ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) চার গবেষক ইলিশ মাছের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য বা জিনোম উন্মোচনের কথা জানিয়েছিলেন। বিবিসি বাংলা ২০১৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এ খবর প্রকাশ করে। গবেষকরা ২০১৫ সাল থেকে এই জিনোম গবেষণা চালাচ্ছিলেন। তাদের আশা ছিল, এই সাফল্য ইলিশের সংরক্ষণ, উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে এবং ভোক্তার কাছে ইলিশ আরও সহজলভ্য করবে।
এর এক বছর আগে, ২০১৭ সালের আগস্টে, ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। মৎস্য অধিদপ্তরের আবেদনে পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) নিবন্ধন সম্পন্ন করে; জামদানির পর ইলিশ ছিল দেশের দ্বিতীয় জিআই পণ্য।
গবেষণা দল ও তাদের কাজ
'ইলিশ জিনোম সিকোয়েন্সিং অ্যান্ড অ্যাসেম্বলি' নামের এই গবেষণা দলের সমন্বয়ক ছিলেন বাকৃবির ফিশারিজ বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম। দলের অন্য তিন সদস্য ছিলেন পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্লা, বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম এবং ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গোলাম কাদের।
গবেষকরা বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা নদী থেকে পূর্ণবয়স্ক ইলিশ সংগ্রহ করে প্রায় দুই বছর গবেষণা চালান। পরে ফলাফল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। অধ্যাপক বজলুর রহমান জানান, ফলাফলকে আরও সমৃদ্ধ করতে তখনও গবেষণা চলছিল। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; এর ক্যাম্পাস ময়মনসিংহ শহরের কাছে।

জিনোম কী, ইলিশের ক্ষেত্রে কেন জরুরি
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সংজ্ঞায়, জিনোম হলো কোষে থাকা ডিএনএ-র নির্দেশনার পূর্ণ সংকলন। অধ্যাপক সামছুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "জিনোম হচ্ছে কোনও জীবের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। জীবের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াসহ জৈবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় জিনোমের মাধ্যমে।"
তিনি আরও বলেন, "ইলিশ সারা বছর সাগরে থাকে। শুধুমাত্র ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে। আর এই পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স থেকেই জানা যাবে এরা কখন, কোথায় ডিম দেবে।" তার মতে, বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশের মজুত কত এবং কোন এলাকায় এর বিস্তৃতি কতটা, তাও এ থেকে জানা যাবে।
মাছের তথ্যভান্ডার ফিশবেসের বর্ণনায় ইলিশ (Tenualosa ilisha) একটি অ্যানাড্রোমাস মাছ, অর্থাৎ সাগর থেকে নদীতে উঠে ডিম ছাড়ে। এটি উপকূলের সাগরে ঝাঁক বেঁধে থাকে, প্রজননের জন্য প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সময় নদীতে আসে এবং মূলত পানি ছেঁকে প্ল্যাংকটন খায়।

উৎপাদন বাড়ানোর আশা
বিবিসি বাংলা বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে, আর পৃথিবীর মোট ইলিশের প্রায় ৬০ ভাগ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। গবেষকদের মতে, এই চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বাড়াতে হবে, আর সেজন্য ইলিশের জন্ম, বৃদ্ধি ও প্রজনন সম্পর্কে জানা জরুরি।
গবেষণা দলের সদস্য ড. মো. বজলুর রহমান মোল্লা গবেষণার তিনটি গুরুত্বের কথা বলেন: "প্রথমত ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্স জানার মাধ্যমে ইলিশের টেকসই আহরণ নিশ্চিত করা যাবে।" "এছাড়া ইলিশের জন্য দেশের কোথায় কোথায় ও কতটি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা বা তুলে নেয়া প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা যাবে।" "সেইসঙ্গে অন্য দেশের ইলিশ থেকে আমাদের ইলিশ বৈশিষ্ট্যগতভাবে স্বতন্ত্র কিনা তাও নিশ্চিত হওয়া যাবে।"
গবেষণাটি বাস্তবে প্রয়োগ হলে বাজারে আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে এবং বেশি সময় ধরে ইলিশ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হয়েছিল। ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা, দুই সন্তানের মা জাহানারা বেগম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ইলিশ সব মৌসুমে পাওয়া যায়না। পাওয়া গেলেও দাম এতো বেশি থাকে যে সব সময় চাইলেই কিনতে পারিনা।"

এর আগেও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা জিনোম গবেষণায় সাফল্য দেখিয়েছিলেন। বিবিসি বাংলা মনে করিয়ে দেয়, এর আট বছর আগে তারা পাটের দুটি জাতের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন; গমের ক্ষতিকর ব্লাস্ট রোগের জন্য দায়ী ছত্রাকের জীবনরহস্যও উন্মোচন করেন এ দেশের বিজ্ঞানীরা।
ছবি: Mamun2a / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.5)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো (ইংরেজি সংস্করণ), ফিশবেস, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এনএইচজিআরআই), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)