সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩০°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬৮%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

চুয়াডাঙ্গায় পাট কাটা শুরু: বৃষ্টিতে ফলন কম, তবে দাম গত বছরের চেয়ে বেশি

২০২৫ সালের আগস্টে চুয়াডাঙ্গায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি, ৮ হাজার ৯৯৫ হেক্টর জমির পাট কাটা শুরু হয়। কাটার আগে টানা বৃষ্টিতে গাছ হেলে পড়ায় ফলন কমেছে, তবে প্রতি মণ পাট বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪ হাজার টাকায়, যা আগের বছরের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি।

চুয়াডাঙ্গায় পাট কাটা শুরু: বৃষ্টিতে ফলন কম, তবে দাম গত বছরের চেয়ে বেশি
এগ্রোবিজ

২০২৫ সালের আগস্টের শেষ দিকে খুলনা বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গার কৃষকেরা মাঠে পাট কাটায় ব্যস্ত ছিলেন। জাগো নিউজ ২৪ সেই বছরের ২৪ আগস্ট জানায়, অতিবৃষ্টির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ায় চাষিরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তবে বাজারে পাটের দাম আগের বছরের চেয়ে বেশি থাকায় জেলার কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশার আলো দেখছিলেন।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সে বছর জেলায় ৮ হাজার ৯৯৫ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়েছিল, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ২৩৫ হেক্টর বেশি। কিন্তু কাটার ঠিক আগমুহূর্তে টানা বৃষ্টিতে পাটগাছ হেলে মাটিতে পড়ে যায়, ফলে ফলন কিছুটা কম হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

কাটার আগে বৃষ্টি, বিঘাপ্রতি খরচ


প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনের খরচ দাঁড়ায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। সাধারণত এক বিঘায় ৮ থেকে ১২ মণ পাট পাওয়া যায়। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বাজারে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছিল প্রায় ৪ হাজার টাকায়, যা আগের বছরের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি। আঁশ ছাড়ানোর পর যে কাঠের মতো কাণ্ড থেকে যায়, সেই পাটকাঠির দামও বেড়েছিল।

চাষিরা বলছিলেন, বাড়তি দাম ছোট ফলনের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করছে না। বেলগাছি গ্রামের কৃষক হাসমত আলী বলেন, ‘পাটের দাম ভালো হলেও ফলন কম হওয়ায় খরচ পোষাতে কষ্ট হচ্ছে। কৃষি উপকরণের দামও বেশি হওয়ায় দুশ্চিন্তা বেড়েছে।’

আসাদুল হক নামের আরেক চাষি বলেন, ‘এক বিঘায় প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু ফলন আগের মতো হচ্ছে না। দাম বেশি হলেও লোকসান কাটানো কঠিন।’

বিঘা ও মণ গ্রামের কেনাবেচায় এখনো চালু প্রচলিত একক। বাংলাদেশে এক বিঘা সমান ২০ কাঠা বা ১৪ হাজার ৪০০ বর্গফুট; ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলায় এককটি এভাবে নির্দিষ্ট করা হয়। ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট ফরিদপুরের পাটের দাম নিয়ে প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার এক মণ ধরেছে ৪০ কেজি। অন্যদিকে দেশের মোট পাট উৎপাদন গোনা হয় বেলে; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে এক বেল ১৮০ কেজি।

মাথাভাঙ্গা, ভৈরব আর বিলের পাড়ে পাট শুকানো


প্রতিবেদনের সময় চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা নদী, দামুড়হুদার রাইসার বিল, পদ্ম বিল, দলকালক্ষ্মীপুরের বিল, আলমডাঙ্গার তাসসারের বিল, জীবননগরের ভৈরব নদসহ বিভিন্ন খাল-বিলের পাশে চাষিরা পাট শুকাচ্ছিলেন। রাস্তার দুই পাশে বাঁশের আড়ায় ঝুলছিল পাটকাঠি, কোথাও কৃষকেরা আঁটি বেঁধে শুকাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন।

পর্যাপ্ত বৃষ্টিতে ডোবা, পুকুর, খাল ও বিল ভরে ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেই পানিতে জাগ দেওয়া পাটের রং ভালো হয়েছে, পাটকাঠির মানও উন্নত হয়েছে।

মাথাভাঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। পদ্মা থেকে বেরিয়ে এটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে হাটবোয়ালিয়া গ্রাম পর্যন্ত এসে দুই ভাগ হয়। একটি শাখা কুমার নামে আলমডাঙ্গার পাশ দিয়ে এগিয়ে যায়; অন্য শাখা আঁকাবাঁকা পথে দক্ষিণে চুয়াডাঙ্গা পেরিয়ে ভারতের কৃষ্ণগঞ্জে পৌঁছায়, সেখানে আবার ভাগ হয়ে চূর্ণী ও ইছামতী নামে বয়ে চলে। বৃষ্টির মিষ্টি পানি সুন্দরবনের দিকে বয়ে নেওয়ায় মাথাভাঙ্গাকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদী ধরা হয়। চুয়াডাঙ্গা শহর এই নদীর তীরে।

প্রতিবেদনে জীবননগরের যে ভৈরব নদের কথা আছে, বাংলাপিডিয়া তাকে মৃতপ্রায় বদ্বীপ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী বলেছে। নামের অর্থ ‘ভয়ংকর’, যা মনে করিয়ে দেয় একসময় গঙ্গার মূল প্রবাহ বহন করার দিনে নদীটি কত বড় ছিল। এখন বর্ষায় গঙ্গার পানি এতে আসে, কিন্তু শুকনো মৌসুমে এটি শুকিয়ে যায়। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫০ কিলোমিটার; মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও খুলনা এর তীরের উল্লেখযোগ্য জায়গা।

বাংলাপিডিয়ার তালিকায় চুয়াডাঙ্গার প্রধান নদী মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, চিত্রা, নবগঙ্গা ও কুমার। উল্লেখযোগ্য বিলের মধ্যে আছে ভান্ডারদহ, উজলপুর, মহেশ্বরী, নেহালপুর ও জাজরি; নুরুল্লাহপুর, বেগমপুর ও চাঁদপুর বাঁওড়ও উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে এ ধরনের নদী, বিল ও খালেই কৃষকদের পাট জাগ দেওয়া ও শুকানোর ছবি উঠে আসে।

চুয়াডাঙ্গা শহরে মাথাভাঙ্গা নদীর ওপর সেতু, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তোলা। ছবি: Fardin Ahmed Shovon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চুয়াডাঙ্গা শহরে মাথাভাঙ্গা নদীর ওপর সেতু, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তোলা। ছবি: Fardin Ahmed Shovon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যা বলেছিল


চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার আবাদ বেশি হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় অর্ধেক পাট কাটা শেষ হয়েছে। জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি আছে। দাম ভালো থাকায় কৃষকেরা লাভবান হবেন। পাট চাষ বাড়াতে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

মূল প্রশ্নে কর্মকর্তা ও কৃষকদের মত আলাদা ছিল: কর্মকর্তারা আশা করছিলেন বাড়তি দামে চাষিরা লাভবান হবেন, আর উদ্ধৃত দুই কৃষক বলছিলেন, কম ফলন ও উপকরণের চড়া দামে লোকসান এড়ানো কঠিন।

সীমান্তের কৃষিনির্ভর জেলা চুয়াডাঙ্গা


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী চুয়াডাঙ্গার আয়তন ১ হাজার ১৭৪ দশমিক ১০ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর, দক্ষিণ ও পূর্বে ঝিনাইদহ, পশ্চিমে মেহেরপুর জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। জেলার চারটি উপজেলা: আলমডাঙ্গা (৩৬৪ দশমিক ৬৬ বর্গকিলোমিটার), চুয়াডাঙ্গা সদর (২৯৮ দশমিক ২৭), দামুড়হুদা (৩১১ দশমিক ৯১) ও জীবননগর (১৯৯ দশমিক ২৪)। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১১ লাখ ২৯ হাজার ১৫।

দেশভাগের আগে চুয়াডাঙ্গা ছিল নদীয়া জেলার একটি মহকুমা। ১৯৪৭ সালে কৃষ্ণগঞ্জ থানা বাদে পুরো মহকুমা কুষ্টিয়া জেলায় যুক্ত হয়, আর ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গা আলাদা জেলা হয়। কৃষিই প্রধান জীবিকা: বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ৬৫ দশমিক ১৪ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, এরপর ব্যবসা ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ।

অর্থকরী ফসলের সঙ্গে জেলার ইতিহাস পুরোনো। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৮৫৯-৬০ সালের নীল বিদ্রোহে চুয়াডাঙ্গার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন, আর জেলার ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় আছে ঘোলদাড়ি ও কার্পাসডাঙ্গার নীলকুঠি। নিচের প্রতিবেদনগুলো দেখায়, পাট জেলার চারটি উপজেলাতেই চাষ হয়।

চুয়াডাঙ্গায় পাটের আবাদ কীভাবে বদলেছে


আগের প্রতিবেদন বলছে, একসময় জেলায় এর চেয়ে অনেক বেশি জমিতে পাট হতো। ২০১৪ সালের ২৫ মে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানায়, চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সে মৌসুমে ২০ হাজার ৪৪০ হেক্টরে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে: চুয়াডাঙ্গা সদরে ৩ হাজার ২০০ হেক্টর, আলমডাঙ্গায় ৮ হাজার, দামুড়হুদায় ৭ হাজার ২৪০ এবং জীবননগরে ২ হাজার হেক্টর। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ৭৩ হাজার ৫৮০ টন পাট উৎপাদনের আশা করেছিলেন ডিএই কর্মকর্তারা।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাগো নিউজ জেলা থেকে জানায়, সে বছর ২০ হাজার ৫২৭ হেক্টরে পাট চাষ হয়েছে; হেক্টরপ্রতি উৎপাদনের লক্ষ্য ৩ দশমিক ৬ টন, সম্ভাব্য উৎপাদন ৭৩ হাজার ৮৯৭ টন। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি কম হওয়ায় জাগ দিতে সমস্যা হলেও পরে বৃষ্টিতে তা কেটে যায়। চাষিরা তখন বিঘাপ্রতি খরচ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আর ফলন ১০ থেকে ১২ মণ বলেছিলেন; নতুন পাট বিক্রি হচ্ছিল মণপ্রতি ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে পাট কাটার মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়; পরে দাম ৩ হাজার ৫০০ টাকায় ওঠে এবং মৌসুমের শেষ দিকে হাটে মণপ্রতি ৫ হাজার টাকায় পৌঁছায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২০ সালে প্রতি মণের গড় দাম ছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা।

এই হিসাবের পাশে রাখলে ২০২৫ সালের মৌসুমে জমির পরিমাণ কম, তবে তা নিজের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে; আর বিঘাপ্রতি খরচ ও মণপ্রতি দাম, দুটিই চার বছর আগে জেলার কৃষকদের দেওয়া হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

২০২৫ সালের আগস্টে দেশের পাট মৌসুম


দুর্বল ফলন আর চড়া দামের এই মিশ্র চিত্র সে মাসে সারা দেশেই দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টার ফরিদপুর থেকে জানায়, সেখানে কাঁচা পাট বিক্রি হচ্ছিল মণপ্রতি ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়, আগের বছর যা ছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। পাবনার ব্যবসায়ীরা বি-গ্রেড পাটের দাম জানান মণপ্রতি ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকা, আগে যা ছিল ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা।

সেখানেও ফলন মার খেয়েছিল। ফরিদপুরের কৃষকেরা পত্রিকাটিকে বলেন, ভারী বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে থাকা এবং গাছে আগাম ফুল আসায় বিঘাপ্রতি ফলন ৭ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত কমেছে। ফরিদপুর জেলা পাটচাষি সমিতির সভাপতির হিসাবে সেখানে এক বিঘায় পাট চাষে খরচ ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা, যা চুয়াডাঙ্গার জন্য দেওয়া হিসাবের চেয়ে বেশি।

পত্রিকাটি বিবিএসের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, আবাদ কমা ও ফলন কম হওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের পাট উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে ৬ শতাংশ কমে ৮৯ দশমিক ৫ লাখ বেলে দাঁড়িয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে বলা হয়, সারা দেশে ৭ লাখ ৫ হাজার হেক্টরে পাট চাষ হয়েছে, উৎপাদনের লক্ষ্য ৮৩ দশমিক ৩ লাখ বেল। প্রধান পাট উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে নাম আসে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও বগুড়ার; এর মধ্যে কুষ্টিয়া চুয়াডাঙ্গার উত্তরের প্রতিবেশী জেলা।

একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাট চাষে উৎসাহ দিতে সরকার কৃষকদের প্রণোদনা হিসেবে ১ কেজি বীজ ও ১৪ কেজি সার দিয়েছে, আর শুধু ফরিদপুরেই ১৪ হাজার ৫০০ কৃষক এই সহায়তা পেয়েছেন।

দাম সব সময় কৃষকের পক্ষে যায়নি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, রংপুর অঞ্চলের চাষিরা তখন মণপ্রতি ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকায় পাট বিক্রি করছিলেন, আগের বছর যা ছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা; অথচ বিঘাপ্রতি খরচ বেড়ে হয়েছিল ১৩ থেকে ১৬ হাজার টাকা। সে বছর রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় পাট চাষ হয়েছিল ৫১ হাজার ৬২৭ হেক্টরে, আগের বছর যা ছিল ৫৬ হাজার ৪১২ হেক্টর। ২০২৪ সালের নভেম্বরে একই পত্রিকা জানায়, রংপুর অঞ্চলের বেশির ভাগ কৃষক মণপ্রতি ২ হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টাকায় পাট বিক্রি করে দিয়েছিলেন; সরকার পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণার পর চাহিদা বাড়লে দাম ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় ওঠে, কিন্তু তখন মজুত ছিল মূলত ব্যবসায়ীদের হাতে।

সোনালি আঁশ পাট


পাট কর্কোরাস (Corchorus) গণের আঁশ উৎপাদনকারী উদ্ভিদ। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হওয়ায় একসময় একে বাংলাদেশের সোনালি আঁশ বলা হতো। বাংলাপিডিয়া জানায়, আঁশ আসে মূলত দুটি প্রজাতি থেকে: সাদা বা দেশি পাট (Corchorus capsularis), যার উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ চীনসহ ইন্দো-বার্মা অঞ্চল বলে ধরা হয়, এবং তোষা পাট (Corchorus olitorius), যার উৎপত্তি আফ্রিকায়। বিশ্বের পাট রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অংশ ১৯৪৭-৪৮ সালে ছিল ৮০ শতাংশ, কিন্তু অন্য দেশে পাট ও সমজাতীয় আঁশের চাষ এবং কৃত্রিম বিকল্প আসায় ১৯৭৫-৭৬ সালে তা নেমে আসে ২৫ শতাংশে।

পাটের দরকার উষ্ণ ও ভেজা মৌসুম। বছরে ১ হাজার ৫০০ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টি, যার মধ্যে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের প্রতিটিতে অন্তত ২৫০ মিলিমিটার, এবং ১৮ থেকে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পাট ভালো হয়। বাংলাদেশে প্রজাতিভেদে সাধারণত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত বীজ বোনা হয়। দেশি পাট জলাবদ্ধতা বেশি সহ্য করে, তাই নিচু জমিতেও হয়; তোষা পাট জলাবদ্ধতায় বেশি স্পর্শকাতর, তাই মাঝারি থেকে মাঝারি-নিচু জমিতে চাষ হয়। এঁটেল থেকে বেলে দোআঁশ পর্যন্ত, ৫ দশমিক ০ থেকে ৮ দশমিক ৬ পিএইচের মাটিতে পাট জন্মে।

বোনার চার থেকে পাঁচ মাস পর ফুল আসার পর্যায়ে পাট কাটা হয়; আঁশ আসে কাণ্ডের বাকল বা ফ্লোয়েম স্তর থেকে। পাট চাষ শ্রমনির্ভর, আর এর বেশির ভাগ চাষি প্রান্তিক, দরিদ্র ও ক্ষুদ্র জমির মালিক। ছিটিয়ে বুনলে হেক্টরে ১০ থেকে ১২ কেজি বীজ লাগে, সারিতে বুনলে কম লাগে। প্রাচীনকালে বাংলায় পাট ছিল অনেকটা বাগানের গাছ, আর এর পাতা খাওয়া হতো শাক হিসেবে।

দুই ডজনের বেশি পোকা ও মাকড় পাটের ক্ষতি করে। বাংলাপিডিয়া বিছা পোকাকে (Spilosoma obliqua) সবচেয়ে ক্ষতিকর এবং ঘোড়া পোকাকে (Anomis sabulifera) আরেকটি মারাত্মক পোকা বলেছে; বিশেষ পরিস্থিতিতে শুধু পোকার কারণেই উৎপাদন ১২ শতাংশ বা তার বেশি কমতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোগ কাণ্ড পচা, যা Macrophomina phaseolina ছত্রাকে হয় এবং গাছের যেকোনো পর্যায়ে আক্রমণ করতে পারে। পোকা বা রোগ দমনের ব্যবস্থা বেছে নিতে কৃষকেরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।

জাগ দেওয়া: আঁশের রং কেন পানির ওপর নির্ভর করে


কাটার পর গাছ আঁটি বেঁধে পাঁচ থেকে সাত দিন জমিতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, যাতে পাতা ঝরে যায়। এরপর আঁটিগুলো পানিতে ডোবানো হয়। জাগের জন্য পরিষ্কার, ধীরে বয়ে চলা পানি সবচেয়ে ভালো। ১২ থেকে ১৫ দিনে জাগ সম্পূর্ণ হলে হাতে কাঠি থেকে আঁশ ছাড়ানো হয়, ধুয়ে রোদে শুকানো হয়, তারপর কৃষকেরা তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এ কারণেই চুয়াডাঙ্গার প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ভরা বিল-পুকুরের সঙ্গে আঁশের ভালো রঙের সম্পর্ক টানা হয়েছিল।

জাগের পানি সব সময় মেলে না। কৃষকদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ২০১৫ সালে সিআইজিআর জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের কিছু এলাকায় জাগের পানির অভাবকে এই ফসলের অন্যতম প্রধান সমস্যা বলা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বেশির ভাগ কৃষক এখনো পুকুর ও খালে জাগ দেওয়ার প্রচলিত, সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা আঁশের মান ও মাছ চাষের ক্ষতি করতে পারে এবং গাছের অংশ পচে পানি দূষিত করে। গবেষকদের মতে, শুধু ছাড়ানো বাকল জাগ দেওয়ার স্বল্প খরচের রিবন রেটিং পদ্ধতি কৃষককে উন্নত মানের আঁশ পেতে সাহায্য করতে পারে।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলা ট্রিবিউন জানায়, পানিস্বল্প এলাকায় পাটের রিবনিং করতে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) ‘অটো-জুট পাওয়ার রিবনার’ উদ্ভাবন করেছে এবং এ নিয়ে কৃষক পর্যায়ে প্রশিক্ষণও দিয়েছে। অল্প সময়ে পাট কাটার জন্য প্রতিষ্ঠানটি ‘বিজেআরআই মাল্টিফাংশন জুট হার্ভেস্টার’ও উদ্ভাবন করেছে।

বাংলাদেশে পাট চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ২০০৭ সালের আগস্টে তোলা। ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
বাংলাদেশে পাট চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ২০০৭ সালের আগস্টে তোলা। ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

পাটকাঠি এবং ফসলটির পেছনের গবেষণা


চুয়াডাঙ্গার প্রতিবেদনে পাটকাঠির দাম বাড়ার যে কথা আছে, তার পেছনে কাঠির নতুন ব্যবহারও আছে। ২০২১ সালের বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে পাটকাঠি খেতখামারে ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো; এখন এ দিয়ে তৈরি হয় উচ্চমূল্যের অ্যাকটিভেটেড চারকোল, যা বিদেশে রপ্তানি হয়।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিজেআরআই পাট ও পাট জাতীয় আঁশ ফসলের মোট ৫০টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে, আর তখন চাষের জন্য সুপারিশ করা হচ্ছিল ২২টি উন্নত জাত: ৯টি দেশি, ৮টি তোষা, ৩টি কেনাফ ও ২টি মেস্তা। পাট বীজের অভাব দূর করতে প্রতিষ্ঠানটি ‘নাবী পাট বীজ উৎপাদন’ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে; সাধারণত বীজ উৎপাদনে ৮ থেকে ৯ মাস লাগলেও এ পদ্ধতিতে ৪ থেকে ৫ মাসে দ্বিগুণের বেশি, হেক্টরপ্রতি প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি ফলন পাওয়া যায়। বিজেআরআই আরও জানায়, জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে দেশি ও তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচিত হয়েছে।

ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বিজেআরআই দেশের সবচেয়ে পুরোনো একক-ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বাংলাপিডিয়া এর সূচনা খুঁজে পায় কৃষি বিভাগের অধীনে সৃষ্ট আঁশ বিশেষজ্ঞের পদে, যে দায়িত্ব ১৯০৪ সালে স্যার আর এস ফিনলো গ্রহণ করেন, এবং ১৯৩৬ সালে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির ঢাকা ফার্মে স্থাপিত জুট অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে। ১৯৪৭ সালের পর গবেষণাগারটি পুনর্গঠিত হয়ে ১৯৫১ সালে বর্তমান স্থানে জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউট হয়। পাট ও সমজাতীয় আঁশ নিয়ে গবেষণা, উন্নত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, এবং নতুন জাতের প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ এর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

বাংলাদেশের রংপুর জেলায় গ্রামের পথের পাশে রোদে শুকাতে দেওয়া পাটকাঠি, ২০১৭ সালের আগস্টে তোলা। ছবি: sadot arefin / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
বাংলাদেশের রংপুর জেলায় গ্রামের পথের পাশে রোদে শুকাতে দেওয়া পাটকাঠি, ২০১৭ সালের আগস্টে তোলা। ছবি: sadot arefin / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

ছবি: Auyon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, বাসস (দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের মাধ্যমে), বাংলা ট্রিবিউন, সিআইজিআর জার্নাল, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোবিজ

সম্পর্কিত খবর

শাকসবজি

উল্লাপাড়ায় আগাম খিরা উঠতে শুরু, আড়তে মণ ১,২০০ থেকে ১,২৫০ টাকা

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ৩৬০ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ২২৫ হেক্টরে খিরা বোনা হয়েছে; চরবদ্ধনগাছা ও চাকশা আড়তে আগাম খিরা চড়া দামে বিকোচ্ছে।

কৃষি সময়১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফসল

ইটনার হাওরে ডিলারের সার মিলছে না, বস্তায় ২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনছেন কৃষক

বোরোর জমি তৈরির সময়ে কিশোরগঞ্জের ইটনায় ১০৮ বস্তা বিএডিসির ডিএপি সারসহ একটি নৌকা আটক করেছে নৌ পুলিশ; কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের বরাদ্দ এলাকায় না আসায় চোরাই সার কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে।

সমকাল১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

জয়পুরহাট ও বগুড়ায় কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা, আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা

উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানির জন্য জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল ও বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার কথা ভাবছে কৃষি মন্ত্রণালয়; পঞ্চগড়ের ২১৭.৭৮ একর খাসজমিও যাচাই হবে।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)