দেশে একসময় 'ফরমালিনের নামে' কৃষকের প্রচুর ফল নষ্ট করা হয়েছিল বলে অভিযোগ তুলে, সেই কাজের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ফল বিশেষজ্ঞ ও 'বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন' প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ। ২০২৬ সালের ২৭ জুন রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত 'ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা' শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ দাবি জানান। তার মতে, ফরমালিন ও কার্বাইড নিয়ে জনমনে যে আতঙ্ক রয়েছে, তার বড় একটি অংশ ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি
ড. মেহেদী মাসুদ বৈঠকে বলেন, 'এক সময় ফরমালিনের নাম করে কৃষকের প্রচুর ফল নষ্ট করা হয়েছে। যারা এ কাজটি করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক এবং ওই সব চাষিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।' এটি তার একটি অভিযোগ ও দাবি; কোনো আদালতের সিদ্ধান্ত নয়। তিনি দাবি করেন, ফলে ফরমালিন আছে বলে অভিযান চালিয়ে যারা ফল ধ্বংস করেছিলেন তাদের বিচারের আওতায় আনা উচিত। বৈঠকটি সংবাদ সংস্থা জাগো নিউজের আয়োজনে হয় এবং এতে আলোচকরা ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
ড. মেহেদীর বক্তব্য, ফলে ফরমালিন দেওয়া হয় এই ধারণার বাস্তব ভিত্তি খুবই দুর্বল। তার ভাষায়, 'ফলে কখনো ফরমালিন কেউ দেয়নি, দেবেও না।' ভোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাজার থেকে কেনা ফল পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে খেলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই; গুজবে কান না দিয়ে নিয়মিত ফল খাওয়াই উচিত। প্রসঙ্গত, ফল ও শাকসবজি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ১০ বছরের বেশি বয়সীদের দৈনিক অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি খাওয়ার পরামর্শ দেয়। সংস্থাটি ২ থেকে ৫ বছর বয়সীদের জন্য দৈনিক ২৫০ গ্রাম এবং ৬ থেকে ৯ বছর বয়সীদের জন্য ৩৫০ গ্রাম ফল ও শাকসবজির পরামর্শ দেয়। ভিত্তিহীন আতঙ্কে ফল খাওয়া কমে গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্যও ভালো নয় বলে বৈঠকে মত দেওয়া হয়।

ফরমালিন কী এবং কেন ফলে তা কাজ করে না
রসায়নের ভাষায় ফরমালিন হলো ফরমালডিহাইডের জলীয় দ্রবণ; সাধারণত প্রায় ৩৭ শতাংশ ফরমালডিহাইডযুক্ত দ্রবণকে 'ফরমালিন' বলা হয়। এটি মূলত জীবাণুনাশক হিসেবে এবং গবেষণাগারে প্রাণী বা প্রাণীর কলা সংরক্ষণে (টিস্যু ফিক্সেশন) ব্যবহৃত হয়। ফরমালডিহাইড প্রোটিনের অ্যামিনো গ্রুপের সঙ্গে বিক্রিয়া করে প্রথমে মিথাইলল এবং পরে শিফ বেজ তৈরি করে ক্রস-লিংক ঘটায়; এর ফলেই কলা শক্ত ও স্থিতিশীল হয়। ড. মেহেদী মাসুদের ব্যাখ্যা, 'ফরমালিন শুধু প্রোটিনের ওপর কাজ করে। ফলে প্রোটিন থাকে ১ শতাংশের নিচে, তাহলে ফলে ফরমালিন কী কাজ করবে? করবে না।'
বাস্তবে ফরমালিন একটি শিল্প-রাসায়নিক; এটি জীবাণুনাশক হিসেবে, বিভিন্ন রজন (রেজিন) তৈরিতে এবং মৃতদেহ বা জৈব নমুনা সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়, খাদ্যের উপাদান হিসেবে নয়। প্রোটিনসমৃদ্ধ কলা শক্ত ও স্থিতিশীল করাই এর কাজ, অথচ ফল মূলত পানি ও শর্করায় ভরা এবং এতে প্রোটিন খুবই কম। তাই রসায়নের দিক থেকেই ফল ফরমালিনের উপযুক্ত লক্ষ্য নয়; ফলের গায়ে ফরমালিন প্রয়োগ করলে তা সংরক্ষণের বদলে কার্যত অপচয়ই হয়।
ফরমালডিহাইড অনেক স্বাভাবিক খাবারেও প্রাকৃতিকভাবে অল্প পরিমাণে থাকে। রাসায়নিক তথ্যভাণ্ডার অনুযায়ী খাবারে সাধারণত প্রতি কেজিতে ১ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ফরমালডিহাইড থাকতে পারে, এবং মানবদেহের রক্তেও বিপাকক্রিয়ার ফলে স্বল্প মাত্রায় (প্রায় ৫০ মাইক্রোমোলার) ফরমালডিহাইড তৈরি হয়; শরীর দ্রুত তা ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে ফেলে। বৈঠকে ড. মেহেদীও বলেন, 'ফলের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু ফরমালিন তৈরি হয়... এর একটা সেফ ডোজ আছে; ২ থেকে ৬০ পিপিএম পর্যন্ত এটা শরীরের জন্য কোনো ক্ষতি নেই।' এই নির্দিষ্ট মাত্রার দাবিটি তার নিজস্ব বক্তব্য।
রাসায়নিক তথ্যভাণ্ডার আরও জানায়, মানবদেহে সেরিন ও থ্রিয়োনিনের মতো অ্যামিনো অ্যাসিডের বিপাকের ফলে স্বাভাবিকভাবেই ফরমালডিহাইড তৈরি হয়; শরীর তা দ্রুত ভেঙে ফরমিক অ্যাসিডে পরিণত করে। পরিবেশেও ফরমালডিহাইড স্থায়ী হয় না; সূর্যালোক কিংবা মাটি ও পানির ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ভেঙে যায়। খাবারের মধ্যে মাছ, সামুদ্রিক খাবার ও ধোঁয়ায় প্রক্রিয়াজাত হ্যামে তুলনামূলক বেশি ফরমালডিহাইড থাকে বলে উল্লেখ আছে; আর খাবারে থাকা ফরমালডিহাইড সাধারণত আবদ্ধ অবস্থায় থাকে এবং জলীয় পরিবেশে অস্থিতিশীল। এ কারণে ফলের গায়ে ফরমালিন ছিটালেও তা বাষ্পীভূত হয়ে বা ধুয়ে সহজেই চলে যায় এবং খোসা ভেদ করে ভেতরে স্থায়ী হওয়ার বাস্তব সুযোগ কম।
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) ফরমালডিহাইডকে মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী (গ্রুপ ১) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এই ঝুঁকি মূলত বাতাসে দীর্ঘদিন শ্বাসের মাধ্যমে উচ্চমাত্রার সংস্পর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটি নাক ও গলার ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। বাতাসে প্রায় ০.১ পিপিএমের বেশি মাত্রা চোখ ও শ্বাসনালিতে জ্বালা ধরাতে পারে। অর্থাৎ পেশাগত শ্বাস-সংস্পর্শের ঝুঁকিকে ধুয়ে খাওয়া ফলের সামান্য প্রাকৃতিক ফরমালডিহাইডের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা বিজ্ঞানসম্মত নয়। তবে কারও নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য বা খাদ্যসংক্রান্ত উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।

ফরমালিন অভিযান ও মাপার যন্ত্রের বিভ্রান্তি
ড. মেহেদী মাসুদের বক্তব্যে অতীতের সেই অভিযানগুলোর প্রসঙ্গ উঠে আসে, যেখানে ফলে ফরমালিন আছে ঘোষণা দিয়ে টনকে টন ফল নষ্ট করা হয়েছিল। তার দাবি, বাতাসের ফরমালিন মাপার যন্ত্র ফলের ভেতরে ঢুকিয়ে বলা হতো যে ফলে ফরমালিন আছে। প্রকৃতপক্ষে হাতে বহনযোগ্য ওই ধরনের যন্ত্র তৈরি হয় বাতাসে ফরমালডিহাইডের উপস্থিতি মাপার জন্য, ফলের ভেতরের মাত্রা নির্ভুলভাবে নির্ণয়ের জন্য নয়। তিনি বলেন, 'আমি ১০ পিপিএম আছে বলে দিলাম, ফরমালিন বলে টনকে টন ফসল ধ্বংস করলো। এটি শুধু অজ্ঞতার কারণে।' এই মূল্যায়ন তার নিজস্ব; তিনি মনে করেন, অভিযানকারী 'ম্যাজিস্ট্রেট'দেরও বিচারের আওতায় আনা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুল পরিমাপ ও গুজবের কারণে অতীতে অনেক নিরীহ চাষি ও ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়েছেন, বিশেষত আম মৌসুমে, যখন একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ফল বাজারে আসে। ড. মেহেদী মাসুদের বক্তব্য এ কারণেই পরিমাপ ও পরীক্ষায় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ এবং দোষীদের জবাবদিহির দাবি তুলে ধরে। তার মতে, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগারে যথাযথ পদ্ধতিতে পরীক্ষা না করে কেবল হাতে বহনযোগ্য যন্ত্রের পাঠ দেখে ফল ধ্বংস করা ন্যায্য নয়।
ফরমালিনের অপব্যবহার ঠেকাতে ২০১৫ সালে 'ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন' প্রণয়ন করা হয়, যার মাধ্যমে ফরমালিন আমদানি, উৎপাদন, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর লাইসেন্সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইনের আওতায় গঠিত বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার তদারকির দায়িত্ব পালন করে। এসব আইন ও কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য হলো ভোক্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, একইসঙ্গে ভুল পরিমাপ বা ভিত্তিহীন ধারণার কারণে প্রকৃত ক্ষতির হাত থেকে কৃষককে রক্ষা করা।
ক্লাইমেক্টেরিক ও নন-ক্লাইমেক্টেরিক ফল
ড. মেহেদী মাসুদ ব্যাখ্যা করেন, গাছ থেকে সংগ্রহের পর সব ফল একইভাবে পাকে না। ফল সাধারণত দুই ধরনের: ক্লাইমেক্টেরিক ও নন-ক্লাইমেক্টেরিক। আম, কলা ও আপেলের মতো ক্লাইমেক্টেরিক ফলে পরিপক্বতার সময় শ্বসন (রেসপিরেশন) হঠাৎ বেড়ে যায় এবং ইথিলিন হরমোনের প্রভাবে সংগ্রহের পরও স্টার্চ ধীরে ধীরে চিনিতে রূপান্তরিত হয়; ফলে ফল আরও পাকে ও মিষ্টি হয়। অন্যদিকে আনারস, কমলা বা মাল্টার মতো নন-ক্লাইমেক্টেরিক ফলে গাছ থেকে পাড়ার পর এ ধরনের পরিবর্তন তেমন হয় না, তাই এসব ফল গাছেই পরিপক্ব অবস্থায় সংগ্রহ করতে হয়।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, ক্লাইমেক্টেরিক ফলে পরিপক্বতার শুরুতে ইথিলিন উৎপাদন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ একসঙ্গে বেড়ে যায়; এই হঠাৎ বৃদ্ধি বা 'বার্স্ট' ফলটিকে সমানভাবে পাকায়। নন-ক্লাইমেক্টেরিক ফল গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সাধারণত আর পুরোপুরি পাকে না। এ কারণেই বাণিজ্যিকভাবে অনেক ফল কাঁচা অবস্থায় সংগ্রহ করে পরে নিয়ন্ত্রিতভাবে পাকানো সম্ভব হয়, যেমন কলা সবুজ অবস্থায় তুলে পরিবহনের পর গন্তব্যে পাকানো হয়। এই পার্থক্য বোঝা থাকলে কোন ফল কখন সংগ্রহ করতে হবে এবং কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, তা সহজে নির্ধারণ করা যায়।
উদ্ভিদদেহে ইথিলিন তৈরি হয় মেথিওনিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে; মেথিওনিন প্রথমে এস-অ্যাডিনোসিল মেথিওনিন, এরপর এসিসি (১-অ্যামিনোসাইক্লোপ্রোপেন-১-কার্বক্সিলিক অ্যাসিড) এবং শেষে জারিত হয়ে ইথিলিনে পরিণত হয়। কাঁচা ফলে ইথিলিন নিজেই নিজের উৎপাদন দমিয়ে রাখে, ফলে ফল সময়ের আগে পাকে না। কিন্তু পরিপক্ব অবস্থায় প্রক্রিয়াটি উল্টে যায়; সামান্য ইথিলিন আরও ইথিলিন উৎপাদনের 'অটোক্যাটালিটিক' চক্র শুরু করে ফলটিকে দ্রুত ও সমানভাবে পাকিয়ে তোলে। শ্বসনের সর্বোচ্চ পর্যায়টিই সাধারণত ফলের সর্বোত্তম খাওয়ার উপযোগী অবস্থা নির্দেশ করে; এর পর ফল ছত্রাক-আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে ও নষ্ট হতে শুরু করে।

কার্বাইড নিষিদ্ধ, ইথিলিন প্রাকৃতিক
ফল পাকানোর ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও ইথিলিনের পার্থক্য তুলে ধরে ড. মেহেদী বলেন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড নিষিদ্ধ। এটি পানির সংস্পর্শে এসে অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে, যা ইথিলিনের মতো ফল পাকাতে পারলেও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শিল্পমানের কার্বাইডে প্রায়ই আর্সেনিক ও ফসফরাসজাত বিষাক্ত অপদ্রব্য (ফসফিন, আর্সিন) মিশে থাকতে পারে; এ কারণে বিশ্বের অনেক দেশেই ফল পাকাতে কার্বাইডের ব্যবহার নিষিদ্ধ।
অন্যদিকে ইথিলিন একটি প্রাকৃতিক উদ্ভিদ হরমোন, যা ফলের ভেতরেই স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হয় এবং পাকতে ভূমিকা রাখে। ড. মেহেদীর ভাষ্য, প্রয়োজন হলে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মান মেনে ইথিলিন ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ফল একসঙ্গে নিরাপদে পাকিয়ে বাজারে সরবরাহ করা যায়; বিশ্বজুড়ে এ পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়। তিনি সতর্ক করেন, নিষিদ্ধ কার্বাইড আর অনুমোদিত ইথিলিনকে একই কাতারে ফেলায় মানুষের মধ্যে অযথা ভয় তৈরি হচ্ছে এবং ফল খাওয়ার প্রবণতা কমছে।
বাণিজ্যিক পর্যায়ে ইথিলিন গ্যাস উৎপাদনকারী যন্ত্র (ক্যাটালিটিক জেনারেটর) ও সেন্সরের সাহায্যে গ্যাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদভাবে ফল পাকানো হয়। এমনকি ঘরোয়া পর্যায়ে ঢাকনাযুক্ত পাত্রে ফল রাখলে চারপাশে ইথিলিন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে পাকার গতি বাড়ে। মূল কথা হলো, ইথিলিন উদ্ভিদের নিজস্ব হরমোন, এটি ফল পাকার স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রকের কাজ করে, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক নয়। অন্যদিকে কার্বাইড থেকে তৈরি অ্যাসিটিলিন ইথিলিনের নকল করলেও তা উদ্ভিদের স্বাভাবিক হরমোন নয়, এবং এর সঙ্গে আসা অপদ্রব্যই মূল উদ্বেগের কারণ।

ফল সংরক্ষণে নিয়ন্ত্রিত বায়ুমণ্ডল প্রযুক্তি
দীর্ঘদিন ফল ভালো রাখতে নিয়ন্ত্রিত বায়ুমণ্ডল (কন্ট্রোলড অ্যাটমোসফিয়ার) প্রযুক্তি কার্যকর বলে জানান ড. মেহেদী। এ পদ্ধতিতে সংরক্ষণাগারের অক্সিজেন কমিয়ে তার পরিবর্তে নাইট্রোজেন বা কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ানো হয়; এতে ফলের শ্বসন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং ফল দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। বিশ্বজুড়ে আপেলসহ নানা ফল কয়েক মাস পর্যন্ত সতেজ রাখতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
ক্লাইমেক্টেরিক ফলের বেলায় এ প্রযুক্তি বিশেষভাবে কার্যকর, কারণ অক্সিজেন কমে গেলে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়লে ইথিলিনের কার্যকারিতা ও শ্বসন, দুই-ই ধীর হয়ে যায়, ফলে পাকার গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ; উপযুক্ত শীতল তাপমাত্রা বিপাকক্রিয়া কমিয়ে ফল টাটকা রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে আম ও অন্যান্য মৌসুমি ফল স্বল্প সময়ে একসঙ্গে বাজারে আসে, এমন সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি অপচয় কমানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ড. মেহেদী জানান, তার ব্যক্তিগত গবেষণায় ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আম ২৫ দিন পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার আম নিয়ে পরিচালিত একটি পরীক্ষায়ও দেখা গেছে, এ পদ্ধতিতে আম তিন থেকে চার সপ্তাহ ভালো থাকে। এই তথ্য তার বক্তব্য অনুযায়ী। মৌসুমি ফলের শেলফ লাইফ বাড়াতে পারলে ভরা মৌসুমে দাম পড়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ফল নষ্ট হওয়ার সমস্যা অনেকটা কমানো সম্ভব; বৈঠকের মূল আলোচ্য 'ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ' সম্ভাবনার সঙ্গে এটি সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের আম ও ফলের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের ফল অর্থনীতিতে আমের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আম (বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica) Anacardiaceae পরিবারের গাছ। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে দেশে প্রায় ১০০টির মতো আমের জাত রয়েছে এবং উন্নত জাতের আম প্রধানত রাজশাহী, নবাবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ও দিনাজপুর অঞ্চলে জন্মে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়েছিল বলে বাংলাপিডিয়া উল্লেখ করেছে, যদিও আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন বছরে বছরে ওঠানামা করে। আমগাছে সাধারণত জানুয়ারি-মার্চে মুকুল আসে এবং সেই সময়ের কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফল ধারণে ক্ষতি করতে পারে। কাঁচা অবস্থায় আম সবুজ থাকে এবং পাকলে জাতভেদে সবুজাভ-হলুদ, হলুদ, কমলা বা লালচে রঙ ধারণ করে; কিছু জাত আবার পাকলেও সবুজই থাকে।
আম ছাড়াও বাংলাদেশে কলা, কাঁঠাল, পেঁপে, আনারস, লিচু ও পেয়ারার মতো নানা ফল উৎপাদিত হয়; এর মধ্যে কাঁঠাল দেশের জাতীয় ফল। মৌসুমি এসব ফলও প্রায় একই সময়ে বাজারে আসে বলে ভরা মৌসুমে দাম পড়ে যাওয়া ও অপচয়ের সমস্যা সব ফলের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। ফলে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের গুরুত্ব কেবল আমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক ফল অর্থনীতির জন্যই তা প্রযোজ্য।
জুন মাস দেশের আম মৌসুমের ভরা সময়; এ সময়ই প্রতিবছর ফরমালিন ও কার্বাইড নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি হয় এবং ভিত্তিহীন আতঙ্ক ছড়ালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহীর মতো আম অঞ্চলের চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বৈঠকের আলোচকরা মনে করেন, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প সম্প্রসারিত হলে মৌসুমের উদ্বৃত্ত ফল নষ্ট না হয়ে জুস, পাল্প, আচার বা শুকনো ফলে রূপান্তরিত হতে পারে, যা কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ও অপচয় কমাতে সহায়ক হবে।
গোলটেবিল বৈঠকের আলোচক ও আহ্বান
জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।
বৈঠকের মূল সুর ছিল, ফল নিয়ে অযথা আতঙ্ক না ছড়িয়ে বিজ্ঞানসম্মত তথ্যের ভিত্তিতে ভোক্তাদের সচেতন করা এবং দেশের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া। ড. মেহেদী মাসুদের দাবি, নিষিদ্ধ কার্বাইডের বিরুদ্ধে কঠোর থাকার পাশাপাশি অনুমোদিত ইথিলিন ও আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তিকে ভুল বোঝাবুঝি থেকে মুক্ত রাখলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হবেন।
আলোচনার ব্যবহারিক বার্তা ছিল স্পষ্ট: বাজার থেকে কেনা ফল পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া, নিষিদ্ধ কার্বাইড ও অনুমোদিত ইথিলিনের পার্থক্য বোঝা, এবং শীতল সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রিত বায়ুমণ্ডল ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো। ড. মেহেদী মাসুদ মনে করেন, বিজ্ঞাননির্ভর তথ্য প্রচার করলে ভোক্তার আস্থা ফিরবে, ফল খাওয়ার প্রবণতা বাড়বে এবং কৃষকও তার উৎপাদিত ফলের ন্যায্যমূল্য পাবেন।
ছবি: Yahya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; উইকিপিডিয়া (ফরমালডিহাইড, ক্লাইমেক্টেরিক ফল ও ফল পাকানোর রসায়ন); বাংলাপিডিয়া (আম); আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি); বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।





মন্তব্য
(০)