দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন কেপ অঞ্চলে ড্রোন ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছিল। বিবিসি বাংলা ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিবিসির সংবাদদাতা তুরাই মাদুনা গিয়েছিলেন ফার্স্ট ফ্রুট গ্রুপ নামের একটি লেবু বাগানে, যার বেশির ভাগ লেবু রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে আর বাকিটা যায় স্থানীয় সুপার মার্কেটে। সেখানে নিয়মিত মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন উড়ে পুরো বাগানের ওপর নজর রাখছিল।
চোখের সীমা পেরিয়ে পুরো বাগানে নজর
বড় বাগানে একজন মানুষ দিনে কতটুকু জায়গা ঘুরে দেখতে পারবেন, তা নির্ভর করে চোখের সীমা আর সময়ের ওপর। ফার্স্ট ফ্রুট গ্রুপের প্রধান নির্বাহী হাইন গার্বার বিবিসিকে বলেন, "সাধারণত আপনার যতদূর চোখ যাবে আপনি তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সময়েরও একটা ব্যাপার আছে। এই দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করবে আপনি দিনে আপনার বাগানের নির্দিষ্ট কতটুকুর উপর নজর রাখতে পারবেন। কিন্তু ধরুন বাগানের অন্য কোন অংশে আপনার যাওয়া হলো না আর সেখানে কোন সমস্যা হয়ে গেলো।"
দূর থেকে চালানো ছোট এই উড়ন্ত যন্ত্র সেই সমস্যারই সমাধান দিচ্ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় এই প্রযুক্তির উদ্যোক্তারা জানান, খামারের বেড়া কোথাও ভেঙে গেছে কি না, কোথায় পানির অভাবে ফসল শুকিয়ে যাচ্ছে, কোন অংশে ফলন কম হয়েছে কিংবা কোথায় মাটির অবস্থা কেমন, সবই ড্রোনের তোলা ছবিতে উঠে আসে। সেই তথ্য প্রতিদিন কম্পিউটারে পৌঁছায়, যা নিয়মিত বিশ্লেষণ করা যায়। হাইন গার্বার জানান, ড্রোন ব্যবহার করে তাঁর খামার বেশ উপকৃত হচ্ছে।
কৃষিকাজে ব্যবহৃত ড্রোন ফসলের বৃদ্ধির ধাপ, ফসলের স্বাস্থ্য ও মাটির তারতম্য সম্পর্কে তথ্য দেয়। অনেক ড্রোনে মাল্টিস্পেকট্রাল সেন্সর থাকে, যা খালি চোখে দেখা আলোর বাইরের নিয়ার-ইনফ্রারেডসহ বিভিন্ন তরঙ্গের ছবি তোলে; আবার কোনো কোনো ড্রোনে বালাইনাশক ছিটানোর যন্ত্রও লাগানো হয়।

খরার মধ্যে সেচ ব্যবস্থাপনায় ড্রোনের ছবি
ওয়েস্টার্ন কেপ অঞ্চলের খামারগুলোকে ড্রোন সেবা দিচ্ছিল কেপটাউনের প্রতিষ্ঠান অ্যারোবটিকস, যারা ড্রোনের তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে। সিএনএন মানির ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেপটাউনের কাছে একটি ফলের খামারে বেড়ে ওঠা জেমস প্যাটারসন সহপ্রতিষ্ঠাতা বেনজি মেলৎজারকে নিয়ে ২০১৪ সালে নিজের গ্যারেজে ড্রোন বানানো শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানটি স্যাটেলাইট, ড্রোন ও মোবাইল ফোনের ছবি কম্পিউটারে বিশ্লেষণ করে অ্যারোভিউ নামের অ্যাপে ফসলের স্বাস্থ্যের তথ্য দেয়, যা রোগ, পোকামাকড় এবং পানি বা পুষ্টির অভাবজনিত সমস্যা চিহ্নিত করতে পারে।
অ্যারোবটিকসের প্রধান নির্বাহী জেমস প্যাটারসন বিবিসিকে বলেন, "এই মুহূর্তে মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করা এই অঞ্চলের জন্য সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওয়েস্টার্ন কেপ অঞ্চলে এই মুহূর্তে খরা বিরাজ করছে। বাগানগুলো তাই সঠিকভাবে সেচ ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করছে।" তিনি জানান, কোন অংশে কম সেচ দেওয়া হয়েছে এবং কোথায় কতটা ফলন হলো, তা ড্রোনের ছবিতে বোঝা যায়, ফলে সমস্যা বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ে।
সেই খরা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে, আর ২০১৭ সাল ছিল ১৯৩৩ সালের পর সবচেয়ে শুষ্ক বছর। ২০১৭ সালের মে মাসে কেপটাউনের পানির উৎস বাঁধগুলোতে ধারণক্ষমতার মাত্র ২১ দশমিক ২ শতাংশ পানি ছিল।


আফ্রিকার কৃষিতে ড্রোনের সম্ভাবনা ও বাধা
জাতিসংঘের ২০১৭ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৯ দশমিক ৮ বিলিয়নে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০০৯ সালে হিসাব দিয়েছিল, ২০৫০ সালের বাড়তি জনগোষ্ঠীকে খাওয়াতে খাদ্য উৎপাদন ৭০ শতাংশ বাড়াতে হবে। এতে আফ্রিকার ভূমিকা বড়: আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংকের 'ফিড আফ্রিকা' কৌশলপত্র বলছে, পৃথিবীতে এখনো চাষ না হওয়া আবাদযোগ্য জমির ৬৫ শতাংশ এই মহাদেশে।
খামারিরা যাতে মোবাইল ফোনের অ্যাপ দিয়ে নিজেরাই এসব ড্রোন চালাতে পারেন, সে ব্যবস্থা চালুর চেষ্টাও চলছিল। তবে ইন্টারনেটের গতি তখনো বড় বাধা ছিল। জেমস প্যাটারসন বলেন, "আফ্রিকা ভিত্তিক হওয়ার একটি বিষয় হলো সব যায়গায় আমরা ভালো ইন্টারনেট পাইনা। আমরা যে তথ্য সংগ্রহ করি সেটি ক্লাউড ভিত্তিক।" ইন্টারনেটের অভাবে সংগৃহীত তথ্য সব সময় দ্রুত গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো যায় না, যদিও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ড্রোনের মতো প্রযুক্তি তরুণ প্রজন্মের কাছে কৃষিকে আকর্ষণীয় করে তুলবে বলেও মনে করা হচ্ছিল। প্রযুক্তিনির্ভর এই চাষাবাদকে বলা হচ্ছিল স্মার্ট ফার্মিং।

ছবি: Trusted user53 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, সিএনএন মানি, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ (ইউএন ডেসা), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)