বাংলাদেশে মাছ চাষের কিছু খামারে মুরগির বিষ্ঠা খাদ্য হিসেবে এবং খাদ্য কোম্পানির পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিকসহ নানা রাসায়নিক ব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছিল বিবিসি বাংলার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের জন্য ঢাকার মিরপুরের একটি মাছের বাজার এবং ময়মনসিংহের ত্রিশালের কয়েকটি খামার ঘুরে দেখা হয়। গবেষকেরা এভাবে উৎপাদিত মাছের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন, আর মৎস্য অধিদপ্তর তাদের তদারকির কথা জানিয়েছিল।
বাজারে ক্রেতাদের সংশয়
মিরপুরের বাজারে রুই, কাতলা, মৃগেল, কই, পাঙাশসহ নদীর ও চাষের নানা আকারের মাছ নিয়ে বসেছিলেন বিক্রেতারা। একজন নিয়মিত ক্রেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, তিনি নদীর মাছ ছাড়া কেনেন না, কারণ চাষের মাছে নদীর মাছের স্বাদ পান না। আবার চাষের মাছ কেনেন এমন ক্রেতারও অভাব ছিল না, বড় কারণ দাম কম। একজন নারী ক্রেতা জানান, নদীর রুই বা কাতলার অর্ধেক দামে চাষের মাছ পাওয়া যায়, তবে মাছটি কোথায়, কীভাবে চাষ হচ্ছে এবং কী খাওয়ানো হচ্ছে, তা নিয়ে তাঁর মনে সন্দেহ থাকে।

ত্রিশালের খামারে মুরগির বিষ্ঠা
মাছ চাষের জন্য পরিচিত ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলা থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাছ ঢাকায় যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রিশালের পোড়াবাড়ি এলাকায় মাছের খামারের পাশেই মুরগির খামার গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে কর্মচারীরা মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য আবর্জনা ধুয়ে নালায় ফেলছিলেন, যা নালা দিয়ে মাছের খামারে গিয়ে মাছের খাদ্য হিসেবে কাজ করে। খামারের একজন কর্মচারী জানান, সাত বছর ধরে তাঁরা এভাবে খাদ্য দিচ্ছেন এবং এতে খাদ্যের খরচ অনেক কমে; এ পদ্ধতি যে নিষিদ্ধ, তা তাঁরা জানতেন না। ত্রিশালে অন্তত আরও তিনটি খামারে একই চিত্র দেখা যায়।
মৎস্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক গোলজার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, মুরগি পালনে নানা রকম অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়, যা বিষ্ঠার মাধ্যমে মাছের শরীরে প্রবেশ করে এবং পরে মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে গিয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতি ঘটাতে পারে। তাঁর ভাষায়, এ কারণেই কয়েক বছর আগে সরকার মাছের খাদ্য হিসেবে মুরগির বিষ্ঠা নিষিদ্ধ করেছে। এরপরও কেন এ চর্চা চলছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "অনেকে এখনো গোপনে এটা করছে। আমরা জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।"

ওষুধের মাত্রা ঠিক করে কে
অন্য কয়েকটি খামারে দেখা যায়, ভুট্টা, খৈল, হাড়ের গুঁড়া, ধানের কুঁড়া ও শুঁটকির মিশ্রণে তৈরি কোম্পানির ফিশ ফিড দেওয়া হচ্ছে। মাছের রোগবালাই সারাতে খামারিরা বিভিন্ন ওষুধও ব্যবহার করেন, যার মধ্যে সিপ্রোফ্লক্সাসিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিকও আছে। খামারিরা সবসময় এসব ওষুধ দেন না, তবে যখন দেন, অনেক সময় নিজেদের ইচ্ছেমতো বা ফিড কোম্পানির প্রতিনিধিদের পরামর্শে দেন। খামারমালিক মোস্তাফিজ রাজু বলেন, কোম্পানির লোকেরা এসে কীভাবে কতটুকু ব্যবহার করতে হবে তা বলে দেন; তাঁর অভিযোগ, তাঁর এলাকায় মৎস্য অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা পরামর্শ দিতে আসেন না, আর তিনিও অধিদপ্তরে পরামর্শের জন্য যান না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওয়াহিদা হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, দেশে মাছের যেসব ওষুধ আসে তা মূলত বিদেশ থেকে আসে, আর কোন মাত্রায় ব্যবহার হবে তার নির্ধারিত মানদণ্ড সেভাবে ঠিক করা নেই। তাঁর মতে, চাষিরা কখনো দ্রুত বৃদ্ধির জন্য বা চিকিৎসার জন্য হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক দেন; মাত্রায় হেরফের হলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে, তাই সরকারি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও নজরদারি থাকা উচিত।
জবাবে মহাপরিচালক গোলজার হোসেন বলেন, অধিদপ্তর মাছের খাদ্য প্রস্তুতকারকদের খাদ্য নিয়মিত পরীক্ষা করে এবং ক্ষতিকর কিছু পেলে বা প্রয়োজনীয় উপাদান না পেলে ব্যবস্থা নেয়। বিভিন্ন এলাকায় খামারিদের নিয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে খাবার ও ওষুধ কীভাবে, কোন পরিমাণে দিতে হবে তা জানানো হয়। তবে সব এলাকায় সবসময় নজরদারি সম্ভব হয় না বলে স্বীকার করেন তিনি, এবং এর জন্য জনবলের অভাবকে দায়ী করেন। মাছের রোগ বা ওষুধ নিয়ে খামারিরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।

আইন ও গবেষণা কী বলে
বাংলাদেশের মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০-এর ১৪(১) ধারায় বলা আছে, মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড ও কীটনাশকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না।
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক সাময়িকী অ্যাকুয়াকালচারে প্রকাশিত এক গবেষণায় (আলী, রিকো, মুর্শেদ-ই-জাহান ও বেল্টন) ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত নয় ধরনের খামারে জরিপ চালিয়ে ৪৬টি রাসায়নিক ও জৈব পণ্যের ব্যবহার পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৭টি অ্যান্টিবায়োটিক ও ৭টি কীটনাশক। জীবাণুনাশক ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি ছিল নিবিড় কই ও পাঙাশ খামারে। গবেষকেরা লিখেছিলেন, এশিয়ার অন্য মাছ উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এসব পণ্যের ব্যবহার তুলনামূলক কম, তবে ব্যবহৃত অনেক উপাদানের পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আরও নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যায়ন দরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালের নভেম্বরে খামারি ও খাদ্যশিল্পকে সুস্থ প্রাণীর বৃদ্ধি বাড়াতে ও রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধের সুপারিশ করে। সংস্থাটির ভাষায়, প্রাণী ও মানুষের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার ও অপব্যবহার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ক্রমবর্ধমান হুমকিতে ভূমিকা রাখছে।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০ (আইন ও বিচার বিভাগ, বাংলাদেশ সরকার), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, অ্যাকুয়াকালচার সাময়িকী (আলী ও সহকর্মী, ২০১৬)





মন্তব্য
(০)