টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালিয়া ইউনিয়নের কুতুবপুর হাট কলার পাইকারি বাজার হিসেবে জেলায় পরিচিতি পেয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউন ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর জানায়, প্রতি রবি ও বুধবার বসা এই হাট থেকে সপ্তাহে প্রায় কোটি টাকার কলা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছিল। বাজার বণিক সমিতির সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান ফকির পত্রিকাটিকে বলেন, “এ বাজারে সপ্তাহে প্রায় কোটি টাকার কলার বেচা-কেনা করা হয়। তাছাড়া কুতুবপুর অন্যতম বিখ্যাত কলার বাজার বলে খ্যাতি রয়েছে।”
সপ্তাহে দুই দিনের হাট, কলা যায় সারা দেশে
কুতুবপুর বাজারের কলা ব্যবসায়ীদের দাবি, উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় কলার হাট তখন এই কুতুবপুর। সখীপুরের কুতুবপুর, বড়চওনা, দাড়িপাকা, শ্রীপুর, তৈলধারা, মুচারিয়া পাথার ও শালগ্রামপুর, ফুলবাড়িয়া উপজেলার গারোবাজার এবং ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ও জোড়দিঘীসহ নানা এলাকা থেকে কলা আসে। শনিবার বিকেল থেকে রবিবার দুপুর ১২টা এবং মঙ্গলবার বিকেল থেকে বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত কলা আসতে থাকে।
কলাচাষি ও ছোট ব্যবসায়ীরা হাটে কলা নিয়ে আসেন। তাদের কাছ থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা কিনে ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় নিয়ে বিক্রি করেন। হাটের আড়তদার ফজল মিয়া জানান, প্রতি হাটে এখান থেকে ২০ থেকে ২৫ ট্রাক কলা দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়, আর কলা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এখানে সাতটি আড়ত গড়ে উঠেছে।
একই বছরের ৩১ জানুয়ারি দৈনিক মানবজমিনের এক প্রতিবেদনে হাটটির অবস্থান বলা হয় ঢাকা-সাগরদিঘী সড়কের কুতুবপুরে, রাস্তার দুই পাশে; জায়গাটি টাঙ্গাইলের সখীপুর ও ঘাটাইল এবং ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা উপজেলার সীমানায়। সেই প্রতিবেদনেও হাটের দিন ছিল রোববার ও বুধবার, আর কাঁদিপ্রতি এক টাকা হারে খাজনা আদায়ের কথা বলা হয়েছিল।

কাঁদির দাম ১০০ থেকে ৫০০ টাকা
ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, সে বছর কলার দাম অনেকটাই বেশি ছিল। কাঁদির আকার ও মান অনুযায়ী প্রতি কাঁদি কলা বিক্রি হচ্ছিল ১০০ থেকে ৫০০ টাকায়। কলা ব্যবসায়ী মিয়া হোসেন বলেন, এ বাজারের কলা উন্নত মানের এবং দেশের সব জায়গায় এর চাহিদা আছে, তাই দামও একটু বেশি। তার হিসাবে ১৫ থেকে ১৮ ছড়ির মধ্যম মানের একটি কাঁদি অন্তত ৩০০ টাকায় এবং এর চেয়ে ভালো মানের কাঁদি ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতো।
শ্রীপুর গ্রামের কলাচাষি মজিবুর রহমান বলেন, উপজেলার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় কলার হাট; অন্য বাজারের তুলনায় এখানে বেশি কলা বিক্রি হয় এবং দামও কিছুটা ভালো পাওয়া যায়, তাই কুতুবপুরে কলার আমদানিও বেশি।

চাষির হিসাবে খরচ ও আয়
গারোবাজারের কলাচাষি হযরত আলী জানান, সে বছর তিনি বিঘাপ্রতি ৩০০টি করে কলাগাছ লাগিয়েছিলেন। প্রতি বিঘায় তার খরচ হয়েছিল ৩০ হাজার টাকা, আর প্রতি বিঘা থেকে অন্তত ৮০ হাজার টাকার কলা বিক্রির আশা করছিলেন তিনি।

কলা চাষে টাঙ্গাইলের অবস্থান
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এম এফ হোসেন ২০১৪ সালে এআরপিএন জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখান, ২০০৬-০৭ থেকে ২০১০-১১ সাল পর্যন্ত দেশের ২৩টি অঞ্চলের মধ্যে কলার আবাদ সবচেয়ে বেশি ছিল টাঙ্গাইল অঞ্চলে। ২০১০-১১ সালে এই অঞ্চলে কলার আবাদ ছিল ১৬ হাজার ৮৬৩ একর, গড় ফলন একরে ৮ দশমিক ০৫ টন। একই বছর সারা দেশে কলার আবাদ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৮৯ একর, উৎপাদন ৮ লাখ ৮৪০ টন।
গবেষণাটি নরসিংদী, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, রংপুর, বগুড়া, নাটোর, পাবনা, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও খুলনাকে কলা চাষের প্রধান জেলা হিসেবে উল্লেখ করে। সারা বছর পাওয়া, পুষ্টিগুণ, দাম ও জনপ্রিয়তার কারণে কলাকে দেশের এক নম্বর ফল বলা হয়, আর দেশের মোট ফলের চাহিদার ৪২ শতাংশ কলা মেটায় বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে।
সখীপুর ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল জেলার একটি উপজেলা। এর আয়তন ৪৩৫ দশমিক ১৯ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১০টি, কালিয়া তার একটি। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৮৫।

ছবি: David Stanley / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, দৈনিক মানবজমিন, এআরপিএন জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল সায়েন্স (এম এফ হোসেন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)