সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮+০.০%আদা - আমদানিকৃত১৬৭+০.০%আদা - দেশী১৫৪+০.০%আমন চাল - মাঝারি৫৬+০.০%আমন চাল - মোটা৪৮+০.০%আমন চাল - সরু৭২+০.০%আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২+০.০%কাঁচা মরিচ২১৮+০.০%খামারের মুরগী১৬২+০.০%খাসী৯০০+০.০%চিনি (দেশী)১৩২+০.০%ছোলা - গোটা৮৫+০.০%ডিম ফার্ম - লাল৪৭+০.০%পেঁয়াজ - দেশী৬০+০.০%বোরো চাল - মাঝারি৫৫+০.০%বোরো চাল - মোটা৪৭+০.০%বোরো চাল - সরু৬৬+০.০%মাংসঃ– গরু৭২৯+০.০%মুগ ডাল১২২+০.০%রসুন - আমদানিকৃত১৯২+০.০%রসুন - দেশী১৭৩+০.০%সয়াবিন তেল১৬৩+০.০%
হালনাগাদ ৩ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা২৭°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৮০%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

ডিমের দাম উৎপাদন খরচের নিচে, বন্ধের পথে প্রান্তিক খামার

টানা চার মাস ধরে ডিম বিক্রি করেও মুরগির খাবারের খরচ তুলতে পারছেন না দেশের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা। তাদের অভিযোগ, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে খরচ প্রায় সাড়ে ৯ থেকে ১০ টাকা, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬ থেকে ৭ টাকায়।

ডিমের দাম উৎপাদন খরচের নিচে, বন্ধের পথে প্রান্তিক খামার
লাইভস্টক

টানা চার মাস ধরে ডিম বিক্রি করেও মুরগির খাবারের খরচ পর্যন্ত তুলতে পারছেন না দেশের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা, ২০২৬ সালের মার্চে এমনটাই জানিয়েছেন খামারি ও খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ৯ থেকে ১০ টাকা, অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬ থেকে ৭ টাকায়। প্রতিটি ডিমেই দুই-তিন টাকা করে লোকসান, আর এই ক্রমবর্ধমান ব্যবধানই অনেক ছোট খামারকে বন্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। হাজার হাজার ডিম প্রতিদিন বিক্রি করা একটি খামারে এই ঘাটতি দ্রুত জমে বড় অঙ্কের লোকসানে পরিণত হয়।

দীর্ঘদিনের লোকসান, ঋণের বোঝা ও বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের কারণে অনেকেই খামার বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছেন; কিছু খামারে উৎপাদন ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। খামারিরা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে একের পর এক ছোট ও প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে যাবে। এতে বাজারে ডিমের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত বাড়তি দাম গুনতে হবে ভোক্তাদেরই। অর্থাৎ আজ যে কম দামে ক্রেতারা ডিম পাচ্ছেন, খামার বন্ধ হয়ে গেলে কাল সেই ডিমই তাদের অনেক বেশি দামে কিনতে হতে পারে।

চার মাস ধরে উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি


টাঙ্গাইল এলাকার খামারি খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিবেদন প্রকাশের আগের সোমবার তিনি প্রতিটি ডিম বিক্রি করেছেন সাড়ে ৬ টাকায়, অথচ প্রতিটি ডিম উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে সাড়ে ৯ টাকা। তিনি বলেন, ‘চার মাস ধরে লোকসানে ডিম বিক্রি করছি। এই লোকসান বহন করার মতো শক্তি আর নেই।’ তার মতে, প্রতিদিনের এই ঘাটতি জমতে জমতে এখন সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

খামারিদের অভিযোগ, ন্যায্যমূল্য না পেয়ে তাদের অনেক প্রতিবেশীই দেউলিয়া হয়ে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, আবার কেউ ঋণের ভয়ে নিজের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। আরেক খামারি আবু হানিফ বলেন, ‘ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে। কেউ দেশের বাইরে গেছে, কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদেরও একই পরিণতি হবে।’

ডিমের ব্যবসায় উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ ডিম বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না এবং দাম যেমনই হোক প্রায় প্রতিদিন তা বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে ডিমের দাম যতই কম হোক, মুরগিকে প্রতিদিন একই পরিমাণ খাবার দিতে হয়; খাবার বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। ফলে কম দামের প্রতিটি দিন খামারির মুনাফা কমানোর বদলে সরাসরি লোকসানের খাতায় যোগ হয়। মূলধন ভেঙে লোকসান টানতে টানতে ছোট খামারিদের হাতে নতুন করে বাচ্চা তোলা বা পরের চালানের খাবার কেনার টাকাও থাকে না, আর একবার উৎপাদন থামলে আবার চালু করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

পোল্ট্রি খামারে লেয়ার মুরগি; এমন প্রান্তিক খামারই দেশের ডিমের জোগানের মূল ভিত্তি। ছবি: Tiger Gang / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পোল্ট্রি খামারে লেয়ার মুরগি; এমন প্রান্তিক খামারই দেশের ডিমের জোগানের মূল ভিত্তি। ছবি: Tiger Gang / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

‘ডিমের রাজধানী’ টাঙ্গাইল


মধ্য বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের জেলা টাঙ্গাইল গ্রামে গ্রামে ঘন লেয়ার খামারের কারণে দেশে ‘ডিমের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও সেখানে গ্রামের পর গ্রাম মুরগির কোলাহল আর খামারিদের কর্মব্যস্ততায় মুখর ছিল, আর এই খামারকে কেন্দ্র করে আশপাশের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। খামারের পাশাপাশি খাবার, ওষুধ ও বাচ্চা সরবরাহ, পরিবহন ও ডিম কেনাবেচা ঘিরেও বহু মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছিল।

কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সেই অনেক খামার আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। যারা টিকে আছেন, তারাও চরম চাপের মধ্যে চলছেন; খামারিরা নিজেদের অবস্থাকে ‘দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এত পরিচিত একটি খামার-কেন্দ্রের এই পতন সারা দেশের জন্যই সতর্কবার্তা, যেখানে একই রকম হাজারো ছোট খামার সামান্য লাভের ওপর টিকে আছে। টাঙ্গাইলের মতো জেলায় যেখানে বহু পরিবারের আয়ের প্রধান উৎসই পোল্ট্রি, সেখানে একের পর এক খামার বন্ধ হলে তার প্রভাব কেবল খামারিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ে।

সংকটে ৫০ হাজার কোটি টাকার শিল্প


খাত সংশ্লিষ্টরা দেশের পোল্ট্রি শিল্পের আকার প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের বাজার অব্যবস্থাপনা, ডিম ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এবং নীতিগত দুর্বলতা মিলে শিল্পটিকে বড় সংকটে ফেলেছে। প্রান্তিক খামারিরা ঝরে পড়লে গোটা শিল্প কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। তাদের ভাষ্য, এই শিল্পের সঙ্গে খাবার, ওষুধ, বাচ্চা উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণন মিলিয়ে বিপুল কর্মসংস্থান জড়িত, ফলে প্রান্তিক খামারের সংকট একটি গোটা মূল্যশৃঙ্খলকেই নাড়িয়ে দিতে পারে।

গত কয়েক দশকে এই শিল্প দ্রুত বেড়েছে। খাত নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল নাগাদ সারা দেশে আনুমানিক ১ লাখ ৫০ হাজার পোল্ট্রি খামার চালু ছিল এবং এতে মোট বিনিয়োগ ধরা হতো প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ব্রয়লার মুরগি হয়ে ওঠে পোল্ট্রি মাংসের প্রধান উৎস আর লেয়ার মুরগি ডিমের প্রধান উৎস; ছোট খামারের বিস্তারেই মানুষ তুলনামূলক কম দামে ডিম ও মুরগি কিনতে পেরেছে।

দেশে বাণিজ্যিক পোল্ট্রি তুলনামূলকভাবে নবীন একটি শিল্প। আফতাব বহুমুখী ফার্মসের মতো প্রতিষ্ঠান ও প্রয়াত সৈয়দ হেদায়েতুল্লাহ এবং ফণীন্দ্র নাথ সাহার মতো উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়, আর আশির দশক থেকে হ্যাচারি, ফিড মিল ও গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া হাজার হাজার ছোট খামারির মাধ্যমে তা দ্রুত বিস্তৃত হয়। ২০১৭ সালের দিকে ঢাকায় বড় আকারের আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি প্রদর্শনী ও সেমিনার আয়োজিত হতো, যা এই খাতের বিস্তারের একটি পরিমাপ।

ডিম বাংলাদেশের পরিবারগুলোর কাছে প্রাণিজ আমিষের সবচেয়ে সস্তা উৎসগুলোর একটি, আর লেয়ার খামারের বিস্তারে তা লাখো মানুষের প্রতিদিনের খাবারে পরিণত হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সুলভতা মূলত ছোট খামারিদের সামান্য লাভে পরিশ্রম করার ওপর দাঁড়িয়ে আছে; এই খামারিদের বাজার থেকে সরিয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত যে ভোক্তারা উপকৃত হচ্ছেন, তাদেরই বেশি দাম দিতে হবে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রান্তিক খামারিদের পরিশ্রমের কারণেই সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম দামে ডিম ও মুরগি খেতে পেরেছে, অথচ আজ সেই খামারিরাই সবচেয়ে বেশি সংকটে। তিনি বলেন, তারা ঝরে পড়লে শিল্পটি কয়েকটি করপোরেট কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে এবং তখন তাদের নির্ধারিত দামেই ভোক্তাদের ডিম ও মুরগি কিনতে হবে।

দাম নির্ধারণে খামারির হাত নেই


প্রান্তিক খামারিরা যে দামে ডিম বিক্রি করবেন, তার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ খুবই সামান্য। খামার থেকে ডিম সাধারণত ফড়িয়া, পাইকার ও আড়তদারের হাত ঘুরে খুচরা দোকানে পৌঁছায়, আর পচনশীল পণ্য বলে ডিম ধরে রাখতে না পারা খামারিই এই শৃঙ্খলে সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিম ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও দীর্ঘদিনের বাজার অব্যবস্থাপনার কারণে খুচরা দাম তেমন না কমলেও খামার পর্যায়ের দাম কম থেকে যাচ্ছে।

এই নির্ভরতা কাটাতেই প্রান্তিক খামারিদের জন্য বাজার ও আড়তে আলাদা বিক্রয়কেন্দ্রের দাবি উঠেছে, যাতে ছোট উৎপাদকরা মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্য দিয়ে না গিয়ে ভোক্তার কাছাকাছি বিক্রি করতে পারেন। খামারিদের মতে, এমন ব্যবস্থা না থাকলে চাহিদা কমলে কিংবা বাজারে ডিমের জোগান বেড়ে গেলে তার ধাক্কা সরাসরি গিয়ে পড়ে সবচেয়ে ছোট ও সবচেয়ে কম ক্ষমতাধর উৎপাদকের ওপর। বড় করপোরেট খামার নিজস্ব সরবরাহ ও বিপণন নেটওয়ার্ক দিয়ে এই ধাক্কা কিছুটা সামলাতে পারলেও প্রান্তিক খামারির সেই সুযোগ নেই, ফলে সংকটে তারাই আগে ঝরে পড়েন।

সবচেয়ে বড় খরচ মুরগির খাবার


একটি ডিম উৎপাদনে সবচেয়ে বড় খরচ খাবার বা ফিড, যা খামারি ও ফিড মিল মালিকদের মতে মোট খরচের বড় অংশ দখল করে। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক পোল্ট্রি ফিড মূলত ভুট্টা ও সয়াবিন খইলকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়, যার বড় অংশ আমদানি করা। এসব উপকরণের দাম বাড়লে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচও বাড়ে, আর উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করা খামারির পক্ষে খাবার কমিয়ে খরচ ছাঁটাই করা কঠিন, কারণ তাতে মুরগি অভুক্ত থাকবে এবং ডিম উৎপাদন আরও কমে যাবে।

ভুট্টা এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফিড-শস্য। এটি খরিফ ও রবি দুই মৌসুমেই চাষ হয়; দিনাজপুর, রাজশাহী, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান অন্যতম প্রধান উৎপাদন এলাকা, আর খাদ্য ও শিল্পের পাশাপাশি পশুখাদ্য হিসেবেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। তারপরও দেশের অভ্যন্তরীণ ভুট্টা ও সয়াবিন উৎপাদন ফিড মিলের চাহিদা মেটাতে পারে না, ফলে শিল্পটি অনেকটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সময়ের সঙ্গে দেশে ভুট্টার আবাদ অনেকটা বেড়েছে মূলত পোল্ট্রি ও মাছের খাবারের চাহিদা মেটাতেই, তবু চাহিদার বড় অংশ এখনো আমদানি করেই পূরণ করতে হয়।

আমদানিনির্ভর হওয়ায় টাকায় ফিডের দাম শুধু বিশ্ববাজারের শস্যমূল্যের ওপরই নয়, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজ ভাড়া ও বন্দর খরচের ওপরও নির্ভর করে। এর যেকোনো একটি বাড়লে ফিডের দাম বেড়ে যায়, আর ডিমের উৎপাদন খরচে ফিডের অংশ এত বেশি যে বিক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলে খামারির হাতে প্রায় কোনো রক্ষাকবচই থাকে না।

ভুট্টার মোচা; ভুট্টা ও সয়াবিন খইল বাণিজ্যিক পোল্ট্রি ফিডের প্রধান উপকরণ, যা ডিম উৎপাদনের সবচেয়ে বড় খরচ। ছবি: User:Asbestos / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
ভুট্টার মোচা; ভুট্টা ও সয়াবিন খইল বাণিজ্যিক পোল্ট্রি ফিডের প্রধান উপকরণ, যা ডিম উৎপাদনের সবচেয়ে বড় খরচ। ছবি: User:Asbestos / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

ডিম ও পোল্ট্রি উৎপাদনের উত্থান


সরকারি তথ্য দেখাচ্ছে এই খাত কতদূর এগিয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স’ অনুযায়ী, দেশে ডিম উৎপাদন ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রায় ১,১৯১ কোটি থেকে বেড়ে ২০২০-২১ সালে ২,০৫৮ কোটি, ২০২১-২২ সালে ২,৩৩৫ কোটি, ২০২২-২৩ সালে ২,৩৩৮ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২,৩৭৫ কোটিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে মুরগির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩,২৭৮ লাখ (প্রায় ৩২ কোটি ৮০ লাখ) এবং হাঁসসহ মোট পোল্ট্রি প্রায় ৩,৯৬০ লাখে দাঁড়িয়েছে।

মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা বছরে প্রায় ১৩৭টিতে উঠেছে, যা ডিএলএসের নির্ধারিত বছরে মাথাপিছু ১০৪টি ডিমের চাহিদার চেয়ে বেশি; অর্থাৎ দেশ তার মৌলিক চাহিদার চেয়ে বেশি ডিম উৎপাদন করছে। সামগ্রিকভাবে প্রাণিসম্পদ খাত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপির ১৬.৫৪ শতাংশ জোগান দেয়; অধিদপ্তরের হিসাবে এ খাত দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষকে পূর্ণকালীন ও প্রায় অর্ধেক মানুষকে আংশিক কর্মসংস্থান দেয়। এই হিসাব থেকেই বোঝা যায়, ডিম কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ও বহু পরিবারের জীবিকারও বড় ভিত্তি।

পোল্ট্রির পাশাপাশি সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাতও বিস্তৃত হয়েছে। ডিএলএসের হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন ছিল প্রায় ১৫০ লাখ টন ও মাংস প্রায় ৯২ লাখ টন, যা এক দশক আগের চেয়ে অনেক বেশি। ডিম, দুধ ও মাংস মিলে প্রাণিসম্পদকে কৃষির অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল খাতে পরিণত করেছে; গরু পালনের তুলনায় কম জমি ও দ্রুত আয়ের কারণে পোল্ট্রি বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ উদ্যোক্তাকে আকৃষ্ট করেছে, যাদের বড় অংশই নারী ও তরুণ।

এত বৃদ্ধির পরও পুষ্টিবিদ ও এফএও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশে মাথাপিছু ডিম ও মাংস গ্রহণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম; অর্থাৎ আয় বাড়ার সঙ্গে চাহিদা আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে। ডিম স্বল্প খরচে পাওয়া ঘন পুষ্টিসমৃদ্ধ আমিষের উৎস, আর পরিবারগুলোকে নিয়মিত ডিম খেতে উৎসাহিত করতে নানা প্রচারও চলে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের শুরুতে খামার পর্যায়ে দামের ধস এমন একটি দেশে বেমানান, যেখানে আরও বেশি ডিমের ভালোভাবেই সদ্ব্যবহার সম্ভব ছিল।

দেশে কেবল মুরগিই পালন করা হয় না। ডিএলএসের হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হাঁসের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৮৩ লাখ; এর পাশাপাশি পরিবারগুলো রাজহাঁস, কবুতর এবং ক্রমবর্ধমানভাবে কোয়েল ও টার্কিও পালন করে। এই ছোট পরিসরের পালন এবং অনেক প্রান্তিক লেয়ার খামার চালান নারী ও তরুণরা, যাদের অনেকের কাছে এটি ব্যবসায় প্রথম পদক্ষেপ। ডিমের জোগানের প্রশ্ন ছাড়িয়ে এই কারণেও প্রান্তিক খামার হারিয়ে যাওয়া নীতিনির্ধারকদের ভাবাচ্ছে।

এসব সংখ্যার পেছনে থাকা মুরগির বেশিরভাগই উন্নত জাতের লেয়ার। বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ডিম-পাড়া জাত হোয়াইট লেগহর্ন বছরে প্রায় ২৩০টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে; দেশে পালিত অন্যান্য উন্নত জাতের মধ্যে রয়েছে রোড আইল্যান্ড রেড ও প্লাইমাউথ রক। ছোট ও প্রান্তিক খামারে লাখ লাখ এমন মুরগির নিয়মিত ডিম পাড়াই গড়ে তুলেছে আজকের ঝুঁকিতে পড়া ডিমের জোগান। এই জাতের মুরগি স্থানীয় দেশি মুরগির চেয়ে অনেক বেশি ডিম দেয় বলেই বাণিজ্যিক লেয়ার খামারে এদের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

একটি হোয়াইট লেগহর্ন ডিম-পাড়া মুরগি; বাংলাদেশে এই জাত বছরে প্রায় ২৩০টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। ছবিটি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্যারাফিল্ড পোল্ট্রি ফার্মে তোলা। ছবি: State Government Photographer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
একটি হোয়াইট লেগহর্ন ডিম-পাড়া মুরগি; বাংলাদেশে এই জাত বছরে প্রায় ২৩০টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। ছবিটি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্যারাফিল্ড পোল্ট্রি ফার্মে তোলা। ছবি: State Government Photographer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)

বারবার ধাক্কা সামলানো এক খাত


বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাত বারবার ধাক্কা সামলেছে। গ্রামাঞ্চলে মুরগির মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখ করা হয় রানীক্ষেত (নিউক্যাসল) রোগকে, যা ডিম-পাড়া মুরগির ডিমের সংখ্যা ও গুণমান দুটোই তীব্রভাবে কমিয়ে দেয়; অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি রোগ হলো ককসিডিওসিস। ২০০৭ সালে বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ খামার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যে ধাক্কা সামলে উঠতে শিল্পটির কয়েক বছর লেগে যায়।

এসব রোগ ঠেকাতে খামারিরা মুরগিকে টিকা দেন ও জৈব-নিরাপত্তার নানা ব্যবস্থা মেনে চলেন, কিন্তু সামান্য লাভে চলা ছোট খামারে টিকা, পশুচিকিৎসা ও পরিচ্ছন্ন ঘর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ নিজেই একটি বোঝা। দীর্ঘ দামের সংকট চললে এই মৌলিক সুরক্ষাগুলো ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে রোগ ও বাজার, দুই দিক থেকেই চাপ বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, নিয়মিত টিকাদান ও সঠিক ব্যবস্থাপনাই গ্রামীণ পোল্ট্রিতে মৃত্যুহার কমানোর প্রধান উপায়, কিন্তু লোকসানে চলা খামারে তা উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এই ইতিহাসের বিপরীতে খামারিরা বলছেন, ২০২৬ সালের শুরুর দামের সংকট ভিন্ন ধরনের হুমকি, যা রোগ নয় বরং বাজার নিজেই তৈরি করেছে। তাদের যুক্তি, রোগের প্রাদুর্ভাবের পর খামার আবার দাঁড় করানো যায়, কিন্তু মাসের পর মাস উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করলে খামারি নতুন করে শুরু করার পুঁজিই হারিয়ে ফেলেন এবং অনেক সময় চিরতরে এই পেশা ছেড়ে দেন।

খামারিদের দাবি


বিপিআইএ সভাপতি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, কৃষক কার্ড বিতরণে যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পোল্ট্রি খামারিদের দেওয়া হয় এবং ঋণ, ভর্তুকি ও উন্নত বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রান্তিক খামারিদের পাশে দাঁড়ানো হয়। তিনি প্রান্তিক উৎপাদকদের জন্য আলাদা বাজার-নীতির দাবি জানিয়ে বলেন, তাদের পণ্য বিক্রিতে যেন কোনো ট্যাক্স বা ভ্যাট না থাকে, আর বড় করপোরেট খামারের জন্য ভিন্ন ট্যাক্স ধার্য করা যেতে পারে, যাতে ছোট খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন।

তিনি বিদ্যুতের ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ ও সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি বাজার ও আড়তে প্রান্তিক খামারিদের জন্য আলাদা বিক্রয়কেন্দ্র তৈরির দাবি জানান, যাতে তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে জিম্মি না হন। ছোট খামার টিকিয়ে রাখতে হলে এসব প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সরকার যা বলছে


প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, আগের তুলনায় দেশে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা কমেছে। তবে তিনি যোগ করেন, এই খাত নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই; দেশে মোট কতটি পোল্ট্রি খামার আছে এবং এতে কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, তার নির্ভুল তথ্যও নেই। তিনি বলেন, সম্প্রতি অনুমোদিত পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা এই খাতের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। নির্ভুল পরিসংখ্যানের অভাবে প্রকৃত সংকটের মাত্রা নিরূপণ ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলেও খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

ছবি: Maksym Kozlenko / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৪-২৫; বাংলাপিডিয়া; পোল্ট্রি ফার্মিং ইন বাংলাদেশ (উইকিপিডিয়া)।

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘিয়ের ব্যবসা থেকে ১৮৫ রকম মিষ্টি: বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের চার প্রজন্ম

ব্রিটিশ আমলের ঘিয়ের ব্যবসা থেকে শুরু হওয়া বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার এখন প্রায় ১৮৫ রকম মিষ্টি বানায়, শাখা প্রায় ৪৫টি, কর্মী প্রায় তিন শ; দুধ, ছানা, ক্ষীর ও মাওয়ার বেশির ভাগ আসে মুন্সিগঞ্জ থেকে।

প্রথম আলো৩ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
মতামত

লোকসানে খামার ছাড়ছেন প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা: ড. মো. ফোরকান আলীর কলাম

জাগো নিউজে লেখা কলামে ড. মো. ফোরকান আলী লিখেছেন, সাড়ে ৯ টাকা খরচের ডিম খামারিরা বেচছেন সাড়ে ছয় টাকায়; বিপিআইএর হিসাবে পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার খামার বন্ধ হয়েছে। মতামত লেখকের নিজস্ব।

জাগো নিউজ ২৪৩ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

মেক্সিকো থেকে বাছুর আমদানি কমলে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়বে গরুর মাংসের দাম: ফাপ্রির বিশ্লেষণ

নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্মের কারণে দেওয়া বিধিনিষেধের পর মেক্সিকোর গবাদিপশু আমদানি স্বাভাবিক হলে আর দীর্ঘদিন কম থাকলে কী হবে, তা তুলনা করেছে মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়; কম আমদানিতে দাম বাড়ে, মাংস উৎপাদন সরে যায় মেক্সিকোতে।

Farms.com৩ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)