শীত নামলেই ঢাকার ফুটপাত থেকে গ্রামের হাট পর্যন্ত ভ্যানে ভ্যানে কমলার স্তূপ চোখে পড়ে। উজ্জ্বল রঙের এই ফল হাতে নিলেই খোসা ছাড়ানোর ঘ্রাণে মন ভালো হয়ে যায়। অসুস্থ মানুষকে দেখতে গেলে আমরা কমলা নিয়ে যাই, শিশুর টিফিনে দিই, অতিথির সামনে সাজিয়ে রাখি। কিন্তু যে কমলা আমরা খাই, তার বড় একটি অংশ আসে বিদেশ থেকে। অথচ সিলেটের টিলা, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় আর উত্তরের পঞ্চগড়ের মাটিতে দেশি কমলার বাগান নিঃশব্দে প্রমাণ করে চলেছে, এই ফল বাংলাদেশেও ভালোভাবে ফলানো যায় এবং তা থেকে কৃষক লাভবানও হতে পারেন।
কমলা পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ও সুস্বাদু ফল, যা বাংলাদেশের কৃষিতে লাভজনক ফসল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এটি শুধু খেতেই ভালো নয়, স্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পুষ্টিগুণ, চাহিদা আর বাজারদর, তিনটিই বেশি হওয়ায় কমলা চাষ কৃষকের জন্য লাভের পথ খুলে দেয়। সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা মেনে চললে একটি কমলা বাগান থেকে বেশি ফলন এবং বহু বছর ধরে নিয়মিত আয় নিশ্চিত করা যায়। ফলে কমলা চাষের মাধ্যমে কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন।
এই প্রতিবেদনে আমরা দেখব কমলার পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা কী, কেন এটি চাষের জন্য লাভজনক, আর ভালো ফলনের জন্য সার, সেচ, আগাছা দমন ও ফল তোলার কাজগুলো কীভাবে করতে হয়।
লেবুজাতীয় পরিবারের রঙিন সদস্য
কমলা লেবুজাতীয় বা সাইট্রাস পরিবারের ফল। একই পরিবারে আছে পাতিলেবু, কাগজিলেবু, মাল্টা, জাম্বুরা ও বাতাবিলেবু। বাংলাদেশে যে কমলা চাষ হয়, তা মূলত ম্যান্ডারিন ধরনের, যার খোসা পাতলা ও ঢিলা, হাত দিয়েই ছাড়ানো যায়, আর কোয়াগুলো আলাদা হয়ে আসে। এ দেশে সিলেট, মৌলভীবাজার, পঞ্চগড় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা কমলা চাষের জন্য উপযোগী হিসেবে পরিচিত। উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলোতেও গত কয়েক বছরে অনেক নতুন বাগান হয়েছে।
কমলা নিয়ে গবেষণার একটি বড় কেন্দ্র হলো সিলেটের জৈন্তাপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের, অর্থাৎ বারির লেবুজাতীয় ফসল গবেষণা কেন্দ্র। ১৯৬০-৬১ সালে ফল উন্নয়ন কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান লেবুজাতীয় ফলের জাত উদ্ভাবন ও চাষপদ্ধতি নিয়ে কাজ করে। বারি উদ্ভাবিত কমলার জাতের মধ্যে বারি কমলা-১ পরিচিত নাম। নতুন বাগান করতে চাইলে এসব অনুমোদিত জাতের কলমের চারা সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার বা বিশ্বস্ত নার্সারি থেকে সংগ্রহ করাই নিরাপদ।
একটি কমলায় কী আছে
কমলা নানা রকম ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ। এর সবচেয়ে বড় পরিচয় ভিটামিন সি। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্য-উপাদান তথ্যভান্ডার অনুযায়ী ১০০ গ্রাম কাঁচা কমলায় প্রায় ৫৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে। ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। কমলায় আরও আছে:
- ভিটামিন এ: চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
- অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট: দেহের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল দূর করে। ফ্রি র্যাডিক্যাল হলো এমন অস্থির অণু, যা কোষের ক্ষতি করতে পারে।
- আঁশ বা ফাইবার: হজমশক্তি বাড়ায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
- পটাশিয়াম: রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- কম ক্যালরি: ওজন নিয়ন্ত্রণের খাদ্যতালিকার জন্য উপযুক্ত।
তুলনার জন্য একটি হিসাব দেওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের খাদ্যসম্পূরক দপ্তরের সুপারিশ অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দিনে ৯০ মিলিগ্রাম এবং নারীর ৭৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি দরকার। অর্থাৎ মাঝারি আকারের একটি বা দুটি কমলাই দিনের চাহিদার বড় অংশ মিটিয়ে দিতে পারে। ভিটামিন সি শরীরে জমা থাকে না, প্রতিদিন খাবার থেকে নিতে হয়; তাই মৌসুমি ফল হিসেবে কমলা নিয়মিত খাওয়ার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদেরা। আরেকটি কথা মনে রাখা ভালো: ভিটামিন সি তাপে ও দীর্ঘ সময় কেটে রাখলে নষ্ট হয়, তাই কমলা খোসা ছাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে খাওয়াই উত্তম।
প্রতি ১০০ গ্রাম কমলায় প্রায়
- ক্যালরি: ৪৭
- শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট: ১১.৮ গ্রাম
- আমিষ বা প্রোটিন: ০.৯ গ্রাম
- চর্বি বা ফ্যাট: ০.১ গ্রাম
- আঁশ বা ফাইবার: ২.৪ গ্রাম
সংখ্যাগুলো থেকে বোঝা যায়, কমলা মূলত পানি, প্রাকৃতিক শর্করা আর আঁশের ফল; এতে চর্বি প্রায় নেই বললেই চলে। মাঝারি আকারের একটি কমলা খেলে পেট অনেকটা ভরে, অথচ ক্যালরি জমে খুব কম। বাজারের প্যাকেটজাত জুসের চেয়ে গোটা ফল খাওয়া ভালো, কারণ তাতে আঁশটুকু পুরোপুরি পাওয়া যায় এবং বাড়তি চিনি থাকে না।
কমলা খাওয়ার উপকারিতা
পুষ্টিবিদেরা কমলাকে বহুগুণের ফল বলেন, আর নিয়মিত খেলে অনেক শারীরিক সমস্যা থেকে দূরে থাকা যায়। প্রথমত, এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কমলার ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরকে ঠান্ডা, সর্দি এবং অন্যান্য সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। শীতের মৌসুমে, যখন সর্দি-কাশি বাড়ে, ঠিক তখনই কমলার ভরা মৌসুম, প্রকৃতির এই মিলটি লক্ষ করার মতো।
দ্বিতীয়ত, কমলা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এর পটাশিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ত, কমলা ত্বক উজ্জ্বল রাখে। ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে; কোলাজেন হলো এক ধরনের প্রোটিন, যা ত্বককে টানটান ও স্বাস্থ্যকর রাখে।
চতুর্থত, কম ক্যালরি ও বেশি আঁশ থাকায় কমলা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে। পঞ্চমত, আঁশসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ষষ্ঠত, কমলায় থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ফাইটোকেমিক্যাল, অর্থাৎ উদ্ভিদের নিজস্ব উপকারী রাসায়নিক যৌগ, দেহে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রোধে ভূমিকা রাখে বলে পুষ্টিবিদেরা মনে করেন। তবে কোনো একটি ফল একাই রোগ সারায় না; সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবেই কমলার উপকার পুরোপুরি পাওয়া যায়।
কেন কমলা চাষ লাভজনক
কৃষকের দৃষ্টিতে কমলার প্রথম আকর্ষণ এর বাজারদর। সারা বছরই কমলার চাহিদা থাকে, ফলে বিক্রি করে ভালো আয় করা যায়। দেশের বাজারে বিপুল চাহিদা রয়েছে, আর আন্তর্জাতিক বাজারেও কমলা বহুল কেনাবেচা হওয়া ফল। দেশে উৎপাদন বাড়লে আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমবে, এটিও একটি জাতীয় লাভ।
দ্বিতীয় সুবিধা হলো কমলা চাষে খুব বেশি জটিলতা নেই এবং তুলনামূলক কম শ্রম লাগে। ধান বা সবজির মতো প্রতি মৌসুমে নতুন করে জমি চাষ, বীজ বোনা বা চারা রোপণের ঝামেলা নেই। একবার গাছ রোপণ করলে দীর্ঘদিন ধরে ফল পাওয়া যায়, এটাই দীর্ঘমেয়াদি আয়ের মূল কথা। বাগান একবার দাঁড়িয়ে গেলে বছরের পর বছর ফলন দেয়।
তৃতীয়ত, সঠিক পরিচর্যা ও সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এক হেক্টর জমি থেকে প্রচুর ফলন পাওয়া সম্ভব। চতুর্থত, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি, বিশেষ করে পাহাড়ি ঢাল ও উত্তরের উঁচু জমি, কমলা চাষের উপযোগী। পাহাড়ের ঢালে যেখানে ধান হয় না, সেখানে কমলা বাগান অব্যবহৃত জমিকে আয়ের উৎসে পরিণত করে।
পঞ্চমত, কমলা চাষের খরচ তুলনামূলক কম আর লাভ বেশি। শুধু তাজা ফল নয়, প্রক্রিয়াজাত করেও বাড়তি আয় করা যায়। কমলার জুস, জ্যাম, মারমালেড বানিয়ে বিক্রি করলে যে ফল আকারে ছোট বা দেখতে কম সুন্দর, সেগুলোও ভালো দামে বিক্রি হয়। গ্রামের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
চারা বাছাই ও বাগানের যত্ন
একটি ভালো কমলা বাগানের শুরু হয় ভালো চারা দিয়ে। বিশেষজ্ঞেরা ভালো জাতের কলমের চারা লাগানোর পরামর্শ দেন। কলমের চারা মাতৃগাছের গুণ হুবহু ধরে রাখে এবং বীজের চারার চেয়ে অনেক আগে ফল দেয়। বীজ থেকে জন্মানো গাছে ফল আসতে দেরি হয়, আর ফলের মানও মাতৃগাছের মতো নাও হতে পারে।
কলম বলতে কী বোঝায়, তা একটু খুলে বলা দরকার। কলমের চারায় দুটি অংশ জোড়া লাগানো থাকে। নিচের অংশটি হলো আদিজোড় বা রুটস্টক, সাধারণত কোনো শক্ত, রোগ সহনশীল লেবুজাতীয় গাছের চারা, যার শিকড় মাটি থেকে ভালোভাবে পানি ও খাবার টানতে পারে। ওপরের অংশটি হলো উপজোড় বা সায়ন, যা নেওয়া হয় ভালো ফল দেওয়া কোনো মাতৃগাছের ডাল থেকে। দুটি অংশ জোড়া লেগে একটি গাছে পরিণত হয়। ফলে শিকড়ের শক্তি আর ফলের গুণ, দুটোই একসঙ্গে পাওয়া যায়। চারা কেনার সময় জোড়ের জায়গাটি মসৃণ ও শক্তভাবে লেগেছে কি না, পাতা সতেজ ও দাগমুক্ত কি না, তা দেখে নেওয়া উচিত। জোড়ের নিচ থেকে কোনো কুশি বের হলে তা কেটে দিতে হয়, নইলে রুটস্টকের ডাল বেড়ে উঠে আসল গাছকে দুর্বল করে দেয়।
চারা লাগানোর জমি হতে হবে এমন, যেখানে পানি দাঁড়ায় না। কমলা গাছের শিকড় জলাবদ্ধতা একেবারেই সহ্য করতে পারে না; কয়েক দিন গোড়ায় পানি জমে থাকলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে, শিকড়ে পচন ধরে। এ কারণেই পাহাড়ের ঢাল আর উঁচু জমিতে কমলা ভালো হয়। গাছে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য নিয়মিত ডালপালা ছাঁটাই করতে হয়; রোগাক্রান্ত, মরা ও ভেতরের দিকে ঘন হয়ে আসা ডাল কেটে দিলে গাছের ভেতরে রোদ পৌঁছায় এবং ফলের মান ভালো হয়।
সার ব্যবস্থাপনা: মাটি ও গাছের বয়স বুঝে
কমলার ভালো ফলনের জন্য সঠিক সার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাটির গুণাগুণ ও গাছের বৃদ্ধির পর্যায় অনুযায়ী সার দিতে হয়। ছোট চারা আর পূর্ণবয়স্ক ফলন্ত গাছের চাহিদা এক নয়; তাই মাটি পরীক্ষা করে এবং উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে সারের মাত্রা ঠিক করাই ভালো।
জৈব সার কমলা বাগানের ভিত্তি। প্রতি বছর গাছের গোড়ায় গোবর, কম্পোস্ট বা ভার্মি কম্পোস্ট দিতে হবে। ভার্মি কম্পোস্ট হলো কেঁচো দিয়ে তৈরি জৈব সার, যা মাটিকে ঝুরঝুরে ও উর্বর করে। প্রতি গাছের জন্য বছরে ১০ থেকে ১৫ কেজি জৈব সার প্রয়োজন। জৈব সার মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায় এবং রাসায়নিক সারের কার্যকারিতাও বাড়িয়ে দেয়।
রাসায়নিক সারের মধ্যে তিনটি প্রধান উপাদান কমলার জন্য দরকার। নাইট্রোজেন গাছের পাতা ও ডালপালা বৃদ্ধিতে কাজ করে; ইউরিয়া এর প্রধান উৎস। ফসফরাস গাছের শিকড়ের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে; টিএসপি থেকে এটি পাওয়া যায়। পটাশ বা পটাশিয়াম ফলের আকার বড় করে এবং মিষ্টতা বাড়ায়; এমওপি এর উৎস। কমলা টক না মিষ্টি হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে গাছ পর্যাপ্ত পটাশ পাচ্ছে কি না তার ওপর।
সার প্রয়োগের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বর্ষাকালের আগে এবং ফলের মুকুল আসার সময় সার দিতে হয়। বর্ষার আগে দিলে বৃষ্টির পানিতে সার মাটিতে মিশে শিকড়ের কাছে পৌঁছায়। সার দিতে হয় গাছের কাণ্ড থেকে কিছুটা দূরে, ডালপালা যতদূর ছড়িয়েছে তার নিচের বৃত্তাকার অংশে, কারণ খাবার শোষণকারী শিকড়গুলো সেখানেই বেশি থাকে। তবে অপপ্রয়োগ এড়িয়ে চলতে হবে। বেশি সার দিলে লাভ হয় না, বরং গাছের ক্ষতি হতে পারে, শিকড় পুড়ে যেতে পারে, আর অকারণে খরচ বাড়ে।
সেচ: শুষ্ক মৌসুমে পানি, বর্ষায় নিষ্কাশন
সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কমলার উৎপাদন অনেক বাড়ানো যায়। শুষ্ক মৌসুমে প্রতি ৭ থেকে ১০ দিন পর পর সেচ দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে গরম বেশি থাকায় গাছের গোড়ায় বেশি পানির দরকার হয়। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাগানে নালা কেটে রাখলে ভারী বৃষ্টির পানি গোড়ায় জমে না।
সেচের পদ্ধতি হিসেবে ড্রিপ সেচ কমলা চাষের জন্য সবচেয়ে কার্যকর। ড্রিপ সেচে সরু পাইপের ছোট ছিদ্র দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি সরাসরি গাছের গোড়ায় পৌঁছায়, ফলে পানির অপচয় কম হয় এবং আগাছাও কম জন্মায়। ড্রিপ ব্যবস্থা না থাকলেও গাছের গোড়ায় সরাসরি পানি দেওয়াই ভালো, পুরো জমি ভিজিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। তবে জমিতে পানি জমে থাকা ক্ষতিকর, এ কথা বারবার মনে রাখতে হবে।
পানির সংকট দেখা দিলে মালচিং কাজে আসে। মালচিং মানে গাছের গোড়ার মাটি খড়, শুকনো পাতা বা অন্য কোনো আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখা। এতে রোদে মাটির পানি দ্রুত উড়ে যায় না, মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘক্ষণ ধরে থাকে। পাহাড়ি এলাকায়, যেখানে শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া কঠিন, সেখানে মালচিং অনেক বাগানের ভরসা।
আগাছা দমন: হাত, মালচ ও সাবধানতা
আগাছা গাছের পুষ্টি ও পানি গ্রহণে বাধা দেয়। গাছের জন্য দেওয়া সার আর পানির ভাগ বসায় আগাছা, ফলে ফলন কমে যায়। তরুণ বাগানে এই ক্ষতি বেশি হয়, কারণ ছোট চারার শিকড় তখনও গভীরে যায়নি।
- হাতে তুলে পরিষ্কার: গাছের গোড়া ও চারপাশের আগাছা হাত দিয়ে তুলে ফেলুন। ছোট বাগানে এটিই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
- মালচিং: খড়, পাতা বা কম্পোস্টের মতো জৈব মালচ দিয়ে গাছের গোড়া ঢেকে রাখলে আগাছা কম গজায়; একই সঙ্গে মাটির আর্দ্রতাও রক্ষা হয়।
- যন্ত্রের ব্যবহার: বড় বাগানে কৃষিযন্ত্র দিয়ে গাছের সারির ফাঁকের জমি পরিষ্কার করা যায়।
- নির্বাচিত আগাছানাশক: আগাছা খুব বেশি হলে হালকা মাত্রার আগাছানাশক ব্যবহার করা যায়।
- সতর্কতা: আগাছানাশক ব্যবহারের সময় যেন কমলা গাছের পাতা বা কাণ্ডে না লাগে, তা নিশ্চিত করুন।
বাগানের শত্রু চেনা: রোগ ও পোকা
সার, সেচ ও আগাছা দমনের পাশাপাশি একটি সফল কমলা বাগানের জন্য রোগ ও পোকামাকড় চেনাও জরুরি। লেবুজাতীয় গাছের কয়েকটি পরিচিত সমস্যা আছে, যেগুলো বাংলাদেশের বাগানেও দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ের নাম সাইট্রাস গ্রিনিং, যাকে অনেকে হলুদ ডগা রোগ বলেন। এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা সাইট্রাস সাইলিড নামের ছোট এক পোকার মাধ্যমে এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছড়ায়। আক্রান্ত গাছের পাতা এলোমেলোভাবে হলুদ হয়ে যায়, ফল ছোট, বাঁকা ও টক হয়, আর ধীরে ধীরে গাছটি মরে যায়। এ রোগের কোনো নিরাময় নেই; তাই রোগমুক্ত নার্সারি থেকে চারা কেনা, সাইলিড পোকা দমন করা এবং আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলাই প্রধান প্রতিরোধ।
আরেকটি পরিচিত রোগ হলো ক্যাঙ্কার। এতে পাতা, ডাল ও ফলের গায়ে খসখসে, উঁচু, বাদামি দাগ পড়ে; দাগের চারপাশে হলুদ বলয় থাকে। দাগওয়ালা ফল বাজারে কম দামে বিক্রি হয়। বর্ষায় বৃষ্টির ছিটায় এ রোগ ছড়ায়। আক্রান্ত ডাল ছেঁটে পুড়িয়ে ফেলা এবং কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত তামাযুক্ত ছত্রাকনাশক স্প্রে করা এর প্রচলিত দমন ব্যবস্থা।
পোকার মধ্যে লিফ মাইনার বা পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা কচি পাতার ভেতরে আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গ কেটে খায়, ফলে পাতা কুঁকড়ে যায়; চারা ও তরুণ গাছে এর ক্ষতি বেশি। লেবুর প্রজাপতির শূককর কচি পাতা খেয়ে ফেলে, আর ফলের মাছি পাকা ফলে ডিম পাড়ে, ফলে ফল পচে ঝরে পড়ে। বাগান নিয়মিত ঘুরে দেখা, ঝরা ও পচা ফল মাটিতে পুঁতে ফেলা, আক্রান্ত অংশ হাতে তুলে নষ্ট করা এবং প্রয়োজনে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে বালাইনাশক ব্যবহার করা, এই সমন্বিত পদ্ধতিই সবচেয়ে কার্যকর ও কম খরচের।
ফল তোলা: সময়, পদ্ধতি ও যত্ন
সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে কমলা তোলা হলে ফলের মান ভালো থাকে এবং সংরক্ষণেও সুবিধা হয়। ফুল ফোটার ৭ থেকে ৮ মাস পর কমলা পরিপক্ক হয়। কমলার রং হালকা সবুজ থেকে হলুদ বা কমলা হতে শুরু করলে বুঝতে হবে তোলার সময় হয়েছে। এ দেশে সাধারণত শীতকালেই কমলা পাকে, আর হাটবাজারে দেশি কমলার ভরা মৌসুমও তখন। আম বা কলার মতো কমলা গাছ থেকে পাড়ার পর আর পাকে না, মিষ্টতাও বাড়ে না; তাই খুব আগে তোলা কমলা টকই থেকে যায়। গাছে পুরোপুরি পরিপক্ক হতে দেওয়াই ভালো ফলের শর্ত।
ফল তুলতে হবে হাতে অথবা ধারালো কাঁচি দিয়ে বোঁটা কেটে। টেনে ছিঁড়লে বোঁটার কাছের খোসা ফেটে যায়, সেখান দিয়ে পচন ঢোকে। ফলের গায়ে যেন কোনো আঘাত না লাগে, তা খেয়াল রাখতে হবে; ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলা বা মাটিতে পড়তে দেওয়া চলবে না। তোলার পর ফল পরিষ্কার করে ছায়াযুক্ত জায়গায় শুকিয়ে নিতে হবে, যাতে গায়ে লেগে থাকা পানি বা শিশির চলে যায়।
সংরক্ষণের জন্য ফল ঠান্ডা ও শুকনো জায়গায় রাখতে হবে। আধুনিক পদ্ধতিতে হিমাগারে কমলা দীর্ঘদিন ভালো রাখা যায়। ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষককে মৌসুমের শুরুতে কম দামে সব ফল একসঙ্গে বিক্রি করতে হয় না; দাম বাড়লে ধীরে ধীরে বিক্রি করা যায়। আকার ও মান অনুযায়ী ফল আলাদা করে বাছাই করলে বাজারে দামও ভালো পাওয়া যায়।
যে ফল আকারে ছোট, গায়ে দাগ আছে বা পরিবহনে সামান্য আঘাত পেয়েছে, সেগুলো ফেলে না দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা যায়। ঘরোয়াভাবেই কমলার জুস, জ্যাম ও মারমালেড তৈরি করা সম্ভব; মারমালেডে খোসার সরু টুকরোও কাজে লাগে। পরিষ্কার পাত্রে, সঠিক মাত্রায় চিনি দিয়ে এবং ভালোভাবে বন্ধ বোতলে রাখলে এসব পণ্য কয়েক মাস টেকে। এতে বাগানের প্রতিটি ফল থেকেই কিছু না কিছু আয় আসে, অপচয় কমে।
ধৈর্যের ফসল, দীর্ঘ মেয়াদের আয়
কমলা চাষ একটি লাভজনক কৃষি উদ্যোগ, তবে এটি ধৈর্যের চাষও বটে। চারা লাগানোর পর প্রথম কয়েক বছর গাছ বড় হয়, ফলন আসে ধীরে ধীরে। এই সময়টায় বাগানের ফাঁকা জায়গায় সবজি বা মসলা চাষ করে অনেক কৃষক বাড়তি আয় করেন। একবার বাগান ফলন্ত হয়ে উঠলে তা বছরের পর বছর আয় দেয়।
সঠিক সার ব্যবস্থাপনা, সময়মতো সেচ, আগাছা নিয়ন্ত্রণ আর যত্নের সঙ্গে ফল তোলা, এই কয়েকটি কাজ ঠিকঠাক করলে কমলা চাষ আরও সফল হয়। দেশে ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং রপ্তানির সম্ভাবনার কারণে কমলা কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ফসল হয়ে উঠতে পারে। যে কৃষক আজ পরিকল্পনা করে ভালো জাতের চারা দিয়ে বাগান শুরু করবেন, কয়েক বছর পর শীতের সকালে গাছভর্তি রঙিন কমলাই হবে তাঁর পরিশ্রমের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিদান। আর আমদানি করা কমলার পাশে দেশি কমলার স্তূপ যত বাড়বে, দেশের কৃষি অর্থনীতিও তত শক্ত হবে।
ছবি: জাতীয় বৃক্ষমেলায় কমলার গাছ, ঢাকা / Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)





মন্তব্য
(০)