প্রাণীর কোষ থেকে মাংস তৈরি এখন আর শুধু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির বিষয় নয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) এক রুশ নভোচারী থ্রিডি প্রিন্টার ব্যবহার করে গরু ও খরগোশের মাংস এবং মাছের টিস্যু তৈরি করেন। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি ২০১৯ সালের অক্টোবরে এ খবর জানায়। পরীক্ষার জন্য প্রাণীর কোষ সরবরাহ করেছিল ইসরায়েলের নবীন প্রতিষ্ঠান আলেফ ফার্মস।
মহাকাশ স্টেশনে যেভাবে হলো পরীক্ষা
আলেফ ফার্মস জানায়, পরীক্ষাটি হয় আইএসএসের রুশ অংশে। রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান থ্রিডি বায়োপ্রিন্টিং সলিউশনসের তৈরি একটি থ্রিডি বায়োপ্রিন্টার দিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে পেশি টিস্যু জোড়া লাগানো হয়। গরুর দেহে পেশি টিস্যু যেভাবে স্বাভাবিকভাবে নতুন করে তৈরি হয়, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সেই প্রক্রিয়াটি অনুকরণ করাই ছিল লক্ষ্য। প্রায় ভারহীন অবস্থায়ও যে এভাবে মাংসের টিস্যু গড়া যায়, পরীক্ষাটি তার প্রাথমিক প্রমাণ দেয়। এ কাজে আরও যুক্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মিল সোর্স টেকনোলজিস ও ফিনলেস ফুডস।
আলেফ ফার্মসের প্রধান নির্বাহী দিদিয়ের তুবিয়া এএফপিকে বলেন, এই প্রযুক্তি দীর্ঘ মহাকাশযাত্রা সম্ভব করতে পারে এবং মহাকাশ অভিযানে নতুন গতি আনতে পারে; উদাহরণ হিসেবে মঙ্গল অভিযানের কথা আসে। ফুড অ্যান্ড ড্রিংক টেকনোলজির প্রতিবেদনে তাঁর উদ্ধৃতি ছিল, ‘মহাকাশে এক কেজি গরুর মাংস উৎপাদনের জন্য আমাদের হাতে ১৫ হাজার লিটার পানি নেই।’
তবে তুবিয়া এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য পৃথিবীতে মাংস বিক্রি করা।’ তাঁর ভাষায়, এর উদ্দেশ্য ‘প্রচলিত কৃষিকে প্রতিস্থাপন করা নয়’, বরং ‘কারখানাধর্মী পশু খামারের একটি ভালো বিকল্প হওয়া’। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত আলেফ ফার্মসের সদর দপ্তর ইসরায়েলের রেহোভোতে; প্রতিষ্ঠানটি গরুর পেশি গঠনকারী কোষ আলাদা করে বায়োরিঅ্যাক্টরে বড় করে স্টেক তৈরির কাজ করে।

কোষ থেকে মাংস: শুরু ২০১৩ সালে
কোষ থেকে তৈরি মাংসকে কালচারড বা কালটিভেটেড মিটও বলা হয়। এটি কোষ কৃষির একটি রূপ, যেখানে প্রাণীর দেহের বাইরে গবেষণাগারে প্রাণীর কোষ বড় করে মাংস উৎপাদন করা হয়। এএফপি জানায়, গরুর স্টেম সেল থেকে প্রথম বার্গারটি তৈরি করেন নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রিখট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী মার্ক পোস্ট, এবং তা উপস্থাপন করা হয় ২০১৩ সালে। ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে বার্গারটি রান্না করে চেখে দেখানো হয়। এরপর বেশ কিছু নবীন প্রতিষ্ঠান এ খাতে কাজ শুরু করে।

২০১৯ সালের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, উৎপাদন খরচ তখনও অনেক বেশি ছিল এবং এমন কোনো পণ্য বিক্রির জন্য বাজারে আসেনি। এই মাংসের নাম নিয়েও বিতর্ক ছিল: ল্যাবরেটরির মাংস, কৃত্রিম মাংস, কোষভিত্তিক মাংস না কালটিভেটেড মাংস।

বাজারে আসতে কত সময়
শিল্পসংশ্লিষ্টরা তখন আশা করছিলেন, ছোট পরিসরে বাণিজ্যিক বিক্রি বেশ তাড়াতাড়ি শুরু হতে পারে। কোষ থেকে মাংস তৈরি করা ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিষ্ঠান জাস্টের প্রধান জশ টেট্রিক সান ফ্রান্সিসকোর এক সম্মেলনে বলেন, সম্ভবত সে বছরই তা হবে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, চার হাজার ওয়ালমার্ট বা সব ম্যাকডোনাল্ডসে নয়, প্রথমে হাতে গোনা কয়েকটি রেস্তোরাঁয়।
নিউইয়র্কে কোষ থেকে মাংস তৈরি করা প্রতিষ্ঠান ফর্ক অ্যান্ড গুডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী নিয়া গুপ্তা বলেন, একটি শিল্প হিসেবে তাঁরা শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানের দিক থেকে অগ্রগতি করছেন; পরের ধাপ হলো প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা। এএফপি জানায়, বিভিন্ন হিসাবে যুক্তিসংগত দামে সুপারমার্কেটে এই মাংস আসতে পাঁচ থেকে ২০ বছর লাগতে পারে, আর এর জন্য আরও বিনিয়োগ দরকার। মাংস ও মাছের বিকল্প নিয়ে কাজ করা সংস্থা দ্য গুড ফুড ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০১৮ সালে এ খাতে মোট বিনিয়োগ এসেছিল মাত্র ৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে কোষভিত্তিক খাদ্যের তদারকি কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) ও খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, তবে তখনও তা চূড়ান্ত হয়নি। সমর্থকদের মতে, পশু পালন ও জবাই এড়িয়ে এ ধরনের মাংস উৎপাদনব্যবস্থাকে টেকসই করতে পারে; অন্যদিকে জ্বালানি খরচসহ এর প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছিল।
ছবি: NASA / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, এএফপি (ফ্রান্স ২৪ ও ফিজ ডট অর্গ), নিউজউইক, ফুড অ্যান্ড ড্রিংক টেকনোলজি, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)