দেশে এখন কত মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, তার নির্দিষ্ট হিসাব নেই। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সর্বশেষ জাতীয় জরিপ হয়েছিল ২০১৮-১৯ সালে; গত সাত বছরে আর কোনো জরিপ হয়নি। আজ ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা এই ঘাটতির কথা তুলে ধরেছেন। এবারের প্রতিপাদ্য "জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি"।
সেই জরিপ অনুযায়ী দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮.৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভোগেন; ১৮ কোটি মানুষের দেশে এই হার প্রায় তিন কোটি মানুষ। এর মধ্যে ৬.৭ শতাংশ বিষণ্নতায় এবং ৪.৫ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগে ভোগেন। ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে হার ১২.৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি পাঁচ প্রাপ্তবয়স্কে একজন এবং প্রতি আট শিশুতে একজন। আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ শতাংশের বেশি এবং শিশুদের ৯৪.৫ শতাংশ কখনো বিজ্ঞানসম্মত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাননি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, অন্তত পাঁচ বছর পরপর জাতীয় জরিপ হওয়া উচিত। ২০১৯ সালের পর করোনা মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, হাম ও ডেঙ্গুর মতো নানা সংকটের মধ্য দিয়ে মানুষকে যেতে হয়েছে, তাই পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। তাঁর ভাষায়, আগামী বছর জরিপ হতে পারে, তখন প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে।
সেবার ঘাটতিও বড়। প্রতিবেদন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মূলত রাজধানী ও বিভাগীয় শহরে সীমাবদ্ধ, আর মানসিক স্বাস্থ্যে কর্মরত জনবল প্রতি এক লাখ মানুষে মাত্র ০.৫০ জন। ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের (বিএপি) এক সেমিনারে বক্তারা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ এবং সব সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে মানসিক রোগ বিভাগ খুলে বিশেষজ্ঞ পদায়নের দাবি জানান।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, মাদকাসক্তির পাশাপাশি ইন্টারনেট ও মোবাইল আসক্তি, অনলাইন জুয়া ও রিল দেখার প্রবণতা বাড়ছে; এগুলো কোন পর্যায়ে আছে জানতে গবেষণা ও জরিপ জরুরি। বিএপির সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার চালুসহ সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সাইকোসিস বা আসক্তির মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষ জানেন কখন প্রথম সমস্যা বোঝা যায়, পরিবারকে বলতে কী সংকোচ হয়, চিকিৎসা নিতে কী বাধা আসে; এই অভিজ্ঞতা বই থেকে পাওয়া যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছর এমন মানুষদের নীতি ও সেবা পরিকল্পনায় অংশীদার করা এবং প্রতিষ্ঠাননির্ভর সেবার বদলে কমিউনিটিভিত্তিক সেবার ওপর জোর দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বছরে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন এবং তাঁদের বেশির ভাগের মানসিক সমস্যা থাকে; সচেতন থাকলে এর বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিজে বা পরিচিত কেউ মানসিক সংকটে থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রতিবেদনটি দেশ রূপান্তরের আরিফ সাওনের।
ছবি: Yahya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0); ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
সূত্র: দেশ রূপান্তর





মন্তব্য
(০)