২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর, শনিবার ঢাকার বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়, বিবিসি বাংলা সেদিন জানায়। অথচ সে বছরের আগস্টে একই পেঁয়াজ পাওয়া যেত কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার পর দাম এক ধাক্কায় বেড়ে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় পৌঁছায়, তারপর বাড়তেই থাকে। বিশেষজ্ঞরা তখন বলেন, দেশে যথেষ্ট পেঁয়াজ উৎপাদন না হলে এমন সংকট যেকোনো সময় আবার দেখা দিতে পারে।
দাম বাড়তে থাকায় ঢাকার বাসিন্দা সালমা আক্তার পেঁয়াজ খাওয়া কমিয়ে দেন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, তাঁর পাঁচজনের পরিবারে সপ্তাহে তিন কেজি পেঁয়াজ লাগত, এখন তিনি সপ্তাহে এক থেকে দেড় কেজি কেনেন।
ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও আমদানি নির্ভরতা
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সব ধরনের পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। বিজনেস টুডের সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোতে অতিবৃষ্টিতে সময়মতো ফসল তোলা যায়নি, দিল্লি ও মুম্বাইয়ে খুচরা দাম কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ রুপিতে ওঠে, আর এর পরই পেঁয়াজ রপ্তানি পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা জানায়, দেশে বছরে ১৭ থেকে ১৯ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, যা মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ। বাকি ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ৭ থেকে ১১ লাখ টন আমদানি করতে হয়, যার ৯৫ শতাংশ আসে ভারত থেকে; বাকিটা মিয়ানমার, মিশর ও তুরস্ক থেকে। পচনশীল পণ্য দ্রুত বাজারে আনতে হয় এবং পরিবহন খরচ কম বলে কাছের দেশ ভারতের ওপর এই নির্ভরতা। দ্য ডেইলি স্টার ১ অক্টোবর ২০১৯ জানায়, প্রায় ২৪ লাখ টন চাহিদা মেটাতে বছরে প্রায় ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। নিষেধাজ্ঞার পর অন্য দেশ থেকে আমদানি শুরু হলেও নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত দাম কমেনি, বরং বেড়েছিল।

কৃষক কেন পেঁয়াজে আগ্রহী নন
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, উৎপাদন বাড়ানো দরকার হলেও কৃষককে কয়েকটি বাধার মুখে পড়তে হয়। ধান অপেক্ষাকৃত লাভজনক বলে কৃষক পেঁয়াজে ততটা আগ্রহী নন। যে জমিতে পেঁয়াজ হয় সেখানে অন্য ফসলও হয়, ফলে জমি নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকে, আর চাইলেই চাষের জমি বাড়ানো যায় না। তাঁর মতে, পেঁয়াজের উপযুক্ত জমি মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিচু জমি; দেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলোতে ফলন ভালো হয়, কিন্তু সিলেট বা চট্টগ্রামের উঁচু অথবা বেশি নিচু জমিতে পানি জমার আশঙ্কায় ফলন হয় না।
শীতকালই পেঁয়াজের উপযোগী মৌসুম। নতুন জাতে গরমকালেও চাষ করা যায়, তবে সেই পেঁয়াজ বেশিদিন রাখা যায় না, আর বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে ফসল নষ্ট হয়। সরকারের কৃষি আবহাওয়া তথ্য পোর্টাল বামিসও বলছে, পেঁয়াজ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না; রবি ও খরিফ মৌসুমের জন্য বারি পেঁয়াজ-১ থেকে বারি পেঁয়াজ-৫ পর্যন্ত জাত রয়েছে। রাজশাহীর কৃষক আসলাম হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, পেঁয়াজে লাভ কম, চালে বেশি, আর একটু বৃষ্টিতে জমিতে পানি উঠে পেঁয়াজ পচে গিয়ে অনেক লোকসান হয়।

সংরক্ষণও বড় সমস্যা। অধ্যাপক জহিরুদ্দিন জানান, আলুর হিমাগারে পেঁয়াজ রাখা যায় না; পেঁয়াজের জন্য ৬০ শতাংশ আর্দ্রতা এবং ৮ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা লাগে, আর দেশে এমন হিমাগারের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

বাজার তদারকি ও সংকট কাটানোর পথ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. মোঃ কিসমাতুল আহসানের মতে, সব ফসলে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে এমন নয়; হঠাৎ সংকটে উৎপাদন বাড়ানোর চেয়ে বাজার তদারকিতে জোর দেওয়া দরকার। কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে দাম বাড়ার কারণ চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতা, নাকি ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। তিনি মনে করেন, অন্য দেশ থেকে আমদানিতে সময় লাগে বলে সরকারের আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।
তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ভারত যে হঠাৎ করে পেঁয়াজ দেয়া বন্ধ করে দেবে আমরা ভাবতেও পারিনি। তবে আমাদের আগে থেকেই অনুমান করা উচিত ছিল।" তিনি উৎপাদন কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টার কথা বলেন। তাঁর মতে, হিমাগারে রাখলে পেঁয়াজের দাম ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের চেয়েও অনেক বেশি পড়বে, আর সে বছর মৌসুমের আগের বৃষ্টি পেঁয়াজের ক্ষতি করেছে।
অধ্যাপক জহিরুদ্দিনের মতে, কম সময়ে বেশি ফলনের জাত উদ্ভাবন বা দেশের আবহাওয়ার উপযোগী উচ্চফলনশীল বীজ আমদানি করা গেলে সংকট অনেকটা কাটবে; তাৎক্ষণিকভাবে তিনি পেঁয়াজের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দেন। ড. আহসান বলেন, সরকারের উপযুক্ত তদারকি এবং ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফার মানসিকতা থেকে সরে এলে এমন সংকট কাটানো সম্ভব।
ছবি: Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, বিজনেস টুডে, বাংলাদেশ এগ্রো-মেটিওরোলজিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম (বামিস)





মন্তব্য
(০)