জাকাতের আটটি খাতের মধ্যে দুটি, ফি-সাবিলিল্লাহ ও ইবনিস-সাবিল, বাংলাদেশে কার্যত অব্যবহৃত, অথচ আজকের বাস্তুচ্যুত, শরণার্থী ও ছিন্নমূল মানুষের সংকটের সঙ্গে এই দুই খাতেরই সবচেয়ে সরাসরি সম্পর্ক। আমার দেশে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়তে এ যুক্তি দিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের অর্থায়নের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার ড. এম কবির হাসান। লেখার মতামত লেখকের নিজস্ব।
লেখক শুরু করেছেন দুটি সংখ্যা দিয়ে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের গত বছরের আগস্টের জরিপে দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও অতিদারিদ্র্য ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা ২০২২ সালের বিবিএস খানা জরিপে ছিল যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৭ ও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ বিভিন্ন গবেষণায় দেশে জাকাতের বার্ষিক সম্ভাব্য পরিমাণ ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা, আর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সরকারি জাকাত ফান্ডে ২০২২-২৩ অর্থবছরে জমা পড়েছিল ১০ কোটি ২১ লাখ টাকা।
সুরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে নির্ধারিত অষ্টম খাত ইবনিস-সাবিল বলতে বোঝায় নিজ সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথে অসহায় মুসাফিরকে। লেখকের মতে, কক্সবাজারের ১২ লাখ রোহিঙ্গা এবং আইওএমের জরিপে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ এই সংজ্ঞায় পড়েন। খলিফা উমর (রা.) নিঃস্ব পথিকের জন্য আটা, খেজুর ও পানি মজুত রাখার ঘর করেছিলেন, আর উমর ইবনে আবদুল আজিজের সময়ে পথে চলাচলকারীর অনুপাতে এই খাতের বরাদ্দের নির্দেশনা ছিল, যাকে লেখক চাহিদানির্ভর বাজেটিংয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ফি-সাবিলিল্লাহ খাতকে চার মাজহাবের অধিকাংশ ফকিহ জিহাদ-সংশ্লিষ্ট কাজে সীমিত রাখলেও রশিদ রিজা, মাহমুদ শালতুত ও ইউসুফ আল-কারজাভিসহ অনেকে একে সব কল্যাণমূলক কাজে প্রসারিত করেছেন, মক্কার ইসলামি ফিকহ একাডেমিও শিক্ষা ও গবেষণাকে এর আওতায় এনেছে। লেখক স্বীকার করেছেন, তামলিক (প্রাপককে মালিক বানানো) ও খাতের সীমা নিয়ে আপত্তি গুরুতর; তাই প্রসারিত পাঠ নিলে কঠোর হিসাবরক্ষণ ও বরাদ্দসীমা জরুরি, তালিকাও ছোট রাখতে হবে, যেমন দরিদ্র শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ।
সংস্কারের প্রস্তাবে তিনি মধ্য মেয়াদে আলাদা আইন ও রাজস্ব বিভাগের বাইরে একটি স্বায়ত্তশাসিত জাকাত কর্তৃপক্ষ চেয়েছেন, যার পর্ষদে আলিম, হিসাববিদ ও নাগরিক প্রতিনিধি থাকবেন। বেসরকারি জাকাত সংস্থাগুলোকে বন্ধ না করে অভিন্ন নিবন্ধন ও প্রতিবেদন মানে আনার এবং দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় শরিয়াহ পর্ষদের মাধ্যমে দুই খাতে গ্রহণযোগ্য ব্যয়ের সীমিত, যাচাইযোগ্য তালিকা করার কথাও বলেছেন।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে লেখক উল্লেখ করেছেন, ইউএনডিপির উদ্ধৃত গবেষণায় বিশ্বে বছরে জাকাতের সম্ভাব্য পরিমাণ ২০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার, অথচ রোহিঙ্গা সহায়তায় জাতিসংঘের ২০২৬ সালের আবেদন গত বছরের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম। তাঁর উপসংহার, জাকাতের বিধানে ঘাটতি নেই, ঘাটতি ব্যবস্থাপনায়।
সূত্র: আমার দেশ



মন্তব্য
(০)