ভারত ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার পর বাংলাদেশের বাজারে পণ্যটির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। যেসব ভোগ্যপণ্যের জন্য বাংলাদেশের ভোক্তারা ভারতের ওপর বেশি নির্ভরশীল, পেঁয়াজ তার অন্যতম। বিবিসি বাংলা ২০১৯ সালের ২৯ নভেম্বর প্রশ্ন তোলে: এই নির্ভরতা থেকে কি বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে পারবে?
আল জাজিরার ২ অক্টোবর ২০১৯-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ বর্ষার কারণে ভারতে নতুন ফসল বাজারে আসতে দেরি হওয়ায় দেশটি রপ্তানি বন্ধ করে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভারত ২২ লাখ টন তাজা পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল, যা এশিয়ার দেশগুলোর মোট আমদানির অর্ধেকের বেশি। নিষেধাজ্ঞার পর বাংলাদেশে কেজিপ্রতি দাম ১২০ টাকায় ওঠে, যা ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ; সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। বিবিসি বাংলা জানায়, ১৬ নভেম্বর ঢাকার বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হয় কেজিপ্রতি ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়, অথচ আগস্টে একই পেঁয়াজের দাম ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা।
গরুর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
এই প্রশ্নে উঠে আসে গরুর উদাহরণ। ভারতে নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেদেশ থেকে বাংলাদেশে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বেনারনিউজের ২০১৫ সালের ২১ এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার আগের বছর ভারত থেকে ২৫ লাখ গরু চোরাপথে বাংলাদেশে এসেছিল; ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে গরু পাচার পুরোপুরি বন্ধ করতে বলেন। ২০১৫ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি ঢাকার হাতিরপুল বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হয় কেজিপ্রতি ৩৭০ টাকায়, চার মাস আগে যা ছিল ২৮০ টাকা।
বিবিসি বাংলার ভাষ্যে, পরে গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায় পৌঁছায় এবং প্রথম দুই বছর কোরবানির জন্য গরু খুঁজে পাওয়াই অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এই সংকটের কারণে কয়েক বছরের মধ্যে দেশে অনেক গরুর খামার গড়ে ওঠে, আর ২০১৯ সালের আগের দুই বছর বাংলাদেশের কোরবানির পশুর বাজার ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল না।

কেন ভারতের ওপর নির্ভরতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের কখনোই উচিত হবে না একটি বাজারের উপর নির্ভরশীল হওয়া।" তাঁর মতে, পেঁয়াজ আমদানিতে শুধু ভারতের ওপর ভরসা না করে বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে, আর দেশের ভেতরে উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। নির্ভরতার দুটি কারণ তিনি উল্লেখ করেন: ঐতিহাসিকভাবে পেঁয়াজ ভারত থেকেই আসে, আর মান ও দাম বিবেচনায় ভারত থেকে আমদানি বাংলাদেশের জন্য লাভজনক।
টিসিবির হিসাব উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা ১৬ নভেম্বর জানায়, দেশে বছরে ১৭ থেকে ১৯ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, যা মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ; বাকি ৭ থেকে ১১ লাখ টন আমদানি করতে হয়। আমদানির ৯৫ শতাংশ আসে ভারত থেকে, বাকিটা মিয়ানমার, মিশর ও তুরস্ক থেকে। পেঁয়াজ পচনশীল বলে কাছের দেশ থেকে দ্রুত আনতে হয়, তাতে পরিবহন খরচও কম পড়ে।

কৃষি সচিবের হিসাব: দাম পেলে উৎপাদন বাড়বে
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরুজ্জামান মনে করেন, ভারত থেকে গরু আসা বন্ধের পর খামারিরা যে সাফল্য দেখিয়েছেন, পেঁয়াজেও তা সম্ভব। তাঁর দেওয়া সরকারি হিসাবে দেশে ২৩ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, কিন্তু ঘরে তোলার সময় প্রায় পাঁচ লাখ টন নষ্ট হয় এবং বাজারে থাকে ১৯ লাখ টন; বিদেশ থেকে আসে ১১ লাখ টন, অথচ বছরে প্রয়োজন ৩০ লাখ মেট্রিক টন।
সচিব জানান, কৃষকেরা তখন উৎপাদিত পেঁয়াজের জন্য কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা পেতেন; ভারত থেকে পেঁয়াজ না এলে তাঁরা পেতেন ৩০ থেকে ৩২ টাকা। তিনি বলেন, "কৃষক যখন উৎপাদন করে তখন বিদেশ থেকে আমদানি করলে দাম অনেক নেমে যায়।" তাই কৃষকেরা ফসল বাজারে আনার সময় আপাতত ভারত থেকে আমদানি বন্ধ রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। তাঁর ধারণা, আমদানি না এলে দেশি পেঁয়াজের দাম হয়তো কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা থাকবে, "কিন্তু কখনো আড়াইশ টাকায় উঠবে না।"
উৎপাদন বাড়ানোর পথে বাধাও আছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুদ্দিন বিবিসি বাংলাকে জানান, পেঁয়াজের জমি অন্য ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকে, উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলোর মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিচু জমিতে ফলন ভালো হয়, আর দেশে পেঁয়াজ রাখার উপযোগী হিমাগারের অভাব রয়েছে। পেঁয়াজ সংরক্ষণে দরকার ৬০ শতাংশ আর্দ্রতা ও ৮ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, যা আলুর হিমাগার থেকে আলাদা।

ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা (২৯ নভেম্বর ও ১৬ নভেম্বর ২০১৯), আল জাজিরা (২ অক্টোবর ২০১৯), বেনারনিউজ (২১ এপ্রিল ২০১৫)





মন্তব্য
(০)