে। বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন আমাদের কাছ থেকে মধু কিনে নিয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মূলত ডিসেম্বর থেকে মধু আহরণের উপযুক্ত সময়। তখন জেলায় বিভিন্ন স্থানে ভালো সরিষা ফুল ফোটে। আকার ভেদে একটি বাক্সে ২ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। আর এই প্রতিটি বাক্সে খরচ হয় ২ থেকে ১২ হাজার টাকা।’
আমিনুর রহমানের সংসারের খরচ চলত এই আয়ে। তিনি বলেন, ‘যদি সরকার আমাদের সহযোগিতা করেন তা হলে আমরা মৌচাষে আরও লাভবান হতাম। কিন্তু আমি বিগত সময়ে জেলা প্রশাসক এবং কৃষি অফিসে গিয়েও কোনো সহযোগিতা পাইনি।’ সরিষার পাশাপাশি তিনি লিচু ফুল থেকেও মধু সংগ্রহ করতেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মৌচাষে আয়ের পাশাপাশি বেকারত্ব কমছিল, আর অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি মৌচাষ করছিলেন।

লক্ষ্যের চেয়ে বেশি জমিতে সরিষা, পরাগায়নে বাড়ে ফলন
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সে বছর টাঙ্গাইলে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৮ হাজার হেক্টর, কিন্তু আবাদ হয়েছিল প্রায় ৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে।
টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুর রাজ্জাক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বছর জেলায় টার্গেটের চেয়ে বেশি সরিষা আবাদ এবং মৌ বক্স স্থাপন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মধু উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কেজি। সামনে আরো মধু উৎপাদন হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌ চাষ করলে সরিষার পরাগায়নের ফলে আবাদ শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ ফলন বৃদ্ধি পায়। কয়েক বছর আগেও সরিষা চাষীরা তাদের জমিতে মৌ চাষীদের মৌ বাক্স স্থাপনে বাধা দিত। তাদের ধারণা ছিল মৌমাছির কারণে সরিষার ফলন কম হবে। তবে আমাদের কৃষি কর্মকর্তারা বোঝাতে সক্ষম হন মৌ চাষের কারণে সরিষার ফলন কম তো হয়ই না, বরং ফলন ভালো হয়। এরপর সরিষা চাষীরা তাদের জমির পাশে মৌ বাক্স স্থাপনে সহায়তা করে আসছেন।’

বাক্সে মৌচাষ: শীতের ফুলের পেছনে ঘোরেন চাষীরা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০০৯ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশে মধু আসে দুইভাবে: প্রাকৃতিক চাক থেকে এবং কাঠের বাক্সে এপিস সেরানা ও এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মৌমাছি পালন করে। প্রাকৃতিক মধুর প্রধান এলাকা সুন্দরবন, পাহাড়ি অঞ্চল ও টাঙ্গাইলের মধুপুর; প্রাকৃতিক মধুর প্রায় ৭৫ শতাংশ আসে সুন্দরবন থেকে। মৌমাছি মধু ও মোম দেওয়ার পাশাপাশি অনেক ফসলের প্রধান পরাগায়নকারী, আর পরাগায়নে ফলন বাড়ে, বীজ ও ফলের মানও ভালো হয়।
গবেষণাটির মাঠ জরিপ হয়েছিল ২০০৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, টাঙ্গাইলের মধুপুর, ভূঞাপুর ও গোপালপুর এবং গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায়। গবেষকেরা লেখেন, মধু উৎপাদনের উপযুক্ত মৌসুম শীতকাল, কারণ তখন প্রচুর সরিষা, তিল ও লিচু ফোটে। জরিপের ৭৪ শতাংশ মৌচাষী সরিষা, লিচু ও তিলের ফুল ফোটার সময় ধরে বাক্স নিয়ে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যেতেন। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস মধুর মৌসুম না থাকায় তাঁরা কৃষি, ছোট ব্যবসা বা অন্য কাজ করতেন। হিসাবে মৌচাষের আয়-ব্যয়ের অনুপাত দাঁড়ায় ১ দশমিক ৫৯, অর্থাৎ ব্যবসাটি লাভজনক ছিল।
একই গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব এপিকালচার এবং প্রশিকার মতো সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও সরঞ্জাম দিয়ে মৌচাষীদের সহায়তা করে আসছিল।

ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, জার্নাল অব বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)