সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা২৫°আংশিক মেঘলাআর্দ্রতা ৯০%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

অবিক্রীত ৩১ লাখ কোরবানির পশু বাড়াল খামারিদের লোকসান

২০২৬ সালের ২৮ মে ঈদুল আজহায় দেশে প্রস্তুত ১ কোটি ২৩ লাখ পশুর মধ্যে কোরবানি হয়েছে প্রায় ৯২ লাখ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩১ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু অবিক্রীত থেকে যাওয়ায় লোকসান ও বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন খামারিরা।

অবিক্রীত ৩১ লাখ কোরবানির পশু বাড়াল খামারিদের লোকসান
লাইভস্টক

২০২৬ সালের ২৮ মে অনুষ্ঠিত ঈদুল আজহার পর সারা দেশে খামারিদের তোলা প্রায় ৩১ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে। ৪ জুন ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে খামারি ও ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদুল আজহাকে ঘিরেই তারা সারাবছরের স্বপ্ন বুনেছিলেন; কোরবানির হাটে গরু-ছাগল বিক্রি করে কিছুটা লাভের আশা ছিল তাদের। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অনেকের পশু অবিক্রীত থেকে যায়। হাট থেকে ফিরিয়ে আনা এসব পশুর খাবার, ওষুধ ও পরিচর্যার খরচ এখনো বহন করতে হচ্ছে তাদের। একদিকে লোকসান, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয়ের চাপ; সবমিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারিরা। খামারিদের ভাষায়, অবিক্রীত এসব পশুই এখন তাদের জন্য লোকসানের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এবারের কোরবানির হিসাব


প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবছর কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ। চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার। আর কোরবানি হয়েছে প্রায় ৯২ লাখ, অর্থাৎ চাহিদার চেয়েও প্রায় ৯ লাখ কম পশু কোরবানি হয়েছে। ফলে খামারিদের প্রায় ৩১ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে। ঈদের আগে অধিদপ্তর সরবরাহ ধরেছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু এবং চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি; এর মধ্যে গরু-মহিষ ছিল ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য পশু কয়েক হাজার। অর্থাৎ হিসাবটি ছিল চাহিদার চেয়ে বেশি সরবরাহের, যা শেষ পর্যন্ত অবিক্রীত পশুর স্তূপে রূপ নেয়।

এসব বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোরবানি প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা কম হয়েছে বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি। মাঠপর্যায় থেকে এখনো তথ্য সংগ্রহ চলছে। বৃহস্পতিবারের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে।’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবিক্রীত পশুর চাপে শেষ সময়ে এসে লোকসানে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও খামারিরা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমে গেছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণ।

আগের বছরের চেয়ে সামান্য বেশি, তবু নিচে


গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানি সামান্য বেড়েছে। ২০২৫ সালে কোরবানি হয়েছিল প্রায় ৯১ লাখ পশু। তবে সেই সংখ্যাও তার আগের বছরের (২০২৪) চেয়ে প্রায় ১৩ লাখ কম ছিল; ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় সারাদেশে প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে কোরবানির সংখ্যা তার সর্বোচ্চ ধাপ থেকে নেমে এসেছে, আর একইসঙ্গে দেশের ভেতরে প্রস্তুত পশুর সরবরাহ বেড়েছে। ঈদের আগে ২২ মে ২০২৬ ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, সরবরাহ বাড়তে থাকায় এবার চাহিদার চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত ছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ঈদুল আজহার কোরবানির বাজারে। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে পশুর দাম দ্রুত বেড়েছে, যা এখন নিম্ন থেকে নিম্নমধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘খামারিদের নানা খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার পশুর দাম বেড়েছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তারা প্রতিদিনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভালো মানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় পদের কর্মী ছাড়া ব্যবসায়ীদেরও মন্দাভাব চলছে। যে কারণে আগে যারা একা একটি পশু কোরবানি দিতেন, তারা এবার ভাগে কোরবানি দিয়েছেন। যারা ছোট গরু দিতেন, তারা ছাগল দিচ্ছেন। আর যারা অনেক কষ্টে দিতেন, তারা এবার আর দিতে পারেননি।’

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতা এখনো কাটেনি। এর মধ্যে দ্রুত পশুর দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই গরু কিনতে এক লাখ বা তার বেশি টাকা খরচ করার সামর্থ্য রাখেন না। যে কারণে তারা ছাগল কিনছেন, অথবা উপায় না পেয়ে কেউ কোরবানি দিচ্ছেন না। আর্থিক দুর্বলতা এখন কোরবানি কমে যাওয়ার বড় কারণ।’

কোরবানি কী, কেন বাড়ল ভাগে কোরবানি


ঈদুল আজহা মুসলিমদের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের একটি এবং এটি হিজরি বর্ষের জিলহজ মাসের ১০ তারিখে পড়ে। উৎসবের তিন দিন সামর্থ্যবান পরিবারগুলো অনুমোদিত পশু কোরবানি করে এবং মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করে; প্রচলিত রীতিতে মাংসের এক ভাগ পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-প্রতিবেশীর জন্য এবং এক ভাগ দরিদ্রদের জন্য রাখা হয়। বাংলাদেশে কোরবানির পশু মূলত গরু, সঙ্গে ছাগল, মহিষ ও ভেড়া। একটি ছাগল বা ভেড়া এক ভাগ হিসেবে গণ্য হয়, আর একটি গরু, মহিষ বা উট সর্বোচ্চ সাতজনে ভাগ করে কোরবানি করা যায়, যেখানে প্রত্যেকে সমান অংশ পান। এই ভাগাভাগির রীতিকেই খামারি ও অর্থনীতিবিদরা ‘ভাগে কোরবানি’ বলছেন।

খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই ভাগে কোরবানির প্রবণতাই বেড়েছে। আগে যারা একটি গোটা পশু কিনতেন, তারা এখন কয়েকটি পরিবার মিলে একটি পশু কিনছেন; আর যারা আগে গরু দিতেন, তারা তুলনামূলক সস্তা একটি ছাগলে নেমে এসেছেন। ঢাকার ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মকবুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার ভাগে কোরবানি বেড়েছে। গতবার আমাদের খামার থেকে যে পরিমাণ ভাগে কোরবানি হয়েছিল, তার তুলনায় এবার হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। এছাড়া অনেকে কোরবানিও করেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘খামার থেকে প্রতিবার গরু নেন কিংবা ভাগে কোরবানি করতেন এমন অনেক ক্রেতাকে পেয়েছি, যারা এবার কোরবানি করেননি।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও কিছুটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে কোরবানির বাজারে।

কোরবানির পশুকে কিছু পুরোনো শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রচলিত রীতিতে একটি গরু বা মহিষের বয়স হতে হয় অন্তত দুই বছর এবং একটি ছাগল বা ভেড়ার অন্তত এক বছর; পশুটিকে সুস্থ হতে হয় এবং খোঁড়া, অন্ধ বা অতিরিক্ত শীর্ণতার মতো বড় কোনো ত্রুটিমুক্ত হতে হয়। অনেকটা এ কারণেই খামারিরা ঠিক এই উৎসবকে লক্ষ্য করেই গরু পালেন ও মোটাতাজা করেন, যাতে হাটের ওই কয়েক দিনের জন্য একটি সুস্থ ও ভালোভাবে বেড়ে ওঠা পশু প্রস্তুত থাকে। নির্দিষ্ট একটি ওজনে এই সময়ের জন্য তৈরি করা পশু পরে সহজে ধরে রাখা বা অন্য কোথাও বিক্রি করা কঠিন; আর সে কারণেই বিক্রি না হওয়ার ধাক্কাটা এত বড় হয়ে ওঠে।

ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের একটি ছাগল। খরচ বাঁচাতে এবার অনেক পরিবার গরুর বদলে ছাগল কোরবানি দিয়েছেন। ছবি: Rezowan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের একটি ছাগল। খরচ বাঁচাতে এবার অনেক পরিবার গরুর বদলে ছাগল কোরবানি দিয়েছেন। ছবি: Rezowan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ঈদের পর ওজন কমা ও খাদ্যের খরচ


খামারিরা বলছেন, কোরবানির হাট থেকে ফিরিয়ে আনা পশু ধকল সামলাতে গিয়ে প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ে, শরীর ভেঙে যায়। এরপর বিক্রির আগ পর্যন্ত এর খাবার ও ওষুধসহ লালন-পালনের পুরো খরচটাই বাড়তি। ঠিক এই সময়ে, কোরবানির পরে, অবিক্রীত পশুর চাপে হাটে দাম পড়ে যায়, ফলে লোকসান আরও গভীর হয়।

বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘যদিও একটি খামারের সবগুলো গরু হাটে নেওয়া হয় না, তবে বাস্তবতা হচ্ছে একটি ৫-৬ মণ ওজনের গরু (প্রায় ১৮৫ থেকে ২২৫ কেজি) কোরবানিতে বিক্রি না হলে সেটা পরে ৫০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হারায়। কারণ এ গরুগুলো ঠিক কোরবানি কেন্দ্র করেই প্রস্তুত করা। যে কারণে যাদের গরু বিক্রি হয়নি তারা এখন প্রচুর লোকসানে পড়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘এমনিতেই গত কয়েক বছর পশুখাদ্য, ওষুধ ও খামার পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়ছে। বিষয়টি সরকারের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’

ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘খামারিরা এবার কোরবানিতে যে পরিমাণ পশু বিক্রির জন্য বাজারে তুলেছিলেন, তার মধ্যে বড় একটি অংশ অবিক্রীত রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের শেষদিক থেকে কোরবানির আগ পর্যন্ত গো-খাদ্যের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু খামারিরা গত বছরের দামে গরু বিক্রি করেছেন। ঈদের দুই-একদিন আগে দাম আরও কমে যায়। তখন অধিকাংশ খামারিকে লোকসানে গরু বিক্রি করতে হয়েছে, তারপরও যাদের রয়ে গেছে তাদের অবস্থা আরও খারাপ।’

খামারে গরু মোটাতাজা করার খরচের বড় অংশই খাদ্য। দেশের গরু সাধারণত খড়, কাঁচা ঘাস ও সবুজ চারার পাশাপাশি চালের কুঁড়া, গমের ভুসি, ভুট্টা, খেসারি-মসুরের ভুসি ও তেলবীজের খৈল দিয়ে তৈরি ঘন খাদ্য (দানাদার খাদ্য) খায়, যার অনেক উপাদান আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজারে দানা ও খৈলের দাম বাড়ায় এবং টাকার মান কমায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গো-খাদ্যের খরচ বেড়েছে বলে খামারি সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে। এক বছর ধরে এই বাড়তি খরচে গরু মোটাতাজা করার পর বিক্রি না হলে প্রত্যাশিত লাভের বদলে খামারির ঘাড়ে চাপে গভীর লোকসান।

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতি


এই লোকসানের পেছনে রয়েছে এমন একটি খাত, যা ধীরে ধীরে গ্রামীণ বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৩-২৪’ অনুযায়ী, দেশে গরুর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ, ছাগল প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ, ভেড়া প্রায় ৩৯ লাখ এবং মহিষ প্রায় ১৫ লাখ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাংস উৎপাদন দাঁড়ায় ৯২ দশমিক ২৫ লাখ টন, যা আগের বছরের ৮৭ দশমিক ১০ লাখ টনের চেয়ে বেশি; আর দুধ উৎপাদন হয় ১৫০ দশমিক ৪৪ লাখ টন। ওই অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপির ১৬ শতাংশের বেশি জোগান দিয়েছে, আর খাতটির প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

এই খাতের পেছনে রয়েছে সরকারি কিছু বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ১৯৮৪ সালের একটি অধ্যাদেশের আওতায় ঢাকার কাছে সাভারে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৭ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করে; এটি গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও হাঁস-মুরগি নিয়ে গবেষণার দেশের প্রধান স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যার আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি, যেখান থেকে এই খাতের প্রয়োজনীয় কৃষি অর্থনীতিবিদ ও পশুচিকিৎসক তৈরি হন। কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, খাতটির পেছনের গবেষণা, জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কারণেই এক সময় সীমান্তের ওপার থেকে আসা গরুর জায়গা দেশের খামারগুলো নিতে পেরেছে।

এই উৎপাদন বৃদ্ধির কারণেই দেশ এখন কোরবানির পুরো চাহিদা নিজের খামার থেকেই মেটাতে পারে। এক সময় প্রতিবেশী ভারত থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আসা গরু ঈদের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করত, কিন্তু সেই সরবরাহ কমে যাওয়ার পর সরকার ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশে পশু পালনে উৎসাহ দেয়; ফলে চলতি দশকের মাঝামাঝি সময়ে কর্মকর্তারা প্রতি বছর চাহিদার চেয়ে বাড়তি পশুর কথা জানাতে থাকেন। ২০২৬ সালের হিসাবও সেই ধারাই অনুসরণ করেছে; চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১ লাখের বিপরীতে সরবরাহ ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি। তবে উদ্বৃত্ত সরবরাহ খামারিদের জন্য দুই ধারের তলোয়ার; কারণ ক্রেতারা হাত গুটিয়ে নিলে সেই উদ্বৃত্তই অবিক্রীত পশুর স্তূপে পরিণত হয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর আরও জানায়, বাংলাদেশ এখন মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং প্রাণিসম্পদ দেশের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস, পাশাপাশি গ্রামীণ আয় ও কর্মসংস্থানেরও বড় ভিত্তি। লাখ লাখ ক্ষুদ্র খামারির কাছে কয়েকটি পশু পালা একদিকে সঞ্চয়, অন্যদিকে দুঃসময়ের ভরসা; আর এ কারণেই বছরের একটিমাত্র বড় বিক্রির সময়ে লোকসানের প্রভাব খামারের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পড়ে।

দিনাজপুরের একটি গ্রামে গরু। সারা বছর ধরে গরু মোটাতাজা করে খামারি ও গৃহস্থরা ঈদুল আজহার বাজারের জন্য প্রস্তুত করেন। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
দিনাজপুরের একটি গ্রামে গরু। সারা বছর ধরে গরু মোটাতাজা করে খামারি ও গৃহস্থরা ঈদুল আজহার বাজারের জন্য প্রস্তুত করেন। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

মৌসুমি পশুর হাট ও খামারি


বছরের কোরবানিযোগ্য পশুর বড় অংশই ছোট ও মাঝারি খামারে এবং গ্রামীণ পরিবারে পালিত হয়, প্রায়ই কয়েকটি করে, আর একটি মাত্র বিক্রির লক্ষ্যে মাসের পর মাস ধরে মোটাতাজা করা হয়। ঈদের আগের সপ্তাহগুলোতে এসব পশু তোলা হয় কোরবানির হাটে, অর্থাৎ শহর-নগরে বসা অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুর হাটে, যার সবচেয়ে বড়গুলো ঢাকায়। মৌসুমি ব্যবসায়ী, যাদের বলা হয় ব্যাপারী, গ্রাম ও উত্তরাঞ্চল থেকে পশু কিনে বড় শহরের হাটে আনেন এবং হাট চালু থাকা কয়েক দিনের মধ্যেই বিক্রির আশা করেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অনলাইন বা ডিজিটাল পশুর হাটকেও উৎসাহ দিয়েছে, যেখানে ছবি ও ওজন দেখে পশু কেনাবেচা হয়। তবে বেচাকেনার মূল চাপ এখনো সরাসরি হাটেই। পুরো ব্যবসাটি যেহেতু অল্প কয়েক দিনের একটি সংক্ষিপ্ত সময়কে ঘিরে গড়ে ওঠে, তাই সময়মতো বিক্রিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অস্থায়ী এই কোরবানির হাটগুলোও নিজেই একেকটি ব্যবসা। ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশন প্রতিটি হাট পরিচালনার অধিকার ইজারা দেয়, আর ক্রেতারা প্রতিটি পশুর জন্য ইজারাদারকে একটি নির্দিষ্ট হারে হাসিল (বাজার মাশুল) দেন। পশু শহরে আনার পরিবহন খরচ, হাট চলাকালীন কয়েক দিন সেগুলোকে খাওয়ানো-পানি দেওয়ার খরচ এবং হাসিল; সবকিছুই নির্ভর করে দ্রুত বিক্রির আশার ওপর। পশু অবিক্রীত থেকে গেলে পালন খরচের ওপর এসব বাড়তি খরচও ব্যবসায়ী ও খামারিদের ঘাড়ে চাপে।

এই কয়েক দিনে যে পশু বিক্রি হয় না, তা কম খরচে ধরে রাখা যায় না; যে ওজন লক্ষ্য করে তাকে মোটাতাজা করা হয়েছিল সেই ওজন হারাতে হারাতে তাকে খাওয়াতে ও পরিচর্যা করতে হয়, আবার অন্য অবিক্রীত পশুতে ঠাসা বাজারেই তাকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। ডেইরি খামারিদের সংগঠন যেমন বলছে, গো-খাদ্যের দাম যখন রেকর্ড উচ্চতায়, তখন ধার করে সারা বছর গরু পালা খামারির জন্য একটি অবিক্রীত পশু প্রত্যাশিত লাভকে বদলে দেয় ক্রমবর্ধমান লোকসানে। এ কারণেই খামারিরা এসব অবশিষ্ট পশুকে লোকসানের ওপর বাড়তি আঘাত বলে বর্ণনা করছেন।

গ্রামের অনেক পরিবারের কাছে একটি কোরবানির পশু যেন চার পায়ে দাঁড়ানো সারাবছরের সঞ্চয়। একটি পরিবার একটি বাছুর বা অল্প বয়সী ষাঁড় কিনে আট থেকে বারো মাস খড়, ঘাস ও কেনা দানাদার খাদ্য খাইয়ে বড় করে, আর ঈদের একটিমাত্র বিক্রিই হয় সেই সব খরচ ও পরিশ্রমের প্রতিদান। যেহেতু এই প্রতিদান আসে বছরে একবার, তা-ও মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে, তাই সঠিক দামে পশুটি বিক্রি না হলে সারা বছরের যত্নে করা পালন এক লহমায় বৃথা হয়ে যেতে পারে।

এসব পরিবারের পাশাপাশি গত এক দশকে গড়ে উঠেছে প্রচুর বাণিজ্যিক গরু মোটাতাজাকরণ ও ডেইরি খামার, যার অনেকটি ঢাকার আশপাশে ও উত্তরাঞ্চলে। বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের মতো সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করা এসব খামারই সবচেয়ে বড় লোকসানে পড়ে, যখন বেশি খরচে ভালোভাবে মোটাতাজা করা একটি পশু বিক্রি হয় না; আর এসব সংগঠনের নেতারাই সরকারের কাছে পশুখাদ্য ও পরিচালন খরচের বৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছেন।

বাংলাদেশের একটি নদীর চরে গরুর পাল। দেশের অনেক গরু চর ও গ্রামীণ গৃহস্থালিতে পালিত হয়। ছবি: Water Alternatives Photos / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
বাংলাদেশের একটি নদীর চরে গরুর পাল। দেশের অনেক গরু চর ও গ্রামীণ গৃহস্থালিতে পালিত হয়। ছবি: Water Alternatives Photos / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)

সরকারের দৃষ্টি চান খামারিরা


উৎসব-পরবর্তী এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখে খামারি নেতারা তাদের পুরোনো দাবিটিই আবার তুলে ধরেছেন। ডেইরি ও ফ্যাটেনিং খামারিদের সংগঠন বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশুখাদ্য, পশু-চিকিৎসার ওষুধ ও খামার পরিচালনার খরচের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের মনোযোগ প্রয়োজন; তাদের আশঙ্কা, ঈদে বারবার লোকসান সেই ছোট ও মাঝারি খামারিদেরই নিরুৎসাহিত করতে পারে, যাদের হাত ধরে দেশ কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর তখনো মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করছিল; অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, কত পশু কোরবানি হলো এবং খামারিদের হাতে কত রয়ে গেল তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব ঈদের পরের বৃহস্পতিবারের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরার কথা ছিল।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৩-২৪); মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়; ঢাকা ট্রিবিউন।

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

মতামত

ভেটেরিনারি সার্জন নিয়োগে বিশেষ বিসিএসের পক্ষে দুই বিশেষজ্ঞের যুক্তি

ইত্তেফাকে প্রফেসর ড. মো. বাহানুর রহমান ও ডা. আর এস মাহমুদ হাসান লিখেছেন, প্রতি উপজেলায় চারজন ভেটেরিনারি সার্জন ও প্রতি ইউনিয়নে একজন ভেটেরিনারিয়ান নিয়োগের ঘোষণা কাজে লাগাতে তথ্যভিত্তিক জনবল পরিকল্পনা ও বিশেষ বিসিএস দরকার।

ইত্তেফাক১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

ওজন কমানোর ওষুধে বদলাচ্ছে মার্কিন বাজার, চাহিদা বাড়ছে মুরগি আর অল্প পরিমাণ ভালো গরুর মাংসে

কোব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান আর্নেস্ট বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চার পরিবারের একটিতে জিএলপি-১ ওষুধ সেবনকারী আছেন; তাঁরা আমিষবহুল মুরগি আর ছোট পরিমাণের ভালো মানের গরুর মাংস বেশি কিনছেন।

মিশিগান এজি টুডে৩১ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

বন্যার আগেই সহায়তা: দক্ষিণ সুদানে এফএও ও ডব্লিউএফপিকে ২১ লাখ পাউন্ড দিল যুক্তরাজ্য

এল নিনোর সম্ভাব্য বন্যা ও খরার আগে জঙ্গলেই, ইউনিটি ও আপার নাইলে আগাম সতর্কতা, নগদ সহায়তা, জীবিকা সুরক্ষা ও ত্রাণসামগ্রী মজুতে এই অর্থ খরচ হবে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত।

ডব্লিউএফপি৩১ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)