২০২৬ সালের ১৩ জুলাই সোমবার সকালে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নে নতুন খনন করা সরিকল-বাটাজোর খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি নিম ও আমড়া গাছের চারা লাগিয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন; রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস সেদিন সকালের প্রতিবেদনে চারা দুটিকে নারিকেল ও নিম বলে উল্লেখ করে। দুই প্রতিবেদনেই বলা হয়, সেদিন ওই স্থানে আড়াই হাজার গাছের চারা লাগানো হবে।
বাটাজোরে খালপাড়ে বৃক্ষরোপণ
প্রধানমন্ত্রী সকাল ১০টার দিকে খালপাড়ে পৌঁছান। বাটাজোর বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি স্থানীয়ভাবে 'বাটাজোর খাল' নামে পরিচিত। জাগো নিউজ ও বাসসের তথ্য অনুযায়ী, বাজারের পূর্ব দিকে খালটি সরিকল নদীর সঙ্গে মিশে মিয়ারচর নদীতে গিয়ে পড়েছে।
জাগো নিউজ জানায়, খালের এক পাড় থেকে গৃহবধূ ও কৃষকেরা প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান, তিনিও হাত নেড়ে গ্রামবাসীর শুভেচ্ছার জবাব দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন; বাসস জানায়, তিনিও একটি গাছের চারা লাগান। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃক্ষরোপণ শেষে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
ঢাকা টাইমস সেদিন সকাল ১০টা ৩৭ মিনিটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অনুষ্ঠানটিকে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন হিসেবে বর্ণনা করে এবং জানায়, গৌরনদীর এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ২ হাজার ৫০০টি বৃক্ষরোপণে অংশ নেন।
"শিশু চারাটিকেও প্রতিদিন যত্ন করতে হবে"
কর্মসূচির উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাছের চারা রোপণ করেই কাজ শেষ হবে না। সেদিন আড়াই হাজার গাছের চারা রোপণ করা হবে, আর সবাইকে এসব গাছের যত্ন নিতে হবে। বাসস তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে: 'শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর আপনারা যেমন তার যত্ন করেন ঠিক সেইভাবে শিশু চারাটিকেও প্রতিদিন যত্ন করতে হবে।'
একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আরও কিছু বক্তব্য তুলে ধরে ঢাকা টাইমস। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমানে গাছের সংখ্যা কম, তাই পরিবেশ রক্ষায় ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; আগামী পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করা হবে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এসেছে, অনেক সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে, আর এ পরিস্থিতিতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হবে না, গাছের যথাযথ পরিচর্যা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন এবং প্রত্যেক নাগরিককে গাছ লাগানোর পাশাপাশি গাছের যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানান।
বৃক্ষরোপণ শেষে প্রধানমন্ত্রী বাটাজোরে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যান; সেখানে তাঁর পরিবারের নারী প্রধানদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়ার কথা ছিল। এরপর সড়কপথে বরিশাল শহরে গিয়ে ত্রিশ গোডাউন বধ্যভূমি লাগোয়া সাগরদী খালপাড়ে আরেকটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করার কথা ছিল তাঁর। ঢাকা টাইমস জানায়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল তারেক রহমানের প্রথম বরিশাল সফর।
অনুষ্ঠানের পেছনে পাঁচ বছরের জাতীয় পরিকল্পনা
গৌরনদীর বৃক্ষরোপণ ছিল আগের সপ্তাহে ঘোষিত একটি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ। ঢাকা ট্রিবিউন ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ জুলাই বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের সংকুচিত বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানায়, প্রকৃত লক্ষ্য ৩২ কোটি চারা রোপণ, কারণ প্রায় ৭ কোটি চারা টিকে না-ও থাকতে পারে; উদ্দেশ্য হলো পাঁচ বছর শেষে অন্তত ২৫ কোটি গাছ যেন বেঁচে থাকে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বন অধিদপ্তর একটি নীতিমালা তৈরি করছিল।
সে বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস বৈশ্বিক তারিখ ৫ জুনের বদলে ৯ জুলাই বার্ষিক বৃক্ষরোপণ অভিযানের সঙ্গে জাতীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সেদিন ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পরিবেশ মেলা ২০২৬, জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও জাতীয় বৃক্ষমেলার উদ্বোধনের কথা ছিল। ঢাকায় মাসব্যাপী মেলার পাশাপাশি সাতটি বিভাগীয় সদরে ১৫ দিন, ৫৬টি জেলা সদরে সাত দিন এবং ২৯টি উপজেলায় তিন দিনের বৃক্ষমেলার পরিকল্পনা করা হয়।
মন্ত্রণালয় জানায়, রোপণ করা চারা স্যাটেলাইটভিত্তিক ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস), রিমোট সেন্সিং ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করা হবে; দুর্গম চর, উপকূল ও বনাঞ্চলে ড্রোন ব্যবহার করা হবে। একটি মোবাইল অ্যাপসহ জাতীয় বৃক্ষ ডেটাবেজ ও বৃক্ষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় প্রতিটি গাছের অবস্থান, টিকে থাকা ও বৃদ্ধির তথ্য রাখা হবে, আর কর্মসূচি তদারকিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সবুজ কর্মসংস্থান এবং ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরির আশা করা হয়, যেখানে গ্রামের নারী ও তরুণদের নার্সারি ব্যবসা ও রোপণ-পরবর্তী পরিচর্যায় যুক্ত করা হবে।
চলতি বছরের জন্য মন্ত্রণালয় জানায়, বন অধিদপ্তর বৃক্ষহীন এলাকায় এবং সড়ক, খাল, বাঁধ ও উপকূলজুড়ে দেড় কোটি দেশি প্রজাতির চারা রোপণ করছে এবং দখলমুক্ত করা ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর বনভূমিতে নতুন বনায়ন করছে। ৮ জুলাই পর্যন্ত অধিদপ্তর ৮৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি চারা রোপণ করেছিল, যা বছরের লক্ষ্যের প্রায় ১৭ শতাংশ। পাঁচ বছরের এই কর্মসূচির উদ্বোধন আগেই কক্সবাজারের ডুলাহাজারায় করা হয়েছিল।
কর্মকর্তারা ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, দেশের ভৌগোলিক, পরিবেশগত ও আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় পরিকল্পনাটি ছয় ভাগে ভাগ করা হয়েছে: উপকূলীয় বনায়ন, বন পুনরুদ্ধার, নগর বনায়ন, কমিউনিটি বনায়ন, বসতবাড়ি ও কৃষিবনায়ন এবং উৎপাদনমুখী বনায়ন; স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ধাপে এগুলো বাস্তবায়ন হবে। সরকার গাছ লাগানোর জন্য নগদ অর্থ, চারা বা জমি দেবে না; যাঁরা স্বেচ্ছায় গাছ লাগাবেন, সেই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেবে, আর সরকারি সংস্থাগুলো নিজস্ব বাজেট থেকে বৃক্ষরোপণের খরচ বহন করবে। প্রায় ৯০০ প্রতিষ্ঠান এর মধ্যে সহায়তার জন্য আবেদন করেছিল।
বিশেষজ্ঞরা উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও রোপণের পর পরিচর্যার ওপর জোর দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের একজন সাবেক চেয়ারম্যান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, গাছের যত্ন নিতে হবে শিশুর মতো, এমনভাবে লাগাতে হবে যাতে প্রতি পাঁচটির মধ্যে অন্তত তিনটি বাঁচে; আর জমির প্রাপ্যতা, শিকড়ের ধরন, ডালপালার বিস্তার ও স্থানীয় পরিবেশ বিবেচনা করে প্রজাতি বাছাই করতে হবে।
অগ্রাধিকারের তালিকায় নিম কেন
সরকার জানায়, বিদেশি গাছের বদলে দ্রুত বর্ধনশীল দেশি প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ৯ জুলাই ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন অধিদপ্তরের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল মেহগনি, গামার, জারুল, কদম, আগর, বাঁশ, শিলকড়ই, জাম, মহুয়া, বহেড়া, অর্জুন, নিম, হরীতকী, কাঁঠাল ও চালতা। পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে এক লাখ নিমের চারা লাগানোর পরিকল্পনাও ছিল সরকারের। উপকূলে ঝাউ এবং সুন্দরবনে সুন্দরী, গেওয়া, বাইন ও গরান প্রজাতিকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, নিম (Azadirachta indica) মেলিয়েসি গোত্রের গভীরমূলী, মাঝারি আকারের ও সাধারণত চিরসবুজ গাছ; এটি সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিটার উঁচু হয় এবং কাণ্ড ৬০ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার চওড়া হয়। গাছটি অল্প উচ্চতাতেই শাখা ছড়িয়ে উজ্জ্বল সবুজ পাতার বড়, ঘন, গোলাকার মাথা তৈরি করে; শুষ্ক অঞ্চলে বা শুষ্ক মৌসুমে এর পাতা ঝরে। ফুল ছোট ও সুগন্ধি, ফল ছোট ও একবীজী, পাকলে মিষ্টি হয় এবং পাখির প্রিয় খাদ্য; গাছের সারকাঠ লাল, শক্ত ও টেকসই। নিম বাংলাদেশের স্থানীয় গাছ, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রচুর জন্মে এবং সারা দেশে, বিশেষ করে শুষ্ক অঞ্চলে লাগানো হয়। বাংলাপিডিয়া একে সবচেয়ে মূল্যবান বহুমুখী উদ্ভিদ প্রজাতির একটি বলেছে: এর কাঠ দিয়ে ঘরবাড়ি ও আসবাব ছাড়াও গরুর গাড়ি, চাকার অক্ষদণ্ড, জোয়াল, দাঁড়, বাক্স, কৃষি সরঞ্জাম ও ঢাক তৈরি হয়; ছাল, আঠা, পাতা ও ফুল ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, আর ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমনে নিমপাতা ব্যবহার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের ১৯৯২ সালের প্রতিবেদন 'নিম: আ ট্রি ফর সলভিং গ্লোবাল প্রবলেমস' অনুযায়ী, নিমের আদি নিবাস ভারত ও বার্মা, আর সারা বছর ছায়া দেওয়ার জন্য গাছটি বিশেষভাবে সমাদৃত। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘানার আক্রা সমভূমিতে নিম জ্বালানি কাঠের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে এবং পরীক্ষায় এর বীজ ও পাতার নির্যাস ২০০টির বেশি প্রজাতির পোকার ওপর প্রভাব ফেলেছে। এর একটি উপাদান অ্যাজাডিরাকটিন পোকার শূককীটের খোলস বদল ব্যাহত করে, আরেকটি উপাদান স্যালানিন শক্তিশালী বিকর্ষক হিসেবে কাজ করে; নিমের যৌগ সাধারণত পোকাকে সঙ্গে সঙ্গে মারে না, তবে খাওয়া, বংশবৃদ্ধি ও বেড়ে ওঠার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, উষ্ণ রক্তের প্রাণীর জন্য নিমজাত পণ্যের বিষাক্ততা কম বলে দেখা গেছে, তবে আশির দশকে মালয়েশিয়ায় মা-বাবার খাওয়ানো নিমবীজের তেলের সঙ্গে কয়েকটি ছোট শিশুর মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল। তাই নিম ঘরোয়া ওষুধ নয়: কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় নিম ব্যবহারের কথা ভাবলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, আর ফসলে নিমজাত বালাইনাশক ব্যবহার করতে চাইলে কৃষকেরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন।
আমড়া, বরিশালের পরিচিত ফল
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা দ্বিতীয় চারাটি আমড়ার। বাংলাপিডিয়ার 'ফল' ভুক্তিতে দেশে জন্মানো ফলের তালিকায় আমড়া বা বিলাতি আমড়াকে Spondias dulcis হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, বৈশাখ থেকে শ্রাবণের মধুমাসে যখন আম, কাঁঠাল, লিচু ও আনারসের প্রাধান্য, তার বাইরের মাসগুলোতে যেসব ফল পাওয়া যায় আমড়া তার একটি; বাংলাদেশ থেকে যেসব মৌসুমি ফল বিদেশে রপ্তানি হয়, তার মধ্যেও আমড়া আছে।
উদ্যানতত্ত্ববিদ জুলিয়া এফ. মর্টন তাঁর 'ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস' (১৯৮৭) বইয়ে কাজুবাদাম গোত্রের (অ্যানাকার্ডিয়েসি) Spondias dulcis বা অ্যাম্বারেলাকে দ্রুত বর্ধনশীল গাছ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় আদি অঞ্চলের বাইরে সাধারণত ৯ থেকে ১২ মিটার উঁচু হয়। এর ২০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার লম্বা যৌগিক পাতা শুষ্ক ও শীতল মৌসুমের শুরুতে হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে। ফল থোকায় ঝোলে, লম্বায় ৬.২৫ থেকে ৯ সেন্টিমিটার, পাকলে সোনালি-হলুদ হয়; শক্ত অবস্থায় শাঁস মচমচে, রসালো ও হালকা টক, আনারসের মতো স্বাদ-গন্ধ থাকে, আর বেশি নরম হতে দিলে কাঠের মতো শক্ত আঁটির চারপাশে আঁশ বেরিয়ে আসে। বীজ থেকে (প্রায় চার সপ্তাহে অঙ্কুরিত হয়), বড় শক্ত ডালের কাটিং বা গুটিকলম থেকে সহজেই চারা হয়; ভারতে সাধারণত দেশি Spondias pinnata-র ওপর এর জোড়কলম করা হয়। বীজের চারা চার বছর বয়সেই ফল দিতে পারে। পরিণত গাছ ভঙ্গুর এবং জোরালো বাতাসে সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই আড়াল পাওয়া জায়গা ভালো। মর্টন হাওয়াইয়ে মাপা হিসাব উল্লেখ করেছেন, প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা শাঁসে ৪২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি; ফলটিকে তিনি লোহার ভালো উৎস বলেছেন, আর কাঁচা ফল দিয়ে জেলি, আচার ও চাটনি তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন।
মর্টন দেশি আমড়া Spondias pinnata-কে এর নিকটাত্মীয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন; কোনো কোনো উদ্ভিদবিজ্ঞানী একে S. dulcis-এর বুনো রূপ মনে করেন। উত্তর ভারতের হিমালয় থেকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত এটি বুনো ও চাষ করা অবস্থায় জন্মে; এর পাতার কিনারা খাঁজকাটা নয়, ফল ছোট, তবে ব্যবহার একই, আর এর টক পাতা ও ফুল বিশেষ করে তরকারিতে স্বাদ বাড়াতে খাওয়া হয়।

বরিশালে আমড়ার আলাদা কদর আছে। প্রথম আলো ২০২৫ সালের ৮ মে জানায়, ওই বছরের ৩০ এপ্রিল বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রণালয় বরিশালের আমড়াকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি দেয়। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাতেই কমবেশি আমড়া চাষ হয়; সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায়, যেখানে শত শত আমড়াবাগান আছে এবং চাষিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাণিজ্যিকভাবে আমড়া চাষ করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভাগে ১ হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমিতে আমড়া চাষ হয় এবং বার্ষিক গড় উৎপাদন ২৪ হাজার ৬৮৪ মেট্রিক টন। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন পিরোজপুরে, ৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন; এরপর ঝালকাঠিতে ৪ হাজার ৫৭৮ মেট্রিক টন এবং বরিশালে ৩ হাজার ৩৮৪ মেট্রিক টন। চাষের জমির হিসাবে শীর্ষে ঝালকাঠি, ৬০২ হেক্টর। চাষিরা জানান, পেয়ারার মৌসুম শেষে আমড়ার মৌসুম শুরু হয়, সাধারণত ভাদ্র মাস থেকে, চলে প্রায় দুই মাস। সে বছর খরা ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রায় আমড়ার ফুল ঝরে গিয়েছিল; বিভাগীয় ডিএইর একজন কর্মকর্তা চাষিদের গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি দিয়ে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার পরামর্শ দেন।

নারিকেল, বাসসের প্রতিবেদনে উল্লেখিত চারা
বাসস নিমের সঙ্গে নারিকেলের চারার কথা উল্লেখ করেছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, নারিকেল পামি গোত্রের শাখা-প্রশাখাহীন লম্বা গাছ, যা বিশ্বের উষ্ণমণ্ডলে বিস্তৃত এবং বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলের নিচু জমি ও ছোট দ্বীপে ভালো জন্মে; বাংলাদেশের সর্বত্র নারিকেল জন্মালেও সমুদ্রতীরের লোনা মাটিতে ফলন ভালো হয়। দেশে চাষ হওয়া জাতগুলো হলো টিপিকা সবুজ, টিপিকা বাদামি ও দুধে। বাংলাপিডিয়ার 'ফল' ভুক্তিতে বলা হয়েছে, দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে নারিকেল প্রচুর জন্মে, গাছপ্রতি গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি ফল পাওয়া যায় এবং সারা বছর সংগ্রহ করা যায়। দেশের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে ফল ও অন্যান্য কাজের জন্য বসতবাড়ির গাছ হিসেবে নারিকেল ব্যাপকভাবে লাগানো হয়: শাঁস দিয়ে পিঠা, মিষ্টি ও নানা রান্না হয়, তেল রান্না ও প্রসাধনীতে লাগে, ছোবড়া দিয়ে দড়ি, ব্রাশ ও পাপোশ তৈরি হয়, আর কাণ্ড দিয়ে ঘরের আড়া ও খুঁটি হয়।
গৌরনদী ও এর কৃষি
কর্মসূচির উদ্বোধনস্থল গৌরনদী বরিশাল জেলার একটি উপজেলা, আয়তন ১৫০.৫৪ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এর উত্তরে কালকিনি, দক্ষিণে উজিরপুর, পূর্বে বাবুগঞ্জ, মুলাদী ও কালকিনি এবং পশ্চিমে আগৈলঝাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলা। প্রধান নদী আড়িয়াল খাঁ, নুন্দা ও অগরপুল, আর উপজেলায় নৌপথ ২১৫ কিলোমিটার। গৌরনদী থানা গঠিত হয় ১৮০৬ সালে এবং ১৯৮২ সালে থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৮৬।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, গৌরনদীর ৫১.৫৯ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। প্রধান ফসল ধান, গম, আলু, পান ও শাকসবজি; প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, জাম, তাল, নারিকেল ও পেঁপে। খালটি যে ইউনিয়নে, সেই বাটাজোরে আছে বাটাজোর অশ্বিনীকুমার ইনস্টিটিউশন, আর বাটাজোরের পৌষসংক্রান্তি মেলাকে বাংলাপিডিয়া উপজেলার উল্লেখযোগ্য মেলাগুলোর একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
বরিশাল জেলার আয়তন ২ হাজার ৭৮৪.৫২ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৭৯৭ সালে বাকেরগঞ্জ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়, পরে এর নাম হয় বরিশাল; ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি বরিশালকে বিভাগ ঘোষণা করা হয়।
ষাটের দশক থেকে বৃক্ষরোপণ অভিযান
খাল ও সড়কের ধারে গাছ লাগানো বাংলাদেশের বনায়নের পুরোনো চর্চা। বাংলাপিডিয়ার সামাজিক বনায়ন ভুক্তি অনুযায়ী, জাতীয় অভিযানের সূচনা ১৯৬২-৬৩ সালে, যখন রাজশাহী ও ঢাকায় দুটি বন সম্প্রসারণ বিভাগ গঠন করা হয় এবং ১ জুন বৃক্ষরোপণ দিবস চালু হয়। পরে অভিযান এক দিন থেকে বাড়িয়ে এক সপ্তাহ, তারপর এক মাস এবং শেষে তিন মাস করা হয়, যদিও প্রথম দিকে এর কাজ নার্সারি স্থাপন আর জেলা সদরে আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণেই সীমিত ছিল।
প্রকৃত অর্থে সামাজিক বনায়ন শুরু হয় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে কমিউনিটি বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে, যা ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত সাত জেলায় চলে: দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও যশোর। এর প্রধান অংশ ছিল সড়ক, রেলপথ ও খালের বাঁধ বরাবর প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান, আর এই প্রকল্পই প্রথম নারীদের কমিউনিটি বনায়নে যুক্ত করে। এর পরের উপজেলা বনায়ন ও নার্সারি উন্নয়ন প্রকল্পের লক্ষ্যের মধ্যে ছিল সড়ক, রেলপথ ও খালের বাঁধ বরাবর ১৭ হাজার ৭৬০ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান এবং উপজেলা কমপ্লেক্সে ৩৪৫টি নার্সারি। ১৯৯৪-৯৫ সালে উপকূলের ১০ জেলায় শুরু হওয়া উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বৃক্ষাচ্ছাদন বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমানো।
২০২৪ সালের জুনে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে সাম্প্রতিক হিসাব দেয়, যা ঢাকা ট্রিবিউন প্রকাশ করে: ২০০৯-১০ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার ৪০২ হেক্টর ব্লক বাগান ও ৩০ হাজার ২৫২ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান করা হয়েছে এবং ১১ কোটি ২০ লাখের বেশি চারা বিতরণ ও রোপণ করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সামাজিক বনায়নের ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৯৯ জন উপকারভোগী মোট ৩২.৬৯৫ বিলিয়ন টাকা লভ্যাংশ পেয়েছেন। সেই বর্ষায় সারা দেশে ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৩০ হাজার চারা রোপণের পরিকল্পনা ছিল।
দেশের কতটা জমি গাছে ঢাকা
সে সময় পাওয়া সর্বশেষ জাতীয় হিসাব এসেছিল বন অধিদপ্তরের দেশের বন ও বৃক্ষসম্পদ জরিপ থেকে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের মার্চে পরিবেশ মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরের ২০১৯ সালের বন ও বৃক্ষসম্পদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানায়, দেশের মোট ভূমির ২২.৩৭ শতাংশ বৃক্ষাচ্ছাদিত। মন্ত্রণালয় তখন জানায়, ২০২৫ সালের মধ্যে বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি ২৪ শতাংশের বেশি করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের জুনে মন্ত্রণালয় ২০৩০ সালের মধ্যে বৃক্ষাচ্ছাদন মোট ভূমির ২২.৩৭ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে এবং বনাচ্ছাদন ১৪.১ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঠিক করে; জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশনের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভূমি অবক্ষয় নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রেখে এই লক্ষ্য নেওয়া হয়। তখন বৃক্ষাচ্ছাদন ও কার্বনের পরিমাণ মাপতে একটি জাতীয় বন জরিপ চলছিল। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা ঘোষণার সময়ও মন্ত্রণালয় এর উদ্দেশ্য হিসেবে দেশের সংকুচিত বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের কথা বলে, বাটাজোর খালপাড়ের চারাগুলোও সেই লক্ষ্যেরই অংশ।
ছবি: Palash90 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাসস, ঢাকা টাইমস, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল (নিম: আ ট্রি ফর সলভিং গ্লোবাল প্রবলেমস, ১৯৯২), জুলিয়া এফ. মর্টন: ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস (পারডু বিশ্ববিদ্যালয়)




মন্তব্য
(০)