বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা ড. এম আব্দুল মোমিন ডেইলি বাংলাদেশে এক কলামে লিখেছেন, দেশের প্রথম উচ্চ ফলনশীল কালো চালের জাত ব্রি ধান১১৫ কৃষক ও ভোক্তা দুই পক্ষের জন্যই সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। তাঁর যুক্তি, কালো বা কালচে-বেগুনি ধানের চাষ এশিয়ায় পুরোনো, কিন্তু বাধা ছিল ফলন। ফিলিপাইনের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছেন, রঙিন এসব ধানের ফলন হেক্টরে মাত্র ২ থেকে ৩ টন, তাই চাহিদা থাকলেও সরবরাহ সীমিত আর দাম সাধারণের নাগালের বাইরে ছিল।
লেখকের দেওয়া তথ্যে, ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় জাতটি সারা দেশে চাষের জন্য ছাড় পায়। ব্রির বায়োটেকনোলজি বিভাগের বিজ্ঞানীরা অ্যান্থার কালচার পদ্ধতিতে, অর্থাৎ পরাগধানী থেকে টিস্যু কালচারে চারা তৈরি করে, অপেক্ষাকৃত কম সময়ে স্থিতিশীল জাতটি পেয়েছেন। গড় ফলন হেক্টরে প্রায় ৭.৪ টন, জীবনকাল ১৩৭ থেকে ১৪২ দিন। ধান লম্বা ও চিকন, খোসা কালচে বাদামি, ভেতরের চাল পুরো কালো। ১ হাজার পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ১৭.৮ গ্রাম, অ্যামাইলোজ ২৩ শতাংশ।
পুষ্টির হিসাবে লেখক জানিয়েছেন, প্রতি কেজি চালে প্রায় ১৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন-ই এবং ২৯.১২ মিলিগ্রাম সায়ানিডিন-৩-গ্লুকোসাইড আছে। তিনি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, কালো চাল পূর্ণশস্য বলে এতে সাদা চালের চেয়ে আঁশ ও প্রোটিন বেশি; প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনো সাদা চালে আঁশ ০.৪ গ্রাম, কালো চালে প্রায় ৪.৯ গ্রাম, যদিও জাতভেদে তা বদলায়। উপকারী ফেনলিক ও অ্যান্থোসায়ানিন উপাদানের বড় অংশ (যথাক্রমে ৭৩ ও ৯১ শতাংশের বেশি) থাকে তুষের স্তরে, তাই বেশি পালিশ করলে সেই গুণ হারিয়ে যায়। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, ভিটামিন-ই-এর জন্য শুধু এই চালের ওপর নির্ভর করা চলবে না; কালো চাল সুষম খাদ্যের পরিপূরক, বিকল্প নয়।
বাজারের দিক থেকে লেখকের মত, বিশ্বজুড়ে কালো চাল প্রিমিয়াম পণ্য, সাধারণ লালচে বা বাদামি চালের চেয়ে দাম তিন থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। দেশে এর চাহিদার পেছনে তিনি চারটি কারণ দেখছেন: ডায়াবেটিস ও স্থূলতা নিয়ে শহুরে মানুষের সচেতনতা, সুপারশপ ও অনলাইনে "স্বাস্থ্যকর চাল" নামে আলাদা বাজার, দেশে উৎপাদন হলে আমদানি কমা, এবং প্রবাসী বাংলাদেশি ও এশীয় স্বাস্থ্যখাদ্যের বাজারে রপ্তানির সুযোগ। হেক্টরে ৭.৪ টন ফলন বেশি দামে বিক্রি করা গেলে কৃষকের লাভ হবে বলে তাঁর ধারণা।
চ্যালেঞ্জও দেখিয়েছেন লেখক। চড়া দামে সাধারণ মানুষের পাতে পৌঁছানো কঠিন, তবে উৎপাদন বাড়লে দাম কমবে বলে তিনি মনে করেন। স্বাদ, গন্ধ ও রান্নার নিয়ম আলাদা হওয়ায় রেসিপি প্রচার এবং স্কুল বা হাসপাতালের খাদ্যতালিকায় পরীক্ষামূলকভাবে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। বেশি লাভের আশায় রং মেশানো ভেজাল কালো চাল বাজারে ঢোকার ঝুঁকি আছে, তাই জাতের নাম দিয়ে ব্র্যান্ডিং ও মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কৃষকের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চাষ, সঠিক গুদামজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে কৃষক, উদ্যোক্তা ও ব্রির মধ্যে শক্ত সমন্বয়ের কথাও বলেছেন তিনি।
শেষে তিনি লিখেছেন, ভালো বীজের সরবরাহ, কৃষকের প্রশিক্ষণ আর বাজার ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে এগোলে এই চাল শুধু শহরের সুপারশপের তাকে আটকে থাকবে না। লেখার মতামত লেখকের নিজস্ব।
ছবি: Anna Frodesiak / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ





মন্তব্য
(০)