গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার হিমালয়-উজানে পরিযায়ী মিঠাপানির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে জলবিদ্যুৎ বাঁধ আর জলবায়ুজনিত বন্যার যৌথ চাপে। মোংগাবে ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে এ কথা লিখেছেন প্রিয়াঙ্কা শঙ্কর (Priyanka Shankar)। মতামত লেখকের নিজের।
লেখার শুরু এ বছর প্রকাশিত পরিযায়ী মিঠাপানির মাছের বৈশ্বিক মূল্যায়ন দিয়ে, যা জাতিসংঘের পরিযায়ী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সনদ (CMS) জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির বিশ্ব সংরক্ষণ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে তৈরি করেছে। এতে দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকের পর বিশ্বে পরিযায়ী মিঠাপানির মাছের সংখ্যা ৮১ শতাংশ কমেছে, আর সনদের তালিকাভুক্ত ৫৮ প্রজাতির ৯৭ শতাংশই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটানা পথ এই অববাহিকাকে প্রতিবেদনে বৈশ্বিক অগ্রাধিকার অঞ্চল বলা হয়েছে; প্রধান লেখকদের একজন, মৎস্যজীববিজ্ঞানী জেব হোগান (Zeb Hogan) একে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় মাছ-পরিযান অঞ্চল বলেন।
নিবন্ধে সাম্প্রতিক দুর্যোগের কথা আছে। ২০২৬ সালের আগস্টের শেষে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বরফ ও পাথরের ধসে ভোটে কোশী ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে; গালছিতে ইসিমোডের (ICIMOD) পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ৩০ মিনিটে পানি ৯ মিটার বাড়তে দেখা যায়। বন্যায় কয়েকশ মানুষ মারা যান, ২৮১ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ সক্ষমতা নষ্ট হয়। বন্যা গণ্ডক নদী হয়ে বিহারের পশ্চিম চম্পারণ ও গোপালগঞ্জ ভাসালে গ্রামবাসীর জালে উঠে আসে উঁচু পাহাড়ের অচেনা মাছ; বিহার সরকার সেগুলো না খাওয়া ও না বেচার সতর্কতা দেয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমের তিস্তায় হিমবাহ-হ্রদ ফেটে বন্যার পর আইসিএআর-ন্যাশনাল ব্যুরো অব ফিশ জেনেটিক রিসোর্সেসের গবেষণায় দেখা যায়, উজানের প্লাবনভূমি ১৩৮ শতাংশ চওড়া হয়েছে; পলিতে চাপা পড়েছে স্নো ট্রাউট মাছের ডিম ছাড়ার ও শীতে আশ্রয় নেওয়ার গভীর খাদ ও নুড়ির তলা।
দ্বিতীয় চাপ বাঁধ। ৫০ কেজির বেশি ওজনের হতে পারে এমন সোনালি মহাশোল একসময় বর্ষার আগে গঙ্গার উপনদী বেয়ে ডিম ছাড়তে যেত। ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার রেডিও টেলিমেট্রি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মাছটির আবাস টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। ভাগীরথীর তেহরি বাঁধ ও অলকানন্দার শ্রীনগর বাঁধ মাছ পার হতে পারে না; জিনগত প্রমাণ বলছে, শ্রীনগর বাঁধ উজানের অলকানন্দার মহাশোলকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করেছে। লেখক বলছেন, ভীমতালে আইসিএআর-শীতল পানির মৎস্য গবেষণা পরিদপ্তরের হ্যাচারি কর্মসূচি তাল রাখতে পারছে না, কারণ মহাশোল দেরিতে প্রাপ্তবয়স্ক হয় আর ডিম দেয় তুলনামূলক কম; ভারতের বাঁধে মাছ চলার পথও খুব কমই রাখা হয়।
তাঁর সমাধান সমাজভিত্তিক সংরক্ষণ। মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে সিমসাং নদীর ওয়াচি ওয়ারি কমিউনিটি মৎস্য অভয়াশ্রম পাহারা দেন গ্রামবাসীরা; গভীর খাদগুলোতে কয়েকশ চকলেট মহাশোল আছে, ডিনামাইট ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা গ্রামের নিয়মে নিষিদ্ধ, আর বাড়তি মাছ খোলা নদীতে ছড়িয়ে মানুষের খাবার জোগায়। ভুটানে ডিম ছাড়ার মৌসুমে মাছ না ধরে স্নো ট্রাউট রক্ষা করা হয়। নাগাল্যান্ডের পোইলওয়া গ্রামের মানুষ তেপুইকি নদীর সাত কিলোমিটারে আটটি প্রজননস্থল চিহ্নিত করে মাছ ধরা বন্ধ করেন; কয়েক মৌসুমে দেশি মাছ ফিরে আসে, বাড়ে পরিবারের আয়ও।
শঙ্কর শেষে লিখেছেন, সিএমএসের মূল্যায়ন মিঠাপানির মাছ সংরক্ষণকে মূল ধারায় আনার নির্দেশনা: যৌথ পর্যবেক্ষণ, সুরক্ষিত পরিযান পথ আর নদীর সংযোগ ফিরিয়ে আনা।
ছবি: Charles J. Sharp / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: Mongabay India




মন্তব্য
(০)