দেশের ভোজ্যতেলের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর, আর এই আমদানিতে প্রতি বছর ব্যয় হয় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। কয়েক বছর ধরেই এই নির্ভরতা কমানোর পথ খোঁজা হচ্ছে, আর তারই একটি নতুন দিশা মিলছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ত, নিচু জমিতে। ২০২৬ সালের মার্চে খুলনা অঞ্চলের কৃষকেরা এমন সব জমিতে সূর্যমুখী চাষ করছিলেন, যেগুলো আমন ধান কাটার পর বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকত। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চলা এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে কৃষি কর্মকর্তারা বলছিলেন, শুকনো মৌসুমে যে জমি আগে কিছুই দিত না, সেগুলোই এখন হলুদ ফুলের চাদরে ঢেকে গেছে।
দেশে প্রধানত চার ধরনের ভোজ্যতেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়: সরিষা, ধানের কুঁড়া (রাইস ব্রান), সয়াবিন ও সূর্যমুখী। এই চারটিরই উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার, আর উপকূলের পতিত ও লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখীর এই আবাদ সেই চেষ্টারই একটি অংশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা জানান, আমন ও বোরো ধানের মাঝের রবি মৌসুমে সরকারি সহায়তায় এই ফসল চাষ করা হচ্ছে, মূলত অধিদপ্তরের পার্টনার প্রকল্পের মাধ্যমে।
ডিএই কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১৪ হাজার ৪০৬ টন সূর্যমুখী তেল আমদানি হয়েছে, অথচ দেশে বছরে উৎপাদন হয় সাধারণত মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টন। এই উৎপাদন বাড়ানো এবং পতিত জমিকে আবার আবাদের আওতায় আনাই খুলনার এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
খুলনা অঞ্চলের লবণাক্ত জমি
খুলনা কৃষি অঞ্চল গঠিত চারটি জেলা নিয়ে: নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট। ডিএই কর্মকর্তারা বলছেন, এই অঞ্চলের প্রায় ৫৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত, এবং আমন ধান কাটার পর খরিপ-১ মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে। সাধারণত ৮ ডেসিসিমেন্স পার মিটার (ডিএস/মি) লবণাক্ততা হলেই জমিকে লবণাক্ত বলা হয়; অথচ সূর্যমুখী প্রায় ১৫ ডিএস/মি পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। এ কারণেই কৃষি কর্মকর্তারা এই ফসলকে অঞ্চলটির জন্য অন্যতম সম্ভাবনাময় ফসল বলছেন।
এই লবণাক্ততা দীর্ঘদিনের এবং ভালোভাবেই জরিপ করা। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) একটি গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮১ লাখ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ১৯টি উপকূলীয় জেলার প্রায় ১০ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমি কমবেশি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সমস্যা সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ-পশ্চিমে: খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা, এই পাঁচ উপকূলীয় জেলার প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে লবণাক্ততা ইনস্টিটিউটের হিসাবে ৮ দশমিক ১ থেকে ১৬ ডিএস/মি পর্যন্ত। প্রচলিত বেশির ভাগ ফসল মাত্র ০ দশমিক ৭ ডিএস/মি পর্যন্ত লবণাক্ততা সইতে পারে, আর উপকূলের জন্য উদ্ভাবিত লবণসহিষ্ণু ধানের জাতগুলোও ৮ থেকে ১২ ডিএস/মির কাছাকাছি গিয়ে থমকে যায়। এসআরডিআই আরও দেখিয়েছে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬ হাজার ২০০ হেক্টর নতুন আবাদি জমি লবণাক্ততার কবলে পড়ছে।
এসআরডিআই লবণাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী জমিকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করে: সামান্য লবণাক্ত (প্রায় ২ থেকে ৪ ডিএস/মি), মাঝারি লবণাক্ত (৪ থেকে ৮), লবণাক্ত (৮ থেকে ১৫) এবং তীব্র লবণাক্ত (১৫ ডিএস/মির বেশি)। উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমের বড় অংশই পড়ে উঁচু শ্রেণিগুলোতে, আর ঠিক সে কারণেই যেখানে সেরা লবণসহিষ্ণু ধানও হার মানে, সেখানে প্রায় ১৫ ডিএস/মি পর্যন্ত সইতে পারা একটি ফসল গুরুত্বপূর্ণ।
উপকূলীয় বলয়ে লবণাক্ততা বাড়ে যখন শুকনো মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমে আসে এবং সাগরের নোনা পানি আরও ভেতরে ঢুকে পড়ে; আর এটি সবচেয়ে প্রকট হয় মোটামুটি নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত, ঠিক যে মাসগুলোতে আমনের জমি নইলে খালি পড়ে থাকত। এই জেলাগুলোর কৃষক পরিবারের কাছে এর অর্থ দীর্ঘদিন ধরেই ছিল বছরে একটিমাত্র ধানের ফসল, তারপর পতিত জমি। সূর্যমুখী সেই পতিত, নোনা সময়টুকুই কাজে লাগানোর কথা।
সূর্যমুখী: নোনা জমির উপযোগী এক ফসল
সূর্যমুখী (হেলিয়ান্থাস অ্যানুয়াস) ডেইজি পরিবার অ্যাস্টারেসি-এর একটি লম্বা বর্ষজীবী উদ্ভিদ। এটি প্রথম গৃহপালিত হয় আমেরিকা মহাদেশে এবং এর আদি আবাস যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণ কানাডা ও উত্তর মেক্সিকো; তবে এখন এটি নাতিশীতোষ্ণ বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই চাষ হয় এবং বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত ভোজ্যতেলগুলোর একটি। ২০২৪ সালে বিশ্বে সূর্যমুখী বীজের উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ কোটি ১৯ লাখ টন, যার অর্ধেকেরও বেশি একসঙ্গে উৎপাদন করেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন।
কর্মকর্তা ও গবেষকেরা যে কারণগুলোর কথা বলছেন, সেগুলোর জন্যই ফসলটি খুলনার এই পরীক্ষার সঙ্গে মানানসই। এর শিকড় প্রায় ১৫ ইঞ্চি গভীরে যায়, যেখানে ধানের শিকড় যায় ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি; ফলে এটি মাটির নিচের স্তর থেকে রস টেনে নিতে পারে এবং সামান্য সেচেই টিকে থাকে। সাক্ষাৎকার দেওয়া কৃষকেরাও জোর দিয়ে বলেছেন, ধানের তুলনায় সূর্যমুখীতে দাঁড়ানো পানি অনেক কম লাগে। এর জীবনকাল স্বল্প, ৮৫ থেকে ১০৫ দিন, যার ফলে এটি আমন ও বোরো ধানের মাঝের ফাঁকে ভালোভাবে বসে যায়। ধানের চেয়ে এটি লবণ অনেক বেশি সহ্য করে। আর এর ঝরে পড়া পাতা মাটিতে জৈব উপাদান যোগ করে, ফলে পরের ফসলে সার কম লাগে।
কচি সূর্যমুখীর মাথা প্রতিদিন আকাশে সূর্যের পথ ধরে ঘোরে, যাকে বলা হয় হেলিওট্রপিজম; কাণ্ডের বৃদ্ধি থেমে গিয়ে ফুল পরিণত হলে মাথাটি পূর্ব দিকে মুখ করে স্থির হয়, যা সকালে গাছকে দ্রুত উষ্ণ করে ও বেশি পরাগবাহী পোকা টানে। আন্তর্জাতিকভাবে এই ফসল সাধারণত দানাদার শস্য, সয়াবিন বা সরিষার সঙ্গে শস্যপর্যায়ে চাষ করা হয়, যে ধরন জমির অলস সময় কমায় ও সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ায়, অনেকটা খুলনার পরিকল্পনায় দুই ধানের মাঝে একে বসানোর মতোই।
অঞ্চলটিতে দুই ধরনের বীজ বিতরণ করা হয়েছে: হাইব্রিড এবং উন্মুক্ত পরাগায়িত বারি সূর্যমুখী-৩, যা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত একটি জাত। ছোট কৃষকের কাছে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ বলে কর্মকর্তারা জানান: হাইব্রিড বীজ কৃষক পরের মৌসুমের জন্য কার্যকরভাবে রেখে দিতে পারেন না, আবার কিনতে হয়; কিন্তু বারি সূর্যমুখী-৩ এর বীজ সংরক্ষণ করে আবার বোনা যায়। সূর্যমুখীর বীজ আবার দুই ধরনের, তেলবীজ ও খাবার-বীজ; খুলনায় যে তেলবীজ মাড়াই হচ্ছে তা থেকে পাওয়া খৈল গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর গাছের কাণ্ড জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো যায়। গাছটি এতটাই শক্তপোক্ত যে অন্যত্র একে আচ্ছাদন ফসল হিসেবে এবং দূষিত মাটি থেকে সিসার মতো ভারী ধাতু টেনে বের করতেও কাজে লাগানো হয়; তবে খুলনায় এর মূল্য আরও সরল, যে জমি কিছুই দিত না সেখানে একটি নগদ তেলফসল।

মাঠের চিত্র
চার জেলাজুড়ে সম্প্রসারণকর্মীরা প্রদর্শনী প্লট গড়ে তোলেন, আর মাঠ ঘুরে দেখার সময় বিশাল বিশাল এসব ক্ষেত পুরোপুরি ফুলে ভরে উঠেছিল; দূর থেকে দেখে মনে হতো হলুদ গালিচা বিছানো, আর কাছে গেলে বোঝা যেত হাজার হাজার ফুল বাতাসে দুলছে। ফুলগুলো ছিল বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের, এবং কোনো কোনো প্লটে একেকটি ফুলের চাকতি (বীজের চাকতি) এক কেজির বেশি ওজনের।
নড়াইল সদর উপজেলার তুলারাম ইউনিয়নের চাঁচড়া গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম এবারই প্রথম সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও এসব জমিতে আমন ধান কাটার পর কিছুই হতো না, পতিত থাকত। লবণ ওঠে বলে ভাবতাম কিছু চাষ করলে শুধু খরচই বাড়বে। কিন্তু এবার কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে সূর্যমুখী করেছি, আর ফলন দেখে আমি অবাক।’
খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউনিয়নের আলকা গ্রামে ছয়জন কৃষক মিলে দুই একর জমিতে সূর্যমুখী করেছেন। তাঁদের একজন রেজাউল করিম বলেন, এবারই তাঁদের প্রথম চেষ্টা: ‘ফলন ভালো হলে ধানের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ হবে। আগে জমি ফাঁকা পড়ে থাকত; এখন স্বল্প খরচে ফসল হচ্ছে, আর আরেকটি সুবিধা হলো সূর্যমুখীতে সেচের পানি খুব বেশি লাগে না।’ গ্রামেরই আরেক কৃষক আনিছুর রহমান (৩২) বলেন, এই এলাকায় এমন ফসল তিনি আগে দেখেননি, তাই তিনিও এক বিঘা জমিতে চাষ করেছেন।
বাগেরহাটের মোল্লারহাট উপজেলার আটজুড়ী ইউনিয়নে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমলা বিশ্বাস বলেন, আটজুড়ী গ্রামের পেয়ারী বেগম, বাচ্চু মিয়া, নিজাম মোল্লা ও আ. হালিম মোল্লাসহ চারজন কৃষক দুই একর জমিতে বারি সূর্যমুখী-৩ চাষ করেছেন, যেখানে একেকটি ফুলের পরিধি প্রায় ১৫ ইঞ্চি এবং তাতে এক কেজির বেশি বীজ ধরেছে। ফুলতলা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, সাধারণ কৃষকেরা প্রথমে অচেনা ফসল চাষে রাজি হন না বলে প্রথম প্রদর্শনীগুলো ইচ্ছা করেই ক্যান্টনমেন্ট, পুলিশ লাইন্সসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় করা হয়েছিল; সেগুলোর ভালো ফলন দেখে প্রতিবেশীদের মধ্যে আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ে।
খরচ ও আয়
কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে ফসলটি চাষে খরচ তুলনামূলক কম। বারি সূর্যমুখী-৩ এর ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ বা এক বিঘা জমির জন্য প্রায় ৪ হাজার টাকার বীজ লাগে, আর অন্যান্য খরচসহ এক বিঘা জমি মোটামুটি ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে ফলানো সম্ভব। অন্যভাবে বললে, কর্মকর্তাদের ভাষ্যে, সূর্যমুখী চাষে এক একরে খরচ প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা, আর তার বিপরীতে আয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা।
তাঁদের উল্লেখ করা ফলন বিঘাপ্রতি সাড়ে ৭ থেকে ৮ মণ বীজ। এক কেজি বীজ থেকে অন্তত ৪০০ গ্রাম তেল পাওয়া যায়, ফলে সাড়ে ৭ মণ অর্থাৎ প্রায় ৩০০ কেজি বীজ থেকে বিঘাপ্রতি তেল হবে প্রায় ১৩০ লিটার; কেজিপ্রতি ২৫০ টাকা ধরলে যার মূল্য কমবেশি ৩২ হাজার টাকা, এর সঙ্গে খৈল ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য শুকনো গাছের মূল্য আলাদা। চাষকে আরও সহজ করতে সরকার প্রতি বিঘার জন্য একটি উপকরণ-প্যাকেজ দেয়: এক কেজি বীজ এবং ১০ কেজি করে ডিএপি, টিএসপি ও পটাশসহ অন্যান্য উপকরণ। কর্মকর্তারা জানান, এই প্যাকেজে সরকারের খরচ হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা, অথচ ওই জমিতে উৎপাদিত ফসলের মূল্য অন্তত প্রায় ২৬ হাজার টাকা।
এগুলো কর্মকর্তাদের হিসাব। কৃষকদের নিজেদের কথা ছিল আরও সংযত, প্রথম মৌসুমের আশা হিসেবে বলা, নিশ্চিত ফল হিসেবে নয়; কয়েকজন শুধু বলেছেন, ফলন ঠিক থাকলে আয় ধানকে ছাড়িয়ে যাবে। বীজ শোধন কিংবা ছত্রাকনাশকের সুপারিশকৃত মাত্রা স্থানভেদে বদলায় বলে কৃষকদের কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা নয়, বরং নিজ উপজেলা কৃষি অফিসের নির্ধারিত মাত্রা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

চাষ ও এরপর যা আসে
উপকূলে সূর্যমুখীর কদরের কেন্দ্রে রয়েছে এর স্বল্প মৌসুম। গাছটি ৮৫ থেকে ১০৫ দিনে পরিণত হয় বলে এটি আমন ও বোরো ধানের মাঝের পতিত সময়টুকুতে কোনো ধানকে না সরিয়েই বসে যায়, আর কাটা হয়ে গেলে একই জমিতে পাট, ধান, তিল, মুগডাল, ধৈঞ্চা বা সবুজ সারজাতীয় ফসল করা যায়। কর্মকর্তারা বলছেন, গভীর শিকড় ও ঝরে পড়া পাতা মাটিকে পরের ফসলের জন্য আরও উর্বর রাখে, ফলে পরবর্তী ফসলে সার কম লাগে।
এই ফসল কেবল খোলা মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। কর্মকর্তারা জানান, সূর্যমুখী চাষ করা যায় পুকুরের পাড়ে, ক্ষেতের উঁচু আইলে ও বাড়ির আঙিনায়, নিষ্কাশনযোগ্য প্রায় যেকোনো উঁচু জায়গায়; ফলে ধানের জমি না কমিয়েও আবাদযোগ্য জায়গা বাড়ে। সূর্যমুখী বোনা হয় অগভীরে, মাটির প্রায় এক ইঞ্চি নিচে, এবং বিশেষত ভেজা মাটিতে ডাউনি মিলডিউর মতো রোগের দিকে নজর রাখতে হয়; এ কারণেই সম্প্রসারণকর্মীরা বীজের সঙ্গে প্রশিক্ষণও দিয়েছেন। তবু এই মৌসুমে চার জেলার কৃষকেরা এবারই প্রথম এই ফসল করছেন, আর কর্মকর্তারা বলছেন, আসল পরীক্ষা হলো এই শুরুর আগ্রহ পরবর্তী বছরগুলোতেও টিকে থাকে কি না।
তেল আমদানির খরচ কমানো
মাঠপর্যায়ের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে একটি জাতীয় সমস্যা। কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ভোজ্যতেলের মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়, বাকি ৮৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়, যাতে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। পার্টনার প্রকল্পের খুলনা অঞ্চলের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, আমন পরবর্তী পতিত ও লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষ বাড়ানো গেলে এই আমদানির হার কমবে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে; নইলে, তাঁর সতর্কবাণী, দেশ তেল আমদানিকারকদের হাতে ‘জিম্মি’ হয়ে পড়বে।
ঘাটতির মাত্রা বাণিজ্যিক পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ধরেছে প্রায় ২৪ লাখ টন, যার প্রায় ৯০ শতাংশই মেটে আমদানিতে, আর এর সিংহভাগ পাম ও সয়াবিন তেল; যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের (ইউএসডিএ) একটি হিসাব ২০২২-২৩ সালে সয়াবিন তেলের ব্যবহার ধরেছিল প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ লাখ টন এবং পাম তেল প্রায় ১৭ লাখ টন। এই পরিমাণের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হওয়া ১৪ হাজার ৪০৬ টন সূর্যমুখী তেল এবং দেশে উৎপাদিত ১০ থেকে ১২ হাজার টন খুবই সামান্য, আর ঠিক এ কারণেই কর্মকর্তারা দেশি ফসলটি বাড়ানোর সুযোগ দেখছেন।
মোসাদ্দেক বলেন, শুধু খুলনা অঞ্চলেই প্রায় ১৩ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে, যার ১৮ থেকে ২০ শতাংশ আমন মৌসুমের পর পতিত থাকে। এমন পতিত জমি থেকেই ধীরে ধীরে যদি দেশের অর্ধেক তেলের চাহিদা মেটানো যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে বিপুল, কারণ পতিত মাঠের পাশাপাশি পুকুরের পাড়, ক্ষেতের আইল ও বাড়ির আঙিনাতেও সূর্যমুখী বসানো যায়।


জলবায়ু ঝুঁকিকে ঘিরে গড়া প্রকল্প
খুলনার এই উদ্যোগ চলছে ডিএইর ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ তথা পার্টনার প্রকল্পের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (আইএফএডি) সঙ্গে এই কর্মসূচিতে অর্থায়নকারী বিশ্বব্যাংকের বর্ণনায়, পার্টনার হলো ২০২৩ সাল থেকে চলা পাঁচ বছরের একটি উদ্যোগ, যার লক্ষ্য দেশের কৃষি অঞ্চলগুলোতে চাষের বৈচিত্র্য আনা, খাদ্য নিরাপত্তা উন্নত করা ও জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলা; এর প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা ডিএই। এর আওতায় খুলনার কৃষকদের বীজ, সার, কীটনাশক ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন কী কী বিতরণ করা হয়েছে। ডিএইর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৩৫০ জন কৃষককে এক বিঘা করে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে, আর প্রকল্পের আওতায় ৪০টি ব্লকে দুই একর করে জমিতে বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যাতে এ মৌসুমে প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি সূর্যমুখীর আওতায় এসেছে। একটি আঞ্চলিক কৃষি অভিযোজন প্রকল্পের আওতায় ৩০টি উপজেলাকে ভাগ করে আটটি তেল নিষ্কাশন মেশিন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান, আর ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি যোগ করেন, আমন কাটার পর পতিত থাকা আড়াই লাখ হেক্টর জমি ধীরে ধীরে আবাদে আনা গেলে শুধু সূর্যমুখী নয়, মুগডাল, ধৈঞ্চা ও সবুজ সারজাতীয় ফসলও বাড়ানো যাবে, আর একজন কৃষক প্রায় ১০০ কেজি বা আড়াই মণ বীজ পেলে তা থেকে উৎপাদিত তেলেই একটি পরিবারের সারা বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
পার্টনার প্রকল্পের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ এই উদ্যোগকে বৃহত্তর জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খুলনা অঞ্চল দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, আর লবণাক্ততা বাড়ায় অনেক জমি পতিত থাকে; সূর্যমুখী চাষে উৎসাহ দেওয়া সেই জমিকে কাজে লাগানোরই একটি উপায়, আর কৃষকেরা ইতোমধ্যে ভালো ফল পাচ্ছেন। সূর্যমুখী তেল স্বাস্থ্যের জন্য ভালো বলে তিনি মন্তব্য করেন, তবে আমদানিনির্ভরতার কারণে এর দাম বেশি, আর দেশে উৎপাদন বাড়লেই তা সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হবে।
ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই); বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি); কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই); বিশ্বব্যাংক; যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তর (ইউএসডিএ)।





মন্তব্য
(০)