কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার সীমান্তবর্তী শুভনগর গ্রামের যুবক ইকবাল হোসেন ইউটিউবে ভিডিও দেখে বাড়ির উঠানে চৌবাচ্চায় মাছ চাষ শুরু করে সফল হয়েছিলেন। ঢাকা ট্রিবিউন ২০১৯ সালের ২৫ জুন জানায়, পেশায় প্রিন্টিং প্রেস ব্যবসায়ী ইকবাল শখের বশে শুরু করা এ চাষ থেকে তখন নিজের পরিবারের মাছের চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের পরিবারগুলোতেও মাছ সরবরাহ করছিলেন।
ইউটিউবের ভিডিও থেকে উঠানের চৌবাচ্চায়
ইকবাল হোসেন ইউটিউবে বাড়ির উঠানে স্বল্প খরচে চৌবাচ্চায় মাছ চাষের পদ্ধতি দেখেন। এরপরই তাঁর মাছ চাষের শখ জাগে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তিনি উঠানে ৭ ফুট বাই ৮ ফুট মাপের তিনটি চৌবাচ্চায় মাছ চাষ শুরু করেন। সব মিলিয়ে তাঁর খরচ হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
শুরুতে তিনি কয়েক প্রজাতির মাছ চাষ করেছিলেন। পরে তাঁর কাছে শিং, তেলাপিয়া ও পাঙাস এ পদ্ধতির জন্য উপযুক্ত মনে হয়; এর বাইরে অন্য মাছও চৌবাচ্চায় রাখা হতো। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তিনটি চৌবাচ্চায় কয়েক শ মাছ ছিল। স্বল্প পুঁজিতে নিজের চেষ্টায় গড়া চাষটি দেখাশোনা করতেন পরিবারের সদস্যরা। ইকবাল হোসেনের মতে, এ পদ্ধতিতে যে কেউ পরিবারের মাছের চাহিদা মিটিয়ে কিছু মাছ বিক্রিও করতে পারেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা যা বলেছিলেন
কুমিল্লার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুছ আখন্দ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, পানি ও অক্সিজেনের সরবরাহ থাকলে যে কেউ চৌবাচ্চায় মাছ চাষ করতে পারেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ চাষে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয় না, তাই চৌবাচ্চায় উৎপাদিত মাছ পরিবেশসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত হয়। বাণিজ্যিকভাবে না হলেও স্বল্প খরচের এ চাষে একটি পরিবারের সারা বছরের মাছের চাহিদা মেটানো যায়, পাশাপাশি কিছু মাছ বিক্রিও করা যায়। তাই গ্রাম বা শহরের যে কেউ এ পদ্ধতিতে মাছের চাহিদা মেটাতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ যে অবস্থানে আছে, তা আরও এগিয়ে নিতে চাষ বাড়াতে হবে। চৌবাচ্চায় মাছ চাষে মানুষকে উৎসাহিত করা গেলে তা উৎপাদনে ভূমিকা রাখবে, পরিবারের চাহিদাও মিটবে।
চৌবাচ্চায় চাষ হওয়া তিন মাছ
শিং (বৈজ্ঞানিক নাম Heteropneustes fossilis) এ অঞ্চলের দেশি মাছ; ফিশবেসের তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত এর প্রাকৃতিক বিস্তার। মাছটি প্রয়োজনে বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে, তাই পুকুর, ডোবা ও জলাভূমির মতো অক্সিজেন কম থাকা পানিতেও টিকে থাকে। এর বুকের পাখনার কাঁটায় বিষ থাকে, তাই ধরার সময় সাবধান থাকতে হয়। ঔষধি গুণের কারণে বাজারে এ মাছের চাহিদা অনেক।
তেলাপিয়া বাংলাদেশে বিদেশ থেকে আনা মাছ। গ্লোবাল অ্যাকোয়াকালচার অ্যাডভোকেট সাময়িকীতে ২০০৩ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধ অনুযায়ী, দেশে প্রথম আনা হয় মোজাম্বিক তেলাপিয়া, ১৯৫৪ সালে। এরপর ১৯৭৪ ও ১৯৮৭ সালে নাইলোটিকা (নাইল) তেলাপিয়া আনা হয় এবং ১৯৯৪ সালে আসে উন্নত জাতের গিফট তেলাপিয়া। নিবন্ধটি জানায়, গ্রামের পরিবারগুলোর ছোট পুকুরের বেশির ভাগেই তেলাপিয়া পাওয়া যায়, আর পুকুরেই এর পোনা হওয়াকে চাষিরা বড় সুবিধা মনে করেন।

দেশে থাই পাঙাস নামে পরিচিত চাষের পাঙাসের (Pangasianodon hypophthalmus) আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেকং অববাহিকা ও চাও ফ্রায়া নদী। পাকিস্তান জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেসে ২০০৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ড থেকে মাছটি দেশে আনে এবং ১৯৯৩ সালে দেশের হ্যাচারিতে এর কৃত্রিম প্রজনন শুরু হয়। দ্রুত বৃদ্ধি, ভালো স্বাদ ও আকারের কারণে মাছটি দেশজুড়ে জনপ্রিয় হয়। এর পটকা বাতাস থেকে শ্বাস নেওয়ার কাজও করে, তাই অক্সিজেন কম থাকা পানিতেও এটি টিকে থাকতে পারে।

ছবি: দিব্য দত্ত (Dibya Dutta) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, ফিশবেস, গ্লোবাল অ্যাকোয়াকালচার অ্যাডভোকেট (গ্লোবাল সিফুড অ্যালায়েন্স), পাকিস্তান জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)