হেমন্তের কোনো ঝকঝকে সকালে পঞ্চগড়ের একেবারে উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়া থেকে কখনো কখনো দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফঢাকা চূড়া। গাছের সারির ওপারে পাহাড়টাকে এত কাছে মনে হয়, যেন সামনের মাঠেরই অংশ। এক অর্থে কথাটা মিথ্যাও নয়। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও আর দিনাজপুরের উত্তর-পশ্চিমের কৃষক যে মাটিতে লাঙল চালান, তার বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে হিমালয় থেকে নদীর স্রোতে ভেসে এসেছে।
ঢাকা থেকে উত্তরের দিকে যত এগোনো যায়, দেশের চেনা ভূদৃশ্য তত বদলাতে থাকে। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে সামনে আসে বিস্তীর্ণ মাঠ, সবুজ ফসল আর এমন এক ভূমিরেখা, যা দেশের অনেক এলাকার নিচু, পানিতে ভেজা প্লাবনভূমির মতো নয়। এখানে কোথাও মাটি শক্ত, কোথাও ঝুরঝুরে। কোনো জমিতে বৃষ্টির পানি কয়েক ঘণ্টায় নেমে যায়, পাশের জমিতে জমে থাকে কয়েক দিন। একই জেলার কাছাকাছি দুই গ্রামের জমিতেও এমন পার্থক্য চোখে পড়ে, আর ফসল সেই পার্থক্য টের পায়।
দেশের এই কোণের একটি বৈজ্ঞানিক নাম আছে: পুরাতন হিমালয় পাদদেশীয় সমভূমি, ইংরেজিতে Old Himalayan Piedmont Plain। বাংলাদেশের ৩০টি কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলের মধ্যে এটিই প্রথম, পরিচিত AEZ-1 নামে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সার সুপারিশ নির্দেশিকা ২০২৪ অনুযায়ী, এই অঞ্চলের আয়তন ৩ লাখ ৯৮ হাজার ১৫৪ হেক্টর, অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার ৯৮২ বর্গকিলোমিটার। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের বেশির ভাগ এলাকা এবং দিনাজপুরের উত্তর-পশ্চিমাংশ এর ভেতরে পড়ে। বিএআরসির হিসাবে অঞ্চলটির প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৩০০ হেক্টর ঠাকুরগাঁওয়ে, ১ লাখ ১২ হাজার ১০০ হেক্টর পঞ্চগড়ে এবং ৯৫ হাজার ৮০০ হেক্টর দিনাজপুরে।
কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল বলতে কী বোঝায়
কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল বা AEZ হলো এমন একটি এলাকা, যেখানে ফসলের জন্য সবচেয়ে জরুরি পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যগুলো মোটামুটি একই রকম। বিএআরসির নির্দেশিকায় এই ভাগের চারটি ভিত্তির কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি ভূপ্রকৃতি, অর্থাৎ জমির গড়ন আর কোন উপাদানে তা তৈরি। দ্বিতীয়টি মাটি: তার বুনট, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা আর উর্বরতা। তৃতীয়টি জমির ধরন, মানে বর্ষায় জমি কতটা গভীরে আর কত দিন পানিতে ডুবে থাকে। চতুর্থটি কৃষি-জলবায়ু: খরিফ ও রবি মৌসুম কত দীর্ঘ, শীতে কত দিন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে আর গ্রীষ্মে কত দিন ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়।
এই চার স্তর একটির ওপর আরেকটি মিলিয়ে বাংলাদেশকে ভাগ করা হয়েছে ৩০টি অঞ্চল, ৮৮টি উপ-অঞ্চল আর ৫৩৫টি ছোট একক বা সাব-ইউনিটে। অঞ্চল দেয় বড় ছবিটা; উপ-অঞ্চল আর সাব-ইউনিটে গিয়ে জমিগুলোর মিল আরও স্পষ্ট হয়। তালিকায় AEZ-1-এর অবস্থান প্রথমে, আর মানচিত্রেও একেবারে ওপরে।
প্রাচীন নদীর পলল পাখায় গড়া সমভূমি
নামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এই অঞ্চলের ইতিহাসের একটি অংশ। "পাদদেশ" মানে পাহাড়ের পা বা গোড়া, আর "পুরাতন" শব্দটি জমির উপরিভাগের বয়সের দিকে ইঙ্গিত করে। বিএআরসির বর্ণনায়, অঞ্চলটি গড়ে উঠেছে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া তিস্তার একটি পুরনো পলল পাখার ওপর।
পলল পাখা তৈরি হয় তখন, যখন কোনো নদী পাহাড় ছেড়ে সমতলে নামে। স্রোতের গতি কমে যায়, পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, আর বয়ে আনা বালি, পলি ও নুড়ি সেখানেই জমতে থাকে। ধীরে ধীরে তৈরি হয় চওড়া, হালকা ঢালের এক ভূমি, দেখতে অনেকটা খোলা হাতপাখার মতো। তিস্তা একসময় এখানে ঠিক এ কাজটিই করেছে। স্তরের পর স্তর হিমালয় অঞ্চলের পলি জমে আজকের সমভূমির জন্ম। নদীর মূল ধারা পরে পূর্ব দিকে সরে গেছে, কিন্তু তার গড়া জমি রয়ে গেছে।
তাই এই অঞ্চলকে একটানা সমতল মাঠ ভাবলে ভুল হবে। বিএআরসি এখানে চওড়া ও সরু প্লাবনভূমির উঁচু আল বা শিরার পাশাপাশি লম্বা, সরু নিচু খাদের কথা বলেছে। বাইরে থেকে উচ্চতার এই তফাত সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু বৃষ্টির পানি কোথায় যাবে, তা ঠিক করে এটিই। একটু উঁচু জমি থেকে পানি দ্রুত নেমে যায়, পাশের নিচু জমি ভিজে থাকে অনেক বেশি সময়। কৃষকের কাছে এর মানে হলো কখন সেচ দেবেন, পানি কীভাবে বের করবেন, কোন ফসল বেছে নেবেন আর কবে বুনবেন, সবই বদলে যায়। জমির গড়নই হয়ে ওঠে চাষের পঞ্জিকার অংশ।

নিচু দেশের উঁচু জমি
দেশের বড় অংশে বর্ষা মানে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কখনো মাসের পর মাস জমিতে পানি। AEZ-1 এখানে আলাদা। বিএআরসির হিসাবে অঞ্চলটির প্রায় ৫৮ শতাংশ উঁচু জমি, যা সাধারণত বন্যার পানির ওপরে থাকে। আরও ৩৪ শতাংশ মাঝারি উঁচু জমি, যেখানে অল্প পানি ওঠে। মাঝারি নিচু জমি মাত্র ১ শতাংশ। বাকি ৭ শতাংশ বসতভিটা আর জলাশয়।
জমির এই উঁচু চরিত্রই বুঝিয়ে দেয়, কেন এখানকার কৃষির বছর সিলেটের হাওর বা দক্ষিণের জোয়ার-ভাটার প্লাবনভূমির চেয়ে ভিন্ন। দীর্ঘ ও গভীর মৌসুমি বন্যা এখানে প্রধান দুশ্চিন্তা নয়। বরং প্রশ্ন বেশি ওঠে হালকা মাটিতে যথেষ্ট আর্দ্রতা ধরে রাখা আর পানির সঙ্গে ধুয়ে যাওয়া পুষ্টি উপাদান আটকে রাখা নিয়ে।
তবে এই উঁচু সমভূমির ভেতরেও সব জায়গা এক রকম নয়। পাশাপাশি দুই গ্রামে মাটির অম্লতা, আর্দ্রতা, সেচের সুযোগ আর পুষ্টির মাত্রা আলাদা হতে পারে। তাই শুধু জেলার নাম দেখে কোনো জমির ব্যবস্থাপনা ঠিক করা যথেষ্ট নয়। একই উপজেলার দুই গ্রামের জন্যও আলাদা পরামর্শের দরকার হতে পারে।

ফসলের নিচে যে মাটি
AEZ-1-এর কৃষি বুঝতে হলে গাছের নিচে, মাটির দিকে তাকাতে হবে। বিএআরসির ২০২৪ সালের নির্দেশিকা বলছে, এ অঞ্চলে প্রধানত গভীর, দ্রুত পানি চুইয়ে যাওয়া বেলে দোআঁশ আর বেলে এঁটেল দোআঁশ মাটি। সাধারণ ভাষায় এগুলো হালকা, দানাদার মাটি: বৃষ্টি বা সেচের পানি ওপরে জমে না থেকে দ্রুত ভেতরে ঢুকে যায়।
এই মাটি অম্লীয়ও বটে। মাটির অম্লতা মাপা হয় পিএইচ মাপকাঠিতে, যেখানে ৭ নিরপেক্ষ আর সংখ্যা যত কম, অম্লতা তত বেশি। বেশির ভাগ মাঠফসল সামান্য অম্লীয় থেকে নিরপেক্ষ মাটিতে সবচেয়ে ভালো হয়। বিএআরসির বর্ণনায় AEZ-1-এর ওপরের মাটি তীব্র থেকে অতি তীব্র অম্লীয়, আর নিচের স্তর মাঝারি অম্লীয়। নির্দেশিকার উর্বরতা সারণিতে উঁচু জমির মাটির পিএইচ ৪.৩ থেকে ৫.৬ এবং মাঝারি উঁচু জমির ৪.৫ থেকে ৬.১। অম্লতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মাটিতে পুষ্টি থাকলেও গাছ তার কতটা নিতে পারবে, তা অনেকখানি ঠিক করে পিএইচ।
অঞ্চলটিতে সাত ধরনের সাধারণ মাটি পাওয়া যায়, তার মধ্যে তিনটির প্রাধান্য: চুনবিহীন বাদামি প্লাবনভূমি মাটি, কালো তরাই মাটি এবং চুনবিহীন গাঢ় ধূসর প্লাবনভূমি মাটি। "চুনবিহীন" মানে মাটিতে নিজস্ব চুন নেই, অম্লীয় থেকে যাওয়ার এটি একটি কারণ। আর "তরাই" হলো হিমালয়ের পাদদেশ বরাবর নেপাল ও ভারত থেকে বাংলাদেশের এই কোণ পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমির নাম।
নির্দেশিকায় উর্বরতার সমস্যাগুলো স্পষ্ট করে বলা আছে: জৈব পদার্থ কম, আর নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, সালফার, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম দ্রুত ধুয়ে যায়। হালকা মাটির ভেতর দিয়ে নিচে নামা পানি যখন গলে যাওয়া পুষ্টি উপাদান শিকড়ের নাগালের বাইরে নিয়ে যায়, তাকেই বলে পুষ্টি ধুয়ে যাওয়া বা লিচিং। এসব মাটির ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতাও কম, অর্থাৎ পুষ্টি ধরে রেখে ধীরে ধীরে গাছকে জোগানোর সামর্থ্য সীমিত। বিএআরসি বলছে, এ কারণে মাটির বাফারিং ক্ষমতা বা পিএইচের ওঠানামা সামলানোর শক্তি কম, তাই পিএইচ দ্রুত নেমে যেতে পারে। উঁচু ও মাঝারি উঁচু দুই ধরনের জমিতেই দস্তা ও বোরনের মাত্রা খুব কম থেকে কম।
তবে বিএআরসির নিজের নির্দেশনাতেই একটি সতর্কবার্তা আছে। পুরো অঞ্চলকে একই মাটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কৃষকেরা জমিকে ছোট ছোট খণ্ডে ভাগ করেছেন, প্রতিটির ব্যবহার আর যত্নের ইতিহাস আলাদা। নির্দেশিকা বলছে, পাশাপাশি দুই খণ্ডের উর্বরতাতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকতে পারে। তাই নির্দিষ্ট জায়গার উর্বরতা জানতে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে বিশদ বিশ্লেষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অঞ্চলের গড় তথ্য শুরুর বিন্দু মাত্র; কৃষকের নিজের জমিতে কী আছে, তা বলে দেয় মাটি পরীক্ষা।
এই মাটিতে কী ফলে
দেশের অন্য সব জায়গার মতো এখানেও কৃষির কেন্দ্রে ধান, বর্ষায় রোপা আমন। শীতের বড় ফসল গম। হালকা, পানি নিষ্কাশিত জমিতে আলু, ভুট্টা, সরিষা, ডাল আর নানা সবজিও হয়। ঠাকুরগাঁওয়ের আলুর নাম জেলার বাইরেও পরিচিত, সঙ্গে পরিচিত ভালো ফলনের বছরে বাজারে দাম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও।
অঞ্চলের উত্তর প্রান্তকে আলাদা করে চেনায় দুটি ফসল। শুকনো মৌসুমে পঞ্চগড়ের খোলা মাঠ লাল হয়ে ওঠে রোদে শুকাতে দেওয়া মরিচে। আর পঞ্চগড় পরিচিতি পেয়েছে সমতল জমির চা-বাগানের জন্য, যা সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাগানের প্রচলিত ধারা থেকে ভিন্ন।

দেশের সবচেয়ে উত্তরের অংশ বলে এখানকার শীতও দক্ষিণের চেয়ে বেশ কড়া। শীতের আবহাওয়া বার্তায় প্রায়ই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার জায়গা হিসেবে তেঁতুলিয়ার নাম আসে। কৃষির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, আর সে কারণেই শীতল দিনের সংখ্যা কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল ব্যবস্থায় প্রতিটি অঞ্চলের জলবায়ু বর্ণনার একটি মাপকাঠি। দীর্ঘ, ঠান্ডা শীত গম আর আলুর মতো ফসলের জন্য উপযোগী।

গবেষণা যখন কৃষকের মাঠে
পুরাতন হিমালয় পাদদেশীয় সমভূমির মাটির অম্লতা নতুন আবিষ্কার নয়, মাঠে এর সমাধানও পরীক্ষা হয়েছে। ২০১৯ সালে এশিয়ান জার্নাল অব সয়েল সায়েন্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট নিউট্রিশনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গম, মুগ ও রোপা আমন ধানের শস্যক্রমে চুন ও জৈব সারের প্রভাব দেখা হয়। টানা দুই বছর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে এবং কৃষকের নিজের জমিতে পরীক্ষাটি চালানো হয়।
চুন মাটির জন্য অনেকটা অ্যান্টাসিডের মতো কাজ করে, পিএইচ বাড়ায়। জৈব সার মাটিতে যোগ করে পচা উদ্ভিদ ও প্রাণিজ উপাদান, যা পানি ও পুষ্টি ধরে রাখতে সাহায্য করে। গবেষকেরা হেক্টরপ্রতি শূন্য, এক ও দুই টন ডলোচুনের সঙ্গে মুরগির বিষ্ঠা, গোবর সার এবং কোনো সার না দেওয়ার তুলনা করেন।
চুন দেওয়ায় মাটির পিএইচ বাড়ে, জৈব সারে বাড়ে জৈব পদার্থ। হেক্টরপ্রতি এক টন চুনের সঙ্গে তিন টন মুরগির বিষ্ঠা মিলিয়ে দেওয়া জমিতে গড়ে গমের ফলন চুন-সারহীন জমির চেয়ে ৩৫ থেকে ৫৫ শতাংশ বেশি হয়, আর পরের আমন ধানে বাড়ে ৪১ থেকে ৪৩ শতাংশ। গোবর সারের চেয়ে মুরগির বিষ্ঠার ফল ভালো ছিল।
এখানে আসল শিক্ষা এক বস্তা চুনে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকেরা এই মাটির একটি বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করেছেন, সত্যিকারের চাষের পরিস্থিতিতে সমাধান পরীক্ষা করেছেন এবং কী বদলাল তা মেপেছেন। গবেষণা আর কৃষির এই সংযোগই একটি বৈজ্ঞানিক ফলকে কৃষকের কাজের সমাধানে পরিণত করে।
ফলনের বাইরে: শস্যদানার ভেতরের পুষ্টি
এ অঞ্চলের গবেষণা এখন শুধু "এক হেক্টরে কত টন হলো" প্রশ্নে আটকে নেই। ২০২৬ সালে অ্যাডভান্সেস ইন অ্যাগ্রিকালচার সাময়িকীতে প্রকাশিত আক্তার ও সহকর্মীদের একটি গবেষণায় পুরাতন হিমালয় পাদদেশীয় সমভূমিতে গম, পতিত ও আমন ধানের শস্যক্রমের মাটি ও শস্যদানায় আয়রন বা লৌহ এবং জিংক বা দস্তার বিস্তার মানচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষক দল গাছের শিকড়ের চারপাশের মাটি থেকে ৭০টি নমুনা, গমের ৫৩টি এবং ধানের ৪৫টি দানার নমুনা সংগ্রহ করেন। আর্কজিআইএস নামের মানচিত্র তৈরির সফটওয়্যারে তাঁরা দেখান, জায়গা বদলালে এই দুই খনিজের মাত্রা কীভাবে বদলায়। গম ও ধান দুই ফসলের দানাতেই লৌহ ও দস্তার মাত্রায় উল্লেখযোগ্য তারতম্য পাওয়া যায়। মাটির পিএইচ, বুনট, জৈব কার্বন, নাইট্রোজেন এবং মাটির লৌহ ও দস্তার সঙ্গে দানার মাত্রার সম্পর্কও তাঁরা যাচাই করেন।
যিনি কখনো চাষ করেননি, তাঁর কাছে এর গুরুত্ব কী? ভাত আর রুটিনির্ভর খাদ্যাভ্যাসে লৌহ ও দস্তার ঘাটতি খুব সাধারণ। এক গ্রামের মাটিতে ফলা শস্যে যদি পাশের গ্রামের চেয়ে দস্তা কম থাকে, সেই তফাত শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় খাবারের থালায়। কৃষির সাফল্য তাই শুধু টনের হিসাবে মাপা যায় না। মাটির স্বাস্থ্য, পুষ্টির জোগান আর খাদ্যের মান, সবই একই হিসাবের অংশ।
এক গ্রামের দুই জমি, ফলন কি এক হবে?
ধরা যাক, একই অঞ্চলের দুই কৃষক। দুজনই ধান চাষ করেন, দুজনই উন্নত জাতের বীজ বোনেন, বৃষ্টিও পান প্রায় সমান। কিন্তু একজনের জমির মাটি বেশি অম্লীয়, অন্যজনের জমিতে সেচের সুবিধা ভালো। একটি জমি থেকে পানি দ্রুত নেমে যায়, অন্যটি ভেজা থাকে বেশি সময়। সার দেওয়ার ধরনও দুজনের আলাদা। দুজনের ফলন কি একই হবে? প্রায় নিশ্চিতভাবেই নয়।
এখানেই গ্রাম পর্যায় আর জমি পর্যায়ের তথ্যের গুরুত্ব। একটি কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল গবেষকদের বড় এলাকার পরিবেশের নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ছবি দেয়। কিন্তু কৃষকের দরকার নির্দিষ্ট এক টুকরো জমির তথ্য, আর তার জন্য লাগে আরও খুঁটিনাটি প্রমাণ।
একটি গ্রামের কৃষি তথ্যভান্ডারে কী থাকতে পারে
কোনো গ্রামের দীর্ঘমেয়াদি কৃষি তথ্যভান্ডার বছরে একটি ফলনের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি কিছু ধারণ করতে পারে। গবেষকেরা একসঙ্গে সংগ্রহ ও যুক্ত করতে পারেন:
- মাটির পিএইচ, জৈব পদার্থ এবং নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম
- দস্তা, বোরনসহ অণুপুষ্টি উপাদান
- মাটির আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা
- সেচ: দেওয়া হয়েছে কি না, কখন ও কতটা
- ফসল, জাত এবং রোপণ ও কাটার তারিখ
- ফলন ও মোট উৎপাদন
- সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার
- প্রতি মৌসুমের পোকামাকড় ও রোগবালাই
- উৎপাদন খরচ ও বাজারদর
- জমির ধরন ও অবস্থান
- এনডিভিআই ও ইভিআইয়ের মতো স্যাটেলাইট সূচক
বিএআরসির কাছে এরই মধ্যে ভূমিসম্পদের একটি স্থানিক তথ্যভান্ডার আছে। তাতে রয়েছে মাটির বুনট, পানি নিষ্কাশন, মাটির সিরিজ, ভূমির উঁচু-নিচু গড়ন, ঢাল, পিএইচ, আর্দ্রতা, পুষ্টির অবস্থা, লবণাক্ততা, পানি চুইয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আর দুর্যোগের পুনরাবৃত্তির তথ্য, সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার রেকর্ড। ভিত্তি তৈরি আছে। এখন দরকার এসব আঞ্চলিক তথ্যকে গ্রাম আর জমির খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে জোড়া দেওয়া।
যে প্রশ্নের উত্তর শুধু মানচিত্রে মেলে না
স্থানীয় তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হলে কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলের কাঠামো AEZ-1-এর জন্য কিছু বাস্তব প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়:
- মাটি: কোন ব্যবস্থাপনায় অম্লীয় মাটির উন্নতি হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে?
- পানি: নির্দিষ্ট একটি জমিতে কখন, কতটুকু সেচ দরকার?
- ফসল: নির্দিষ্ট মাটি আর আবহাওয়ায় কোন ফসল বা জাত সবচেয়ে ভালো ফলন দেয়?
- পুষ্টি: কোন গ্রাম বা জমিতে কোন পুষ্টির ঘাটতির আশঙ্কা বেশি?
- ফলনের পূর্বাভাস: আগের বছরের ফলন, মাটি, আবহাওয়া আর স্যাটেলাইট তথ্য মিলিয়ে ফসল কাটার আগেই গ্রামের ফলন কতটা নির্ভুলভাবে অনুমান করা যায়?
- জলবায়ু ঝুঁকি: বৃষ্টি বা তাপমাত্রার পরিবর্তনে কোন এলাকার কৃষি বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর অফিসের টেবিলে বসে পাওয়া যাবে না। দরকার মাঠের প্রমাণ।
প্রযুক্তি কোথায় সাহায্য করে, কোথায় যাচাই লাগে
স্যাটেলাইটের ছবি মহাকাশ থেকে পুরো মৌসুম ধরে ফসলের অবস্থা অনুসরণ করতে পারে। এনডিভিআই বা স্বাভাবিকীকৃত উদ্ভিদ পার্থক্য সূচক আর ইভিআই বা উন্নত উদ্ভিদ সূচকের মতো মাপকাঠি গাছের পাতায় আলোর প্রতিফলন পড়ে বলে দেয় ফসল কতটা সবুজ ও সতেজ। আবহাওয়ার তথ্যে দেখা যায় বৃষ্টি ও তাপমাত্রার ধরন, মাটির তথ্যভান্ডার জানায় মাটির ভৌত ও রাসায়নিক অবস্থা। এর সঙ্গে কয়েক বছরের গ্রামভিত্তিক ফলনের রেকর্ড যুক্ত হলে মেশিন লার্নিং, অর্থাৎ অতীতের তথ্য থেকে ধরন শিখে নেওয়া কম্পিউটার প্রোগ্রাম দিয়ে ফলনের পূর্বাভাস মডেল তৈরি করা সম্ভব।
কিন্তু কম্পিউটারের পূর্বাভাস আর মাঠের ফসল এক জিনিস নয়। ধরা যাক, মডেল বলল হেক্টরে চার টন হবে, অথচ মাঠে হলো তিন টন। এই ফারাক নিছক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি গবেষণার প্রশ্ন। মাটির অবস্থা কি আলাদা ছিল? সেচ কি দেরিতে হয়েছে? রোগ লেগেছিল? সার কি ভুল সময়ে দেওয়া হয়েছিল? অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি হয়েছিল? মেঘ বা অন্য কিছুতে কি স্যাটেলাইটের সংকেত বিঘ্নিত হয়েছিল? পূর্বাভাসকে বাস্তব জমির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা, বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন মাঠ যাচাই, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেয়। ভুল ধরা পড়লে কারণ খুঁজতে হয়, নতুন তথ্য যোগ করে আবার পরীক্ষা করতে হয়, আর তাতেই মডেল উন্নত হয়।
গবেষণাপত্র থেকে কৃষকের জমিতে
একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেখানেই কাজ শেষ নয়। গবেষকদের জানতে হবে কৃষক বাস্তবে সেই ফল কাজে লাগাতে পারছেন কি না। কৃষক কি পরামর্শটি গ্রহণ করছেন? উৎপাদন কি বাড়ছে? খরচ কি কমছে? আয় কি বাড়ছে? ঝুঁকি কি কমছে? বছরের পর বছর মাটির স্বাস্থ্য কি ভালো হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোই গবেষণাকে জ্ঞান তৈরির গণ্ডি পেরিয়ে মাপা যায় এমন পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়।
AEZ-1-এর মতো একটি অঞ্চলের জন্য পথটি হতে পারে সাত ধাপের:
কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল → গ্রাম → মাঠের তথ্য → বৈজ্ঞানিক গবেষণা → মাঠ যাচাই → কৃষকের গ্রহণ → পরিমাপযোগ্য ফল
প্রথমে অঞ্চলকে বোঝা, তারপর তার ভেতরের গ্রামগুলোকে। এরপর মাঠ থেকে তথ্য সংগ্রহ। বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে গবেষণার প্রশ্ন তৈরি। কৃষকের জমিতে সমাধান পরীক্ষা। কৃষক তা গ্রহণ করছেন কি না দেখা। সবশেষে উৎপাদন, খরচ, আয়, ঝুঁকি আর মাটির অবস্থার পরিবর্তন মাপা। এই ধারাই গবেষণাকে কাগজের ফল থেকে মাঠের ফলে নিয়ে যেতে পারে।
হিমালয়ের পাদদেশে নদীবাহিত পলিতে যে ভূমি দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হয়েছে, আজ সেখানে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় আর দিনাজপুরের উত্তর-পশ্চিমের হাজারো কৃষক মৌসুমের পর মৌসুম জীবিকা গড়ে তুলছেন। মাটি তাঁদের জীবনের অংশ, তেমনি পানি, বৃষ্টি, ফসল, পুষ্টি, প্রযুক্তি আর প্রতিবছরের সিদ্ধান্তও।
পুরাতন হিমালয় পাদদেশীয় সমভূমি দেখিয়ে দেয়, কেন বাংলাদেশের দরকার এমন গবেষণা, যা বড় আঞ্চলিক ছবি থেকে স্থানীয় খুঁটিনাটি প্রমাণ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল বলে দেয় আমরা কেমন কৃষি পরিবেশ দেখছি। গ্রামের তথ্য দেখায় সেই পরিবেশ একটি জনপদে কেমন আচরণ করে। জমি পর্যায়ের গবেষণা বলে একজন কৃষকের জমিতে কী ঘটছে। আর মাঠ যাচাই জানায়, প্রস্তাবিত সমাধান সত্যিই কাজ করে কি না।
এই পথ ধরে এগোলে একটি কৃষি-পরিবেশ মানচিত্র কেবল শ্রেণিবিন্যাসের কাঠামো হয়ে থাকবে না। তা হয়ে উঠতে পারে জায়গা বুঝে দেওয়া পরামর্শের ভিত্তি, যা পরীক্ষিত হবে সবচেয়ে জরুরি জায়গায়, কৃষকের নিজের জমিতে। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণার ভবিষ্যৎ হয়তো এই যাত্রাতেই: বড় মানচিত্র থেকে একটি গ্রামের দিকে, গ্রাম থেকে একটি জমির দিকে, আর মাঠের প্রমাণ থেকে মাপা যায় এমন পরিবর্তনের দিকে।
প্রচ্ছদ ছবি: পঞ্চগড়ের মাঠের ওপারে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ছবি: MD sajjad hossain photography / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)





মন্তব্য
(০)