বাড়িতে ঢুকে মাছ খেয়ে ফেলায় এক নারী একটি বিড়ালের গলা কেটে হত্যা করেছেন, এমন অভিযোগ এনে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর, বুধবার, বগুড়ার আদমদীঘি থানায় লিখিত অভিযোগ দেন বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্য। পরদিন ৬ নভেম্বর সকালে জাগো নিউজ ২৪ ও প্রথম আলো খবরটি প্রকাশ করে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, বিড়ালটির মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টির তদন্ত চলছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটে আদমদীঘি উপজেলার দত্তবাড়ীয়া গুচ্ছগ্রামে। দুটি প্রতিবেদনেই ঘটনার বিবরণ এসেছে অভিযোগকারী ও প্রতিবেশীদের ভাষ্য হিসেবে। কোনো প্রতিবেদনে অভিযুক্ত নারীর বক্তব্য ছিল না, আর প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত পুলিশ বা আদালতের কোনো সিদ্ধান্তও আসেনি।
অভিযোগে যা বলা হয়েছে
অভিযোগকারী বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এমরান হোসেন। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর লিখিত অভিযোগে বলা হয়, কয়েক দিন আগে দত্তবাড়ীয়া গুচ্ছগ্রামের ২৬ বছর বয়সী এক নারীর বাড়িতে একটি বিড়াল ঢুকে মাছ খেয়ে ফেলে। জাগো নিউজ ওই নারীর নাম লিখেছে বুলবুলি। প্রথম আলো জানায়, বিড়ালটি রান্না করা মাছ খেয়েছিল।
অভিযোগে বলা হয়, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, বিড়ালটি দ্বিতীয়বার ঘরে ঢুকলে ওই নারী ক্ষিপ্ত হয়ে সেটিকে ধরে ফেলেন এবং বঁটি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেন। জাগো নিউজ জানায়, অভিযোগে আরও বলা হয়েছে যে তিনি বিড়ালটির বুক চিরে ফেলেন এবং পরে মরদেহটি বাড়ির পাশের একটি ধানখেতে ফেলে দেন। সময় নিয়ে দুই প্রতিবেদনে ভিন্নতা আছে: জাগো নিউজ লিখেছে, বিড়ালটি মঙ্গলবার দুপুরে আবার ওই বাড়িতে যায়; প্রথম আলো লিখেছে, মঙ্গলবার রাতে।
দুটি পত্রিকাই জানায়, অভিযোগটি লিখিতভাবে বুধবার আদমদীঘি থানায় জমা দেওয়া হয়। প্রথম আলোর ভাষায়, বিষয়টি জানাজানির পর বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়।
যে প্রতিবেশীরা বিড়ালটির মরদেহ উদ্ধার করেন
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাটি জানার পর প্রতিবেশী শামছুন্নাহার মিনা বিড়ালটির মরদেহ নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। তিনি ককশিটের বাক্সে বরফ দিয়ে মরদেহটি সংরক্ষণ করেন এবং পুলিশকে খবর দেন। প্রথম আলো জানায়, তিনি বুধবার সকালে মরদেহটি উদ্ধার করেন; পত্রিকাটি তাঁকে ইসাহাক আলীর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।
শামছুন্নাহার মিনার স্বামী ইসাহাক জাগো নিউজকে বলেন, এক মাস আগে তাঁরা গ্রামে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসেন এবং সঙ্গে ছয়টি পোষা বিড়াল নিয়ে আসেন। যে বিড়ালটিকে হত্যা করা হয়েছে, সেটি ওই বিড়ালগুলোর সঙ্গেই থাকত। মঙ্গলবার বিড়ালটি হত্যার পর তিনি বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে বিষয়টি জানান। প্রথম আলো একই কথা শামছুন্নাহার মিনার মুখ থেকে প্রকাশ করেছে: এক মাস আগে তিনি বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ছয়টি পোষা বিড়াল আনেন, আর হত্যার শিকার বিড়ালটি সেগুলোর সঙ্গেই থাকত।
জাগো নিউজ জানায়, হত্যার পর বিড়ালটিকে ফেলে রাখার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দেখে অনেকে ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং শাস্তির দাবি জানান।
পুলিশ ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর যা বলেছে
আদমদীঘি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মোস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিড়ালটির মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টির তদন্ত চলছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা পেলে জড়িত নারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আদমদীঘি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বেনজির আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। দুটি পত্রিকাই তাঁর বরাত দিয়ে জানায়, বিড়ালটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় ময়নাতদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একটি প্রাণিকল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে বলেছিলেন, আইন অনুযায়ী মৃত প্রাণীকে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে নিতে হয়, তিনি অটোপসি করে প্রাণীটির অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে জানালে তবেই বিচার এগোয়।
প্রথম আলো প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে লিখেছে, প্রচলিত আইনে প্রাণীর প্রতি নির্দয় আচরণ বা এতে সহায়তার দায়ে ২ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। জাগো নিউজও একই অঙ্ক দিয়ে লিখেছে, এই আইনের তেমন ব্যবহার দেখা যায় না এবং এই আইনে দায়ের হওয়া মামলাও খুব একটা নেই। নিচে আইনের সরকারি পাঠ থেকে দেখা যাবে, ওই দণ্ড কিছু অপরাধের জন্য নির্ধারিত, অন্য কিছু অপরাধের জন্য দণ্ড এর চেয়ে কম।

প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এ যা আছে
ঘটনার সময় প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা-সংক্রান্ত যে আইন বলবৎ ছিল, সেটি প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ (২০১৯ সনের ১২ নং আইন), তারিখ ১০ জুলাই ২০১৯। এই আইন দ্য ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট, ১৯২০ রহিত করে প্রণীত হয়। আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ, সদয় আচরণ প্রদর্শন ও দায়িত্বশীল প্রতিপালনের মাধ্যমে প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিত করা আবশ্যক, এবং সে উদ্দেশ্যে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নতুন আইন করা হয়েছে। আইনটি বলছে, অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর কিছু থাকলেও এই আইনের বিধান প্রাধান্য পাবে।
আইনে ‘প্রাণী’র সংজ্ঞায় মানুষ ছাড়া সব স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ, মাছ ছাড়া অন্যান্য জলজ প্রাণী এবং সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করলে অন্য যেকোনো প্রাণী অন্তর্ভুক্ত; ফলে গৃহপালিত বিড়ালও এর আওতায় পড়ে। ‘মালিক’ মানে প্রাণীর আইনানুগ মালিক; আর ‘তত্ত্বাবধানকারী’ মানে এমন ব্যক্তি, যিনি মালিকের সম্মতিতে বা সম্মতি ছাড়া, স্বেচ্ছায় কিংবা কর্তৃপক্ষের আদেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো প্রাণী দখলে বা তত্ত্বাবধানে রেখেছেন। ‘মালিকবিহীন প্রাণী’ হলো মালিকানা বা দাবিদারবিহীন প্রাণী, অথবা যুক্তিসংগত অনুসন্ধানের পরও যার মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীকে পাওয়া যায় না। ধারা ৪ অনুযায়ী, প্রত্যেক মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীর দায়িত্ব প্রাণীর প্রতি কল্যাণকর ও মানবিক আচরণ করা এবং যৌক্তিক কারণ ছাড়া নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকা।
ধারা ৬-এ অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণের তালিকা দেওয়া আছে। এর মধ্যে রয়েছে এমন কোনো কাজ বা কাজ থেকে বিরত থাকা, যা প্রাণীর অসুস্থতার কারণ হয়; প্রাণীকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রহার করা; প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানি না দেওয়া; এমনভাবে বেঁধে বা আবদ্ধ করে রাখা, যাতে প্রাণীটি স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে, বসতে বা শুতে পারে না; নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ধারালো ধাতব বস্তু দিয়ে প্রহার বা আঘাত করা; অসুস্থ অবস্থায় বা মৃত্যু ঘটানোর জন্য প্রাণীকে লোকালয়ে ছেড়ে দেওয়া; প্রাণীকে লড়াইয়ে প্ররোচিত করা বা টোপ হিসেবে ব্যবহার করা; এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর কোনো পদার্থ সেবন করানো। সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে আরও আচরণকে এর অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। ধারা ৬(৩) অনুযায়ী এমন নিষ্ঠুর আচরণ করা বা তাতে সহযোগিতা করা অপরাধ।
ধারা ৬(৪)-এ এমন কিছু কাজের কথাও বলা আছে, যা অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ হিসেবে গণ্য হবে না। যেমন: প্রাণীটির নিজের বা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রাণীর প্রাণ সংশয়ের হুমকি দূর করতে সৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ; নিশ্চিত জলাতঙ্কগ্রস্ত বা অন্য অনিরাময়যোগ্য সংক্রামক রোগে আক্রান্ত প্রাণীকে সরকার বা সরকার-অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের মান অনুসরণ করে ব্যথাহীন মানবিক উপায়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা; খাদ্যের জন্য জবাই বা ধর্মীয় উৎসর্গে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার অনুসরণ; সরকার-স্বীকৃত শিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও গবেষণার কাজ; এবং বন্যপ্রাণী আইনের অধীনে নেওয়া ব্যবস্থা।
প্রাণী হত্যা ও ক্ষতিসাধন নিয়ে আরও তিনটি ধারা আছে। ধারা ৭ বলছে, আইনে উল্লিখিত কারণ ছাড়া কোনো মালিকবিহীন প্রাণী নিধন বা অপসারণ করা যাবে না, এবং মালিকবিহীন প্রাণী হত্যা অপরাধ। ধারা ১০(১) অনুযায়ী প্রাণীর ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে প্রাণিদেহের কোনো সংবেদনশীল টিস্যু অপসারণ, অঙ্গ কর্তন বা শারীরিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটানো, এর চেষ্টা করা বা এতে সহায়তা করা অপরাধ; তবে ধারা ১০(২) অনুযায়ী ভেটেরিনারি সার্জনের লিখিত অনুমতি নিয়ে পরিচর্যা ও স্বাস্থ্য-সুরক্ষার প্রয়োজনে শিং কর্তন, লেজ কর্তন বা ক্যাস্ট্রেশনের মতো কাজ করা যায়। ধারা ১১(১) অনুযায়ী বিষাক্ত বা অনিষ্টকর জেনেও প্রাণীকে এমন ওষুধ বা খাবার খাওয়ানো বা দেহে বিষ প্রয়োগ করা, যার ফলে প্রাণীর মৃত্যু, স্থায়ী অঙ্গহানি বা স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়, অপরাধ।
দণ্ড কত, আর আদালতে মামলা নেওয়ার এখতিয়ার কার
ধারা ১৬-তে দুই স্তরের দণ্ড রয়েছে। ধারা ৬(৩) (অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ), ধারা ৭(২) (মালিকবিহীন প্রাণী হত্যা) এবং পরিবহন, পোষা প্রাণীর বাণিজ্যিক উৎপাদন, কলাকৌশল প্রদর্শনকারী প্রাণী ও পরিদর্শনে বাধা-সংক্রান্ত আরও কয়েকটি বিধানের অধীন অপরাধ করলে বা তাতে সহায়তা করলে অনধিক ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। ধারা ১০(১) (অঙ্গহানি) বা ধারা ১১(১) (বিষ প্রয়োগ)-এর অধীন অপরাধের দণ্ড অনধিক দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। আদমদীঘির ঘটনায় এর কোন বিধান প্রযোজ্য হবে, কিংবা আদৌ হবে কি না, তা নির্ধারণের ভার কর্তৃপক্ষ ও আদালতের; ৬ নভেম্বরের প্রতিবেদনগুলোতে কেবল অভিযোগ দায়ের ও তদন্ত শুরুর কথা ছিল।
আইনটি সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা দিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগকে। ধারা ১৮ বলছে, কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ করবেন না। ধারা ২ অনুযায়ী ‘কর্তৃপক্ষ’ মানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অধিদপ্তরের কোনো ভেটেরিনারি সার্জন। ধারা ১৯ অনুযায়ী এই আইনের সব অপরাধ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য। ধারা ২০ বলছে, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত হওয়া সাপেক্ষে এসব অপরাধ মোবাইল কোর্টে বিচার করা যাবে।
প্রাণী রক্ষায় কর্তৃপক্ষের কিছু ক্ষমতাও আছে। ধারা ১৪ অনুযায়ী কোনো প্রাণী সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে বলে মনে হলে বা কেউ এমন খবর দিলে কর্তৃপক্ষ সংকট প্রশমনে ব্যবস্থা নিতে পারে, মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীকে নির্দেশ দিতে পারে, অথবা প্রাণীটিকে উদ্ধারে থানা, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে পারে। ধারা ১৫ অনুযায়ী এই আইনের অধীন অপরাধের শিকার প্রাণীকে কর্তৃপক্ষ আটক করে চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য সরকারি ভেটেরিনারি হাসপাতাল বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে পারে।
প্রাণীর ক্ষতিসাধন নিয়ে আলাদা ও পুরোনো একটি আইনেও বিধান আছে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০ প্রাণী হত্যা, বিষ প্রয়োগ, বিকলাঙ্গ করা বা অকেজো করে দেওয়াকে ‘রিষ্টি’ (mischief) হিসেবে গণ্য করে। ধারা ৪২৮ অনুযায়ী ১০ টাকা বা তার বেশি মূল্যের প্রাণীর ক্ষেত্রে এমন রিষ্টির শাস্তি যেকোনো বর্ণনার অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। ধারা ৪২৯ অনুযায়ী হাতি, উট, ঘোড়া, খচ্চর, মহিষ, ষাঁড়, গাভী বা বলদ, মূল্য যা-ই হোক, অথবা ৫০ টাকা বা তার বেশি মূল্যের অন্য যেকোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে শাস্তি অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
বাস্তবে আইনটি কতটা কাজে লেগেছে
২০১৯ সালের আইনটির ব্যবহার কম, প্রতিবেদনের এই মন্তব্যের প্রতিধ্বনি আগের কয়েক মাসে আইনজীবী ও প্রাণিকল্যাণকর্মীদের কথাতেও পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই দ্য ডেইলি স্টার বাংলা আইনটি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উপলক্ষ ছিল সেই সপ্তাহে বরিশালের বাকেরগঞ্জে একটি কুকুরকে গাছে বেঁধে ঝুলিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা। পত্রিকাটি জানায়, ঘটনায় জড়িত ছিলেন চারজন; উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁদের একজন, ৪২ বছর বয়সী এক শ্রমিককে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন, আর বাকি তিনজন কিশোর হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। কোনো ফৌজদারি মামলা হয়নি।
একই প্রতিবেদনে আগের দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি আবাসিক ভবনে এক ব্যক্তি লাথি মেরে একটি বিড়ালকে হত্যা করেন, আদালত তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন এলাকায় অন্তত ১০টি কুকুর-বিড়ালকে বিষ মেশানো খাবার খাইয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে; পত্রিকাটির ভাষ্য, সে ঘটনায় মামলার পর অভিযুক্তরা শাস্তি পান। প্রথম আলো ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর জানিয়েছিল, আগের রাতে জাপান গার্ডেন সিটিতে তিনটি বেওয়ারিশ কুকুর ও একটি বিড়াল মারা যায়; একটি প্রাণিকল্যাণ ফাউন্ডেশন এটিকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে আদাবর থানায় অভিযোগ দেয়। থানার ওসি তখন জানান, পুলিশ সংশ্লিষ্টদের বলেছে যে বেওয়ারিশ কুকুর বা বিড়ালকে বিষ খাইয়ে হত্যা অপরাধ, আর ফাউন্ডেশনটিকে আদালতে মামলা করতে বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, প্রাণিকল্যাণ আইন সম্পর্কে মানুষের ধারণা খুবই কম, আর এর প্রয়োগেও নানা জটিলতা আছে। তাঁর ব্যাখ্যায়, অপরাধগুলো অ-আমলযোগ্য হওয়ায় পুলিশ বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার বা আদালতের অনুমতি ছাড়া তদন্ত করতে পারে না; আর ধারা ২০-এ মোবাইল কোর্টে বিচারের সুযোগ রাখা হলেও আইনটি তখনো ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের তফসিলভুক্ত হয়নি, যদিও পুরোনো ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট তফসিলে ছিল। অভয়ারণ্য-বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পত্রিকাটিকে বলেন, আইনটি শাস্তির জন্য কার্যকর নয়, এটি প্রয়োগের জন্য পৃথক কোনো ইউনিট বা বাহিনী নেই, ফলে অনেক প্রাণী নির্যাতনের মামলা বিচার ছাড়াই নিষ্পত্তি হয়ে যায়; আর তখন প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার যত মামলা হচ্ছিল, সবগুলোর শাস্তি হচ্ছিল দণ্ডবিধি অনুযায়ী।

গৃহপালিত বিড়াল
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বিড়াল কার্নিভোরা বর্গের ফেলিডি গোত্রের প্রাণী; এই গোত্রে প্রায় ৩৪টি প্রজাতি আছে, যারা সাধারণত একাকী চলাফেরা করা মাংসাশী শিকারি। এদের দাঁত বিদ্ধ ও কাটার উপযোগী, আর নখ শিকার আঁকড়ে ধরার জন্য। এরা ছোট থেকে বড় নানা মেরুদণ্ডী প্রাণী খায়, যার বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী ও পাখি, এবং ভালো গাছে চড়তে পারে। বিড়াল পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে হাঁটে; থাবার চারপাশের ঘন লোমের কারণে নিঃশব্দে শিকারের পিছু নিতে পারে। মাথার সামনের দিকে বসানো বড় চোখ এদের ভালো দ্বিনেত্র দৃষ্টি দেয়। দিনের আলোয় এরা ভালো দেখে, রাতের দেখার জন্যও চোখ বিশেষভাবে অভিযোজিত; বড় ও নড়নক্ষম কানে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ ধরতে পারে, আর লম্বা শক্ত গোঁফ স্পর্শে খুবই সংবেদনশীল।
বাংলাপিডিয়া বলছে, গৃহপালিত বিড়াল আফ্রিকান বনবিড়ালের পোষ মানানো রূপ। এই বনবিড়াল এখনো আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে এবং গৃহপালিত বিড়ালের সঙ্গে অবাধে প্রজনন করে; মিসর থেকে গৃহপালিত বিড়াল ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়েছে। ২০০৭ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত, ৯৭৯টি গৃহপালিত বিড়াল ও তাদের বুনো আত্মীয়দের ওপর করা এক জিনগত গবেষণায় দেখা যায়, বিড়ালকে পোষ মানানো হয়েছিল নিকট প্রাচ্যে, সম্ভবত উর্বর চন্দ্রকলা অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক গ্রাম গড়ে ওঠার সময়ে; আর গৃহপালিত বিড়ালেরা ওই অঞ্চলের অন্তত পাঁচটি আদি পূর্বপুরুষের বংশধর, যাদের উত্তরসূরিদের মানুষই সারা বিশ্বে নিয়ে গেছে।
বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, বাংলাদেশে বাঘ থেকে শুরু করে বনবিড়াল ও মেছোবিড়াল পর্যন্ত আটটি বুনো বিড়াল প্রজাতি আছে, যার ছয়টি নানা ধরনের হুমকির মুখে। গ্রামের বাড়িতে পোষা গৃহপালিত বিড়াল এসব বুনো প্রজাতি থেকে আলাদা প্রাণী।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথ (ডব্লিউওএএইচ), যার মানের কথা ২০১৯ সালের আইনেও উল্লেখ আছে, স্থলচর প্রাণীর কল্যাণে তাদের কাজের ভিত্তি হিসেবে ‘পাঁচ স্বাধীনতা’ নীতিকে গ্রহণ করেছে। ১৯৬৫ সালে প্রণীত এই নীতিতে মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রাণীর যে অবস্থা পাওয়া উচিত, তা বলা হয়েছে: ক্ষুধা, অপুষ্টি ও তৃষ্ণা থেকে মুক্তি; ভয় ও মানসিক কষ্ট থেকে মুক্তি; তাপজনিত চাপ বা শারীরিক অস্বস্তি থেকে মুক্তি; ব্যথা, আঘাত ও রোগ থেকে মুক্তি; এবং স্বাভাবিক আচরণ প্রকাশের স্বাধীনতা। সংস্থাটির বৈশ্বিক প্রাণিকল্যাণ কৌশল ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে উপস্থাপিত হয় এবং ২০১৭ সালে সব সদস্যদেশ তা গ্রহণ করে।
আদমদীঘি ও বগুড়া
আদমদীঘি রাজশাহী বিভাগের বগুড়া জেলার একটি উপজেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ১৬৮.৮৩ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে আক্কেলপুর ও দুপচাঁচিয়া উপজেলা, দক্ষিণে রানীনগর উপজেলা, পূর্বে কাহালু ও নন্দীগ্রাম উপজেলা এবং পশ্চিমে নওগাঁ সদর উপজেলা। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ১,৯৫,১৮৬। আদমদীঘি থানা গঠিত হয় ১৮২১ সালে, উপজেলায় রূপান্তরিত হয় ১৯৮৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। রেলওয়ে জংশন সান্তাহার এই উপজেলাতেই।
বাংলাপিডিয়ায় উপজেলার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, আলু, গম, সরিষা ও শাকসবজি এবং প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল ও পেঁপের নাম আছে; প্রধান রপ্তানিদ্রব্যের মধ্যে ধান ও আলু। সেখানে ৩২টি মৎস্য হ্যাচারি, ৭৫টি গবাদিপশুর খামার, ৩৩টি হাঁস-মুরগির খামার এবং ৫৯৬টি চালকলের হিসাব দেওয়া আছে। নাগর ও ইরামতী নদী এবং রক্তদহ বিল এখানকার উল্লেখযোগ্য জলাশয়। অভিযোগ অনুযায়ী যে ধানখেতে বিড়ালটির মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়েছিল, এমন খেতই উপজেলার গ্রামগুলোর চারপাশের চেনা দৃশ্য।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ১৮২১ সালে বগুড়া জেলা প্রতিষ্ঠার সময় যে থানাগুলো নিয়ে জেলাটি গঠিত হয়, আদমদীঘি ছিল তার একটি। জেলার আয়তন ২,৮৯৮.৬৮ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৩৪,০০,৮৭৪। প্রধান নদীর মধ্যে আছে করতোয়া, যমুনা, নাগর, বাঙালি ও ইছামতী।

সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো
অভিযোগকারীর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন দেশে কাজ করা কয়েকটি প্রাণিকল্যাণ সংগঠনের একটি; ঢাকার আগের ঘটনাগুলো নিয়ে কাজ করেছে অন্য সংগঠনও, যেমন জাপান গার্ডেন সিটির ঘটনায় দ্য পিপল ফর অ্যানিমাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। এ ধরনের সংগঠন ঘটনা জানায়, অভিযোগ দেয় ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ দেয়; কিন্তু ২০১৯ সালের আইনের ধারা ১৮ অনুযায়ী এই আইনের অধীন অপরাধ আদালত বিচারার্থে গ্রহণ করতে পারে কেবল সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগে।
সেই বিভাগ হলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী অধিদপ্তরটি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির জন্য ভেটেরিনারি সেবা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সেবা দেয়। এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের সিভিল ভেটেরিনারি ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে; একই বছর বেঙ্গল ভেটেরিনারি ইনস্টিটিউট ও একটি ভেটেরিনারি হাসপাতালও প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশভাগের পর একে পূর্ব পাকিস্তানের পশুপালন পরিদপ্তর হিসেবে পুনর্গঠিত করা হয় এবং ১৯৬০ সালে নাম হয় প্রাণিসম্পদ পরিদপ্তর। অধিদপ্তরের প্রধান মহাপরিচালক, যিনি প্রাণিকল্যাণ আইনে উল্লিখিত কর্তৃপক্ষ; প্রধান কার্যালয় ঢাকার ফার্মগেটে কৃষি খামার সড়কের প্রাণিসম্পদ ভবনে। উপজেলা পর্যায়ে অধিদপ্তরের প্রতিনিধিত্ব করেন আদমদীঘির উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার মতো কর্মকর্তারা, যিনি এ ঘটনায় বিড়ালটির মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠান।
ছবি: Moheen Reeyad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (৬ নভেম্বর ২০২৫), প্রথম আলো (৬ নভেম্বর ২০২৫), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (৩০ জুলাই ২০২৫), প্রথম আলো (২৩ নভেম্বর ২০২৪), প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ ও দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (বাংলাদেশ আইন, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ), বাংলাপিডিয়া (আদমদীঘি উপজেলা, বগুড়া জেলা, বিড়াল, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর), সায়েন্স (ড্রিসকল ও অন্যান্য, ২০০৭), ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথ





মন্তব্য
(০)