ঢাকার রামপুরায় তিন সন্তান নিয়ে থাকেন গৃহকর্মী খালেদা বেগম ও নিরাপত্তাকর্মী আলফাজ। দুজনের মাসিক আয় মিলিয়ে ১৯ হাজার ৫০০ টাকা। সেপ্টেম্বর থেকে বাসাভাড়া সাত হাজার থেকে বেড়ে আট হাজার টাকা হয়েছে, দুই সন্তানের পড়াশোনায় মাসে যায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার, আর হাঁপানিতে ভোগা আলফাজের ওষুধে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। বাকি টাকায় পাঁচজনের খাবার জোটে মূলত আলু, পেঁপে আর ডালে।
খালেদা বেগম ঢাকা পোস্টকে জানান, গত কোরবানির ঈদের পর আর মাংস কেনা হয়নি, আর মাছের দাম এত চড়া যে কিনতে গেলে চাল কেনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। 'বেশির ভাগ সময় আলু আর পেঁপের সঙ্গে একটু ডাল দিয়ে আমাদের সংসারের খাবার চলে,' বলেন তিনি। মাসের শেষ সপ্তাহে প্রতি বেলায় ভাতের সঙ্গে থাকে আলু বা পেঁপের ভর্তা। আগে টিসিবির একটি কার্ড থাকলেও গত ছয় মাস ধরে সেটি বন্ধ; এভাবে চললে দুই সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৮.৩৪ শতাংশ; খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.০২ থেকে বেড়ে ৭.২২ শতাংশ। অথচ জাতীয় মজুরি হার সূচক বেড়েছে ৭.৯০ শতাংশ, যা সাধারণ মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর, ব্যবসায়ীদের মতে, পরিবহন খরচ আর ধানের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারেও।
গত সপ্তাহে বার্লিনে প্রকাশিত ২০২৬ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৮৪তম, ক্ষুধার মাত্রা 'মাঝারি'। ২০১৮ সালের ২০ স্কোর থেকে আট বছরে কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮ পয়েন্ট, দাঁড়িয়েছে ১৯.২-এ; অথচ ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে স্কোর কমেছিল ৪২ শতাংশের বেশি। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের হার ২০১৮ সালের ৮.৪ থেকে বেড়ে ১২.৯ শতাংশ হয়েছে, যা ২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ; তবে খর্বকায়তা কিছুটা কমে ২৪ শতাংশ, আর সার্বিক অপুষ্টির হার ১২.১ থেকে কমে ৮.২ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২২ সালের 'নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক পারিবারিক নির্দেশিকা' অনুযায়ী, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাবার পায় না, প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী অপর্যাপ্ত খাবার খান, আর প্রায় ৫০ শতাংশ গর্ভবতী নারী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। নির্দেশিকায় একজন প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক খাবারে ২৭০ থেকে ৪২০ গ্রাম চাল বা গম, ৭৫ থেকে ১০০ গ্রাম কন্দ বা কলা, এক থেকে চার টুকরো মাছ বা মাংস, এক থেকে দুই কাপ ডাল, অন্তত এক কাপ দুধ, দুটি মৌসুমি ফল, ১০০ গ্রাম সবজি বা ২০০ গ্রাম শাক এবং অন্তত একটি ডিম রাখার পরামর্শ আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, সরকারি সহায়তা বাড়াতে গেলে ঋণ নিতে বা কর বাড়াতে হয়, আর হঠাৎ মানুষের হাতে বাড়তি টাকা দিলে নতুন মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি হতে পারে; পরিস্থিতির সঙ্গে বৈশ্বিক সংকটও জড়িত। তাঁর পরামর্শ, ফাস্টফুড, চিপস ও চকলেটের মতো অপ্রয়োজনীয় খাবারে খরচ কমিয়ে কম দামে পুষ্টিকর দেশি খাবারের অভ্যাস গড়া, আর প্রশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপচয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
প্রতিবেদন: মাহতাব লিমন, ঢাকা পোস্ট।
ছবি: বাংলাদেশের একটি বাজারে আলু, NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: ঢাকা পোস্ট





মন্তব্য
(০)