বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক কলামে মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইমদাদুল হক তালুকদার লিখেছেন, বিজ্ঞান যাকে চিকিৎসাযোগ্য রোগ বলছে, বাংলাদেশের আইন ও সমাজ এখনো তাকে অপরাধ হিসেবে দেখছে। এর ফলে আসক্ত বা মানসিক সংকটে থাকা মানুষ সহমর্মী চিকিৎসার বদলে শাস্তির মুখে পড়ছেন। মতামতগুলো লেখকের নিজের।
তাঁর প্রথম উদাহরণ আত্মহত্যার চেষ্টা। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের ডিএসএম-ফাইভ-টিআর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আইসিডি-ইলেভেন একে গভীর মানসিক যন্ত্রণা বা বিষণ্নতার চরম প্রকাশ হিসেবে দেখে। অথচ ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টা এখনো দণ্ডনীয় অপরাধ। লেখকের মতে, এই ভয়ে পরিবারগুলো ঘটনা লুকিয়ে রাখে এবং মানুষটি সময়মতো চিকিৎসা পান না।
মাদকাসক্তির ক্ষেত্রেও একই সংঘাত দেখছেন তিনি। স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণার উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, মাদকাসক্তি মস্তিষ্কের দীর্ঘস্থায়ী ও বারবার ফিরে আসা একটি ব্যাধি। কিন্তু ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ব্যবহারকারীকেও কঠোর অপরাধী হিসেবে দেখে, আর কারাগারে বিজ্ঞানসম্মত ডিটক্সিফিকেশন বা সাইকোথেরাপির সুযোগ নামমাত্র।
তৃতীয় বিষয় জুয়ার আসক্তি। লেখকের মতে, স্মার্টফোনে অবৈধ অনলাইন বেটিং অ্যাপের মাধ্যমে তরুণ ও প্রান্তিক মানুষের মধ্যে এই সংকট দ্রুত ছড়াচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমের বৈকল্য, অথচ ১৮৬৭ সালের প্রকাশ্য জুয়া আইন ও সাইবার নিরাপত্তাকাঠামো একে কেবল অপরাধ হিসেবে দেখে।
অন্য দেশের উদাহরণও দিয়েছেন তিনি। পর্তুগাল ২০০১ সালে ব্যক্তিগত মাদক ব্যবহারকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ব্যবহারকারীদের মনোবিজ্ঞানী ও সমাজকর্মীদের কমিশনের কাছে পাঠানোর নিয়ম করে। যুক্তরাজ্য ১৯৬১ সালে আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধমুক্ত করে, আর ভারতের ২০১৭ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইনের ১১৫ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টাকারীকে তীব্র মানসিক চাপে থাকা রোগী হিসেবে দেখে তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়ার কথা বলা আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় মানসিক স্বাস্থ্য আদালত শাস্তির বদলে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পথ খুলে দিয়েছে।
লেখকের প্রস্তাব: দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা বাতিল করে আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধমুক্ত করা; মাদক নিয়ন্ত্রণ, জুয়া ও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত আইনকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডে হালনাগাদ করা; এবং পুলিশ, আইনজীবী ও বিচারকদের জন্য মনের অসুখ আর ফৌজদারি অপরাধের পার্থক্য বোঝার বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা।
তাঁর ভাষায়, মানসিক যন্ত্রণায় থাকা মানুষকে হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখা নয়, সহমর্মিতা, সাইকোথেরাপি ও মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের দিকে নিয়ে আসাই সভ্য সমাজের পথ। মানসিক সংকটে থাকলে বা কারও জন্য উদ্বিগ্ন হলে দেরি না করে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
ছবি: Yahya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0); ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)