উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় ২০১৯-২০ মৌসুমে কুল চাষ আগের বছরের চেয়ে বেড়েছিল, কিন্তু ফলন কিছুটা কমে যায়। ২০২০ সালের মার্চে জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে কৃষি বিভাগ ও চাষিরা এর জন্য ২০১৯ সালের নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় বুলবুলকে দায়ী করেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে সেই মৌসুমে জেলায় ৬ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন কুল উৎপাদিত হয় এবং কুল বিক্রি করে আয় হয় ৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
সাত উপজেলায় ৬৫৪ হেক্টরে কুলের আবাদ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সাতক্ষীরা খামারবাড়ির অফিস সহকারী শেখ হাফিজুর রহমান জানান, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জেলায় ৬৫৪ হেক্টর জমিতে কুলের আবাদ হয়। সবচেয়ে বেশি আবাদ হয় কলারোয়া উপজেলায়, ৩১৬ হেক্টরে। এরপর তালায় ১৫৮ হেক্টর ও সাতক্ষীরা সদরে ১০৪ হেক্টর। শ্যামনগরে ২৫, কালিগঞ্জে ২০, দেবহাটায় ১৬ এবং আশাশুনিতে ১৫ হেক্টর জমিতে কুল চাষ হয়।
খামারবাড়ির উপপরিচালক অরবিন্দু বিশ্বাস তখন জানান, জেলায় পাঁচ হাজার কুলচাষি রয়েছেন। আগের মৌসুমে জেলায় ৭ হাজার ৯২ মেট্রিক টন কুল উৎপাদিত হয়েছিল এবং আয় হয়েছিল ৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। তাঁর ভাষ্য, অল্প খরচে বেশি লাভ হওয়ায় সাতক্ষীরায় কুলের আবাদ বাড়ছে এবং কৃষি বিভাগ চাষিদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে; তবে সেই মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে চাষিদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
মুকুলের সময় আঘাত হানে বুলবুল
অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর রাতে পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপের কাছে উপকূলে আঘাত হানে। পরদিন দুর্বল হয়ে এটি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে অগ্রসর হয় এবং ভারী বৃষ্টি ঝরায়। বাংলাদেশে ঝড়ে ২৫ জনের মৃত্যু হয়; প্রায় ৭২ হাজার মেট্রিক টন ফসল নষ্ট হয়, যার মূল্য ধরা হয় ২৬৮ কোটি টাকা।
ঢাকা ট্রিবিউনের ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর বাইরে সবজি, পান, সরিষা ও কুল মিলিয়ে আরও ২ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়। কুলগাছে সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ফুল আসে এবং শীতে ফল পাকে; ঝড়টি এসেছিল ঠিক মুকুল আসার শুরুতে।

তালার দুই চাষির হিসাব
তালা উপজেলার ইসলামকাটি ইউনিয়নের বাউখোলা গ্রামের আজগর আলী মোল্লা তরকারি ও সবজির চাষ ছেড়ে পাঁচ বছর ধরে কুল চাষ করছিলেন। আগের মৌসুমে তিনি ৭৫ হাজার টাকা খরচে তিন বিঘায় কুল চাষ করে দেড় লাখ টাকার বেশি বিক্রি করেন। ২০১৯-২০ মৌসুমে নিজের চার বিঘা জমিতে এক লাখ টাকা খরচ করে তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি বিক্রির আশা করেছিলেন। কিন্তু মুকুল আসার শুরুতেই বুলবুলে তা ঝরে যায়; বিক্রি হয় ২ লাখ ২০ হাজার টাকার কুল, লাভ থাকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা।
একই গ্রামের কাবিল শেখ ১৪ বছর ধরে কুল চাষ করছেন। নিজের জমি না থাকায় অন্যের জমি ইজারা নিয়ে সেই মৌসুমে তিনি ৫০ বিঘায় কুল চাষ করেন, খরচ হয় ২০ লাখ টাকা। ৪০ থেকে ৪২ লাখ টাকার কুল বিক্রির আশা থাকলেও বিক্রি হয় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকার। তাঁর মতে, কুল চাষে খরচ কম, বাড়তি পরিচর্যা লাগে না, আর কুলের মৌসুম শেষে একই জমিতে অন্য ফসল চাষ করে বাড়তি আয় করা যায়।
সাতক্ষীরার কুল ঢাকা, খুলনা ও যশোরসহ বিভিন্ন জায়গায় যায়। এ অঞ্চলের কুলের সবচেয়ে বড় মোকাম খুলনার কাঁচাবাজার; সেখানকার ব্যবসায়ীরা চাষিদের কাছ থেকে কুল কিনে নেন।

কুল: কাঁটাওয়ালা গাছের শীতের ফল
কুল বা বরইয়ের বৈজ্ঞানিক নাম Ziziphus mauritiana; এটি র্যামনেসি (Rhamnaceae) পরিবারের কাঁটাযুক্ত চিরসবুজ গুল্ম বা ছোট গাছ, যার আদি নিবাস দক্ষিণ এশিয়াসহ দক্ষিণ চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অংশ। গাছ ১০ থেকে ১২ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে এবং লাগানোর তিন বছরের মধ্যে ফল দেয়। এটি চরম তাপমাত্রা সইতে পারে এবং শুষ্ক বা জলাবদ্ধ দুই অবস্থাতেই টিকে থাকে। বাংলাদেশে প্রায় সব জায়গায়, সব ধরনের মাটিতে কুল জন্মে।
পুষ্টিগুণেও কুল সমৃদ্ধ। এতে ভিটামিন সি-র পরিমাণ পেয়ারার পরেই, লেবুজাতীয় ফল ও আপেলের চেয়ে অনেক বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম কুলে প্রায় ৫৮.৫ কিলোক্যালরি শক্তি ও ১৭ গ্রাম শর্করা থাকে; সঙ্গে আছে ভিটামিন এ ও খনিজ উপাদান।

ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, উইকিপিডিয়া (ঘূর্ণিঝড় বুলবুল; Ziziphus mauritiana; কুল)





মন্তব্য
(০)