জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বাংলাদেশের যে অর্থ দরকার, তার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ ২০২৩-২০৫০) অনুযায়ী ১১৩টি উদ্যোগ বাস্তবায়নে ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৮ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। বছরে গড়ে দরকার ৮৫০ কোটি ডলার, যার ৬০০ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক তহবিল ও উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে আসার আশা করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা, যা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। এর মধ্যে সরকার নিজস্ব অর্থে যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড চালায়, সেটি পেয়েছে মাত্র ১০০ কোটি টাকা। জাতীয় বাজেট আট গুণের বেশি বাড়লেও দেড় দশক আগে গঠিত এই তহবিলের বরাদ্দ সেই অনুপাতে বাড়েনি।
ন্যাপে পানি, কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ, নগর, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ ৮টি অগ্রাধিকার খাত রয়েছে। স্থানীয় আগাম সতর্কবার্তা, জলবায়ুসহনশীল কৃষি, নিরাপদ পানি ও জীবিকার ব্যবস্থাও এর অংশ। সাতক্ষীরার আশাশুনির প্রান্তিক কৃষক মিতা রানী দাশের অভিজ্ঞতা এই ঘাটতি দেখায়: গত বছর প্রচণ্ড গরমে তাঁর ছোট মাছের ঘেরের প্রায় ৩০ শতাংশ মাছ মরে যায়, পরে জুলাইয়ের প্রবল বৃষ্টিতে ঘের উপচে বাকি মাছের বেশির ভাগ নষ্ট হয়। আগাম আবহাওয়ার কোনো বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছায়নি।
সিরাজগঞ্জ শহরের আমলাপাড়ার একটি বস্তিতে জলবায়ু তহবিলের অর্থে একটি স্থানীয় এনজিও সৌরবিদ্যুৎচালিত পানির পাম্প বসিয়েছে। দুই বছরে সেখানকার মানুষের পানির কষ্ট কিছুটা কমেছে। কিন্তু স্থানীয় লোকজন ও পৌরসভার কর্মকর্তাদের হিসাবে শহরের প্রায় ৩০টি বস্তির আর কোথাও এমন ব্যবস্থা নেই।
নিঃসরণ কমানোর দিকেও বড় অঙ্ক দরকার। এনডিসি ৩.০ অনুযায়ী ২০৩৫ সালের লক্ষ্য পূরণে লাগবে ১১ হাজার ৬১৮ কোটি ডলার, যার ২ হাজার ৫৯৫ কোটি ডলার দেশীয়ভাবে জোগানোর কথা, বাকি ৯ হাজার ২৩ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। ন্যাপ ও এনডিসির অঙ্ক সরাসরি যোগ করা যায় না, কারণ একটি অভিযোজনের, অন্যটি প্রশমনের হিসাব।
পরিবেশ ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞ হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, বড় লক্ষ্যগুলোর অর্থ কোথা থেকে আসবে তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই, এবং ট্রাস্ট ফান্ডে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ হতাশাজনক। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০২৫ সালের পর্যালোচনায় জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন কয়েক বছর ধরে প্রায় ৮৫ শতাংশে স্থির দেখা গেছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাচ্ছে কি না এবং কৃষক ও জেলেরা প্রকল্পের কেন্দ্রে আছেন কি না, সেটি দেখতে হবে।
কৃষক ও জেলেদের জন্য এর অর্থ সরাসরি: সময়মতো আবহাওয়ার সতর্কবার্তা, লবণাক্ততা ও তাপসহনশীল চাষ এবং ঘের রক্ষার ব্যবস্থা এই অর্থের ওপরই নির্ভর করে। প্রতিবেদনটি লিখেছেন প্রথম আলোর পার্থ শঙ্কর সাহা।
ছবি: সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ, A junaid alam khan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)