রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের দেওবাডিয়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মো. শরিফুল ইসলাম আকাশ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আধুনিক কৃষি হাতিয়ার নিয়ে একটি ছোট ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। কৃষকের কাজ দ্রুত ও সহজ করার লক্ষ্যে তিনি এখন পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০ হাজার পিস স্থানীয়ভাবে তৈরি সরঞ্জাম বিক্রি করেছেন, যার বাজারমূল্য প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি লাঙল, কাঁচি থেকে শুরু করে মাটিতে সহজে গর্ত করার বিশেষ হাতিয়ারসহ ৪৫ ধরনের বেশি কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছিলেন, যেগুলো গ্রামীণ কামারশিল্প ও লেদ শিল্পের সমন্বয়ে তৈরি এবং অফলাইন ও অনলাইন দুই মাধ্যমেই বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত, আর কৃষিকাজকে সহজ করা ও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই মানসম্মত ও টেকসই কৃষি সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।
চাকরি ছেড়ে কৃষি হাতিয়ারের পথে
মো. মজিবুর মোল্লার ছেলে শরিফুল ইসলাম আকাশ ২০২০ সাল থেকে চাকরি ছেড়ে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। এই প্রতিবেদনের আগের দুই বছর ধরে তিনি বিশেষভাবে কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি নিজেও বরই, পেয়ারাসহ নানা ধরনের ফল ও শাক-সবজি চাষ করেন, আর মাঠে কাজ করতে গিয়েই এই উদ্যোগের ভাবনা তাঁর মাথায় আসে বলে জানান।
শরিফুল ইসলাম আকাশ বলেন, ‘আমি নিজেও বরই, পেয়ারা ও বিভিন্ন ধরনের ফল ও শাক-সবজি চাষ করি। মাঠে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জমি প্রস্তুত করা ও হাতের কাজগুলোতে অনেক কষ্ট হয় এবং সময়ও বেশি লাগে। তখনই মনে হয়েছে, কৃষকের কাজ সহজ করার জন্য কিছু করা দরকার। সেখান থেকেই এই উদ্যোগের শুরু।’
একসময় কৃষিকাজ মানেই ছিল দীর্ঘসময় ধরে কঠোর পরিশ্রম; তবে সেই ধারণা এখন বদলাতে শুরু করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আধুনিক হ্যান্ড টুলস ও গৃহস্থালি কৃষি উপকরণের ব্যবহারে কম সময়ে বেশি কাজ করা সম্ভব হচ্ছে, যা কৃষকের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলছে আরও সহজ ও কার্যকর। মাটি কোপানো, গর্ত তৈরি, আগাছা পরিষ্কার কিংবা ফসল কাটার মতো যে কাজ একজন কৃষক আগে কয়েক ঘণ্টায় সম্পন্ন করতেন, আধুনিক টুলস ব্যবহারে তা এখন অনেক কম সময়ে শেষ করা যাচ্ছে। এতে শ্রম যেমন কমছে, তেমনই বাড়ছে উৎপাদন দক্ষতা। শরিফুলের ভাষায়, নিজের জমিতে ফল ও সবজি চাষ করতে গিয়ে হাতে করা কাজে সময় ও পরিশ্রমের এই চাপ তিনি নিজেই অনুভব করেছেন, আর সেখান থেকেই কৃষকের জন্য সহজ, টেকসই হাতিয়ার তৈরির ভাবনা আসে।
৪৫ ধরনের বেশি হাতিয়ার
উদ্যোক্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের লাঙল, মাটিতে সহজে গর্ত করার বিশেষ হ্যান্ড টুলস, দা, কাঁচি, শাবল, বটিসহ এমনকি গৃহস্থালি ব্যবহারের উপযোগী সরঞ্জামসহ মোট ৪৫টিরও বেশি আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছেন। দেশীয় প্রযুক্তিতে কামার ও লেদ শিল্পের সমন্বয়ে এসব যন্ত্রপাতি তৈরি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন আকার ও কাজের উপযোগী করে এসব হাতিয়ার বানানো হয়, যাতে একজন কৃষক জমি তৈরি থেকে ফসল তোলা পর্যন্ত নানা কাজে সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন। দেশীয় উপকরণে তৈরি হওয়ায় নষ্ট হলে স্থানীয় বাজারেই এগুলো সহজে মেরামত করা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশি-বিদেশি ডিজাইনের সমন্বয়ে যত্নসহকারে তৈরি এসব টুলস জমি চাষ থেকে শুরু করে আগাছা পরিষ্কার ও ফসল কাটার কাজে কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে তাঁর দাবি। এতে একদিকে যেমন কৃষকের সময় বাঁচছে, অন্যদিকে শ্রমের চাপও কমছে। এসব হাতিয়ার মূলত ছোট ছোট দৈনন্দিন কাজের জন্য তৈরি, যেমন জমি তৈরি, চারা রোপণের জন্য গর্ত করা, আগাছা তোলা কিংবা ফসল কেটে ঘরে তোলা, যে কাজগুলোতে একজন কৃষক বা বাগানি সরাসরি হাতে কাজ করেন। অফলাইন ও অনলাইন, উভয় মাধ্যমেই এসব যন্ত্রপাতি বিক্রি করা হচ্ছে; তবে ‘এগ্রো মার্ট’ নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই বিক্রির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ গ্রামীণ কামারের তৈরি পণ্য এখন অনলাইন বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছে।

দাম, বিক্রি ও উদ্যোক্তার লক্ষ্য
শরিফুল জানান, পণ্যের মান অনুযায়ী ১৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দামের মধ্যে বিভিন্ন হ্যান্ড টুলস বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০ হাজার পিস বিভিন্ন ধরনের টুলস বিক্রি হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় দেড় থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা। শুরুতে পণ্যের প্রচারণা ও বাজারজাতকরণে কিছুটা সময় লাগলেও আগের কয়েক মাসে বিক্রির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে তিনি জানান।
তবে লাভই একমাত্র লক্ষ্য নয় বলে জানান এই উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, ‘মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের কৃষিখাতকে আরও শক্তিশালী করা এবং কৃষকের কাজকে সহজ করা।’ ব্যবসার অগ্রগতির পাশাপাশি কৃষিখাতে অবদান রাখার তৃপ্তিই তাঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শরিফুলের ভাষ্য, চীনে উৎপাদিত অনেক কৃষি টুলস দেশে ব্যবহৃত হলেও সেগুলোর স্থায়িত্ব কম এবং রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন। অনেক সময় অল্পদিন ব্যবহারের পরই সেগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা যায় না। সেখানে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি টুলস সহজেই স্থানীয় বাজার থেকে মেরামত করে আবার ব্যবহার করা যায়, ফলে নতুন করে কিনতে না হওয়ায় কৃষকের খরচও কমে বলে তিনি দাবি করেন। শুধু পেশাদার কৃষকই নন, পারিবারিক সবজি চাষে যুক্ত মানুষও এসব পণ্য ব্যবহার করছেন এবং দেশজুড়ে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি জানান। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন তরুণ খণ্ডকালীনভাবে কাজ করছেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেশের কৃষিখাতকে আরও এগিয়ে নিতে সামনে ভারী ও অধিক কার্যকর কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করার পরিকল্পনা আছে। লক্ষ্য একটাই, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো এবং সীমিত জমিতে আরও বেশি ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা।’
রাজবাড়ী ও পাংশা: কৃষিনির্ভর জনপদ
শরিফুল যেখানে বসবাস ও কাজ করেন, সেই রাজবাড়ী মধ্য বাংলাদেশে পদ্মার তীরের একটি ছোট জেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জেলাটির আয়তন প্রায় ১ হাজার ৯২ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার; প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব প্রায় ৯৬১ জন ও শিক্ষার হার ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ। জেলার বেশির ভাগ জমিই পদ্মার বয়ে আনা পলিমাটি দিয়ে গঠিত এবং এর নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা, গড়াই, চন্দনা ও চিত্রা। আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যা মোট আয়ের প্রায় ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ; এরপর রয়েছে বাণিজ্য প্রায় ১৪ শতাংশ এবং চাকরিসহ অন্যান্য পেশা। জেলার জনসংখ্যার বড় অংশই মুসলিম।
শরিফুলের উপজেলা পাংশা জেলার পশ্চিমে পদ্মা ও গড়াই (গড়াই-মধুমতী) নদীর মাঝে অবস্থিত। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এর আয়তন প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার। এখানকার প্রধান ফসল ধান, পাট, আখ, পান ও তিল, আর আয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশই আসে কৃষি থেকে। উপজেলার তালিকাভুক্ত কুটিরশিল্পের মধ্যে রয়েছে কামারশিল্প, যে শিল্পই শরিফুলের হাতিয়ার তৈরির ভিত্তি। তাঁর গ্রাম দেওবাডিয়া সরিষা ইউনিয়নে পড়ে; বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, এই ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ৫ হাজার ৯৮ একর, সেখানে নারী ও পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার ৭০০ করে এবং শিক্ষার হার ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এটি এমন এক কৃষিজনপদ, যেখানে নদীর পলিতে ধান ও পাট ফলে এবং মাটি কোপানো, আগাছা পরিষ্কার ও ফসল কাটার হাতিয়ার দৈনন্দিন জীবনের অংশ। যে জনপদে দশ পরিবারের ছয়টিই কৃষিনির্ভর এবং যেখানে কামারশিল্প একটি তালিকাভুক্ত কুটিরশিল্প, সেটি সাশ্রয়ী ও দেশে তৈরি কৃষি হাতিয়ারের ব্যবসার জন্য উপযুক্ত ভিত্তি।
গ্রামীণ কামারশিল্প ও হাতিয়ারের ঐতিহ্য
শরিফুলের হাতিয়ার তৈরি হচ্ছে বাংলার কৃষির মতোই পুরোনো একটি শিল্পের হাত ধরে, সেটি হলো গ্রামীণ কামারের কাজ। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কামাররা হলেন গ্রামীণ ধাতুশিল্পী, যাঁরা অতি প্রাচীনকাল থেকে লোহার হাতিয়ার তৈরি করে আসছেন; তাঁদের পেশার সূচনা জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলে স্থায়ী কৃষির সূচনার সঙ্গে। কৃষি, গৃহনির্মাণ ও কাঠের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় লোহার নানা সরঞ্জাম তৈরি করাই তাঁদের মূল পেশা।
কামারের হাপর থেকেই তৈরি হয় লাঙল, কাস্তে, নিড়ানি, খন্তা, কোদাল, শাবল ও দা, সেই সঙ্গে ছুরি, কুড়াল, চিমটা, করাত, বাটালি ও হাতুড়ির মতো গৃহস্থালি ও কাঠমিস্ত্রির নানা সরঞ্জাম। এই কাজ হয় কামারপাড়ায়, যেখানে থাকে হাতে নিয়ন্ত্রিত লোহা গলানোর চুল্লি এবং একটি নেহাই, যার ওপর লাল-গরম লোহা পিটিয়ে আকার দেওয়া হয়। বাংলাপিডিয়া বলছে, অতীতে কামাররা কয়েকটি উপশ্রেণিতে বিভক্ত ছিলেন এবং এই পেশা গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলে স্থায়ী কৃষির সূচনার সঙ্গে জড়িত একটি জীবিকাভিত্তিক গোষ্ঠী হিসেবে।
দীর্ঘদিন এই পেশা নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বাংলাপিডিয়া জানাচ্ছে, বর্তমানে অনেক মুসলিম এই পেশায় এসেছেন এবং অনেক কামার গ্রাম ও শহরে অন্য পেশায় সরে গেছেন; আর এই শিল্পের টিকে থাকা জড়িয়ে আছে প্রচলিত কৃষি, সেচ ও গৃহনির্মাণের ধারার সঙ্গে। শরিফুলের মতো উদ্যোগের পেছনের প্রেক্ষাপটও এটাই: যেখানে এখনো হাতে জমি চাষ হয়, সেখানে হাতে তৈরি লোহার হাতিয়ারের চাহিদা থেকেই যায়, যদিও কর্মরত কামারের সংখ্যা কমছে এবং সস্তা আমদানি করা হাতিয়ার বাজার দখল করছে। এই হাপরের কাজকে আধুনিক লেদ শিল্প এবং দেশি-বিদেশি ডিজাইনের সঙ্গে মিলিয়ে শরিফুল মূলত একটি পুরোনো শিল্পকে একটি নতুন, আংশিক অনলাইন বাজারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের চিত্র
দেশে ছোট-বড় যন্ত্রের ব্যবহার বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশকে কৃষিতে অনেকটাই যান্ত্রিকীকৃত দেশ হিসেবে ধরা হয়, বিশেষত স্থানীয়ভাবে ‘পাওয়ার টিলার’ নামে পরিচিত টু-হুইল বা দুই চাকার ট্র্যাক্টর হিসাবে নিলে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, টু-হুইল বা ওয়াকিং ট্র্যাক্টর হলো একটি এক-অক্ষবিশিষ্ট যন্ত্র, যা সাধারণত প্রায় ৫ থেকে ১৮ অশ্বশক্তির একক-সিলিন্ডার ডিজেল ইঞ্জিনে চলে এবং লাঙল, হ্যারো, সিডার, ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার, এমনকি এশিয়ায় ছোট কম্বাইন হারভেস্টার ও মালবাহী ট্রেলারের মতো নানা যন্ত্র টানতে ও চালাতে পারে।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এই যন্ত্রে চালানো যায় এমন সরঞ্জামের পরিধি বেশ বিস্তৃত। মাটির কাজে থাকে রোটারি টিলার, মোল্ডবোর্ড ও ডিস্ক লাঙল, হ্যারো, সিডার, ট্রান্সপ্লান্টার ও প্ল্যান্টার; ফসল রক্ষা ও আগাছা দমনে থাকে ইন্টার-কাল্টিভেটর ও স্প্রেয়ার; শস্য কাটায় থাকে রিপার, রিপার-বাইন্ডার এবং এশিয়ার ক্ষেত্রে ছোট কম্বাইন হারভেস্টার; আর মালামাল পরিবহনে আধা টন থেকে তারও বেশি ধারণক্ষমতার ট্রেলার। অর্থাৎ একটি বড় চার চাকার ট্র্যাক্টরের বেশির ভাগ কাজই একটি দুই চাকার ট্র্যাক্টর করতে পারে, যা বাংলাদেশে ছোট কৃষকদের মধ্যে এসব ছোট যন্ত্র ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
যেসব আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে কেবল চার চাকার ট্র্যাক্টর গোনা হয়, সেগুলোয় বাংলাদেশকে প্রায় অযান্ত্রিক দেখানো হয়; কিন্তু দুই চাকার ট্র্যাক্টর হিসাবে আনলে যন্ত্রচালিত চাষের জমির আয়তনের বিচারে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে যান্ত্রিকীকৃত দেশের অন্যতম বলে উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনীতিতে কৃষির অংশ কয়েক দশকে কমে এলেও তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়া বলছে, স্বাধীনতার আগে কৃষি জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ ছিল, যা ১৯৯৭-৯৮ সালে নেমে আসে প্রায় ৩০ শতাংশে; আর শ্রমশক্তিতে কৃষির অংশ ১৯৮৯ সালের ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ১৯৯৫-৯৬ সালে হয় ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ, যখন ৫ কোটি ৬০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ কৃষিতে যুক্ত ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে খাতটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে প্রায় ১৪ শতাংশ ছিল, আর শ্রমশক্তির প্রায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ এখনো কৃষিতে যুক্ত।
সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও ধান রোপণযন্ত্রের মতো যন্ত্র কৃষকদের দিয়ে যান্ত্রিকীকরণকে আরও এগিয়ে নিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪০ হাজার যন্ত্র বিতরণের বিষয়টি খতিয়ে দেখে। বড় যন্ত্রগুলো যেখানে বড় জমিতে জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ সামলায়, সেখানে শরিফুলের বিক্রি করা হাতিয়ারগুলো মূলত ছোট জমি ও বসতবাড়ির বাগানের দৈনন্দিন কাজের জন্য, যেমন মাটি কোপানো, চারার জন্য গর্ত করা, আগাছা তোলা ও ফসল কাটা। ছোট কৃষক ও বসতবাড়ির বাগানিদের জন্য ১৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার একটি মজবুত ও মেরামতযোগ্য হাতিয়ার প্রায়ই তার বহুগুণ দামের একটি যন্ত্রের চেয়ে নাগালের মধ্যে থাকে, আর শরিফুলের ভাষ্যে, তাঁর পণ্য সেই ফাঁকটিই পূরণ করতে চায়।
যে ফল তিনি নিজে চাষ করেন: বরই ও পেয়ারা
শরিফুল নিজে যে ফল চাষ করেন, সেই বরই ও পেয়ারা বাংলাদেশে সবচেয়ে বহুল চাষ হওয়া ফলের অন্যতম। স্থানীয়ভাবে বরই বা কুল নামে পরিচিত এই ফল বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে Zizyphus গণের অন্তর্গত, যার প্রায় ৪০টি প্রজাতি রয়েছে; চাষ হওয়া দুটি প্রজাতি হলো ভারতীয় কুল (Z. mauritiana) ও চায়না কুল (Z. jujuba)। গাছটি শক্ত ও খরাসহিষ্ণু প্রকৃতির; জনপ্রিয় জাতের মধ্যে রয়েছে বাউ কুল ১ ও ২, বারি কুল ১ ও ২, নারকেলি, সবজি ও আপেল কুল। বাউ কুল ১-এর ফলের ওজন ৯০ থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। বাংলাপিডিয়া বলছে, কিছু জাত কাঁটাবিহীন, দ্রুতবর্ধনশীল এবং রোপণের চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যেই ফল ধরে; মিষ্টি কুমিল্লা কুল (স্থানীয়ভাবে ডাব কুল) এবং কম ফল ঝরে পড়া মুচমুচে আপেল কুলও চাষ হয়, আর গাছটি একটি পোকার মাধ্যমে লাক্ষা উৎপাদনেও সহায়তা করে। লবণাক্ত এলাকা (যেমন বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা), বেলে ও পাহাড়ি এলাকাসহ সারা দেশেই কুলের চাষ হয়; ফল তাজা খাওয়ার পাশাপাশি জ্যাম, জেলি, চাটনি, আচার ও জুসে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, আর মার্চ থেকে মে মাসকে রোপণের সেরা সময় ধরা হয় এবং ফসল তোলার পর ছাঁটাই করা হয়।
পেয়ারা Psidium গণের ফল, যার মধ্যে বাংলাদেশে চাষ হওয়া প্রজাতি Psidium guajava; এটি ২ থেকে ১০ মিটার উঁচু অগভীর শিকড়ের মাঝারি আকারের গাছ, যার আদি নিবাস ক্রান্তীয় আমেরিকা। এর ফুল উভলিঙ্গ এবং বাতাস বা পোকার মাধ্যমে পরাগায়িত হয়; কাঁচা ফল সবুজ, পাকলে হলুদ হয়ে যায়। বাংলাপিডিয়ায় স্থানীয় জাত হিসেবে কাজী পেয়ারা, বরিশালের স্বরূপকাঠি ও চট্টগ্রামের কাঞ্চননগরের কথা উল্লেখ আছে, পাশাপাশি রয়েছে বাউ উদ্ভাবিত এফটিআইপি বাউ পেয়ারা জাত, যার মধ্যে পেকটিনসমৃদ্ধ জেলি জাতটি জ্যাম ও জেলির জন্য উপযোগী, এবং বারি পেয়ারা ২ ও ৩, এলাহাবাদ ও এল-৪৯ জাত। পেয়ারা ভিটামিন সি-এর বড় উৎস, প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী অংশে যা প্রায় ২৬০ মিলিগ্রাম; ফলে আর্দ্রতা থাকে প্রায় ৮০ থেকে ৮৩ শতাংশ। পেয়ারা চাষের উপযোগী তাপমাত্রা ২৩ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ১০০ সেন্টিমিটার এবং সুনিষ্কাশিত মাটির পিএইচ প্রায় ৪ দশমিক ২ থেকে ৮ দশমিক ২; বিশ্বের প্রধান পেয়ারা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। দুটি ফলই মূলত ছোট কৃষক ও বসতবাড়ির বাগানিদের হাতে চাষ হয়, যাঁরা শরিফুলের ভাষ্যমতে তাঁর হাতিয়ার ব্যবহার করছেন।

ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া (টু-হুইল ট্র্যাক্টর ও বাংলাদেশের কৃষি), বিশ্বব্যাংক।





মন্তব্য
(০)