সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ভাসমান টার্মিনাল বা ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। সেখান থেকে পাইপলাইনে গ্যাস মোংলায় নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানায় ব্যবহারের কথা। সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে নৌপরিবহনমন্ত্রী, বিদ্যুৎমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি দল জায়গাটি দেখে এসেছে, আর ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্থানটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
আকরাম পয়েন্ট সুন্দরবনের ভেতরে পশুর ও শিবসা নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনার কাছে। এর ৬০ কিলোমিটার উজানে মোংলা বন্দর, ৩০ কিলোমিটার ভাটিতে হিরণ পয়েন্ট। দুই পাশে সুন্দরবনের দুটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, উত্তর-পশ্চিমে শিবসা ডলফিন অভয়ারণ্য; এলাকায় গাঙ্গেয় ডলফিন (শুশুক) ও ইরাবতী ডলফিনের অবাধ বিচরণ। ২০২৩ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় গ্যাস টার্মিনাল লাল শ্রেণির, অর্থাৎ সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৯৯ সালে সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটারকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সেখানে বনের জন্য ক্ষতিকর শিল্প নিষিদ্ধ করা হয়।
সোমবার এক আলোচনা সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, খুলনার কাছে ২০ মিটার ড্রাফটের একটি জায়গায় বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও এলএনজি খালাসের আধুনিক টার্মিনাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) শেখ শওকত আলীর মতে, টার্মিনাল হলে নিয়মিত চ্যানেল খননে অন্য জাহাজও সহজে বন্দরে আসতে পারবে। দেশে এখন কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল আছে।
বন বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, মতামত চাওয়া হলে তাঁরা সুন্দরবন নিয়ে উদ্বেগ জানাবেন। পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল ইসলামও বলেছেন, তাঁদের এখনো কিছু জানানো হয়নি। এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মনে করিয়ে দিয়েছেন, সুন্দরবন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য ও রামসার সাইট; রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আগে একে 'ঝুঁকিপূর্ণ ঐতিহ্যের' তালিকায় তোলার উদ্যোগ হয়েছিল।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুণ চৌধুরী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও সুন্দরবনের সংবেদনশীলতার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তাই আগে যথাযথ পরিবেশ প্রতিক্রিয়া যাচাই (ইআইএ) ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা দরকার। সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, এলএনজি মূলত দাহ্য মিথেন, ত্রুটি বা লিকেজে আগুন লাগলে বন ঝুঁকিতে পড়বে; চলতি বছর মহেশখালীর টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, রিগ্যাসিফিকেশনে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহারে আশপাশের নদীর পানি অনেক ঠান্ডা হয়ে যায়, যা পশুর ও শিবসার মাছের ডিম ও জলজ অণুজীবের জন্য ক্ষতিকর। ট্যাঙ্কার চলাচল আর পাম্পিংয়ের শব্দ ও কম্পন ডলফিনের প্রজনন ব্যাহত করবে বলেও মনে করেন তিনি। সমকাল উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গালফ উপকূলে এলএনজি টার্মিনালের কারণে ৫,৪১১ একর ভূমি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১,১২৩ একর জলাভূমির বন বিলুপ্ত হয়েছে বলে রেইনফরেস্ট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে এসেছে।
সুন্দরবনের নদীর মাছ ও পোনা, আর সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল জেলেদের জীবিকার জন্য প্রকল্পের পরিবেশ যাচাই কতটা কঠোর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ছবি: Mithun Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)