২০২৩ সালের জুনে ঈদুল আজহার আগে কক্সবাজারে চাহিদার চেয়ে বেশি কোরবানির পশু মজুত ছিল, তবু হাটের ক্রেতারা বলেছেন, এমন চড়া দাম তাঁরা আগে দেখেননি। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাবে, জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৯২৩টি, আর বিক্রির জন্য আগে থেকে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৬২২টি গবাদিপশু। শেষ হাটের আগের দিন, মঙ্গলবার ২৭ জুন, প্রাচীন ঈদগাঁও গরুর বাজারের ক্রেতারা জানান, প্রায় সবাই ছোট ও মাঝারি দেশি গরু খুঁজছেন, আর এই চাহিদাই সে আকারের গরুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে দেশীয় খামারিদের অসন্তোষের কারণ ছিল সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে আসা গরু; তাঁদের দাবি, এর ফলে তাঁরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। জাগো নিউজ ২৪ বুধবার ২৮ জুন ২০২৩ সকালে এই চিত্র তুলে ধরে। পরদিন, বৃহস্পতিবার ২৯ জুন, দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়।
জেলাজুড়ে শেষ কয়েক দিনে প্রায় প্রতিটি হাটেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কোরবানির পশু বেচাকেনা হয়েছে। সব বাজারেই কাড়াকাড়ি ছিল মাঝারি ও ছোট গরু নিয়ে, যা বেশির ভাগ পরিবারের সাধ্যের মধ্যে এবং এক পরিবারের কোরবানির জন্য উপযোগী। বড় গরু, মহিষ ও ছাগলও হাটে উঠেছিল, আর দাম কমার আশায় অনেক ক্রেতা শেষ দিনের অপেক্ষায় ছিলেন।
চাহিদার চেয়ে বেশি পশু: জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাব
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের কোরবানির ঈদের জন্য কক্সবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রস্তুত ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৬২২টি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া; বিপরীতে জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৯২৩টি। বিক্রয়যোগ্য পশুর মধ্যে গরু ১ লাখ ৪৫২টি, মহিষ ৫ হাজার ৯৪টি, ছাগল ৩৫ হাজার ৪০৭টি এবং ভেড়া ১০ হাজার ৬৬৯টি।
সে মৌসুমে জেলায় মোট ৯০টি হাটে পশু কেনাবেচা হচ্ছিল: ৩৮টি স্থায়ী হাট আর ঈদ উপলক্ষে বসানো ৫২টি অস্থায়ী হাট। হাটে আনা পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রাণিসম্পদ কার্যালয় ২৭টি মেডিকেল টিম মাঠে রেখেছিল। কার্যালয়ের ভাষ্য ছিল, শেষ সময়ে এসে প্রতিটি হাটে বেচাবিক্রি বেশ ভালো।
এমন হিসাব প্রতিবছর ঈদের আগে করা হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) সারা দেশে প্রাণিচিকিৎসা ও প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ সেবা দেয়, আর তাদের মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোর মাধ্যমে এই প্রাক্কলন সংগ্রহ করা হয়। ২০২৩ সালের জুনে অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) দৈনিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বছরের শুরু থেকেই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা খামারিদের পশু পালনের পরামর্শ দেন, মোটাতাজাকরণে ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার না করতে সচেতন করেন এবং কত পশু পালন করা হচ্ছে তার হিসাব রাখেন। মাঠ থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় পর্যায়ের হিসাব তৈরি হয়।
কক্সবাজারে উদ্বৃত্ত পশুর হিসাব নতুন নয়। ২০১৯ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার হিসাবে জেলায় ১ লাখ ৫ হাজার চাহিদার বিপরীতে গরু ছিল ১ লাখ ৮ হাজার। ২০২১ সালের জুলাইয়ে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ঈদুল আজহার আগে কক্সবাজারের স্থানীয় খামারিদের কাছে ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৯টি গরু, আর স্থানীয় চাহিদা ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার। সে বছরগুলোতেও, ২০২৩ সালের মতোই, খামারিদের কাছে বড় প্রশ্ন ছিল পশু যথেষ্ট আছে কি না তা নয়, বরং তাঁরা ন্যায্য দাম পাবেন কি না।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জাহিদ ইকবাল বলেন, হাটগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে পশু বেচাকেনা হচ্ছে, আর তিনি আশা করেন শেষ দিনেও কোনো সমস্যা হবে না। তাঁর ভাষায়, যাঁদের পশু রাখার জায়গা আছে তাঁরা আগেই কিনে ফেলেছেন, আর যাঁদের সে সুযোগ নেই তাঁরা বুধবারই কোরবানির পশু কিনবেন।
ঈদগাঁও হাটের ক্রেতারা: ছোট দেশি গরুর দামই বেশি
প্রতিবেদনের বড় অংশ ঈদগাঁও বাজার থেকে, যা জেলার প্রাচীন গরুর বাজারগুলোর একটি। মঙ্গলবার (২৭ জুন) দুপুরে সেখানে কোরবানির পশু কিনতে আসা এ কে এম জাহাঙ্গীর ও মুহাম্মদ ইউনূস খান বলেন, সিংহভাগ ক্রেতার চাহিদা দেশি মাঝারি ও ছোট গরু। সে কারণে আড়াই থেকে তিন মণ ওজনের গরুর দাম আকারের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। মণ হলো দেশের হাটবাজারে প্রচলিত দক্ষিণ এশীয় ওজনের একক। তাঁদের হিসাবে, এই আকারের গরু ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
ঈদগাঁও হাটে আসা আরেক ক্রেতা জুনায়েদ বলেন, এবার কোরবানির পশুর দাম অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। তাঁর কথায়, যে আকারের গরু বছরের অন্য সময়ে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়, সে আকারের কোরবানির গরু এবার বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকায়। পশু দেখতে একটু সুন্দর ও তরতাজা হলেই বিক্রেতারা অনেক বেশি দাম হাঁকেন। অনেক হাট ঘুরেও তিনি তখনো পশু কিনতে পারেননি, আর বলেছিলেন, শেষ হাটের দিন বুধবার দাম যেমনই হোক, কিনতেই হবে।
শুধু তিনি নন, দাম বেশি বলে আরও অনেক ক্রেতা শেষ হাটের ওপর ভরসা করে ছিলেন। মৌসুমি পশু বিক্রেতা সাহাব উদ্দিনের দাবি, জেলায় চাহিদার চেয়ে বেশি পশু থাকার পরও সংকট দেখিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এটি তাঁর নিজের অভিযোগ; প্রতিবেদনে কোনো ব্যবসায়ীর নাম বা তাঁদের বক্তব্য ছিল না। দাম কমবেশি যা-ই হোক, বুধবারের শেষ হাটে ক্রেতার ভিড় বাড়বে বলে মনে করছিলেন সাহাব উদ্দিন।
দামের চাপ শুধু স্থানীয় কারণে ছিল না। ২০২৩ সালের জুনে দেশ রূপান্তর জানায়, পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় এবার কোরবানির পশুর দাম অন্তত ১০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, আর একই কারণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সারা দেশে ঘাস উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ১৮ জুন ২০২৩ তারিখের সমকালের সম্পাদকীয়তেও বলা হয়, গোখাদ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ায় খামারিরা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন; সম্পাদকীয়টির ভাষ্য, গোখাদ্য আমদানিনির্ভর হওয়ায় একটি সিন্ডিকেট এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রেখেছে বলে অভিযোগ আছে।

মহিষের চাহিদা আর ১৮ মণের 'রাজাবাবু'
কক্সবাজার শহর থেকে ঈদগাঁও হাটে পশু কিনতে আসা মিনহাজ আহমেদ বলেন, এবার হাটে মহিষের যোগান ভালো; ছোট, বড়, মাঝারি সব ধরনের মহিষ উঠেছে। তাঁর মনে হয়েছে, যেসব পরিবারে কারও গরুর মাংসে শারীরিক সমস্যা আছে, সেসব পরিবার কোরবানির জন্য মহিষ কেনায় ঝুঁকেছে। তাঁর কথায়, "আগে লোকজন মহিষ কিনত কম। কিন্তু এবার মহিষের বাজারেও ক্রেতার জট।" জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাবে বিক্রির জন্য মহিষ ছিল ৫ হাজার ৯৪টি, যা ১ লাখ ৪৫২টি গরুর পাশে সামান্য; তবে নিচের জাতীয় হিসাবে দেখা যায়, সে বছর কোরবানির উপযোগী মহিষ সবচেয়ে বেশি ছিল চট্টগ্রাম বিভাগেই।
দেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে মহিষের উল্লেখযোগ্য কোনো নিজস্ব জাত নেই; মহিষ মূলত হালচাষ ও গাড়ি টানার মতো ভারবাহী কাজে পালন করা হয়, আর দেশি মহিষের দুধ উৎপাদনও তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। যেসব জেলায় ভারবাহী পশু হিসেবে মহিষ পালন হয়, তার মধ্যে চট্টগ্রামের নাম আছে। বাংলাপিডিয়ার মতে, কাঁচা ঘাসের অভাবই দেশে মহিষ পালনের প্রধান সীমাবদ্ধতা, কারণ প্রতিটি মহিষের দিনে অন্তত ৩০ কেজি ঘাস দরকার।
আকারের অন্য প্রান্তে ছিল 'রাজাবাবু'। প্রায় ১৮ মণ ওজনের এই গরু বাজারে তুলে হইচই ফেলে দেন কক্সবাজারের ঝিলংজার খরুলিয়া এলাকার আরসিজি এগ্রোর মালিক মোহাম্মদ শফিক। তিনি গরুটির দাম হাঁকেন ১২ লাখ টাকা। এক শৌখিন ক্রেতা ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা দাম বলেছিলেন, কিন্তু শফিকের দাবি, সাড়ে ৭ লাখ টাকার কমে বিক্রি করলে তাঁর খরচই উঠবে না। খরুলিয়া আগেও খামার এলাকা হিসেবে খবরে এসেছে: ২০২১ সালের জুলাইয়ে সেখানকার এক খামারি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, মিয়ানমার থেকে গরু আসায় তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

মহাসড়কে হাট, যানজট আর সড়কে হাট বসানোয় নিষেধাজ্ঞা
গরুর হাট জমে উঠলেও মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতকারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। প্রাচীন ঈদগাঁও এবং খরুলিয়া গরুর বাজার দুটি মহাসড়কের ওপরই বসায় দুই জায়গাতেই বেলা ১১টা থেকে রাত পর্যন্ত যানজট লেগে থাকত, ভোগান্তিতে পড়তেন যাত্রী ও পথচারীরা। রাস্তার ধারে হাট বসলে কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি প্রশাসন দিলেও তখন পর্যন্ত সড়কের ওপরেই কেনাবেচা চলেছে। স্থানীয়দের দাবি ছিল, বাজার দুটি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হোক।
জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অবশ্য স্পষ্ট ছিল। ১৪ জুন ২০২৩ বিডিনিউজ২৪ জানায়, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবারের ঈদে সড়কের ওপর কোনো পশুর হাট বসানো যাবে না। ঢাকার সচিবালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর জাতীয় পশুর হিসাবের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়; সভায় প্রত্যন্ত এলাকায় পশু পরিবহন সচল রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়।
ঈদগাঁও ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর থানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং ২০২১ সালের ২৬ জুলাই উপজেলায় উন্নীত হয়। কক্সবাজার সদর উপজেলার উত্তরের পাঁচটি ইউনিয়ন, ইসলামপুর, পোকখালী, ইসলামাবাদ, ঈদগাঁও ও জালালাবাদ নিয়ে গঠিত নতুন উপজেলাটির আয়তন ১১৯.৬৬ বর্গকিলোমিটার। এর পূর্বে রামু, দক্ষিণে কক্সবাজার সদর, পশ্চিমে মহেশখালী আর উত্তরে চকরিয়া।
মিয়ানমারের গরু ও সীমান্তের প্রেক্ষাপট
জাগো নিউজ ২৪-কে অনেকে জানান, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের একাধিক এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে মিয়ানমারের গরু প্রবেশ করেছে, আর খামারিদের দাবি, এর ফলে তাঁদের অনেকে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রতিবেদনের শুরুতেও দেশীয় খামারিদের অসন্তোষের কারণ হিসেবে টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ি দিয়ে ঢোকা গরুর কথা বলা হয়। এগুলো খামারি ও স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবেদনে যেভাবে এসেছে।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ারুল হোসাইন বলেন, রামুর গর্জনিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির কোরবানির হাটে চোরাই গরু প্রবেশ ঠেকাতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কড়া দায়িত্ব পালন করছে। তাঁর ভাষ্য, মৌসুমের শুরুর দিকে কিছু গরু-মহিষ চোরাই পথে এলেও কিছুদিন ধরে তা পুরোপুরি বন্ধ।
ভূগোলই বলে দেয়, কেন প্রতিবছর এই প্রশ্ন ওঠে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কক্সবাজার জেলার পূর্বে বান্দরবান জেলা, মিয়ানমারের আরাকান ও নাফ নদী। দক্ষিণ প্রান্তের টেকনাফ উপজেলার পূর্বে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য, আর এর প্রধান নদী নাফ। নাইক্ষ্যংছড়ির হাট রামু এলাকার ক্রেতাদেরও কাজে লাগলেও উপজেলাটি বান্দরবান জেলার; এর দক্ষিণ ও পূর্বে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য। বাংলাপিডিয়ায় এখানকার হাটের মধ্যে বাহিছড়ি হাট, নাইক্ষ্যংছড়ি হাট, ঘুমধুম হাট, বড়ইতলী হাট ও দোছড়ি হাটের নাম দেয়। ওসি যে গর্জনিয়া হাটের কথা বলেছেন, সেটি রামু উপজেলার ৩২টি হাটবাজারের মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলোর একটি।
একসময় মিয়ানমার থেকে প্রকাশ্যেই গরু আমদানি হতো। ২০১৭ সালের আগস্টে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ট্রলারে করে নাফ নদী পেরিয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ করিডরে গরু আনা হচ্ছে; টেকনাফ শুল্ক কর্তৃপক্ষ প্রতিটি পশু থেকে ৫০০ টাকা রাজস্ব পাচ্ছিল, আর জেলা প্রশাসন প্রতিটি গরুতে ৫০ টাকা নিচ্ছিল। সে বছরের জুলাই-আগস্টে অন্তত ৮ হাজার ৫০০ গরু এসেছিল, যেখানে ২০১৬ সালের একই সময়ে এসেছিল ৩ হাজার ৪৩৫টি। ২০১৯ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জেলা প্রশাসন শাহপরীর দ্বীপ করিডর দিয়ে আমদানি বন্ধ করেছে; তার আগে টেকনাফ শুল্ক কর্তৃপক্ষ সে বছরের জুনে ১০ হাজার ১৭৭টি ও জুলাইয়ে ১০ হাজার ৯৫টি গরু আসার হিসাব দিয়েছিল। তখনকার জেলা প্রশাসকের উদ্ধৃতি ছিল, চাহিদার বেশি আমদানি করলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন; আকস্মিক নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেন ব্যবসায়ীরা।
২০২১ সালের জুলাইয়ে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, খামারিদের লোকসানের কথা বিবেচনা করে সরকার সে বছরের ৫ জুলাই মিয়ানমার থেকে গরু আমদানি বন্ধ করে; জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বরাতে পত্রিকাটি লেখে, আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি সে বছর মিয়ানমার থেকে কোনো পশু আমদানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যদিও কিছু ব্যবসায়ী নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পশু এনেছেন। ২০২৩ সালে অবস্থা ছিল, বিদেশি গরু আমদানি করা যাবে না। ১৮ জুন ২০২৩ তারিখের সমকালের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, দেশীয় খামারিদের স্বার্থে বিদেশি গরু আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে; সম্পাদকীয়টি উদ্বেগ জানায় যে, তা সত্ত্বেও কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চোরাই পথে ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে, আর সেই গরু সীমান্ত হাটে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে।

২০২৩ সালের ঈদুল আজহায় দেশের চিত্র
কক্সবাজারের উদ্বৃত্ত ছিল দেশজুড়ে উদ্বৃত্তেরই অংশ। ১৪ জুন ২০২৩ আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানান, সে বছর সারা দেশে কোরবানির জন্য প্রস্তুত ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি পশু, বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি; অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ২১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯৪টি পশু বেশি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৮ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫২টি, ছাগল ও ভেড়া ৭৬ লাখ ৯০ হাজার, আর অন্যান্য প্রজাতির পশু ২ হাজার ৫৮১টি। মন্ত্রণালয় জানায়, পশুর কোনো সংকট নেই এবং আমদানির প্রয়োজন নেই।
একই ব্রিফিংয়ে আগের বছরের হিসাবও দেওয়া হয়: ২০২২ সালে কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি পশু, আর কোরবানি হয়েছিল ৯৯ লাখ ২১ হাজার ৯৪১টি। মন্ত্রী জানান, ২০২৩ সালের সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৪৪টি বেশি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগে কোরবানির পশু ছিল ২০ লাখ ৫৩ হাজার ১২৮টি; রাজশাহী বিভাগে ৪৫ লাখ ১১ হাজার ৬১৪টি, রংপুরে ১৯ লাখ ৬২ হাজার ৯৫১টি, খুলনায় ১৫ লাখ ১১ হাজার ৭০৮টি, ঢাকায় ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫৪টি, ময়মনসিংহে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৪৭টি, বরিশালে ৪ লাখ ৯৩ হাজার ২০৬টি এবং সিলেটে ৪ লাখ ১০ হাজার ২২৫টি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে দেশ রূপান্তর ১৮ জুন ২০২৩ জানায়, সে বছর কোরবানির উপযোগী গরু ও মহিষ, দুটিতেই শীর্ষে ছিল চট্টগ্রাম বিভাগ: গরু ১২ লাখ ৪ হাজার ১০৮টি এবং মহিষ ১ লাখ ৪৯২টি। দুটিতেই দ্বিতীয় রাজশাহী বিভাগ; গরুতে তৃতীয় রংপুর আর মহিষে তৃতীয় বরিশাল বিভাগ।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, কোরবানির ঈদকে লক্ষ্য করে দেশে গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া পালন বেড়েছে, ফলে প্রায় পাঁচ বছর ধরে কোরবানির সময় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পশু আমদানি করতে হয়নি। অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া পালনে সরকার বিশেষ সহায়তা দিচ্ছে, আর কয়েক বছর ধরে দেশের পশুতেই কোরবানিসহ মাংসের চাহিদা মিটছে।
হিজরি জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। ২০২৩ সালের ১৯ জুন ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে বৈঠকে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি জানায়, সেদিন সন্ধ্যায় জিলহজের চাঁদ দেখা গেছে এবং ২৯ জুন দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে; সৌদি আরবে ঈদ হয় এক দিন আগে, ২৮ জুন। এই সূচির কারণেই বুধবার ২৮ জুন ছিল কক্সবাজারে শেষ পূর্ণ হাটের দিন, আর সে কারণেই সেখানকার এত ক্রেতা ওই দিনের অপেক্ষায় ছিলেন।

কক্সবাজার জেলা ও হাটের এলাকাগুলো
কক্সবাজার চট্টগ্রাম বিভাগের একটি উপকূলীয় জেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ২ হাজার ৩৮২.৩৮ বর্গকিলোমিটার, আর ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৬৮। এর উত্তরে চট্টগ্রাম জেলা, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে বান্দরবান জেলা, মিয়ানমারের আরাকান ও নাফ নদী। প্রধান নদী মাতামুহুরী, বাঁকখালী ও নাফ। জেলার ৪৯.৮৪ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, এরপর ব্যবসা ১৭.৩৯ শতাংশ।
যে রামু উপজেলার গর্জনিয়া হাটে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারির কথা ওসি বলেছেন, তার আয়তন ৩৯১.৭১ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১১টি, তার একটি গর্জনিয়া। প্রধান নদী বাঁকখালী; প্রধান ফসল ধান, আলু, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, পান, রাবার ও সবজি। এখানকার ৪৭.০১ শতাংশ মানুষের আয়ের উৎস কৃষি। প্রতিবেদনে উল্লেখিত সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের আয়তন ৩৮৮.৬৬ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ছয়টি, টেকনাফ ও সাবরাং থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পর্যন্ত; এর উল্লেখযোগ্য হাটের মধ্যে আছে সাবরাং হাট ও শাহপরীর দ্বীপ হাট।
প্রতিবেশী বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার আয়তন ৪৬৩.৬০ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন চারটি: ঘুমধুম, দোছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি ও বাইশারী। প্রধান ফসল ধান, আখ, তিল, তুলা, ভুট্টা, রাবার, তামাক, পান, হলুদ, আদা ও সবজি; এখানকার ৫১.৯৩ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
সংখ্যায় দেশের প্রাণিসম্পদ
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সারসংক্ষেপ "লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স" অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ঈদের আগের সর্বশেষ পূর্ণ অর্থবছর ২০২১-২২ সালে দেশে গরু ছিল ২৪৭.০০ লাখ, মহিষ ১৫.০৮ লাখ, ছাগল ২৬৭.৭৪ লাখ এবং ভেড়া ৩৭.৫২ লাখ। সে বছর মাংস উৎপাদন হয় ৯২.৬৫ লাখ টন, বিপরীতে জনপ্রতি দিনে ১২০ গ্রাম ধরে চাহিদা ছিল ৭৫.২০ লাখ টন; অধিদপ্তরের হিসাবে প্রাপ্যতা ছিল জনপ্রতি দিনে ১৪৭.৮৪ গ্রাম। স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অবদান ১.৯০ শতাংশ, আর কৃষি জিডিপিতে ১৬.৫২ শতাংশ। অধিদপ্তরের প্রাক্কলন, দেশের ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ আংশিকভাবে এ খাতে নিয়োজিত।
বাংলাপিডিয়া দেশের চারটি উন্নত দেশি জাতের নাম দেয়: পাবনা, রেড চিটাগাং, মুন্সীগঞ্জ ও নর্থ বেঙ্গল গ্রে। রেড চিটাগাং গরুর গায়ের রং লাল, আর এ জাত প্রায় দুই লিটার দুধ দিতে পারে। দেশি গরু একসঙ্গে নানা কাজে লাগে: হালচাষের শক্তি, দুধ ও মাংস দেয়, আর গোবর সার ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সংকরায়ণের জন্য হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহিওয়াল ও সিন্ধির মতো বিদেশি জাত আনা হয়েছে; খামারিদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে বাংলাপিডিয়া কাঁচা ঘাসের অভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও হিসাব না রাখার কথা উল্লেখ করে।
ছবি: Faizul Latif Chowdhury / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিডিনিউজ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, দেশ রূপান্তর, সমকাল, দ্য ডেইলি স্টার, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)