সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা২৯°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭২%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

কেঁচো সার ও ভেষজ কীটনাশকে বিষমুক্ত সবজি চাষ উত্তরাঞ্চলে

বগুড়ার শাজাহানপুরের কামারপাড়াসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় কৃষকেরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বাদ দিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট ও নিমপাতাসহ ভেষজ নির্যাস ব্যবহার করে বিষমুক্ত সবজি চাষ করছেন বলে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জানা যায়।

কেঁচো সার ও ভেষজ কীটনাশকে বিষমুক্ত সবজি চাষ উত্তরাঞ্চলে
শাকসবজি

উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি চাষ করা হচ্ছে বলে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জানা যায়। বগুড়াসহ রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর ও পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন এলাকায় এমন সবজিক্ষেতের দেখা মিলেছে। কৃষকেরা একে বলছেন নতুন এক কৃষি উদ্যোগ। তাঁদের ভাষ্য, যে খাবার বিপদ ডেকে আনে তা তাঁরা উৎপাদন করবেন না; এ কারণেই বিষমুক্ত সবজি চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। এতে একদিকে তাঁদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে, অন্যদিকে বাজারে তাঁদের সবজির চাহিদাও বেড়েছে।

এ প্রতিবেদনটি জাগো নিউজ ২৪-এ ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি সরেজমিন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি। সেখানে কৃষকদের বক্তব্য, তাঁদের উৎপাদন পদ্ধতি এবং স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছিল। মূল প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে এখানে যুক্ত করা হয়েছে কেঁচো সার, ভেষজ কীটনাশক, বগুড়ার কৃষি এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে পাওয়া পটভূমি।

কামারপাড়ায় যা দেখা গেল


বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার চুপিনগর ইউনিয়নের কামারপাড়া ও জৈন্তপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দূরে সরিয়ে রেখে ভেষজ পদ্ধতি এবং ভার্মি কম্পোস্ট প্রয়োগ করে সবজি চাষ করছেন। জমি থেকে বাজার পর্যন্ত সর্বত্রই তাঁদের এ উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

১৮ ডিসেম্বর সকালে টমেটো ক্ষেতের পাশে বসে কাজ করছিলেন কৃষক আব্দুল মান্নান (৫৮)। জমিতে এক ধরনের জৈব সার ছিটিয়ে দিতে দিতে তিনি বলেন, 'আগে রাসায়নিক ব্যবহার করতাম। ফলন ভালো হলেও জমি শক্ত হয়ে মাটির প্রাণশক্তি হারিয়ে যেত। এখন কেঁচো সার আর ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করছি। মাটির উর্বরতা আবার ফিরে এসেছে। ফসলের গুণমানও বেড়েছে।' ক্ষেতের একপাশে গাছের ডালে ঝুলছিল নিমপাতা ও পিতরাজ দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক কীটনাশকের বোতল। মান্নানের ভাষ্য, এ নির্যাস জমিতে স্প্রে করলে পোকামাকড় দূরে থাকে, কিন্তু গাছের ক্ষতি হয় না।

গ্রামটির অবস্থান রাজশাহী বিভাগের বগুড়া জেলায়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ার আয়তন প্রায় ২ হাজার ৮৯৮ বর্গকিলোমিটার এবং জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে করতোয়া, যমুনা, নাগর, বাঙালি ও ইছামতী নদী। জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যা মোট আয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ। শাজাহানপুরসহ জেলার উপজেলাগুলোতে সবজি ও মরিচ চাষ উল্লেখযোগ্য।

কেঁচো সার যেভাবে তৈরি হয়


কামারপাড়া গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশে সিমেন্টের তৈরি রিং দেখা যায়। এগুলোতে কেঁচো, গোবর ও খড়কুটো মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট, যা স্থানীয়ভাবে কেঁচো সার নামে পরিচিত। কৃষক আব্দুল মজিদ (৫৫) তাঁর বাড়ির পাশের রিঙের কাছে দাঁড়িয়ে বলেন, 'গোবর আর কিছু জৈব উপাদান ব্যবহার করে আমরা কেঁচো সার তৈরি করি। এ সার জমিতে দিলে ফলন অনেক ভালো হয়।' নারী কৃষক মনোয়ারা বেগম (৩৮) বলেন, 'আমরা নিজেরাই এ সার তৈরি করি। এটা শুধু খরচ কমায় না, জমির গুণগত মানও বাড়ায়। আগে যে জমিতে ১০০ কেজি ফসল হতো, এখন সেখানে ১২০ কেজি হচ্ছে।' ফলন বাড়ার এ হিসাব কৃষকের নিজের বক্তব্য হিসেবেই এখানে তুলে ধরা হলো।

ভার্মি কম্পোস্ট আসলে কী? এটি এমন এক জৈব সার, যেখানে বিশেষ প্রজাতির কেঁচো গোবর ও গাছের অবশিষ্টাংশের মতো জৈব উপাদান খেয়ে হজম করে এবং তাদের দেহ থেকে বেরিয়ে আসা দানাদার বর্জ্য (কাস্টিং) জমে উর্বর সারে পরিণত হয়। সারা বিশ্বে এ কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় Eisenia fetida প্রজাতির কেঁচো, যা 'রেড উইগলার' বা 'টাইগার ওয়ার্ম' নামে পরিচিত এবং পচনশীল জৈব আবর্জনার মধ্যে দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। সাধারণ গোবরের সারের তুলনায় কেঁচো সারে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের মতো উপাদান সহজলভ্য রূপে থাকে বলে কৃষিবিজ্ঞানে ধরা হয়; এ কারণে অল্প পরিমাণ কেঁচো সারও মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে।

কোন খাদ্য-উপাদানে ভালো মানের কেঁচো সার হয়, তা নিয়ে বাংলাদেশেও গবেষণা হয়েছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি তুলনামূলক গবেষণায় দেখা যায়, Eisenia fetida কেঁচো দিয়ে এবং গোবরকে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করলে কেঁচো সারের পরিমাণ ও গুণমান দুটিই ভালো হয়; গোবরভিত্তিক মিশ্রণে পটাশিয়াম, সালফার ও বোরনের মতো উপাদান তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। কামারপাড়ার কৃষকেরা গোবরকেই মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা এ গবেষণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

আব্দুল মান্নানের মতো কৃষকদের একটি সাধারণ অভিযোগ হলো, দীর্ঘদিন কেবল রাসায়নিক সার দিলে মাটি শক্ত হয়ে যায় ও প্রাণশক্তি হারায়। জৈব সার প্রয়োগের মূল যুক্তিই এখানে; জৈব পদার্থ মাটির গঠন, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা এবং অণুজীবের কার্যকলাপ বাড়াতে সাহায্য করে বলে কৃষিবিজ্ঞানে স্বীকৃত। তবে কেঁচো সার বা অন্য যেকোনো সারের সঠিক মাত্রা জমি ও ফসল ভেদে ভিন্ন হয়, তাই কৃষকদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা স্থানীয় প্ল্যান্ট ক্লিনিক থেকে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তৈরি হওয়া ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
তৈরি হওয়া ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
জমিতে প্রয়োগের জন্য রাখা গোবরের স্তূপ; কেঁচো সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল গোবর। ছবি: Sindugab / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
জমিতে প্রয়োগের জন্য রাখা গোবরের স্তূপ; কেঁচো সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল গোবর। ছবি: Sindugab / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ভেষজ কীটনাশক ও নিমের ভূমিকা


গ্রামের তরুণ কৃষক কামরুল হাসান শোভন (২৮) দেখান, কীভাবে ভেষজ উপাদান দিয়ে কীটনাশক তৈরি করা হয়। তিনি বলেন, 'নিমপাতা, বিষকাটালি আর থানকুনির মতো গাছপালা মেশানো নির্যাস সবজির জমিতে স্প্রে করলে পোকামাকড় দূরে থাকে। এতে গাছ সুস্থ থাকে এবং ফলন বেশি হয়।' তাঁর ভাষ্য, কামারপাড়া গ্রামটি মরিচ চাষের জন্য বিখ্যাত। কৃষকদের ব্যবহৃত নির্যাসে নিম (Azadirachta indica), বিষকাটালি, পিতরাজ, থানকুনি, ধুতুরা ও ভেরেন্ডার মতো স্থানীয় গাছপালা ব্যবহার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

এসব গাছের মধ্যে নিম নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। নিমের বীজ ও পাতায় থাকা সক্রিয় উপাদান অ্যাজাডিরাক্টিন (azadirachtin) জৈব কীটনাশক হিসেবে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উপাদানগুলোর একটি। গবেষণা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিমগাছে অ্যাজাডিরাক্টিনের পরিমাণ মাত্র ০.৩ থেকে ০.৫ শতাংশ, তবু এটি বহু পোকার ওপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। এটি মূলত পোকার খাওয়ার রুচি নষ্ট করে (অ্যান্টিফিড্যান্ট) এবং পোকার বৃদ্ধি ও খোলস বদলের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, ফলে পোকা বড় হতে ও বংশবিস্তার করতে পারে না। একই সঙ্গে মেরুদণ্ডী প্রাণীর জন্য এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।

নির্যাসের অন্য উপাদানগুলোর মধ্যে ধুতুরা (Datura) ও ভেরেন্ডা বা রেড়ি (Ricinus communis) দেশে পরিচিত গাছ; বিষকাটালি ও থানকুনি (Centella asiatica) আর্দ্র জায়গায় জন্মানো ভেষজ। কৃষকেরা এগুলো স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করে নির্যাস বানান। কামারপাড়ার কৃষকদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁরা প্রতি লিটার পানিতে প্রায় ৫০ গ্রাম নির্যাস মিশিয়ে জমিতে স্প্রে করেন। এ মাত্রা কৃষকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেওয়া; কোনো ফসলে কোন ভেষজ কীটনাশক কী মাত্রায় ব্যবহার করা নিরাপদ, তা জানতে কৃষকদের উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।

ভেষজ উপাদান ও জৈব সারের এ ব্যবহার আসলে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট (আইপিএম)-এর অংশ। এ পদ্ধতিতে সব ধরনের উপযুক্ত কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করে পোকার সংখ্যা ক্ষতিকর মাত্রার নিচে রাখা হয়, এবং রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় একেবারে শেষ উপায় হিসেবে।

নিমগাছের পাতা; নিমের সক্রিয় উপাদান অ্যাজাডিরাক্টিন জৈব কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ছবি: Prabhupuducherry / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
নিমগাছের পাতা; নিমের সক্রিয় উপাদান অ্যাজাডিরাক্টিন জৈব কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ছবি: Prabhupuducherry / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

খরচ ও লাভের হিসাব


১০ শতাংশ জমিতে মরিচ চাষের উদাহরণ দিয়ে কামরুল হাসান শোভন একটি হিসাব দেন। তাঁর ভাষ্য, প্রচলিত পদ্ধতিতে জমি চাষ থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, সেচ ও বাজারজাত করা পর্যন্ত এক জমিতে খরচ হয় সাড়ে ৬ হাজার টাকা; এতে ফলন পাওয়া যায় ৪৮ থেকে ৫০ মণ। মণপ্রতি ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করলে দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার টাকা, আর খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে সাড়ে ১১ হাজার টাকার মতো।

অন্যদিকে, তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, অর্গানিক পদ্ধতিতে একই জমি চাষে খরচ পড়ে প্রচলিত পদ্ধতির প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। এ পদ্ধতিতে জমি তৈরির সময় গোবর সার দিতে হয়, এরপর সেচের আগে প্রয়োগ করা হয় ১৫ থেকে ২০ কেজি ভার্মি কম্পোস্ট, আর পোকা দমনে ব্যবহৃত হয় ভেষজ নির্যাস। শোভনের ভাষ্য, এ পদ্ধতিতে ১০ শতাংশ জমি চাষে খরচ পড়ে মাত্র ২ হাজার টাকা, ফলন পাওয়া যায় ৫৫ থেকে ৬০ মণ এবং খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে ১৬ হাজার টাকার মতো। এসব খরচ, ফলন ও লাভের অঙ্ক কৃষকের নিজের দেওয়া হিসাব; এগুলো কোনো দাপ্তরিক গড় নয়।

মরিচ উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মরিচের আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৬৬ হাজার ২৩৫ হেক্টর, আর শীতকালীন ফসল হিসেবে এটি বেশি জন্মে কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বগুড়ায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে একা বগুড়া জেলায় প্রায় ৬ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে মরিচ আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১৭ হাজার ৭৯৯ টন। এ পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, কামারপাড়ার মতো গ্রামে মরিচসহ সবজির চাষ স্থানীয় অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বিষমুক্ত সবজির চাহিদা নিয়ে কথা বলেন পাইকার সালাম সওদাগর (৫০)। তিনি বলেন, 'আমি এ গ্রাম থেকে নিয়মিত সবজি কিনি। ঢাকার বাজারে এ সবজি ভালো দামে বিক্রি হয়। ক্রেতারা বিষমুক্ত জিনিস খুঁজছেন, তাই দাম একটু বেশি হলেও অসুবিধা হয় না। রাসায়নিক সার দিয়ে উৎপাদিত সবজি অনেক সময় ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই পচে যেত; বিষমুক্ত সবজি বেশি সময় টিকে থাকে।' পাশের আরডিএ বাজারে সবজি কিনতে আসা চাকরিজীবী মোসলেম উদ্দিন বলেন, 'আমি বিষমুক্ত সবজি কিনে নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্যরক্ষার চেষ্টা করছি। এসব সবজি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থমুক্ত, তাই নিশ্চিন্তে খেতে পারি।'

নিরাপদ খাদ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ


'বিষমুক্ত' বা নিরাপদ সবজির প্রতি ক্রেতাদের এ আগ্রহ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাসায়নিক কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও মানহীন ব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে বলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। এ কারণেই জমিতে পোকা দমনে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে। কামারপাড়ার কৃষকেরা যেভাবে রাসায়নিকের বদলে জৈব সার ও ভেষজ নির্যাসের দিকে ঝুঁকেছেন, তা মূলত এ ভাবনারই স্থানীয় প্রকাশ।

তবে কেবল 'বিষমুক্ত' শব্দ দিয়ে বাজারজাত করলেই তা প্রমাণিত নিরাপদ খাদ্য হয়ে যায় না; নিরাপদ খাদ্যের জন্য উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত নিয়মকানুন মেনে চলা প্রয়োজন। এ কারণেই গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক বিষমুক্ত সবজি সাধারণ ক্রেতার নাগালে পৌঁছাতে আলাদা বাজার ব্যবস্থা এবং কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা চেয়েছেন। সঠিক তদারকি ও বাজার ব্যবস্থাপনা ছাড়া কৃষকের এ উদ্যোগ টেকসই করা কঠিন।

কীভাবে শুরু হয়েছিল


প্রতিবেদন অনুযায়ী, কামারপাড়ায় বিষমুক্ত চাষের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের দিকে। গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমানের চোখের দৃষ্টিশক্তি কীটনাশক স্প্রে করার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর এ দুর্ঘটনা পুরো গ্রামকে সচেতন করে তোলে। এরপর থেকে কামারপাড়াসহ আশপাশের গ্রামে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বাদ দিয়ে শুধু ভেষজ উপাদান দিয়ে সবজি চাষের আগ্রহ বাড়তে থাকে।

এ কাজে কৃষকদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর তথা 'ফসলের ডাক্তার' রোস্তম আলী। শুরুতে এ উদ্যোগ কামারপাড়া ও জৈন্তপুরে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে আশপাশের বৃ-কুষ্টিয়া, ফুলকোট, বিলকেশপাতা, বিহিগ্রাম, দহিকান্দি, বড়পাথার, চুপিনগর, বোহাইল, দুসকুলা, মোস্তাইল, খলিশাকান্দি, দুর্গাপুর, শিবপুর, রামনগর, জোয়ানপুর, রাধানগর, গাড়িদহ ও সোনাইদীঘি গ্রামেও তা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কৃষকেরা এখন একে অপরকে স্বেচ্ছায় পরামর্শ দিচ্ছেন।

'ফসলের ডাক্তার' বা প্ল্যান্ট ডক্টরের ধারণাটি বাংলাদেশে নতুন নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা সিএবিআই-এর প্ল্যান্টওয়াইজ কর্মসূচির আওতায় দেশে প্রথম প্ল্যান্ট ক্লিনিক চালু হয় ২০১৩ সালে ঢাকায়। এতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা কৃষকের আনা আক্রান্ত নমুনা বা সমস্যার বর্ণনা শুনে রোগ-পোকা শনাক্ত করেন এবং করণীয় পরামর্শ দেন। রোস্তম আলীর মতো 'ফসলের ডাক্তার'রা এ ধরনের মাঠপর্যায়ের পরামর্শসেবারই অংশ।

একইভাবে দেশে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার চর্চাও কয়েক দশকের পুরোনো। এফএও-র আন্তঃদেশীয় আইপিএম কর্মসূচিতে বাংলাদেশ যুক্ত হয় ১৯৮১ সালে, শুরুতে ধান দিয়ে। পরে কৃষক মাঠ স্কুল বা ফার্মার ফিল্ড স্কুলের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয় এবং ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে কয়েক হাজার সম্প্রসারণকর্মী, এনজিও কর্মকর্তা ও কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০০২ সালে প্রণীত জাতীয় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় বলা হয়, আইপিএমের লক্ষ্য শুধু পোকা দমন নয়, বরং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করে কৃষকের টেকসই আয়ের ব্যবস্থা করা। কামারপাড়ার কৃষকদের উদ্যোগ এ ধারারই একটি স্থানীয় রূপ।

নারীদের অংশগ্রহণ ও সংগঠনের সহায়তা


কামারপাড়ায় নারীরা শুধু ঘরের কাজে সীমাবদ্ধ নন। নারী কৃষক মনিরা খাতুন (৪২) বলেন, 'আমরা নিজেরা জমিতে কাজ করি, পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করি। বিষমুক্ত সবজি বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের খরচ চালাই।' খরচ কমায় লাভ বাড়ার কথা জানান কৃষক শুকুর আলী (৬০)। তিনি বলেন, 'আগে মৌসুমে চাষের জন্য অনেক ঋণ করতে হতো, রাসায়নিক কিনতে খরচ হতো অনেক বেশি। এখন নিজেরাই সার আর কীটনাশক তৈরি করি। খরচ কমে যাওয়ায় লাভও বেশি হচ্ছে। আমার দুই ছেলে পড়ালেখা করছে, আগে এটা সম্ভব ছিল না।'

কৃষকদের নিরাপদ সবজি উৎপাদনে সহযোগিতা করছে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এর নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি কীভাবে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করতে হয় এবং ভেষজ কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। তাঁদের এ উদ্যোগ সারা দেশের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠছে।' তিনি বিষমুক্ত সবজি সাধারণ ক্রেতার নাগালে পৌঁছাতে আলাদা বাজার ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা কামনা করেন।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতলুবুর রহমান বলেন, 'বিষমুক্ত চাষাবাদে শুধু কৃষকেরই লাভ হচ্ছে না, ক্রেতারাও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাচ্ছেন। আমরা এ পদ্ধতি সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি, এতে কৃষক ও ভোক্তা দুপক্ষই লাভবান হবেন।' কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান, যারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসেবা দিয়ে থাকে।

রংপুর, দিনাজপুর ও পঞ্চগড়ে একই চিত্র


বিষমুক্ত চাষের এ চর্চা শুধু বগুড়ায় সীমাবদ্ধ নেই। রংপুর জেলার পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলার কৃষকেরাও এখন রাসায়নিক কীটনাশক ছাড়া শাকসবজি চাষ করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রংপুরের একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁরা এ পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেছেন। কৃষক মাহবুবুর রহমান বলেন, 'আমরা আগে রাসায়নিক সার ব্যবহার করতাম, কিন্তু এখন জৈব সার ব্যবহার করি ও গাছের প্রতি যত্নশীল হই। এ নতুন পদ্ধতিতে চাষ করলে ফসলের গুণগত মান অনেক ভালো হয়, পরিবেশও দূষিত হয় না।'

দিনাজপুর জেলার হাকিমপুর, বিরল ও নবাবগঞ্জ এলাকায় কৃষকেরা কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে ভার্মি কম্পোস্ট, গোবর সার ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে জমির উর্বরতা বাড়াচ্ছেন বলে জানা যায়। হাকিমপুরের কৃষক সেলিম উদ্দিন বলেন, 'প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষ করলে জমি আরও সুস্থ থাকে এবং ফসলও ভালো হয়।' অন্যদিকে পঞ্চগড় জেলার কিছু অঞ্চলে কৃষকেরা জৈব সার বা বায়োফার্টিলাইজার ব্যবহার করছেন, যা পরিবেশবান্ধব এবং জমির উর্বরতা বজায় রাখে। স্থানীয় কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন, 'আমরা কিছু প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে সবজি চাষ করি। এতে খরচ কম, ফলনও ভালো হয়।' প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পদ্ধতির ব্যবহার অন্য কৃষকদের মধ্যেও দিন দিন বাড়ছে।

ছবি: Afifa Afrin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, এফএও, সিএবিআই প্ল্যান্টওয়াইজ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

শাকসবজি

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

আলু, কিডনি বিন আর মাশরুমে ঘন গরম স্যুপ: সহজ রেসিপি

পেঁয়াজ, মাশরুম, পুদিনা-রোজমেরি ভেজে কর্নস্টার্চ, সয়া সস, সর্ষে, ব্রথ ও আলুতে ফুটিয়ে শেষে সেদ্ধ কিডনি বিন আর দুধ; ফ্রিজে ৩-৪ দিন, ডিপ ফ্রিজে এক মাস রাখা যায়।

আজকের পত্রিকা১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
শাকসবজি

উল্লাপাড়ায় আগাম খিরা উঠতে শুরু, আড়তে মণ ১,২০০ থেকে ১,২৫০ টাকা

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ৩৬০ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ২২৫ হেক্টরে খিরা বোনা হয়েছে; চরবদ্ধনগাছা ও চাকশা আড়তে আগাম খিরা চড়া দামে বিকোচ্ছে।

কৃষি সময়১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

টক দই আর কাজু-আমন্ডের ঝোলে পটল মহারানী: সহজ নিরামিষ রেসিপি

ভেজে নেওয়া পটল টক দই, কাজু-আমন্ড বাটা, মৌরি ও কাশ্মীরি মরিচের ঝোলে রেঁধে শেষে ঘি আর গরম মসলা; ভাত, রুটি বা পরোটার সঙ্গে খাওয়া যায়।

জাগো নিউজ ২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)