শীতের সকালে তিস্তার পাড়ে দাঁড়ালে মনে হতে পারে নদীটা যেন অনেক দূরে সরে গেছে। শ্রাবণে যেখানে ঘোলা পানি ছুটে চলছিল, সেখানে এখন ফ্যাকাশে বালুর বিস্তীর্ণ প্রান্তর, তার ওপারে সরু একফালি ধীর স্রোত। সেই বালুর ওপর সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কচি ভুট্টার গাছ। আরেকটু এগোলে আলু, পেঁয়াজ, মরিচ, এক কোণে কুমড়ার মাচা। অথচ কয়েক শ মিটার দূরেই এমন জমি, যা মাস কয়েক আগেও পানির নিচে ছিল; তার গায়ে এখনো বন্যার দাগ লেগে আছে।
বদলে যাওয়া এই দৃশ্য উত্তরাঞ্চলের নদীনির্ভর কৃষির খুব চেনা ছবি। দেশের কৃষি মানচিত্রে এটিই একটি ছোট কিন্তু ব্যতিক্রমী অঞ্চলের পরিচয়। নাম সক্রিয় তিস্তা প্লাবনভূমি; বাংলাদেশের ৩০টি কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলের দ্বিতীয়টি, সংক্ষেপে এইজেড-২।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সার সুপারিশ নির্দেশিকা ২০২৪ অনুযায়ী অঞ্চলটির আয়তন ৮৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার, এই তিন নদীর সক্রিয় প্লাবনভূমি নিয়ে এটি গঠিত। নদীগুলোর খাতের ভেতরে আর দুই পাশে সরু ফিতার মতো এলাকা ধরে অঞ্চলটি ছড়িয়ে আছে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধায়। সবচেয়ে বেশি অংশ কুড়িগ্রামে, প্রায় ৩২ হাজার ৯০০ হেক্টর। এরপর লালমনিরহাটে ১৪ হাজার ৮০০, নীলফামারীতে ১৪ হাজার ২০০, রংপুরে ১১ হাজার ৬০০ এবং গাইবান্ধায় ৫ হাজার ১০০ হেক্টর।
কাগজে-কলমে এই হলো অঞ্চলের পরিচয়। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে এখানকার জীবন ধরা যায় না। কারণ এখানে নদী যেমন জমি দেয়, তেমনি জমি কেড়েও নেয়।

কেন এটি আলাদা একটি অঞ্চল
কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল বলতে বোঝায় এমন এলাকা, যেখানে ফসলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মোটামুটি এক রকম: জমির গড়ন, মাটি, বর্ষায় জমি কতটা গভীরে আর কতদিন ডুবে থাকে, আর ফসল ফলানোর মৌসুম কত লম্বা। এই ভাগ ধরে বিএআরসি সারের পরিমাণ আর ফসল পরিকল্পনার পরামর্শ দেয়, যাতে উত্তরের কৃষক আর উপকূলের কৃষককে একই ব্যবস্থাপত্র ধরিয়ে দেওয়া না হয়।
এইজেড-২ আলাদা কারণ এটি স্থির সমভূমি নয়। বিএআরসির বর্ণনায় এখানে জমির গড়ন জটিল: নিচু, মোটামুটি মসৃণ উঁচু ভিটা, তার ফাঁকে ফাঁকে খাদ, নদীর খাত আর নদীর ফেলে যাওয়া পুরোনো খাত। বেশির ভাগ এলাকা বর্ষায় অল্প গভীরে ডোবে, তবে ভরা মৌসুমে কখনো কখনো পানি অনেক বেশি ওঠে।
অঞ্চলের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ, ৭২ শতাংশ, মাঝারি উঁচু জমি। অর্থাৎ বর্ষায় এসব জমিতে সাধারণত এক মিটারের কম পানি ওঠে; ফসল আর চাষের সময় ঠিক করে দেওয়ার মতো ভেজা, তবে সারা বছর ডুবে থাকে না। আরও ২৬ শতাংশ বসতভিটা ও জলাশয়। স্বাভাবিক বন্যার ওপরে থাকা উঁচু জমি মাত্র ২ শতাংশ।
নদী যখন জমি গড়ে
তিস্তাপাড়ের মানুষের কাছে নদী মানচিত্রের রেখা নয়, প্রতিদিনের জীবন। বর্ষায় পানি বাড়ে। পাড় ভাঙে। এক রাতে পুরোনো জমি নদীতে চলে যায়। আবার অন্য কোথাও পানি নামতেই নদীর বুক থেকে মাথা তোলে নতুন চর।
প্রথম দেখায় নতুন চর বালু ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। কিন্তু মৌসুমের পর মৌসুম নদী তার ওপর পলি ফেলে, ঘাস জন্মায়, আর কোনো কোনো চর চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধার কৃষকেরা বছরের পর বছর এমন জমিতে ভুট্টা, আলু, মরিচ, কুমড়া, পেঁয়াজ, রসুন, চিনাবাদাম, গম আর ধান ফলানোর অভিজ্ঞতা গড়ে তুলেছেন।
এর শিক্ষাটা গুরুত্বপূর্ণ। নদীর বুকে নতুন জেগে ওঠা চর মানেই অকেজো জমি নয়। উপযুক্ত ফসল আর যত্নশীল ব্যবস্থাপনায় সেই জমি এমন পরিবারের খাদ্য ও আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে, যাদের হাতে প্রায়ই আর কোনো জমি নেই।

আবার সেই নদীই কেড়ে নেয়
চরের কৃষির সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো অনিশ্চয়তা। যে নদী জমি গড়ে, সেই নদীই জমি চাপা দিতে পারে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বন্যার পর লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর ১৩টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি বালুর নিচে চাপা পড়েছে। কোথাও কোথাও আমন ধান লাগানো জমির ওপর দুই থেকে তিন ফুট পুরু বালু জমেছিল।
কুড়িগ্রামের গতিয়াশ্যাম গ্রামের সাদেকুল ইসলাম পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, তাঁর এক বিঘা জমি এখন বালুতে ঢাকা; পাঁচ বছর আগে আরও দুই বিঘা চাপা পড়েছিল, সেখানে তিনি আজও কিছু ফলাতে পারেননি। রংপুরের গঙ্গাচড়ার ধীরেন বর্মণ শুনিয়েছিলেন ধীর আশার কথা: বালুর ওপর নতুন পলি পড়লে আবার বাম্পার ফলন হতে পারে, তবে তাতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
একজন কৃষকের কাছে এর মানে পরিষ্কার। আজ যে জমিতে ধান বা ভুট্টা দাঁড়িয়ে আছে, একটি বড় বন্যা কিংবা নদীর খাত কয়েক শ মিটার সরে যাওয়ায় সেই জমির চেহারা পুরো বদলে যেতে পারে। আবার পানি নামলে অন্য কোথাও জেগে উঠতে পারে নতুন জমি। এই অবিরাম ভাঙা-গড়াই এইজেড-২-এর কৃষিকে দেশের অপেক্ষাকৃত স্থির অঞ্চলগুলোর চেয়ে আলাদা করেছে।

ধূসর বালু, দুর্বল মাটি
নদী শুধু জমি সরায় না, মাটিও গড়ে। বন্যার পানি বয়ে আনে বালু, পলি আর নানা খনিজ। স্রোত ধীর হলে তার একটি অংশ পাড়ে আর চরে থিতিয়ে পড়ে। প্রতিটি বন্যা রেখে যায় নতুন একটি স্তর। তাই এইজেড-২-এর সব জমির মাটি এক রকম নয়।
বিএআরসির বর্ণনায় এখানে অনিয়মিতভাবে ছড়িয়ে আছে ধূসর, স্তরে স্তরে জমা বালু আর পলি; মোটা আর মিহি দানার স্তর মাটির ভেতরেই চোখে পড়ে। অঞ্চলে চার ধরনের সাধারণ মাটি পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি যেটি, মৃত্তিকাবিজ্ঞানীরা তাকে বলেন চুনবিহীন পলল মাটি: নদীর আনা নবীন পলি, যাতে চুন নেই। এতে এমন খনিজ প্রচুর, যা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গাছের খাবার ছাড়ে; কিন্তু মাটি এখনো নবীন বলে নিজে ধরে রাখে সামান্যই।
নির্দেশিকার হিসাব দেখায় এই উর্বরতা কতটা দুর্বল। জৈব পদার্থ, অর্থাৎ পচা গাছপালা ও প্রাণিজ উপাদান, যা মাটিতে পানি ধরে রাখে আর মাটির প্রাণকে খাবার জোগায়, তার পরিমাণ খুব কম থেকে কম। নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, গন্ধক, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, দস্তা ও বোরনের ঘাটতি এখানে সাধারণ ঘটনা। অঞ্চলের মাঝারি উঁচু জমিতে পটাশিয়াম ছাড়া বাকি সবগুলোর মাত্রাই খুব কম থেকে কম।
মাটির অম্লতাও গুরুত্বপূর্ণ। পিএইচ দিয়ে বোঝা যায় মাটি কতটা অম্লীয় বা ক্ষারীয়; ৭ হলো নিরপেক্ষ। এইজেড-২-এর মাঝারি উঁচু জমিতে পিএইচ ৪.৪ থেকে ৬.৩, অর্থাৎ বেশ অম্লীয় থেকে সামান্য অম্লীয়। অম্লীয় মাটিতে পুষ্টি উপাদান থাকলেও অনেক সময় গাছ তা নিতে পারে না।
এর বাস্তব ফল হলো, পাশের জমিতে যে সার দেওয়া হয়েছে তা দেখে নিজের জমিতে একই পরিমাণ দিলে সব সময় একই ফল মেলে না। কারণ পাশাপাশি দুটি জমির মাটিও আলাদা হতে পারে। একটিতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি, অন্যটিতে ফসফরাস বা পটাশের, তৃতীয়টিতে দস্তা বা বোরনের। তাই অনুমানের চেয়ে মাটি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
চরে শীতের ফসল
তবে তিস্তার চর মানেই শুধু বন্যা আর ভাঙন, এমন ধারণা ভুল। শুকনো মৌসুমে নদী সরু হয়ে গেলে বহু চর হয়ে ওঠে সক্রিয় কৃষিজমি।
গাইবান্ধার কোনো কোনো চরে একসময় যে জমিকে চাষের অযোগ্য ভাবা হতো, সেখানে এখন মরিচ, ভুট্টা, কুমড়া, আলু, পেঁয়াজসহ নানা রবি ফসল হয়। নদীর নতুন পলি আর মৌসুমের পর মৌসুম চর চিনে নেওয়া কৃষকের অভিজ্ঞতা এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। লালমনিরহাটেও তিস্তার বালুময় চরে সবজি আর ভুট্টার আবাদ হচ্ছে।
গাজর দেখায় এই সম্ভাবনা কত দূর যেতে পারে। ২০২৩ সালে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে তিস্তার ৩০টি চরে প্রায় ১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে গাজর চাষ হয়েছে, হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ৩০ টন। লালমনিরহাট সদরের চর কালমাটির মাদ্রাসাশিক্ষক আইয়ুব আলী সাড়ে আট একর জমি ইজারা নিয়ে গাজর চাষ করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কেজি ফলন পেয়েছিলেন।
অর্থাৎ একটি জমির মূল্য সময়ের সঙ্গে বদলায়। আজ যে জমি অনুর্বর দেখায়, কয়েক মৌসুম পর সেটিই হতে পারে ভালো কৃষিজমি।
ভুট্টা কেন চরের ফসল হয়ে উঠল
চরের সঙ্গে কৃষক কীভাবে মানিয়ে নিয়েছেন, তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ভুট্টা। বালুময় জমিতে এটি টিকে যায়, শুকনো মৌসুমের পঞ্জিকার সঙ্গে মেলে, আর হাঁস-মুরগি ও মাছের খাদ্য কারখানায় এর বাজার তৈরি।
২০২৫ সালের মার্চে দ্য ডেইলি স্টার লালমনিরহাটে তিস্তার ভুট্টাচাষিদের সঙ্গে কথা বলে। কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৌলমারীর ৬০ বছর বয়সী দিলবার হোসেন বলেছিলেন, ভুট্টা চাষ করেই তাঁরা স্বাবলম্বী হয়েছেন; ব্যবসায়ী আর খাদ্য কোম্পানির লোকেরা সরাসরি তাঁদের কাছ থেকে কিনে নেন। হাতীবান্ধার চর গড্ডিমারীর নজর মাহমুদ ভুট্টার জমি ১০ বিঘা থেকে বাড়িয়ে ১৫ বিঘা করেছিলেন; ব্যবসায়ীরা তাঁকে আগাম টাকাও দিয়েছিলেন।
এমন উদাহরণ উৎসাহ জোগায়, কিন্তু এর মানে এই নয় যে সব চরে একই ফল মিলবে। প্রতিটি চরের মাটি, পানি, মূল নদী থেকে দূরত্ব আর ঝুঁকি আলাদা। কোন জাত বোনা হলো, কখন বোনা হলো, সেচ, সার, শ্রম আর ফসল তোলার সময়ের দাম, সবই শেষ হিসাব ঠিক করে দেয়।

কখনো পানি বেশি, কখনো পানির অভাব
পানি এখানে আরেক রকম বিপদ নিয়ে আসে। বর্ষায় পানি বেশি, শুকনো মৌসুমে পানির অভাব।
তিস্তার কোনো কোনো অংশ অগভীর হয়ে গেলে বা শুকিয়ে গেলে ফসল বাঁচাতে চরের কৃষককে মাটির নিচের পানি তুলতে হয়। দ্য ডেইলি স্টার লিখেছে, নদীর পানি না থাকায় লালমনিরহাটের কৃষকেরা আলু, ভুট্টা আর অন্যান্য ফসলে ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ চালাচ্ছেন। যাঁদের পাম্প কেনার সামর্থ্য আছে, তাঁদের উৎপাদন খরচ বাড়ে; যাঁদের নেই, তাঁরা হয়তো পুরো মৌসুমটাই হারান।
কৃষকের কাছে তাই পানির দুই চেহারা। বর্ষায় কাজ বাড়তি পানির ধাক্কা সামলানো, শুকনো মাসে যথেষ্ট পানি জোগাড় করা। এখানকার কৃষিকে দুটোরই জবাব দিতে হয়।

দোয়ানীর ব্যারেজ
তিস্তার পানির কথা বললেই আসে তিস্তা ব্যারেজ। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার দোয়ানী আর নীলফামারীর ডিমলার ডালিয়ার মাঝে নদীর ওপর এটি দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানিনিষ্কাশনের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বাড়ানো। ৪৪টি গেটের ৬১৫ মিটার দীর্ঘ ব্যারেজটির কাজ শেষ হয় নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে; এর সঙ্গে যুক্ত আছে সেচখালের বড় একটি জাল।
তবু একটি বড় নদী অববাহিকার পানি কোনো একটি স্থাপনা দিয়ে সামলানো যায় না। বৃষ্টি, নদীর প্রবাহ, মাটির নিচের পানি, প্রতিটি জমির উচ্চতা, কোন ফসল আর কখন বোনা, সব মিলিয়েই ঠিক হয় একটি খামারের কতটা পানি লাগবে, কখন লাগবে। এসবের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাই ভালো পরিকল্পনার ভিত্তি।
এক অঞ্চল, তিন কৃষক, তিন রকম সমস্যা
ধরা যাক, তিস্তাপাড়ের একই গ্রামের তিনজন কৃষক। প্রথমজনের জমি ঠিক নদীর কিনারে। দ্বিতীয়জনের জমি একটু ভেতরে। তৃতীয়জনের জমি তুলনামূলক উঁচুতে।
তিনজনই থাকেন এইজেড-২-এর ভেতরে। কিন্তু তাঁদের ঝুঁকি এক নয়। প্রথমজনের সবচেয়ে বড় ভয় নদীভাঙন। দ্বিতীয়জনের কাছে বড় বিষয় জমি কত ঘন ঘন আর কতদিন ডোবে। তৃতীয়জনের জমির রস সবার আগে শুকায়, তাই তিনি সেচ আর সেচের খরচের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।
এ কারণেই পুরো অঞ্চলের তথ্য দিয়ে এর ভেতরের প্রতিটি খামারের অবস্থা ব্যাখ্যা করা যায় না।
গ্রামের তথ্য কেন জরুরি
কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল দেয় বড় একটি এলাকার সাধারণ চিত্র। কৃষকের দরকার নির্দিষ্ট একটি জায়গার খবর। প্রতিটি গ্রামের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য রাখা গেলে গবেষকেরা অনেক কাজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারবেন। এ বছর বন্যা কতদিন ছিল, পানি কত গভীর উঠেছিল? কোথায় পাড় ভেঙেছে, কোথায় নতুন চর জেগেছে? কোন জমিতে কী বোনা হয়েছিল, ফলন কত, সেচ আর সারে কত খরচ, বাজারে দাম কত মিলেছিল?
বছরের পর বছর এমন তথ্য জমলে একটি গ্রামের কৃষি কীভাবে বদলাচ্ছে, সেই ছবি অনেক স্পষ্ট হবে। এইজেড-২-এর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কৃষি তথ্যভান্ডারে থাকতে পারে:
- গ্রামের নাম এবং প্রতিটি জমির সঠিক অবস্থান;
- মাটির অম্লতা, জৈব পদার্থ, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ এবং দস্তা ও বোরনের মতো অণুপুষ্টি;
- মাটির আর্দ্রতা ও জমির উচ্চতা;
- বন্যার গভীরতা ও স্থায়িত্ব, নদী থেকে জমির দূরত্ব ও ভাঙনের তথ্য;
- বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও সেচ;
- ফসল ও জাত, বপন ও কাটার তারিখ, ফলন ও মোট উৎপাদন;
- সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার, রোগ ও পোকামাকড়;
- উৎপাদন খরচ, বাজারদর এবং উপগ্রহচিত্র থেকে পাওয়া ফসলের অবস্থা।
এর কাঠামোর অনেকটাই আগে থেকে আছে। বিএআরসির স্থানিক তথ্যভান্ডারে মাটির বুনট, নিষ্কাশন, মাটির শ্রেণি, ভূমির উঁচু-নিচু, ঢাল, পিএইচ, আর্দ্রতা, পুষ্টির অবস্থা, লবণাক্ততা, পানি চুইয়ে যাওয়ার হার আর নানা ঝুঁকির তথ্য রয়েছে। কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল ও শস্যবিন্যাসের তথ্যভান্ডারে আছে ফসলের ধারা, বপন ও কাটার সময় এবং ফসল সেচনির্ভর নাকি বৃষ্টিনির্ভর, সেই হিসাব। এই আঞ্চলিক তথ্যের সঙ্গে গ্রাম আর মাঠের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ জোড়া দিলে গবেষণার ভিত অনেক শক্ত হবে।

উপগ্রহের চোখে নদীর চলাফেরা
এ রকম অঞ্চলে উপগ্রহচিত্র বিশেষ কাজের, কারণ এখানে নদী, চর, পানি আর কৃষিজমি সবই সরে যায়। একই গ্রামের দশ বছরের ছবি পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় নদীর খাত কোথায় সরেছে, কোথায় নতুন চর জেগেছে, কোথায় কৃষিজমি হারিয়েছে, কোথায় নতুন জমি তৈরি হয়েছে, আর এক মৌসুম থেকে আরেক মৌসুমে ফসল কেমন বেড়েছে।
বিজ্ঞানীরা এনডিভিআই নামে একটি সূচকও ব্যবহার করেন। গাছের পাতা থেকে ফিরে আসা আলো মেপে এটি বলে দেয় ফসল কতটা সবুজ আর সতেজ। ওপর থেকেই এভাবে ফসলের বেড়ে ওঠা অনুসরণ করা যায়।
তবে উপগ্রহ সব দেখতে পায় না। ছবিতে জমি সবুজ দেখালেই বোঝা যায় না সেখান থেকে কত মণ ফসল উঠেছে। সেটি জানতে এখনো কাউকে মাঠে গিয়ে মাপতে হয়।
ফলন কি আগেই বলা যায়?
গ্রামভিত্তিক ফলনের পূর্বাভাস সম্ভব কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগও দেয় এইজেড-২। ধরা যাক, একটি গ্রামের দশ বছরের ধান উৎপাদনের হিসাব গবেষকদের হাতে আছে। এর সঙ্গে যোগ করা হলো বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, মাটির অবস্থা, সেচ, বন্যার স্থায়িত্ব, ধানের জাত, রোপণের তারিখ আর উপগ্রহের তথ্য। তারপর মেশিন লার্নিং, অর্থাৎ অতীতের তথ্য থেকে ধরন শিখে নেওয়া কম্পিউটার পদ্ধতি দিয়ে ভবিষ্যতের ফলন অনুমানের চেষ্টা করা যায়।
কিন্তু মডেলের উত্তরই শেষ কথা নয়। ধরা যাক, মডেল বলল হেক্টরে ৪.৫ টন ধান হবে, অথচ কৃষক পেলেন ৩.৬ টন। এই ব্যবধানই পরের গবেষণার প্রশ্ন। বন্যা হয়েছিল? রোগ লেগেছিল? সেচ দেরিতে হয়েছিল? নদীর পানি হঠাৎ বেড়েছিল? সার অন্য সময়ে দেওয়া হয়েছিল? উপগ্রহ কি ফসলের ভুল পর্যায়ে ছবি তুলেছিল? মাঠের তথ্যই এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়, আর প্রতিটি উত্তরে মডেল আরও নিখুঁত হয়।
গবেষণার মাঠ থেকে কৃষকের জমিতে
গবেষণা প্রকাশ করা জরুরি। কিন্তু তার আসল মূল্য বোঝা যায় যখন তা বাস্তব চাষের পরিবেশে যাচাই হয়। ধরা যাক, চরের জন্য বিজ্ঞানীরা নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করলেন, গবেষণা খামারে ফলনও ভালো হলো। পরের ধাপ কয়েকটি গ্রামের কৃষকের জমিতে পরীক্ষা। হয়তো এক গ্রামে জাতটি দারুণ ফলন দিল, আরেক গ্রামে দিল না।
কেন? কারণ হতে পারে মাটি, পানি বা বোনার সময়। হতে পারে সার, রোগ, এমনকি বাজারও। প্রতিটি পার্থক্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করে, আর কাজ গবেষণা থেকে মাঠে, মাঠ থেকে আবার গবেষণায় ফেরে, যতক্ষণ না উত্তরটি কৃষকের নিজের জমিতে টিকে যায়।
সম্ভাবনা আছে, দামও আছে
সক্রিয় তিস্তা প্লাবনভূমি তাই শুধু ঝুঁকির অঞ্চল নয়, সম্ভাবনারও অঞ্চল। উপযুক্ত ফসলে নতুন চর হয়ে উঠতে পারে উৎপাদনশীল জমি। শুকনো মৌসুমে কৃষকেরা সেখানে ফলান ভুট্টা, আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, কুমড়া, গাজর আর চিনাবাদাম।
তবে এখানে সম্ভাবনা বিনা মূল্যে আসে না। বন্যা ফিরতে পারে। বালু চাপা দিতে পারে জমি। পাড় ভাঙতে পারে। সেচের খরচ হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে, ফসল তোলার সময় দাম পড়ে যেতে পারে। তাই চরের কৃষির গবেষণায় ফলনের পাশাপাশি খরচ আর ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মানচিত্র থেকে মাঠে পৌঁছানোর পথ
এইজেড-২-এর জন্য একটি কার্যকর পথ হতে পারে এমন একটি ধারা: কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল, গ্রাম, মাঠ, তথ্য, গবেষণা, মাঠে যাচাই, কৃষকের গ্রহণ এবং পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন। প্রথমে অঞ্চলকে বুঝতে হবে। তারপর দেখতে হবে গ্রামগুলো একটি আরেকটি থেকে কোথায় আলাদা। সত্যিকারের মাঠ থেকে তথ্য নিতে হবে, আর সেই তথ্য থেকেই গবেষণার প্রশ্ন ঠিক করতে হবে। সমাধান কৃষকের জমিতে পরীক্ষা করতে হবে, কৃষক তা গ্রহণ করছেন কি না দেখতে হবে, আর শেষে মাপতে হবে ফলন, খরচ, আয়, ঝুঁকি আর মাটির অবস্থায় কী বদল এল। শেষ এই মাপটিই একটি গবেষণালব্ধ ফলকে প্রমাণে পরিণত করে।
তিস্তা উত্তরাঞ্চলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া একটি নদীর চেয়ে অনেক বেশি কিছু। বহু মানুষের কাছে এটি জমি, পানি, ফসল, জীবিকা আর আগামী দিনের সঙ্গে জড়ানো এক বাস্তবতা। বর্ষায় নদী ফুলে ওঠে। কখনো জমি ভাঙে। পানি নামলে জাগে নতুন চর, আর কৃষক আবার ফেরেন বীজ, শ্রম আর অভিজ্ঞতা নিয়ে। কোনো বছর ফলন ভালো হয়। কোনো বছর একটি বন্যা, এক স্তর বালু কিংবা হঠাৎ পানির টান সব হিসাব উল্টে দেয়।
এ কারণেই এইজেড-২-কে কৃষি মানচিত্রের একটি রঙিন টুকরো হিসেবে দেখলে চলবে না। দরকার গ্রামের তথ্য, মাঠের পর্যবেক্ষণ আর দীর্ঘ সময়ের হিসাব। সেগুলো মিললে দেশের দ্বিতীয় কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলটি হয়ে উঠতে পারে তিস্তা আর তার সহোদর নদীগুলোর পাড়ের মানুষের কৃষি, ঝুঁকি, সম্ভাবনা আর বদলে যাওয়া জীবন বোঝার একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
প্রচ্ছদ ছবি: উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ব্যারেজ ও নদীর বুকের বালুচর। ছবি: শফিউল ইসলাম শাইকত / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)


মন্তব্য
(০)