ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেছেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার কোরবানির পশুর হাটে চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬ দুপুরে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাট পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। তখন ঈদুল আজহার মাত্র কয়েক দিন বাকি, যে উৎসবে সারা দেশের মুসলিমরা পশু কিনে কোরবানি দেন। বছরের পশু বেচাকেনার এটাই সবচেয়ে ব্যস্ত সময়; মাত্র কয়েক দিনে লাখো গরু-ছাগল শহরের হাটে আসে এবং বিপুল অঙ্কের নগদ টাকা হাতবদল হয়।
গাবতলীতে প্রশাসক যা বলেছেন
গাবতলী হাটে গরু বাঁধার জন্য প্রতিটি খুঁটির জন্য ১৫ হাজার টাকা আদায়ের একটি অভিযোগ সাংবাদিকেরা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরেন। তিনি তা নাকচ করে দেন। তাঁর ভাষ্য, ‘এই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছি, এমন কোনো সত্যতা পাইনি। কারও কাছ থেকে হাসিলের ৫ শতাংশের বেশি নেওয়া হচ্ছে না।’ হাসিল হলো প্রতিটি পশু বেচাকেনার ওপর হাট কর্তৃপক্ষের নেওয়া টোল বা কমিশন; তিনি যে ৫ শতাংশের কথা বলেছেন, সেটিই করপোরেশনের বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ হার।
হাট ভরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতেই প্রশ্নটি ছিল, আর প্রশাসকের জবাব হলো, তাঁর দপ্তর বিষয়টি যাচাই করেছে এবং অভিযোগটি টেকেনি। এর আগে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে সঙ্গে নিয়ে গাবতলী হাট ঘুরে দেখেন প্রশাসক। তাঁরা হাটের ভেতর ঘুরে গরুর ব্যাপারী ও উৎসবের জন্য পশু কিনতে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের এই পরিদর্শন এবং তাঁদের কাছে তোলা প্রশ্ন ঢাকার হাটগুলোয় প্রতি বছর ফিরে আসা একটি উদ্বেগেরই প্রতিফলন: ক্রেতা-বিক্রেতাকে নির্ধারিত হারের বেশি দিতে হচ্ছে কি না।
অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের জবাব
ঢাকায় কোরবানির পশুর বেচাকেনা ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ পুরোনো। শহরে পশু আনা ব্যাপারী ও পশু নিয়ে ফেরা ক্রেতারা বরাবরই বলে আসছেন, বৈধ হাসিলের বাইরেও হাটের ফটকে বা রাস্তায় কখনো কখনো বাড়তি টাকা চাওয়া হয়। ২৬ মে গাবতলীতে তোলা নির্দিষ্ট অভিযোগটি, অর্থাৎ প্রতিটি খুঁটির জন্য ১৫ হাজার টাকা আদায়, ছিল সেই ধরনেরই একটি অভিযোগ, যেটি তদন্ত করে অসত্য পাওয়ার কথা প্রশাসক জানান।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন প্রমাণসহ অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমাদের জানাবেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব।’ তিনি আরও বলেন, ডিএনসিসির অধীন সব হাটে, অস্থায়ী হাট ও স্থায়ী গাবতলী হাটে তাঁরা কথা বলছেন; এখনো চাঁদাবাজির কোনো ঘটনা তাঁদের নজরে আসেনি; সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা ব্যবস্থা নেবে।
গাবতলীর এই আশ্বাস মাসের শুরুতে দেওয়া বার্তারই ধারাবাহিকতা। ৬ মে ২০২৬ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছিলেন, কোরবানির পশু ঘিরে চাঁদাবাজি হতে দেওয়া হবে না, হলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে; ওই দিন একাধিক সংবাদমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়। ২৬ মে প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য ছিল কার্যত সেই প্রতিশ্রুতিরই অনুসরণ, যখন হাটগুলো ভরে উঠছিল।
ঈদুল আজহা ও কোরবানির বেচাকেনা
ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ ইসলামের দুই প্রধান উৎসবের একটি। এটি হিজরি চান্দ্র বছরের শেষ মাস জিলহজের ১০ তারিখে পালিত হয় এবং এর সঙ্গে আরও তিন দিন, যেগুলো তাশরিকের দিন নামে পরিচিত, উৎসব চলে; চান্দ্র পঞ্জিকা অনুসরণ করায় গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জিতে এর তারিখ প্রতি বছর কিছুটা এগিয়ে আসে। উৎসবটি বার্ষিক হজের সমাপ্তি নির্দেশ করে এবং আল্লাহর আদেশ পালনে নবি ইব্রাহিমের পুত্রকে কোরবানি দিতে প্রস্তুত থাকার স্মৃতি বহন করে। বেচাকেনার দিক থেকে ঈদুল আজহা দুই ঈদের মধ্যে বড়, কারণ এটি কেবল পোশাক ও খাবারকে ঘিরে নয়, বরং সামর্থ্যবান প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি জীবন্ত পশু কেনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
সামর্থ্যবানদের জন্য উৎসবের মূল কাজটি হলো ঈদের জামাতের নামাজের পর অনুমোদিত পশু, অর্থাৎ গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া বা উট কোরবানি দেওয়া। রীতি অনুযায়ী মাংস তিন ভাগে ভাগ করা হয়, এক ভাগ পরিবার রাখে, এক ভাগ আত্মীয় ও প্রতিবেশীর মধ্যে বিলানো হয় এবং এক ভাগ দরিদ্রদের দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এই চাহিদা অল্প সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়: বছরের বেশির ভাগ কোরবানির পশু ঈদের আগের দশ থেকে বারো দিনের মধ্যেই কেনা হয়। সে কারণেই শহরের পশুর হাটগুলো হঠাৎ এত ভরে ওঠে, আর একটি পশুর দাম এবং তার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি খরচ সাধারণ পরিবারগুলো এত গভীরভাবে লক্ষ করে।
গাবতলী ও ঢাকার কোরবানির হাট
রাজধানীর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের গাবতলীতে ঢাকার সুপরিচিত স্থায়ী পশুর হাট; শহরে পরিচালিত এটিই একমাত্র সারা বছরের হাট। বছরের বেশির ভাগ সময় এখানে গরু-ছাগলের নিয়মিত বেচাকেনা চলে; ঈদুল আজহার দুই-তিন সপ্তাহ আগে তা দেশের অন্যতম বড় পশুর হাটে রূপ নেয়, যেখানে সারা দেশ থেকে ব্যাপারী ও পশু আসে।
স্থায়ী হাটের পাশাপাশি দুই সিটি করপোরেশন ঈদ মৌসুমে খোলা জায়গায় অস্থায়ী হাট বসায়। ২০২৬ সালের ঈদুল আজহার জন্য হাটের সংখ্যা ধাপে ধাপে চূড়ান্ত হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি প্রতিবেদনে ২৪টি অস্থায়ী হাটের কথা বলা হয়, আফতাবনগরের জায়গাটি তখনো অনিশ্চিত ছিল; ১৯ এপ্রিল সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬টিতে, আর মে মাসের শুরুতে দরপত্রপ্রক্রিয়া এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে তা ২৭ ও এমনকি ২৮টিতে ওঠে। ২০ মে-র প্রতিবেদনে দুই করপোরেশন মিলিয়ে ২৭টি হাটের হিসাব আসে, যার মধ্যে ১৯টির ইজারা সম্পন্ন হয়; সবচেয়ে বেশি দর ওঠে উত্তরের দিয়াবাড়ি হাটে। অস্থায়ী হাটগুলো বসে দুই সিটি এলাকার খোলা মাঠ, খেলার মাঠ ও ফাঁকা জমিতে, আর ঈদের আগের এক সপ্তাহ থেকে দশ দিনের মধ্যে ব্যাপারীরা পশু নিয়ে এলে সেগুলো ভরে ওঠে; উৎসবের পরপরই হাটগুলো তুলে দেওয়া হয়।
একটি পরিবর্তন নজর কাড়ে। সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর সারুলিয়ায় কোনো হাট বসেনি, যদিও সেটি সাধারণত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্থায়ী হাট হিসেবে পরিচালিত হয়; ফলে শহরের স্থায়ী বেচাকেনা গাবতলীকে ঘিরেই কেন্দ্রীভূত ছিল।

ইজারা ও হাসিল যেভাবে চলে
ঢাকার পশুর হাট পরিচালিত হয় ইজারার মাধ্যমে। প্রতি বছর করপোরেশন প্রতিটি হাট পরিচালনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে; সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য দরদাতা করপোরেশনকে ইজারামূল্য পরিশোধ করেন এবং পরে হাটের ভেতরকার বেচাকেনা থেকে হাসিল আদায় করে তা তুলে আনেন ও মুনাফা করেন। তাই হাসিলই ইজারাদারের মূল আয়, আর যে হারে তা নেওয়া হয় তা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই গভীরভাবে লক্ষ করেন।
হাটে ইজারাদার বা করপোরেশনের লোকজন প্রতিটি বেচাকেনার বিপরীতে একটি রসিদ বা স্লিপ দেন, যেখানে বিক্রি ও তার ওপর নেওয়া হাসিল লেখা থাকে; রসিদ রেখে দিলে ক্রেতার কাছে কত টাকা নেওয়া হলো তার প্রমাণ থাকে। করপোরেশনের কাছ থেকে নির্ধারিত হার প্রদর্শনের প্রত্যাশা করা হয়, যাতে ক্রেতা জানেন তাঁকে কত দিতে হবে। বিরোধ বাধে তখনই, যখন হাসিল হিসেবে কিংবা আলাদা ‘প্রবেশ’ বা ‘পার্কিং’ বাবদ লেখা অঙ্কের চেয়ে বেশি টাকা চাওয়া হয়; বৈধ হাসিল নয়, এই বাড়তি দাবিকেই সাধারণত চাঁদা বলা হয়।
এই হার নিয়ে বছরের পর বছর বিতর্ক চলছে। ২০২৫ সালের মে মাসে খবর আসে, শহরের কোরবানির হাটে প্রতি পশুর হাসিল কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হবে। আর ২৬ মে ২০২৬ প্রশাসক ৫ শতাংশের সর্বোচ্চ সীমার কথা বলেন, যে হারের বেশি কেউ নিচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন। হার যা-ই হোক, বারবার ফিরে আসা উদ্বেগটি হলো ইজারাদার বা তাঁদের লোকজন নির্ধারিত অংশের বেশি আদায় করেন কি না।
কোনো হাটের ইজারা না হলে বা বাতিল হলে করপোরেশন হাটটি কোনো বেসরকারি পরিচালকের হাতে না দিয়ে নিজেই হাসিল আদায় করে, যাকে খাস আদায় বলা হয়। স্থায়ী গাবতলী হাটে ২০২৫ সালে ঠিক তেমনটিই ঘটে: এর ইজারা বাতিল করা হয় এবং হাটটি খাস আদায়ের অধীনে চলে, যে সিদ্ধান্ত নিয়ে তখন সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে।

বাড়তি আদায় নিয়ে আগের উদ্বেগ
গাবতলীতে তোলা অভিযোগটি হঠাৎ আসা নয়। ২০২৬ সালের ঈদের আগের সপ্তাহগুলোয় কয়েকটি প্রতিবেদনে নির্ধারিত অংশের বেশি হাসিল আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ২১ মে ২০২৬ দৈনিক সমকাল জানায়, আগের ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা কম দরে ইজারা নেওয়া একটি হাটে দ্বিগুণ হাসিল আদায় হচ্ছে। এগুলো অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত; প্রশাসক নিজে বলেন, গাবতলীর খুঁটির অভিযোগ তদন্ত করে তিনি কিছু পাননি।
করপোরেশন উন্মুক্ত দরপত্র ও নির্ধারিত হাসিলের সর্বোচ্চ সীমাকেই বাড়তি আদায় ঠেকানোর প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে উপস্থাপন করে: পরিচিত পরিচালক ও প্রদর্শিত হারসহ একটি হাট অনিয়ন্ত্রিত জমায়েতের চেয়ে তদারক করা সহজ। তবে উঁচু ইজারা দর তুলে আনার চাপ ইজারাদারকে বেশি আদায়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে; সে কারণেই ইজারামূল্য, প্রদর্শিত হার ও বাস্তবে নেওয়া অঙ্ক, এই তিনটিই ঈদের দিনগুলোয় নজরে রাখা হয়।
সব মিলিয়ে ৬ মে প্রতিমন্ত্রীর সতর্কবার্তা, মে মাসের মাঝামাঝি বাড়তি আদায়ের প্রতিবেদন এবং ২৬ মে প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারের আশ্বাস কর্তৃপক্ষের একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়ারই ছবি তুলে ধরে; তারা স্বীকার করে যে এটি প্রতি বছরের একটি ঝুঁকি, তবে এবার কোনো প্রমাণিত ঘটনা পাওয়া যায়নি বলেও জানায়।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
হাট পরিচালনাকারী দুই সংস্থা ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি গঠিত হয় ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর, যখন ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর পাস হওয়া সিটি করপোরেশন আইনের সংশোধনীর আওতায় আগের একক ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করা হয়। ঢাকা উত্তরের সীমানা ২০১৬ সালের ৯ মে বাড়িয়ে আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়ন যুক্ত করা হয়, ফলে এর আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ১৯৭ বর্গকিলোমিটার; ২০২২ সালের আদমশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ৫৯ লাখ ৯০ হাজার ৭২৩ (প্রতি বর্গকিলোমিটারে ঘনত্ব প্রায় ৩০ হাজার ৫৩১), যা ৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ১০টি অঞ্চলে বিভক্ত, আর নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ১৮টি। একই সময়ে সম্প্রসারিত ঢাকা দক্ষিণের আয়তন প্রায় ১০৯ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২২ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬৩ (ঘনত্ব প্রায় ৩৯ হাজার ৪০৯), ওয়ার্ড ৭৫টি।
কোরবানির পশুর হাট পরিচালনা করপোরেশনের নিজেদের উল্লেখ করা দায়িত্বগুলোর একটি, ধর্মীয় কল্যাণের অধীনে; পাশাপাশি হোল্ডিং কর নির্ধারণ ও আদায়, ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়ন এবং পৌর হাটবাজার ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবস্থাপনার রাজস্ব কাজও তাদের রয়েছে। এর বাইরে নগর পরিকল্পনা, সড়ক ও পরিবহন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে সমন্বয়ে পানি সরবরাহ এবং নিরাপত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত দায়িত্বও তাদের। বাস্তবে প্রতি ঈদে এর মানে, করপোরেশন হাটের জায়গা ঠিক করে, দরপত্র আহ্বান ও ইজারা দেয়, হাসিলের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেয়, ডিএমপির সঙ্গে মিলে নিরাপত্তা ও যান চলাচল ব্যবস্থাপনা করে এবং কোরবানির পর বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা করে। প্রশাসকের গাবতলী পরিদর্শন সেই দায়িত্বেরই অংশ।
হাট ভরে যে পশুতে
ঈদের হাটে যে পশু আসে, তা বিশাল এক জাতীয় পশুসম্পদের অংশ। ২০২১ সালের হিসাবে বাংলাদেশে গরু প্রায় ২ কোটি ৫৭ লাখ, মহিষ ৮ লাখ ৩০ হাজার, ছাগল ১ কোটি ৪৮ লাখ এবং ভেড়া ১৯ লাখ; এর পাশাপাশি মুরগি প্রায় ১১ কোটি ৮৭ লাখ এবং হাঁস ৩ কোটি ৪১ লাখ। প্রাণিসম্পদ খাত জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ২.৯ শতাংশ জোগায়, আর প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ; সামগ্রিকভাবে কৃষি এখনো দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের খাত। কোরবানির বেশির ভাগ পশু বড় খামারে নয়, ছোট খামার ও পরিবারে পালিত হয় এবং ঈদের শেষ সপ্তাহগুলোয় শহরে আনা হয়।
২০২৬ সালে আঞ্চলিক প্রতিবেদনগুলো হাটমুখী পশুর একটি চিত্র দেয়। রংপুর বিভাগের আট জেলায় প্রায় ২০ লাখ ২৩ হাজার পশু প্রস্তুত বলে জানানো হয় (৫ মে); চট্টগ্রামে প্রায় ৭ লাখ ৮৩ হাজার (১৮ মে), পাবনায় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ (২০ মে), সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার (২৪ মে), যশোরে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৯৭টি (১৭ মে), সাতক্ষীরায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার, যার মধ্যে ১৮ হাজার উদ্বৃত্ত (২১ মে), চুয়াডাঙ্গায় ২ লাখ ২ হাজার (১২ মে), ফেনীতে ৯০ হাজার (১৬ মে), নড়াইলে ৪৫ হাজার ৪৯৭টি (১৯ মে), ভোলার চরফ্যাশনে প্রায় ২৫ হাজার (২০ মে) এবং সাতক্ষীরার তালায় প্রায় ২০ হাজার (২২ মে), এমন বহু জেলার হিসাবের মধ্যে। সব ইঙ্গিত অবশ্য ঊর্ধ্বমুখী ছিল না: সমকাল ৪ মে ২০২৬ জানায়, দুই বছরে দেশে গরু-ছাগলের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কমেছে। পশু রাজধানীতে আসে সড়কপথে এবং, সময়ের আলোর ২১ মে ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদীপথেও।
এই জেলাভিত্তিক হিসাবগুলো আমদানির বদলে দেশে পালিত পশু দিয়ে উৎসবের চাহিদা মেটানোর জাতীয় প্রচেষ্টারই অংশ, যা প্রাণিসম্পদ খাত কয়েক বছর ধরে অনুসরণ করছে; কোনো কোনো জেলা স্পষ্ট উদ্বৃত্তের কথা জানায়, যেমন সাতক্ষীরায় স্থানীয় চাহিদার চেয়ে ১৮ হাজার পশু বেশি। বাজারের ওপরের দিকের পশুগুলোও আলাদা নজর কাড়ে: ২৫ মে ২০২৬ প্রথম আলো জানায়, ঢাকায় ‘কালা মানিক’ নামের একটি ষাঁড় ২২ লাখ টাকায় বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে, সঙ্গে একটি খাসি ফ্রি, যা বাজারের উঁচু প্রান্তের একটি আভাস, যদিও বেশির ভাগ ক্রেতাই অনেক কম দামের পশু খোঁজেন।

খামারি ও ব্যাপারী
হাটের বেশির ভাগ পশুই ছোট খামারির শ্রমের ফল। বাংলাদেশে কোরবানির গরু ও ছাগল মূলত বাণিজ্যিক খামারে নয়, পরিবার ও ছোট খামারে পালিত হয়, প্রায়ই মাসের পর মাস বিশেষভাবে ঈদের বিক্রির জন্য মোটাতাজা করা হয়, যা অনেক গ্রামীণ পরিবারের জন্য বছরের বড় নগদ আয়ের একটি উপলক্ষ। যে ব্যাপারীরা পশু আনেন, তাঁরা গ্রামে ও জেলা হাটে কিনে ট্রাকে এবং ক্রমশ নদীপথে নৌকায় শহরে নিয়ে আসেন, হাটে পশু দাঁড়িয়ে থাকার দিনগুলোর পরিবহন, খাদ্য ও রাখালের খরচ বহন করেন, আর অবিক্রীত পশু ফিরিয়ে নিয়ে আবার খাওয়ানোর ঝুঁকিও নেন। সমকাল ৪ মে ২০২৬-এ জানানো দুই বছরে দেশে গরু-ছাগল প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কমে যাওয়ার প্রভাব প্রথমে এই ছোট খামারি ও ব্যাপারীদের ওপরই পড়ে, যাঁদের কাছে ঈদের হাটের দাম একটি মৌসুমের আয় নির্ধারণ করে দিতে পারে।
হাট ভরার সময় তদারকি
হাসিল কেবল একটি বিষয়; ঈদ মৌসুমে করপোরেশন ও পুলিশ আরও অনেক কিছু তদারক করে। তারা প্রতিটি হাটের সীমানা ঠিক করে দেয় যাতে বেচাকেনা মূল সড়কে ছড়িয়ে রাজধানীর যান চলাচলে বিঘ্ন না ঘটায়; পশুবাহী ট্রাক চলাচলের জন্য হাটের প্রবেশ ও বাহির পথ খোলা রাখতে বলা হয়; এবং বিক্রির জন্য আনা পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ভেটেরিনারি দল রাখা হয়, কারণ ক্রেতারা নিশ্চিত হতে চান যে পশুটি সুস্থ ও রোগমুক্ত। বড় হাটে ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং অপারেটরদের বুথ বসাতে উৎসাহ দেওয়া হয়, যাতে বড় অঙ্কের টাকা হাতে থাকা ক্রেতা-বিক্রেতাকে কেবল নগদের ওপর নির্ভর করতে না হয়, যা চুরি ও জাল নোট উভয়ের বিরুদ্ধেই একটি সতর্কতা। উৎসবের পর করপোরেশন মৌসুমের আরেকটি ভারী কাজ সামলায়, গোটা শহরের রাস্তা ও হাট থেকে কোরবানির বর্জ্য পরিষ্কার করা।
প্রশাসক ও প্রতিমন্ত্রীর হাট ঘুরে দেখা এবং পুলিশ কমিশনারের চাঁদাবাজির অভিযোগ জানানোর উন্মুক্ত আহ্বান এই ঈদপূর্ব তদারকিরই অংশ। গাবতলীতে ব্যাপারী ও ক্রেতাদের সামনেই তা হয়, যাঁদের অভিযোগ শুনতে চাওয়ার কথা কর্তৃপক্ষ বলেছে এবং ন্যায্য দামে তাঁদের আস্থার ওপরই হাটগুলো টিকে থাকে।
ছবি: বাংলাদেশে ঈদুল আজহার সময়ের একটি পশুর হাট, তুলেছেন Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)।
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; আরটিভি নিউজ; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস); দৈনিক ইত্তেফাক; প্রথম আলো; সমকাল; সময়ের আলো; যুগান্তর; দৈনিক আজাদী; উইকিপিডিয়া।





মন্তব্য
(০)