২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে জাগো নিউজ এক কৃষি উদ্যোক্তার খবর প্রকাশ করে, যিনি গ্রীষ্মের কয়েক মাসের ফল আমকে সারাবছর তোলার ফসলে পরিণত করেছেন। তিনি জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রাজারামপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম। রাজশাহী কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ২০১২ সালে তিনি বারোমাসি আমের চাষ শুরু করেন। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তিনি প্রায় ৮০০ বিঘা জমিতে আম চাষ করছিলেন এবং পেয়েছিলেন এআইপি সম্মাননা, কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া স্বীকৃতি।
প্রতিবেদনের শুরুতেই ছিল জেলার মানুষের চোখে পড়া একটি পরিবর্তনের কথা। কয়েক বছর আগেও আমের ঘ্রাণ পাওয়া যেত শুধু মৌসুমে; ২০২৫ সালে এসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম সারাবছর সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিক্রি হচ্ছিল, আর এসব আম চাষ করছিলেন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া চাষিরা। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, জেলায় তখন ৩৭ হাজার ৬০৪ হেক্টর জমিতে মৌসুমি আমের বাগান ছিল। এর বাইরে ১ হাজার ৭৯২ হেক্টর জমিতে ছিল বারোমাসি কাটিমন আমের বাগান।
বরই চাষ থেকে ৮০০ বিঘার আম বাগান
কীভাবে ব্যবসা বড় হলো, সে কথা রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন এভাবে: '২০০৮ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ৫ বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করেছিলাম বরই চাষ। ২০১২ সালে মনে হলো আম চাষের কথা। সে সময়ে ২৭ বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করি আম চাষ। একপর্যায়ে কৃষি বিভাগের সহায়তায় আম রপ্তানি হলো সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে। এতে আরও উৎসাহ পেলাম। বাড়াতে থাকলাম আম বাগানের পরিধি। এখন আমার প্রায় ৮০০ বিঘার মতো আম বাগান আছে।'
তার বর্ণনায় এক লাফে নয়, ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠার ছবি পাওয়া যায়: প্রথমে লিজ নেওয়া ছোট একটি জমিতে বরই, চার বছর পর আরও বড় লিজ জমিতে আম, তারপর বিদেশে ক্রেতা পাওয়ার পর বাগানের পরিধি ক্রমাগত বাড়ানো। রপ্তানির পথ খুলে দেওয়ার কৃতিত্ব তিনি দিয়েছেন কৃষি বিভাগের সহায়তাকে। একই আলাপে তিনি স্পষ্ট করেন, শুরু থেকেই তার লক্ষ্য ছিল এমন আমের জোগান, যা গ্রীষ্মের মৌসুম শেষ হলেও থেমে যাবে না।
শীতেও আম, সঙ্গে এআইপি সম্মাননা
রফিকুল ইসলাম বলেন, 'সিজনাল আম পরিবর্তন করে আমার ইচ্ছে ছিল সারাবছর মানুষকে আম খাওয়াবো। এতে আরও বেশি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই পরীক্ষামূলক অনেকবার চাষাবাদ করে শীত মৌসুমে আম চাষ করে সফলতা পেয়েছি। এখন আমার বাগানে সারাবছর আম পাওয়া যায়। এখনো পাকা আম গাছ থেকে পেড়েছি। ২০২৪ সালে আমি এআইপি সম্মাননাও পেয়েছি।'
তিনি যে সম্মাননার কথা বলেছেন, সেটি এআইপি বা এগ্রিকালচারালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন (কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) স্বীকৃতি। কৃষি মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে এর নীতিমালা তৈরি করে এবং ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর পাঁচটি শ্রেণিতে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ জুলাই রোববার সকালে ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২১ সালের এআইপি সম্মাননা তুলে দেওয়া হয় ২২ জনের হাতে। এটি ছিল দ্বিতীয়বারের মতো এই সম্মাননা প্রদান; ২০২০ সালের জন্য এআইপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৩ জন। ২০২১ সালের তালিকায় উদ্ভাবন (জাত বা প্রযুক্তি) শ্রেণিতে চারজন এবং ফসল উৎপাদন, বাণিজ্যিক খামার স্থাপন ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শ্রেণিতে ১০ জন নির্বাচিত হন।
রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদন শ্রেণিতে নির্বাচিত হন দুজন। তাদের একজন মোহা. রফিকুল ইসলাম, তালিকায় যার পরিচয় দেওয়া হয় 'বারোমাসি আম চাষি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের কৃষি উদ্যোক্তা' হিসেবে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআইপি কার্ডের মেয়াদ এক বছর। কার্ডধারীরা বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) মর্যাদাধারীদের মতো কিছু সুবিধা পান: মন্ত্রণালয়ের প্রশংসাপত্র, সচিবালয়ে প্রবেশের পাস, জাতীয় অনুষ্ঠানে নাগরিক সংবর্ধনার আমন্ত্রণ, সরকারি পরিবহনে আসন সংরক্ষণে অগ্রাধিকার, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য সরকারি হাসপাতালের কেবিন পেতে অগ্রাধিকার এবং বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ।
বারোমাসি আম আসলে কী
জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসসের একটি প্রতিবেদন ২০২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, রাজশাহী অঞ্চলে প্রচলিত জাতের আম তোলা হয় মে মাসের মাঝামাঝি থেকে মোটামুটি আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত। বারোমাসি জাত এই নিয়ম ভেঙে দেয়। এ ধরনের জাতের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত কাটিমন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি থাইল্যান্ডের একটি জাত, যা স্থানীয় উদ্যোক্তারা তখন থেকে প্রায় ছয় বছর আগে দেশে আনেন এবং খুব দ্রুত এটি এ দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচলিত জাতের মতো নয়, কাটিমন গাছে একই সময়ে ফল এবং ফুল বা মুকুল থাকে। প্রচলিত জাত বছরে একবার ফল দিলেও কাটিমন ফল দেয় বছরে তিন থেকে চারবার, তাই মূল মৌসুম শেষ হওয়ার পরও এর ফল বাজারে পাওয়া যায়। রাজশাহীর ডিএইর জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী জেলায় প্রায় ১৫ হেক্টর জমিতে কাটিমনের চাষ হচ্ছিল এবং রাজশাহী ও আশপাশের জেলার প্রায় ২৫০ জন কৃষক এ জাত চাষ করছিলেন। চাষিরা তখন এ আম বিক্রি করছিলেন মণপ্রতি ৮ হাজার টাকায়, অর্থাৎ কেজিপ্রতি প্রায় ২০০ টাকায়; এক কেজিতে ধরে চার থেকে পাঁচটি আম। প্রচলিত আমগাছের মতো নয়, এ গাছ সাধারণত ছয় ফুটের বেশি উঁচু হয় না। প্রতিবেদনে উল্লেখিত এক চাষি দিনাজপুর থেকে প্রতিটি ১৮০ টাকা দরে কেনা ১ হাজার ১০০ চারা ২৫ বিঘা পুকুরপাড়ে সারি করে কলাগাছের পাশাপাশি লাগিয়েছিলেন; পরের বছরই গাছে ফুল আসে, আর তিন মৌসুমে গাছপ্রতি গড়ে ৩ থেকে ৫ কেজি ফলন হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখিত আরেক চাষির লিজ নেওয়া ২০০ বিঘা জমিতে অন্তত ১৪টি পুকুরের পাড়জুড়ে বাগান ছিল। আঞ্চলিক ফল গবেষণা কেন্দ্রের একজন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থাকে জানান, থাই জাতটিতে রোগের আক্রমণ কেমন, তা যাচাইয়ে গবেষণা চলছে।
২০২৫ সাল নাগাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জে কাটিমনের আবাদ অনেক বড় হয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ মার্চের এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা ইউএনবি ডিএইর একই তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, জেলায় ১ হাজার ৭৯২ হেক্টর জমিতে কাটিমনের চাষ হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতটি বছরে তিনবার ফল দেয় এবং চাষিরা ফল তোলার সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। সংস্থাটি গোমস্তাপুরের আরেক তরুণ উদ্যোক্তার কথা তুলে ধরে, যিনি প্রায় ছয় বছর আগে অনলাইনে ভিডিও দেখে নাচোল উপজেলার এলিপুরে ২০ বিঘা জমিতে কাটিমন লাগিয়েছিলেন। তিনি ইউএনবিকে বলেন, বাগান থেকেই কেজিপ্রতি ৩০০ টাকায় আম বিক্রি করছেন।
দেশে চাষ হওয়া বারোমাসি আম শুধু কাটিমন নয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) নিজস্ব একটি বারোমাসি জাতও অবমুক্ত করেছে, বারি আম-১১। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড একে বারির অবমুক্ত করা একমাত্র সারাবছর ফল দেওয়া আম হিসেবে বর্ণনা করে। পত্রিকাটি জানায়, এটি সংকর নয়, বাছাই করা (সিলেকশন) জাত, এবং ফেনী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর চাষ ছড়িয়ে পড়ছে; কিছু বাগানে এর পাশাপাশি কাটিমন নিয়েও পরীক্ষা চলছে।

আম বাগানের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোর একটি। ২০২৪ সালের ২৯ মে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বরাতে জানানো হয়, সেই মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩৭ হাজার ৬০৪ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে চার লাখ টন। সে বছর জেলায় নির্দিষ্ট কোনো আম ক্যালেন্ডার করা হয়নি; চাষি, ব্যবসায়ী, কৃষি বিভাগ ও ফল গবেষকদের সঙ্গে আলোচনার পর ঠিক হয়, আঁটির কাছের শাঁস হালকা হলুদ হলে এবং গাছে দু-একটি পাকা আম দেখা গেলে চাষিরা আম পাড়তে শুরু করবেন। জেলা প্রশাসন জানায়, পাকা ও নিরাপদ আম বিক্রি নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি করা হবে, আর আম পরিবহনের জন্য ২০২৪ সালের ১০ জুন থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে "ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন" চলার কথা ছিল। ভোলাহাটের এক চাষি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, আগের বছরের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে, ফলে বাজারদর আঁচ করা কঠিন।
জেলার আম বাজারে আসে পর্যায়ক্রমে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথমে পাকে গুটি ও গোপালভোগ, যা বাজারে আসে মে মাসের শেষ দিকে; খিরসাপাত আসে জুনের প্রথম সপ্তাহে; আর খিরসাপাতের প্রায় ১০ দিন পর জুনের মাঝামাঝি আসে ল্যাংড়া ও ফজলি। একই প্রতিবেদনে বারির প্রতিষ্ঠান চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার কিছু পরামর্শও ছিল: গাছ ঝাঁকিয়ে নয়, ঠুসি দিয়ে আম পাড়তে হবে; আম কখনো মাটিতে ফেলা যাবে না; দুপুরের রোদে নয়, সকালে বা বিকেলে আম পাড়তে হবে; আর বোঁটা এক থেকে দুই ইঞ্চি রেখে পাড়তে হবে, যাতে কষ বের হয়ে আমের গায়ে লেগে পচন না ধরে।
জেলার কয়েকটি আম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক অনুষ্ঠানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত (হিমসাগর নামেও পরিচিত) আমের জিআই সনদ হস্তান্তর করা হয়। জেলার চাষিদের পক্ষে বারি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে আবেদন করেছিল। ইলিশ ও জামদানির পর খিরসাপাত দেশের তৃতীয় জিআই পণ্য হয়। পত্রিকাটি আরও জানায়, জেলায় আশ্বিনার পর সবচেয়ে বেশি চাষ হয় খিরসাপাত, আর দেশের মোট আম উৎপাদনের ৬৭ শতাংশ আসে উত্তর-পশ্চিমের বিভাগগুলো থেকে, প্রধানত রাজশাহী থেকে। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ল্যাংড়া ও ফজলিকেও জিআই স্বীকৃত আম হিসেবে উল্লেখ করে।

গোমস্তাপুর, যেখানে বাগানগুলো
রফিকুল ইসলামের গ্রাম রাজারামপুর চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায়। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উপজেলাটির আয়তন ৩১৮.১৩ বর্গকিলোমিটার; এর অবস্থান ২৪°৪৪' থেকে ২৪°৫৮' উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°১৩' থেকে ৮৮°৫৮' পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। এর উত্তর ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরে পোরশা উপজেলা, দক্ষিণে শিবগঞ্জ ও নাচোল উপজেলা, আর পূর্বে নিয়ামতপুর ও নাচোল। প্রধান নদী মহানন্দা ও পুনর্ভবা, আর উল্লেখযোগ্য জলাশয়ের মধ্যে আছে কোলার, কুয়ারিয়া, বড়, বারণ, কোরাল, দামস, ঝাপাই ও লিখরিয়া বিল।
বাংলাপিডিয়ায় উপজেলার জনসংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৩ জন উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩২১ জন ও নারী ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫০২ জন; ধর্মবিশ্বাসে মুসলিম ২ লাখ ৫৬ হাজার ৬৫৮ জন, হিন্দু ১৫ হাজার ৯৮৫ জন ও খ্রিস্টান ২ হাজার ৪১৫ জন। সংখ্যাগরিষ্ঠদের পাশাপাশি সেখানে সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুন্ডা ও মাহালি জনগোষ্ঠীর মানুষ বাস করেন। প্রধান ফসল ধান, আলু, গম, ভুট্টা, টমেটো ও শাকসবজি, আর প্রধান ফল কাঁঠাল, আম, কলা ও তরমুজ। রহনপুর হাট ও গোমস্তাপুর হাট এখানকার পরিচিত হাট, আর কালুপুর মেলা সবচেয়ে পরিচিত মেলা। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে আছে নওদা গ্রামের স্তূপ, রহনপুরের এক গম্বুজবিশিষ্ট পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও শাহাপুর গড়।
অর্থাৎ উপজেলায় আম অনেক ফসলের একটি, একমাত্র ফসল নয়। সে কারণেই রাজারামপুরের মানুষের বর্ণনা করা পরিবর্তনটি চোখে পড়ার মতো: জাগো নিউজের প্রতিবেদনে একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, যে জমি পড়ে ছিল এবং যেখানে ফসল হতো না, সেখানে এখন রফিকুল ইসলামের আম বাগান। ২০২৫ সালের মার্চে ইউএনবির প্রতিবেদনেও দেখা যায়, একই সময়ে গোমস্তাপুর ও নাচোলের অন্য তরুণ চাষিরাও কাটিমনের দিকে ঝুঁকছিলেন।

দাম, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি
এত সাফল্যের মধ্যেও রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, চাষিরা বেশি উৎপাদনের সমস্যায় পড়ছেন। তিনি বলেন, 'দিন দিন আমাদের জেলায় আম উৎপাদন বাড়ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী নেই দাম। দাম না থাকার কারণ হচ্ছে বেশি আম উৎপাদন। তাই আম চাষ করে লাভবান হতে হলে প্রথমে আম প্রক্রিয়াজাত করতে নজর দিতে হবে। এতে কর্মসংস্থান হবে শত শত মানুষের। লাভবান হবেন চাষিরা।'
জাতীয় পরিসংখ্যান থেকেও বোঝা যায়, কেন তিনি বেশি উৎপাদনের কথা বলেছেন। জাগো নিউজের প্রতিবেদনের দুই দিন আগে, ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত বাসসের প্রতিবেদনে ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ২ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৯ টন আম উৎপাদিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৫৯ টন, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টর জমিতে ২৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৩ টন। ২০২৫ মৌসুমের জন্য ২ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টর জমিতে রেকর্ড ২৭ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়।
এর তুলনায় রপ্তানি ছিল সামান্য। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আম রপ্তানি হয় ৩০৯ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৫৭ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৩২১ টন; ২০২৫ মৌসুমে লক্ষ্য ছিল প্রায় ৫ হাজার টন। ২০২৩ সালের আগস্টে প্রথম আলো জানায়, ডিএইর তথ্য অনুযায়ী সে বছর ২১ আগস্ট পর্যন্ত রপ্তানি ৩ হাজার ৪৫ টন ছাড়িয়েছে, যেখানে আগের পুরো বছরে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৭৫৭ টন। সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল যুক্তরাজ্য, প্রায় ১ হাজার ৪০০ টন; ক্রেতার তালিকায় যুক্ত হয় নতুন ১০টি দেশ, আর আম রপ্তানি করে ৭০টির বেশি প্রতিষ্ঠান, যেখানে আগের বছর নিবন্ধিত ছিল ৬০টি প্রতিষ্ঠান এবং তাদের ৫০টির বেশি কোনো আম রপ্তানি করেনি। রপ্তানিকারকেরা পত্রিকাটিকে জানান, উড়োজাহাজে পরিবহনে তাদের খরচ কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, যেখানে একই গন্তব্যে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের খরচ প্রায় ১৫০ রুপি; মানসম্মত মোড়কের অভাবের কথাও তারা তুলে ধরেন। পরের বছরের জন্য ডিএই রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে ৪ হাজার ৫০০ টন।
প্রথম আলোর সেই প্রতিবেদনে গোমস্তাপুর উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলামের কথাও ছিল। সে মৌসুমে তিনি ১৪ টন আম বিদেশে পাঠান; আগের বছর তিনি রপ্তানি করেননি, তবে তার আগের দুই বছর করেছিলেন। তিনি পরের বছর আরও বেশি পাঠানোর আশা প্রকাশ করেন। তিনি পত্রিকাটিকে বলেন, বিক্রির আগেই বাগানে প্রায়ই অন্তত ২০ শতাংশ আম পচে যায়; ২০২৫ সালের এপ্রিলে জেলায় আরও প্রক্রিয়াজাতকরণের যে আহ্বান তিনি জানান, তার পেছনে আছে এই ক্ষতি।
সারাবছর বাগানে কাজ
সারাবছর ফল মানে সারাবছর কাজও। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রফিকুলের আম বাগানে কর্মসংস্থান হয়েছে অন্তত দুই শতাধিক মানুষের। আট বছর ধরে তার বাগানে কাজ করে আসা শামিউল হক বলেন, 'আগে মৌসুমে শুধু আমের বাগানে কাজ করতে পারতাম। কিন্তু এলাকায় রফিকুল ইসলাম বাগান করার পরে সারাবছর আম বাগানে কাজ করতে পাচ্ছি। এতে আমরা লাভবান হয়েছি।'
স্থানীয় বাসিন্দা আনারুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, 'আমাদের এলাকার বেশকিছু জমি পড়েছিল। ফসল হতো না। রফিকুল ইসলাম এসে এসব জমিতে আম বাগান করেছেন। এতে তিনিও লাভবান হচ্ছেন; আমরাও লাভবান হচ্ছি। কারণ তার বাগানে অনেকে কাজ করে সংসার চালিয়ে আসছেন।'
পাশের নাচোল উপজেলার কৃষি অফিসও জাতটির বিস্তারের দিকে নজর রাখছিল। ২০২৫ সালের মার্চে ইউএনবির প্রতিবেদনে নাচোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সালেহ্ আকরাম জানান, স্থানীয় কৃষি বিভাগ কাটিমন চাষিদের সহায়তা করছে। তিনি বলেন, রমজানে বাজারে আমদানি করা ফলের চাপ বাড়ে, এতে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়।
রফিকুল ইসলাম সম্পর্কে জাগো নিউজকে একই কর্মকর্তা বলেন, 'রফিকুল ইসলাম বেশ কয়েক বছর ধরে বারোমাসি আম চাষ করে আসছেন। তার বাগানের সিজনাল আম বিদেশেও রপ্তানি হয়। এতে যেমন কর্মসংস্থান হচ্ছে স্থানীয় শ্রমিকদের; তেমনই বিভিন্নভাবে আম বিক্রি করে চাঙা হচ্ছে জেলার অর্থনীতি।'
ছবি: Mahmudul Karim Farsad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (বাসস), ইউএনবি, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)